
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : সমাজ ও পরিবারের নানা বাধা কাটিয়ে জীবনসংগ্রামে সাফল্য অর্জন করেছেন সাতক্ষীরা জেলার পাঁচ অদম্য নারী। নানা বাধা-বিপত্তিকে পায়ে মাড়িয়ে তৃণমূল থেকে উঠে আসা এসব নারীকে খুঁজে বের করে ‘অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫’-এর জন্য পাঁচটি ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত করেছে জেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। এই পাঁচ নারীর প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে অসীম আত্মশক্তি ও সংগ্রামের আলাদা আলাদা জীবনকাহিনি। তাদের সেই সংগ্রামী জীবনের কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো—
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী রায়হাতুল জান্নাত রিমি
জীবনসংগ্রামে দারিদ্র্যকে পিছনে ফেলে সাফল্য অর্জন করেছেন রায়হাতুল জান্নাত রিমি। তিনি সাতক্ষীরা সদরের কাটিয়া লস্করপাড়া এলাকার মো. মিজানুর রহমান ও মোছা. শাহানারা বেগমের কন্যা। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে হওয়ায় অত্যন্ত আদর-যত্নে বড় হচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি বাল্যবিবাহের শিকার হন। এরপর শুরু হয় তার জীবনের করুণ অধ্যায়।
নিজেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি তার বাবা-মায়ের কাছে রিমিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। পূর্বে দুইবার বিয়ে করা ওই যুবক রিমিকে বিদেশে নিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখান। এ দিকে হজে পাঠানোর নাম করে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় সে। অথচ তাদের হজে না নিয়ে পালিয়ে যায়। সেই ঋণের বোঝা রিমির বাবাকে পরিশোধ করতে হয়।
এরই মধ্যে রিমির একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। এ সময় হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তার প্রচণ্ড খিঁচুনি ও ব্রেইন স্ট্রোক হয়। যার ফলে রিমির শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে যায়। একপর্যায়ে স্বামীর সঙ্গে তার ডিভোর্স হয়ে যায়।
এ দিকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় সাতক্ষীরা জেলার মধ্যে কেন্দ্রে প্রথম হন রিমি। পরীক্ষার পর হস্তশিল্প ও বিউটি পার্লারের কাজ শেখার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। পারিবারিকভাবে আবারও তার বিয়ে হয়। কিছুদিন পর তাদের ঘরে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। এ দিকে তার দ্বিতীয় স্বামী নারীঘটিত ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গেও তার ডিভোর্স হয়ে যায়।
ডিপ্লোমার পাশাপাশি মাস্টার্স সম্পন্ন করে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরি শুরু করেন রিমি। পরে ওই চাকরি ছেড়ে বিউটি পার্লার ও বিভিন্ন হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নিতে তিনি ভারতে যান। দেশে ফিরে সাতক্ষীরা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে তিন মাসের বিউটিফিকেশন প্রশিক্ষণ নেন।
সাতক্ষীরা শহরের নারিকেলতলা মোড়ে একটি পার্লার ও বুটিক্স খোলেন তিনি। বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে বুটিক্সের পোশাক, কসমেটিকস ও জুয়েলারি বিক্রি করে লাখ টাকা আয় করছেন। বিজয় মেলায় সেরা স্টল বিজয়ী হিসেবে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ক্রেস্ট এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে সেরা উদ্যোক্তা হিসেবে সম্মাননা পুরস্কার পান।
বর্তমানে দেশি হাঁস-মুরগি ও ফাওমি মুরগিসহ তার পাঁচটি মুরগির ঘর রয়েছে। সেখান থেকে ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ করে বাইরে বিক্রি করে আয় করছেন। পার্লারের পাশে রাস্তার ধারে পাঁচজন নারী উদ্যোক্তাকে সঙ্গে নিয়ে স্ট্রিট ফুডের স্টল করেছেন। বর্তমানে তিনি পৌরসভা নারী সুরক্ষা ফোরামের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একসময় দুঃখ-কষ্টে থাকা রায়হাতুল জান্নাত রিমি বর্তমানে ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করছেন।
শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সফল নারী গুলশান আরা বেগম
শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী গুলশান আরা বেগম। তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাগানবাড়ি গ্রামের শেখ মিজানুর রহমানের কন্যা। আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন।
দাদা-দাদি, চাচা, বাবা-মা ও সাত ভাইবোন নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার তার। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন গুলশান আরা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃত্তি পেয়ে মাধ্যমিকে ভর্তি হন। তিনি এসএসসি ও এইচএসসিতে স্টাইপেন্ডসহ প্রথম বিভাগে পাস করেন।
বাবার স্বল্প আয়ে তখন বড় পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে বাবা তার বিয়ে দিয়ে দেন। শ্বশুরবাড়িতে রান্নাবান্না ও অন্য সব কাজের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও তিনি স্নাতকে ভর্তি হন। শ্বশুরবাড়ির প্রতিকূল পরিবেশ তার লেখাপড়ার পথে বারবার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্য দিয়েই তিনি স্নাতক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স (এমএসএস) ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০০০ সালে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর সি.ইন.এড ও বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন।
করোনাকালে তিনি জেলা প্রশাসক পরিচালিত অনলাইন স্কুল, ‘ঘরে বসে শিখি’ অনলাইন পাঠদান এবং গুগল মিট ব্যবহার করে পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করেন।
শিক্ষাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি তিনি শিশুদের সৃজনশীলতার বিকাশে আবৃত্তি, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন, বিতর্ক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চায় কাজ করে চলেছেন। তিনি নিয়মিত ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করেন এবং মাল্টিমিডিয়া ও প্রজেক্টরের মাধ্যমে শ্রেণি পাঠ পরিচালনা করেন।
তিনি শুধু লেখাপড়াই করান না; পুরো সমাজকে জাগিয়ে তোলার জন্য শিক্ষা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিবর্তনের সোপান তৈরি করেন। কন্যাশিশু ও অসহায় নারীদের এগিয়ে নিতে গ্রহণ করেছেন নানামুখী উদ্যোগ।
ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি রচনা করেছেন ‘অনাগত সন্ধ্যার পদধ্বনি’ ও ‘শিলাখণ্ড সাজায় নতুন স্বপ্ন’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ। প্রাথমিক শিক্ষায় তার গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘আমার প্রাথমিক শিক্ষা ভাবনা’। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয় তার প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও কবিতা।
তিনি ২০২৩ সালে সাতক্ষীরা জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হন। নিজের জীবনের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নারী শিক্ষা তথা নারীর জীবনের মান পরিবর্তনে তিনি অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।
সফল জননী লুৎফুন নেছা বেগম
সফল জননী সেই মা, যিনি নিজের সন্তানদের জীবনের প্রতিটি ধাপে সফল করে গড়ে তুলেছেন এবং তাদের সাফল্যে গর্বিত। এমনই একজন প্রেরণাদায়ী নারী লুৎফুন নেছা বেগম লুৎফা, যিনি প্রতিকূলতার মাঝেও দৃঢ় মনোবল নিয়ে আজ সমাজে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
মাত্র দুই বছর বয়সে মায়ের স্নেহের ছায়া হারিয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন লুৎফা। পিতা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর সৎমায়ের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে তিনি বড় হন। শৈশব থেকেই মেধাবী ছিলেন তিনি, কিন্তু সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বাল্যবিবাহ হয়। নতুন জীবনে পা রাখতেই শুরু হয় আরেক দফা সংগ্রাম। শ্বশুরবাড়ির নানা কষ্ট ও নির্যাতন।
স্বামীর ছিল সাত ভাইবোন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তার স্বামী। সংসার চালানো ও দেবর-ননদদের শিক্ষার দায়িত্ব এসে পড়ে লুৎফার কাঁধে। কটূ কথা, অপমান ও শারীরিক নির্যাতন, সব সহ্য করেও তিনি হার মানেননি।
প্রথম সন্তান জন্মের পরেও নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাননি তিনি। একসময় মনে হয়েছিল সব ছেড়ে পালিয়ে যায়, কিন্তু সৎমায়ের মুখ ভেসে উঠতেই নিজেকে শক্ত করেন। নিজের কাছে অঙ্গীকার করেন, আমার সন্তানরা মানুষ হবে, তবেই আমার জীবনের দুঃখ ঘুচবে।
ক্রমে দেবর-ননদদের আলাদা সংসার হওয়ার পর লুৎফা আরও মনোনিবেশ করেন সন্তানদের মানুষ করার কাজে। স্বল্প আয়ের সংসারে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে তিনি গরু, হাঁস-মুরগি, কবুতর পালন ও সেলাই কাজসহ নানা পরিশ্রমমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।
সন্তানদের পড়ার টেবিলে বসিয়ে নিজেও পাশে বসতেন অনুপ্রেরণা হয়ে। তার অক্লান্ত পরিশ্রম, দৃঢ় মনোবল ও মমতাময়ী নেতৃত্বে আজ তার সব সন্তান উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত।
অগণিত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা ও কষ্টের মাঝেও লুৎফুন নেছা আজ একজন সফল জননী হিসেবে সমাজে অনন্য উদাহরণ।
নির্যাতিতা থেকে উদ্যমী ও স্বাবলম্বী নারী মেরিনা খাতুন
নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নবউদ্যমে জীবন শুরু করা নারী মেরিনা খাতুন। তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পরানপুর গ্রামের মাহাবুব রহমানের মেয়ে।
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্যবিবাহের শিকার হন মেরিনা। বিয়ের বছর খানেক পরই তিনি সন্তান জন্ম দেন। কিছুদিন পর থেকেই তার ওপর শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তার স্বামী ছিলেন নেশাগ্রস্ত।
সংসারে অশান্তির মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান মেরিনা। এরই মধ্যে সংসারে আরেক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। একপর্যায়ে তিনি এইচএসসি পাস করেন।
একদিন নেশাগ্রস্ত স্বামী তার সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলেন। মেরিনাকে একটি ঘরে বন্দি করে রাখেন এবং তার দুই হাতের আঙুল কেটে দেন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন।
এরপর সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসলে সেখানে গিয়ে নেশাগ্রস্ত স্বামী আবারও তাকে কুপিয়ে আহত করে এবং শিশু সন্তানকে জবাই করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে স্বামীকে ডিভোর্স দেন মেরিনা।
এরপর আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে দর্জির কাজ করে সংসারে কিছু উপার্জন করছেন। এছাড়া মেরিনা খাতুন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উত্তরণে একটি প্রকল্পে কিছুদিন চাকরি করেছেন। দুই সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে লড়ে যাচ্ছেন তিনি।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন মোহিনী পারভীন
সমাজ উন্নয়ন, মানবিকতা ও নেতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অদম্য নারী পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন সাতক্ষীরা সদরের মধ্যকাটিয়া মিলবাজার গ্রামের বাসিন্দা মোহিনী পারভীন।
একজন সাহসী ও সচেতন সমাজকর্মী হিসেবে মোহিনী ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনি একজন ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব প্রদান করেছেন।
একই সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি বিভিন্ন সময় বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে মেধা অন্বেষণমূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি শহর ও আশপাশের এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি নিজেকে স্বাবলম্বী করে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করছেন।
জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করাসহ বন্যাকবলিত অঞ্চলে ত্রাণ সহায়তা প্রদান, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক সহমর্মিতা গড়ে তুলতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এছাড়াও মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন, বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন এবং যুব সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।