
হুমায়ুন কবীর রিন্টু , নড়াইল : নড়াইলের হিজলডাঙ্গা মেলায় এবারও মানুষের ঢল নেমেছে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে হিজলডাঙ্গা গিয়ে জানা যায়, মেলার এক সপ্তাহ আগে থেকে হিজলডাঙ্গা এলাকায় মানুষের আগমন ঘটছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পৌষ মাসের শেষ দিন হিজলডাঙ্গার মেলা। প্রতি বছর এ দিনে দিনব্যাপি এ মেলায় হাজার হাজার মানুষের আগমন ঘটে। প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও এক সপ্তাহ আগে হিজলডাঙ্গা গ্রামে মানুষ এসে ভিড় করেছে। হিজলডাঙ্গা গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে দেশের বিভিন্ন এলাকা ও ভারত থেকে অতিথিরা এসেছেন। মেলার আগেই যেন চলছে অন্যরকম মেলা। বিশেষ করে এ গ্রামের জামাইরা পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে শ্বশুর বাড়িতে আসেন। এটা দীর্ঘকালের রীতিতে পরিণত হয়েছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দিন ব্যাপি এ মেলায় হাজার হাজার ভক্ত দর্শক শ্রোতার পদভারে মুখরিত হয়ে উঠবে হিজলডাঙ্গা পাগলচাঁদের মাঠ। বিগত এক সপ্তাহ আগে থেকে হিজলডাঙ্গা গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নড়াইল জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের হিজলডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী পৌষ মেলায় আসা দর্শনার্থী নারী,পুরুষ ও শিশুর ভিড় জমেছে। স্থানীয়রা এ মেলাকে পাগলচাঁদের মেলা বলে জানেন।
আধ্যাত্মিক সাধু পাগলচাঁদের স্মরণে প্রায় একশ বছর ধরে এ মেলা চলে আসছে বলে জানান এ মেলা কমিটির সভাপতি স্কুল শিক্ষক স্বপন কুমার রায়। বাক্যসিদ্ধ মহাপুরুষ পাগলচাঁদ বাইরে থেকে হিজলডাঙ্গায় এসে ধ্যানজ্ঞানে মগ্ন থাকতেন। জীবদ্দশায় অনেক অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা শিক্ষক দীপক শাখারী জানান, আনুমানিক ১৯৩৫ সালে আধ্যাত্মিক সাধু পাগলচাঁদের মারা যান। জীবদ্দশায় তিনি অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। সেই বিশ্বাস থেকে যুগ যুগ ধরে মানুষ এখানে আসে তাদের বিভিন্ন মন বাসনা পুরন করতে। প্রতি বছর তার স্মরনে এ মেলা হয়। প্রথমদিকে স্বল্পপরিসরে এ মেলা শুরু হলেও বর্তমানে এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ মেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। মেলা উপলক্ষে আসা ভক্তদের জন্য হিজলডাঙ্গার প্রতিটি বাড়িতে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা থাকে। মেলাকে ঘিরে দূরে থাকা প্রত্যেক বাড়ির আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসেন।
মেলা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এক সপ্তাহ আগে থেকে এলাকার লোকজনসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারী-পুরুষ দর্শনার্থী জড়ো হতে থাকেন। মেলায় বাহারি সব খাবার আর তৈজসপত্রের মিশেলে উৎসবে মেতে ওঠেন দর্শকরা। শিশু-কিশোরদের হই-হুল্লোড়ের পাশাপাশি সব বয়সী নারী-পুরুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই মেলা। শুরুতে মেলাটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য হলেও বর্তমানে তা সব ধর্মের মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রায় শত বছর ধরে চলে আসা এ মেলায় নানা রকম গ্রামীণ পণ্য পাওয়া যায়। নড়াইলসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। সন্ধ্যার মোমবাতি প্রজ্জ্বলন মেলার আকর্ষণকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। মেলায় এবার গ্রামীণ পণ্যসহ প্রায় ২০০ স্টল বসেছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠেছে। মৃৎশিল্পের পাশাপাশি বস্ত্রশিল্পেরও দেখা মেলে এই মেলায়। মাটির তৈরি নানা তৈজসপত্র উঠেছে মেলায়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্টলে আধুনিক খেলনার সমাহার দেখতে পাওয়া যায়। নাগরদোলায় ওঠার জন্য শিশুদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাহারী পান, পাপড়, তিলের খাজা, কদমা, টক-মিষ্টি আচার এবং বিভিন্ন রকমের মিষ্টান্ন কিনে বাড়িতে ফিরে যেতে দেখা যায় মেলায় আসা দর্শনার্থীদের। মেলায় ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষক প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রতিবছর তিনি এ মেলায় আসেন। তার সাথে থাকা আরেক কলেজ শিক্ষক প্রশান্ত সরকার, অজিত বিশ্বাস সহ আরোও অনেকে বলেন তারা মজা করে বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখছেন। খুব আনন্দ পাচ্ছেন। স্টল থেকে মিষ্টি পান কিনে খেয়েছেন। যশোরের ধলগ্রাম এলাকা থেকে মেলায় মিষ্টি পান বিক্রি করতে আসা শাহাবুল জানান, প্রতিটি পান ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। অনেকে শখ করে পান কিনে খাচ্ছেন।
মেলার কমিটির উপদেষ্টা মুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ অধিকারী জানান, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এ মেলার আয়োজন। পাগল চাঁদকে আধ্যাত্মিক সাধক মনে করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখানে আসেন। পৌষ মেলায় আনন্দ পেতে অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও আগমন ঘটে।

