
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি ও ভোজ্য তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার প্রতিরোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তৎপরতা জোরদার করেছে। ভোজ্য ও জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও পাচার প্রতিরোধ, আভিযানিক সফলতা, আসন্ন পহেলা বৈশাখ ও পবিত্র ঈদ-উল-আজহা (কোরবানি ঈদ) উপলক্ষে বিজিবির পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে প্রেস ব্রিফিং করেছে নীলডুমুর ১৭ বিজিবি। শুক্রবার (১১ এপ্রিল) রাতে নীলডুমুর ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্নেল শাহারিয়ার রাজীব স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, দক্ষিণ পশ্চিম রিজিয়ন, যশোর এর দায়িত্বপূর্ণ ৬০০ কিলোমিটার এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান দমন, অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম ০২টি সেক্টরের অধীনে ০৭টি ইউনিটের ১১৬ টি বিওপি’র মাধ্যমে প্রতিদিন দিবারাত্রি ৪৬৪ টি টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভোজ্য ও জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও পাচার এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধ, আসন্ন পহেলা বৈশাখ ও পবিত্র ঈদ-উল-আজহা (কোরবানি ঈদ) উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও সম্ভাব্য পশু চোরাচালান রোধ এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ব্যাপক ও সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ প্রেক্ষিতে যশোর রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তীসহ অন্যান্য এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
যেমন- বেনাপোল, ভোমরা এবং দর্শনা স্থলবন্দর এলাকায় আমদানি রপ্তানির যানবাহনে বিগত ২৪ ঘন্টায় ৩৩টি বিশেষ নজরদারী/তল্লাশী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। স্থল বন্দর ও সীমান্তবর্তী ২২টি তেল পাম্প এ নিয়মিত নজরদারী, বিশেষ চেকিং এবং শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা, সীমান্তবর্তী এলাকায় ভোজ্য ও জ্বালানি তেল চোরাচালানের রুট চিহ্নিত করে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারিসহ ২৩২৫টি নিয়মিত ও বিশেষ টহল এবং ৮৯৯টি বিশেষ চেকপোষ্ট, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ৮৬৮টি জনসচেতনতা মূলক মতবিনিময়সভা পরিচালনা করা হয়েছে।
এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ এবং শুল্ক বিভাগের সাথে সমন্বয় করে ৩১টি টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে; যাতে অবৈধভাবে মজুদকৃত জ্বালানি তেল জব্দসহ ০১ জনকে ০২ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে ৬৬টি যৌথ নজরদারী, তল্লাশি ও চেক পোস্ট পরিচালনা করা হয়েছে।
আসন্ন ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার রোধে বিজিবি বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি, অতিরিক্ত টহল, চেকপোস্ট স্থাপন এবং সন্দেহভাজন চলাচল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সীমান্তবর্তী জনগণের মাঝে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকান্ডের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে।
এছাড়াও, নিয়মিত আভিযানিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যশোর রিজিয়ন সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে চলতি ২০২৬ সালে ৮৮ জন আসামীসহ সর্বমোট ৫৮ কোটি ৯৩ লক্ষাধিক টাকার চোরাচালানী মালামাল আটক করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে ১.২৮৯১৫ কেজি স্বর্ণ, ১৫৫.৭৬ গ্রাম হিরক, ১০.৫ কেজি রৌপ্য, ৪২ টি বিভিন্ন প্রকার অস্ত্র এবং ১৫২ রাউন্ড গুলি আটক করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও, ২০২৫ সালে যশোর রিজিয়ন ৪২০ জন আসামীসহ সর্বমোট ৩৭৭ কোটি ৪৬ লক্ষাধিক টাকার চোরাচালানী মালামাল আটক করতে সক্ষম হয়; এর মধ্যে ৫৮ কেজি স্বর্ণ, ৫৩ কেজি রৌপ্য, ২৭ টি অস্ত্র এবং ১৫২ রাউন্ড গুলি উল্লেখ্যযোগ্য। চোরাচালানী অভিযানের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে চলতি ২০২৬ সালে ২৩২০ বোতল মদ, ১০০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ, ১২২ কেজি গাঁজা, ২৬,২৭১ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪,১০০ বোতল এর অধিক ফেন্সিডিলসহ সর্বমোট ২২ কোটি ১৩ লক্ষাধিক টাকার মাদকদ্রব্য আটক করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও গত ২০২৫ সালে বিভিন্ন সময়ে মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ৩০,৮০০ বোতল মদ, ৩৭ কেজি হিরোইন, ১,৬১,০০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪৯,০০০ বোতল ফেন্সিডিল, ২,০০০ কেজির অধিক গাঁজাসহ সর্বমোট ১৯ কোটি ৫২ লক্ষাধিক টাকার মাদকদ্রব্য আটক করতে সক্ষম হয়।
বিজিবি মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিশন- ‘বিজিবি হবে সীমান্তে নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক’। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রতিটি সদস্য সর্বদা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্তে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য নিবেদিত। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাসহ চলমান ভোজ্য ও জ্বালানি তেল মজুদ এবং পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক সমাজ, পরিবেশকর্মী এবং সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ; তাই আমাদের সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
একই সঙ্গে আসন্ন বাংলা নববর্ষ (পহেলা বৈশাখ) ও পবিত্র ঈদুল আজহা ঘিরে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
১১ই এপ্রিল শুক্রবার বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিজিবির যশোর রিজিয়ন কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার স্থলসীমান্ত এবং সুন্দরবনের গহীন অরণ্যের জলসীমান্ত মিলিয়ে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে। ২টি সেক্টর— কুষ্টিয়া ও খুলনা সেক্টরের অধীনে ৭টি ব্যাটালিয়ন ও ১১৬টি বিওপি’র মাধ্যমে প্রতিদিন দিবারাত্রি ৪৬৪টি টহল পরিচালনার মাধ্যমে এ অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ভোজ্য ও জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বেনাপোল, ভোমরা ও দর্শনা স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে কড়াকড়ি আরোপ করে বিশেষ তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী ও স্থলবন্দর এলাকায় অবস্থিত ২২টি তেল পাম্পে নিয়মিত নজরদারি ও বিশেষ চেকিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সম্ভাব্য পাচার রুট চিহ্নিত করে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৩২৫টি নিয়মিত ও বিশেষ টহল পরিচালনা করা হয়েছে এবং চোরাচালানপ্রবণ এলাকাসমূহে ৮৯৯টি বিশেষ চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।
বিজিবি জানায়, স্থানীয় জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৮৬৮টি মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের সমন্বয়ে ৩১টি টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধ তেল জব্দসহ একজনকে ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে ৬৬টি যৌথ নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে যশোর রিজিয়ন চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৮৮ জন আটক এবং প্রায় ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকার মালামাল জব্দ করেছে। জব্দকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে ১.২৮৯১৫ কেজি স্বর্ণ, ১৫৫.৭৬ গ্রাম ডায়মন্ড, ১০.৫ কেজি রৌপ্য, ৪২টি অস্ত্র এবং ১৫২ রাউন্ড গুলি। অপরদিকে, ২০২৫ সালে ৪২০ জন আসামিসহ প্রায় ৩৭৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকার চোরাচালানী মালামাল আটক করা হয়, যার মধ্যে ৫৮ কেজি স্বর্ণ, ৫৩ কেজি রৌপ্য, ২৭টি অস্ত্র এবং ১৫২ রাউন্ড গুলি উল্লেখযোগ্য।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানেও বিজিবি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ২ হাজার ৩২০ বোতল মদ, ১০০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ, ১২২ কেজি গাঁজা, ২৬ হাজার ২৭১ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং ৪ হাজার ১০০ বোতলের অধিক ফেন্সিডিলসহ প্রায় ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া গত বছর মাদকবিরোধী অভিযানে ৩০ হাজার ৮০০ বোতল মদ, ৩৭ কেজি হিরোইন, ১ লাখ ৬১ হাজার পিস ইয়াবা, ৪৯ হাজার বোতল ফেন্সিডিল এবং ২ হাজার কেজির অধিক গাঁজাসহ প্রায় ১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়।
এদিকে, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সীমান্ত দিয়ে গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ ও চামড়া পাচার রোধে বিজিবি বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত টহল, চেকপোস্ট স্থাপন এবং সন্দেহভাজন চলাচলের ওপর কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জনগণের মাঝে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে চোরাচালানের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান দমন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে তাদের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত সীমান্ত নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তারা মনে করে।