
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের ঘোনা মাদারডাঙা গ্রামের নিউটন মন্ডল এখন এলাকায় পরিচিত নাম। স্থানীয়ভাবে সবাই তাকে চেনে ‘কচু নিউটন’ নামে। মহানগরীর দৌলতপুর–শাহপুর সড়কের পাশে বিস্তীর্ণ পানিকচুর ক্ষেতই তার সাফল্যের গল্পের সাক্ষী।
একসময় নিউটন মন্ডল বেসরকারি একটি পাটকলে কাজ করতেন। সেখানে কাজ করার সময় শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতায় ভুগে মিলের চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। অভাবের সংসারে জীবিকার সন্ধানে বাড়ির পাশের ৩৪ শতক জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। লাভজনক না হওয়ায় ২০০৫ সালে তিনি জমির একটি অংশে স্থানীয় জাতের পানিকচুর চারা রোপণ করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
বর্তমানে তিনি ৫৫ শতক জমিতে পানিকচুর চাষ করছেন। বর্গা নেওয়া এই জমির জন্য প্রতিবছর ১২ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। কচুর লতি, ফুল, কচু ও চারা বিক্রি করে বছরে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি। ঘেরের পাড় থেকে সংগৃহীত দেশি জাতের পানিকচুর চারা নিজস্ব পদ্ধতিতে রোপণ করেন নিউটন। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে রোপণ শেষ হয়। তিন ফুট দূরত্বে এক ফুট গভীর করে চারা রোপণ করা হয় এবং পরে সুষমভাবে জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয়।
রোপণের ৪৫ দিনের মধ্যেই কচুর লতি বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। নিউটনের কচু সাত ফুট পর্যন্ত লম্বা হয় এবং প্রতিটির ওজন ২০ থেকে ৩২ কেজি পর্যন্ত। নিজস্ব ভ্যানে করে খুলনা শহরে কচু বিক্রি করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করেও বিক্রি কার্যক্রম চালান নিউটন।
এখন তার উৎপাদিত কচু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কোরিয়ায় রপ্তানির প্রস্তুতি চলছে। ক্ষেত থেকে কচু তুলে পরিষ্কার করে খোসা ছাড়িয়ে এক হাত পরিমাণ করে কেটে রোদে শুকানো হয়। তিন থেকে চার দিন শুকানোর পর কচু খুলনা শহরে এনে কোরিয়ান বায়ারের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে।
নিউটন মন্ডল বলেন, “এতদিন আমার কচু দেশের বিভিন্ন বিভাগে গেছে। এখন সেই কচু যাচ্ছে দেশের বাইরে। একসময় মানুষ পাশ দিয়ে গেলেও ফিরত না। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আমার ক্ষেত দেখতে আসে। শ্রম কখনো বিফলে যায় না।” তিনি জানান, তার একমাত্র স্বপ্ন—মেয়েকে বড় করে ডাক্তার বানানো, যাতে সে গরিব ও অসহায় মানুষের সেবা করতে পারে।
নিউটনের স্ত্রী স্মৃতিলতা মালাকার বলেন, “শুরুর দিকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমরা থেমে যাইনি। আজ সেই কচুই আমাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে।” তিনি আরও জানান, কচু চাষের পাশাপাশি তারা গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। পেয়ারার চাষ, বিটি বেগুন ও চুঁইঝালের চাষাবাদেও ভালো ফল পাচ্ছেন।
নিউটন মন্ডলের এই সাফল্য ডুমুরিয়া অঞ্চলের কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

