
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত থাকলেও গ্রামীণ চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। বাজারগুলোতে নির্বাচনি ক্যাম্প অফিস স্থাপন করা হলেও অধিকাংশ স্থানে তা মাইকিংয়েই সীমাবদ্ধ।
শহরে নির্বাচনের আমেজ থাকলেও গ্রামে নির্বাচনের কোনো আমেজ নেই। প্রার্থীরাও ভোটারদের কাছে আসছেন না। কতজন প্রার্থী সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন—এমনটাও সঠিকভাবে জানাতে পারেননি কেউ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশব্যাপী গণভোটের প্রচার-প্রচারণা চালালেও গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জানে না গণভোট কী। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোন ভোট দিলে কী সুফল মিলবে, তাও জানেন না অনেকে।
(৪ জানুয়ারি) রাতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের একটি চায়ের দোকানে আগামী নির্বাচন নিয়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। তারা সবাই নোয়াখালী-৫ আসনের ভোটার।
চায়ের আড্ডায় কথা হয় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। তিনি জানান, গণভোট কবে হবে বা এতে কী উপকারিতা আছে—এ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। নোয়াখালী-৫ আসনের কোনো প্রার্থীও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিশ্রুতি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেননি।
পাশে বসে থাকা ইব্রাহিম নামের আরেক ভোটারের সঙ্গে কথা হলে তিনিও জানান, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ দিলে কী পরিবর্তন হবে, তা তিনি জানেন না।
ইব্রাহিম বলেন, এবার পোস্টার না থাকায় তেমন নির্বাচনি আমেজ নেই। মাঝেমধ্যে মাইকিং হলেও চোখে পড়ার মতো কিছু নেই। সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যার আড্ডায় নির্বাচনের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।
ইব্রাহিম বলেন, ‘এখনো কোনো প্রার্থী আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসেননি। যদি আসে, তারা কী করতে চায় তা শুনে আমরা আমাদের চাওয়াগুলো তুলে ধরবো।’
তবে চায়ের আড্ডায় আব্দুর রহমান নামের ষাটোর্ধ্ব একজন রাজনৈতিক সচেতন ভোটারের দেখা মেলে। তিনি ইন্টারনেট ও সংবাদমাধ্যম থেকে গণভোট সম্পর্কে জেনেছেন এবং আশপাশের মানুষকে বিষয়টি বোঝাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, বিগত সময়ের নির্বাচন সুষ্ঠু না হলেও এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। সে কারণে এবারের জাতীয় নির্বাচনে তিনি ভোট দেবেন বলে মনস্থির করেছেন।
তবে ভোটাররা আশা করছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে নির্বাচনী প্রচারণা বাড়বে। নির্বাচনের উত্তাপ প্রতিটি শহর-গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।
কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলা এবং সদর উপজেলার অশ্বদিয়া ও নেয়াজপুর ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৫ আসন। এই আসনে সবচেয়ে বেশি ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বিএনপির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবু নাছের (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির খাজা তানভীর আহমেদ (লাঙ্গল), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের তৌহিদুল ইসলাম (আপেল), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মুন তাহার বেগম (কাঁচি), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) মোহাম্মদ আনিছুল হক (হাতি), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোহাম্মদ শামছুদ্দোহা (চেয়ার), জাতীয় নীরবতা ভেঙে, রাজপথ আবার স্লোগানে মুখর। যেখানে প্রতিটি ব্যালট পেপার হতে যাচ্ছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন ভোরের স্বপ্নবিজয় বর্ণ। গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য এই মহাযজ্ঞে ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১,৯৭৩ জন প্রার্থী। এবার দেশের মোট ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের হাতে ন্যস্ত হয়েছে, আগামীর নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ভার। যার মধ্যে রয়েছেন ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন পুরুষ এবং ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন নারী ভোটার। বিশেষ করে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ তরুণ ভোটার, যাদের একটি বড় অংশ জীবনের প্রথমবার কোনো অর্থবহ নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন, তারাই হতে পারেন এবারের ফলাফলের মূল কারিগর। এ ছাড়া আধুনিক নির্বাচনী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রায় ৩ লাখ প্র্রবাসী এবার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। উৎসবমুখর আবহে দেশের রাজপথ স্লোগানে মুখর হলেও, সাধারণ মানুষের মনের গহিনে দানা বেঁধে আছে এক জোরালো প্রত্যাশা এবং টেকসই ও সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ। ভোটাররা কেবল একজন প্রার্থীকে জয়ী করতে চান না, বরং চান এমন একটি নির্বাচনী পরিবেশ, যা দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাজার সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ মনে করছে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আসা জনবান্ধব সরকারই, বিভিন্ন সংকট থেকে মুক্তি দিতে পারে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যে বিপুল আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হওয়া অপরিহার্য। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা, পর্দার আড়ালের ষড়যন্ত্র আর অসাংবিধানিক শক্তির হস্তক্ষেপ নিয়ে যে ধোঁয়াশা থাকে, তা চিরতরে বন্ধ হবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের এই অপরিহার্যতা কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী সমাজ ও উদ্যোক্তারা বর্তমানে এক ধরনের ‘অপেক্ষমাণ’ নীতি গ্রহণ করেছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রধান প্রধান চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার না থাকা পর্যন্ত বড় ধরনের বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সফল এবং একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হলে, কল-কারখানার চাকা যেমন সচল হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অমীমাংসিত বাণিজ্য চুক্তিগুলো নতুন গতি পাবে। বিশেষ করে, তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি অর্ডার দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। নির্বাচনী এই স্বচ্ছতা ব্যবসায়ীদের মনে নতুন সাহস জোগাবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে। একইভাবে ব্যাংকিং খাত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই নির্বাচনের দিকে তীক্ষè নজর রাখছে। কারণ একটি শক্তিশালী ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারই পারে, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি কঠোর হাতে দমন করতে। গত কয়েক বছরের অস্থিরতায় ব্যাংকিং খাতে যে তারল্য সংকট এবং আস্থার অভাব তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ভোটের মাধ্যমে জনসমর্থনপুষ্ট সরকার গঠিত হলে, তারা সাহসের সঙ্গে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর দেওয়া কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে। এতে সাধারণ আমানতকারীদের মনে যেমন আস্থা ফিরবে, তেমনি শেয়ারবাজারের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা কাটিয়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হবে। অর্থাৎ নির্বাচনী মাঠের উৎসব কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উৎসবে রূপান্তরিত হওয়ার অপেক্ষায়।
উৎসবের এই রঙিন আবহের সমান্তরালে বয়ে চলেছে এক গভীর ও প্রচ্ছন্ন শঙ্কার স্রোত। দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক শাসনের ক্ষত এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা ভোটারদের মনে এক ধরনের ‘নির্বাচন ভীতি’ জাগিয়ে রেখেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে বড় দলগুলোর মধ্যে, আদর্শিক সংঘাত এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব নির্বাচনী পরিবেশকে কতটা স্থিতিশীল রাখবে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচনী সহিংসতা রোধে এবার প্রায় ৮ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে, যার মধ্যে বিজিবি, র্যাব এবং পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তথ্য বলছে, এবার প্রতিটি কেন্দ্রে ভিডিও নজরদারি এবং তাৎক্ষণিক ফলাফল প্রকাশের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জালিয়াতির সুযোগ কমিয়ে আনবে। এই প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা সাধারণ, মানুষের মনে সাহস জোগাচ্ছে এবং উৎসবের আমেজকে আরও গাঢ় করবে। অর্থনৈতিক প্রত্যাশার পাশাপাশি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের সাময়িক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। পোস্টার ছাপানো, মাইকিং, যানবাহন ভাড়া এবং প্রচার কর্মীদের পারিশ্রমিক বাবদ কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন তৃণমূল পর্যায়ে অর্থপ্রবাহ বাড়িয়েছে। তবে এই উৎসবের ডামাডোলে সাধারণ মানুষের ভয় হলো, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হবে কি না! ব্যবসায়ীদের একটি অংশ যেমন স্থিতিশীলতা চাচ্ছেন, তেমনি অন্য একটি ক্ষুদ্র অংশ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় থাকে। একটি সুষ্ঠু ও ভীতিহীন নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক সমাধান নয়, বরং এটি বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার প্রথম শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে সাধারণ মানুষ। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এবার প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা। ভোটার তালিকায় এবার ১,৬৩৭ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, যা সামাজিক স্বীকৃতির পথে একটি মাইলফলক। পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও উপকূলীয় হাওর এলাকার জন্য বিশেষ হেলিকপ্টার এবং নৌ-চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে কোনো ভোটারই ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত না হন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই সক্রিয়তা নির্বাচনকে যেমন বৈচিত্র্যময় করছে, তেমনি উৎসবের রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে সমাজের একেবারে নিচতলায়। তবুও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং দুর্গম অঞ্চলের মানুষগুলোর মনে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অস্বস্তি রয়ে গেছে, যা দূর করা প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। তরুণ প্রজন্মের জন্য এই নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন নয়, বরং এটি তাদের ‘চব্বিশের চেতনা’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করছেন, যা রাজনীতির প্রতি নতুন প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে ফুটিয়ে তুলছে। তরুণদের এই সক্রিয়তা ভোটারদের মনে এক নতুন সাহসের সঞ্চার করেছে, যা উৎসবের আবহকে আরও বেগবান করছে। তবে তরুণদের আবেগকে পুঁজি করে যাতে কোনো অপশক্তি অস্থিতিশীলতা তৈরি না করতে পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। নতুন ভোটারদের মতে, এবারের ভোট দেওয়া মানে কেবল প্রার্থী নির্বাচন নয়, বরং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করা।
নির্বাচনী প্রচারণার মাঠ স্বচ্ছ রাখতে এবার গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো। ‘সুজন’ (সুশাসনের জন্য নাগরিক) এবং ‘ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এর মতো সংস্থাগুলো প্রতিটি আসনের প্রার্থীর হলফনামা ও অতীত রেকর্ড ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এই সচেতনতা উৎসবের আমেজকে যেমন গঠনমূলক করছে, তেমনি অসৎ প্রার্থীদের মনে ভীতি তৈরি করছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের অবাধ প্রবেশাধিকার এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপনের নিশ্চয়তা সাধারণ ভোটারদের মনে এই বিশ্বাস জাগাচ্ছে যে, এবার অন্তত তাদের দেওয়া ভোটটি বিফলে যাবে না। এই আস্থার পরিবেশই পারে দীর্ঘদিনের নির্বাচনী অনাস্থা দূর করে দেশব্যাপী এক সত্যিকারের গণ-উৎসবের সূচনা করতে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবারের নির্বাচনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নির্বাচন কমিশন প্রথমবারের মতো ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ নামক অ্যাপের মাধ্যমে ভোটারদের কেন্দ্র, প্রার্থীর হলফনামা এবং ভোটের আপডেট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ডিজিটাল এই অগ্রগতির উল্টো পিঠে রয়েছে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর বড় ঝুঁকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, যা উৎসবমুখর পরিবেশে আতঙ্কের বিষ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট। সংবিধানের মৌলিক কিছু সংস্কার এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণ করা হবে এই ভোটের মাধ্যমে। এটি ভোটারদের মধ্যে একদিকে যেমন রাষ্ট্র গঠনে সরাসরি অংশগ্রহণের উদ্দীপনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে পরিবর্তনের ব্যাপকতা নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় কাজ করছে। আন্তর্জাতিকভাবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রায় ১৫০ জনেরও বেশি পর্যবেক্ষক এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই তীক্ষè নজরদারি একদিকে যেমন নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি এক বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষা। নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মতে, এই নির্বাচনের সার্থকতা কেবল ভোট প্রদানের সংখ্যার ওপর নয়, বরং জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করছে। ‘সুজন’ (সুশাসনের জন্য নাগরিক) এবং ‘ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এর মতো সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে ভোটারদের সচেতন করছে, যাতে তারা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারেন। নির্বাচনী মাঠের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সহজ করা হয়েছে, যাতে কোনো অনিয়মের খবর গোপন না থাকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটযুদ্ধ কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার পথে সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত আর ত্যাগের মহিমা ধরে রাখতে হলে, এই নির্বাচনকে হতে হবে কলঙ্কমুক্ত। যদি সফলভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পরবর্তী কয়েক দশকের জন্য নিরাপদ করবে। এর ফলে মেধাবীদের রাজনীতিতে আসার পথ যেমন সুগম হবে, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। ভোটাররা আশা করছেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতা বজায় থাকলে সাম্য ও ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ গড়ার লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েক পর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের দেড় দশকের দুঃশাসন, নির্বাচনের নামে দীর্ঘ সময় ধরে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর আমি ডামি নামক ভুয়া নির্বাচন সবকিছুর অভিজ্ঞতা এদেশের জনগণের অন্তরে প্রজ¦লিত। হাসিনার পতনে ২০২৪ এর জুলাইয়ে সর্বস্তরের নাগরিকদের অংশগ্রহণ, ছাত্র জনতার আপসহীন লড়াই হাসিনাকে সাধের ক্ষমতার আসন ছেড়ে পৈতৃক জীবন নিয়ে পালাতে বাধ্য করেছে।
জনগণের প্রত্যাশা ছিল, ২০০৮ থেকে ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পতনের পর দেশটির সংস্কার হবে। প্রত্যাশা ছিল আইন বিচার বিভাগের সংস্কার হবে। শিক্ষা বিভাগের কারিকুলাম সহ সব ধরনের সংস্কার হবে। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক সংস্কার হবে। জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সংস্কার হবে। মোদ্দা কথা, দুঃশাসনের যুগে যেখানে যেখানে অনাচার হয়েছে, তার শেকড় উপড়ে ফেলা হবে, ব্যাপক সংস্কার করা হবে। দেশের আপামর মানুষ এটাই দাবি করেছিল! কিন্তু হা হতোস্মি! ৫ আগস্ট হাসিনা পলায়নের পর ৮ আগস্ট ২০২৪ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার-এর প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের ক্ষমতা গ্রহণের পর মানুষ যথেষ্ট আশায় বুক বেঁধেছিল, আশ্বস্ত হয়েছিল।
তারপরের ইতিহাস বড়ই হতাশার এক ডক্টর প্রফেসর ইউনুস ছাড়া তাঁর পাশে অনেকেই নেই। হাসিনা সরকারের সময়কার কুখ্যাত মন্ত্রী নামধারী গণ দুশমনরা ক্যান্টনমেন্টে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে গোপনে আশ্রয় গ্রহণ করে। ম্যাজিক বিদ্যার মতো আশ্চর্যজনকভাবে, ৬২২ জন কীভাবে পালিয়ে গেল কেউ তার জবাব দিতে পারছে না। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল, তারা কী ভাবে রাজপুত্রের মতো বীরদর্পে পালিয়ে গেল? কারা এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে সহযোগিতা করলো? একটি জাতি যখন বিপ্লবের মাধ্যমে একটি সরকারের পতন ঘটালো, তাদের নিশ্চয়ই কিছু স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা ছিল? এই স্বপ্নের বিনাশ কারা ঘটালো? সে প্রশ্নটি এখন সমগ্র জাতির সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। ইতিহাসের এই গাদ্দার গুলো কারা? যে বিপ্লব সফলতার মুখ দেখে আবার মুখ থুবড়ে পড়লো। এর পেছনে কারা কুখ্যাত কুশীলব ছিল? সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটি মীরজাফর চক্রের জন্য একটি সফল বিপ্লব অর্থাৎ অসমাপ্ত বিপ্লব জাতিকে পরখ করতে হলো।
প্রশ্ন উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের গত ১৬ মাসে কেন কোনো সুরাহা করতে পারে নাই? গত ১৫-১৬ বছরে নিখোঁজ, গুম হওয়া অসংখ্য পরিবারকে সম্মানজনক কোনো সান্ত্বনা কি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো পজিটিভ ইনফরমেশন কি আছে? কেন নাই? শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড যারা চালিয়েছিল, যাদের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড বা ম্যাসাকার হয় তার কি কোনো দৃশ্যমান সাদাকালো চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি? কেন পেলাম না? ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্দেশে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৮ টি বিভাগীয় শহরে যারা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর ওই কুখ্যাত সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য বেপরোয়া জীবন ঘাতি বুলেট ছুড়িয়ে ছিল, তাদেরকে কী বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে? না হওয়ার কারণ কী? সরকারের সচিবালয়ে নাশকতা সৃষ্টি করে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো, যাতে দুর্নীতির খতিয়ান রয়েছে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর সাথে জড়িত কেষ্টবিষ্টুরা এসব সন্দেহভাজন তস্কররা, এই পোড়ানো ঘটনার সাথে জড়িত, তাদের বাস্তব চেহারা কি আজও জাতির সামনে দেখানো হয়েছে? জুলাই বিপ্লবের অনেক আগে থেকে প্রবাসী অ্যাক্টিভিস্ট বহুমাত্রিক চিন্তার অধিকারী পিনাকী ভট্টাচার্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন, ডক্টর কনক সরোয়ার, ডক্টর তাজ হাশমি, আমেরিকা প্রবাসী আইন বিশেষজ্ঞ জ্যাকব মিল্টন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ২০০ জন উচ্চ পর্যায়ের হাসিনা সরকারের পুলিশ অফিসার নামধারী খুনি দেশত্যাগের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। বিপ্লবের আগে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এসব কুখ্যাত নরপিশাচদের নিরাপদে দেশত্যাগে কারা কীভাবে সহযোগিতা করেছে জাতি আজ তা স্পষ্টভাবে জানতে চায়।
এতসব ব্যর্থতার পর যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালে হাসিনা সহ তার সরকারের কুখ্যাত জালেমদের বিচার শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই বিশেষ মতলবে দেশের কয়েকটি দল প্রবল জনমত উপেক্ষা করে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন দাবি করে বসলো! হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে তো কোনো নির্বাচন দাবি করতে পারে নাই! হাসিনার সরকার তো ২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কথা, অথচ বিপ্লব পরবর্তী নড়বড়ে অর্থনীতিতে যখন প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে, তখনই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি প্রধান হয়ে দেখা দিল! ডক্টর প্রফেসর মোঃ ইউনুস যখন ধ্বংসের স্তূপ থেকে দেশটাকে টেনে তুলছেন, তখনই বলা হলো ডিসেম্বর ২০২৫ এর মধ্যে নির্বাচন না দিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থতার দায়ে চলে যেতে হবে। উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে বলেও শাসানো হলো। এরপর থেকে সবকিছুই ঢিমেতেতালভাবে চলছে। বাধ্য হয়ে হয়ে সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঘোষণা করলেন। এখন দেশের সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে। মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই এবং সর্বশেষ প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্নের পর গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার থেকে সব দলের প্রচারণা চলছে। কিন্তু জনগণের মনে একটি প্রশ্ন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কী হলো? সারা দেশব্যাপী একদিনেই নির্বাচনে প্রত্যেক নির্বাচনী কেন্দ্রে কী সিসি ক্যামেরা থাকবে? পেশি শক্তি, হুমকি ধামকি পার্টি, হোন্ডা গুন্ডা এরা কী নির্বাচন কেন্দ্রের মধ্যে বা ৪০০ গজের মধ্যে অবাধে পাঁয়তারা করে বেড়াবে? এই মুহূর্তে নিরীহ মানুষরা জানতে চায়, এদেরকে প্রতিরোধের ব্যাপারে কী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সরকার কি এর কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছে? পুরোনো নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে জনগণের আশা ভরসা খুবই কম! কারণ এরা সবাই কলের গানের সামনে বসে থাকা কুত্তাটির মতো ‘’ (যা গাওয়ানো হবে তাই গাইবে বলে) জনগণের মনে হয়েছে! এরা সবাই নির্বাচন কমিশনে নিযুক্ত মেরুদণ্ডহীন প্রাণী বলে ইতোমধ্যে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। এদের অবস্থা হয়েছে ইশারায় পরিচালিত হওয়া অর্থাৎ ‘যেমনি নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কী দোষ?’ পুতুল নির্বাচন কমিশন যে নির্বাচনী ফলাফল দেবে তাকি একটি গোঁজামিল ফলাফল হবে? জনমনে এটাই এখন একটি জ¦লন্ত জিজ্ঞাসা। অনেকে বলতে পারেন এমন জিজ্ঞাসার হেতু কী? অবশ্যই হেতু আছে।
কথায় বলে না, সকাল দেখেই যেমন বোঝা যায়, সারাটা দিন কেমন যাবে, নির্বাচন কমিশনের মনোনয়নপত্র জমা এবং বাছাই এর ছ্যারা-ব্যারা লেজ গোবরে অবস্থা দেখে জনগণ তা সহজেই অনুমান করতে পেরেছে। এই নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে জনমনে ব্যাপক অনাস্থা ও সন্দেহ পুঞ্জীভূত হয়েছে। কারণ কী? কারণ তো প্রকাশ্য দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। নমিনেশন পেপার বা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর প্রার্থীর আয় উপার্জন, তার যোগ্যতা, কোথায় কোথায় নাগরিকত্ব আছে, ঋণ খেলাপি কিনা এসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা দরকার। নির্বাচন কমিশন এই কাজগুলো কি সঠিকভাবে করেছে? তাহলে ডাল মে কুচ কালা রয়ে গেল কেন? পুরো জাতির চোখে ধুলো দিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব অর্থাৎ দেশি ও বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের কাছে জায়েজ বলে গণ্য হয়েছে। সেলুকাস কী বিচিত্র এ দেশ! বাল উঠে নাই এমন শিশু এই ধরনের চিত্র দেখে বলে দিতে পারে, কে মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্য আর কার মনোনয়নপত্র বাতিল হবে! অথচ আমাদের দামড়া নির্বাচন কমিশন সবকিছুই জায়েজ করে দিয়েছে কার ইঙ্গিতে? জনগণ জানতে চায়, কোন তালিকা কোন মাপকাঠি অনুযায়ী এগুলো সঠিক হলো? এটা কী একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কাজ? সমগ্র জাতি জনগণ এই প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে উপযুক্ত জবাবের জন্য রেখে দিল।
প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্বাচন কমিশন কী কারো ইশারায় চলছে? তা না হলে এই সামান্য বিষয়টি নির্বাচন কমিশন বুঝতে অপারগ কেন? শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে, নির্বাচনের লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড রক্ষা হচ্ছে না! কোথায় সেই লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড? কোনো কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল গান বাজনা, ঢাক ঢোল শোহরত সহকারে জন সমাবেশে ১০-১৫টা মাইক ব্যবহার করছে, আবার বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে কারো কারো উঠান বৈঠকে হ্যান্ড মাইক কার্যক্রমে হানা দিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে, নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে। এইসব উসকানি পাচ্ছে কোথায়? এখানে নির্বাচন কমিশন কেন কুম্ভ ঘুমে? বিষয়টি কী নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারে পড়ে না? নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা কাল থেকে প্রজাতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীর চাকুরি নির্বাচন কমিশনে দায়বদ্ধ। তাহলে কেন এখানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে এত প্রশ্ন উঠবে? নির্বাচন কমিশনকে আমরা আবারও একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। আল্লাহর ওয়াস্তে একটু সতর্ক হোন। এই মুহূর্তে সামনের এই দুই সপ্তাহ সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপরে কঠোর নজরদারি করুন। প্রতিদ্বন্দ্বী দল গুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ প্রচার প্রচারণায় যাতে কোন ষড়যন্ত্রকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, তার জন্য সার্বক্ষণিক মনিটরিং দরকার। সীমান্তের ওপারে বসে পতিত স্বৈর শাসকের পলাতক দোসররা রীতিমতো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর মতলব এঁটে চলেছে। কথাগুলো নির্বাচন কমিশন এখন থেকে হৃদয়ঙ্গম করলে বোধ করি ভালো হবে। সর্বশেষে আবারও বলি, নির্বাচন যাতে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সে ব্যাপারে আরও তৎপরতা জোরদার করা দরকার। বিষয়টি যাতে লেজে গোবরে জড়িয়ে না যায়, সে ব্যাপারে আগাম সংকেত দিয়ে রাখলাম।
আমাদের দেশে একটি চলতি প্রবাদ আছে, ‘গরিবের কথা বাসি হলে কাজে ফলে!’ তাই নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংশ্লিষ্ট মেশিনারিজকে আরও সক্রিয় হওয়ার জন্য বলবো, মনে রাখবেন, ‘Signal is অর্থাৎ জ্ঞানীর জন্য সংকেত উচ্চারণই যথেষ্ট। আমরা একটি কথা তো জানি, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’। আজ জাতি চরম সংকট সন্ধিক্ষণে। এই মুহূর্তে কেউবা কারো সামান্য গাফিলতি জাতির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, কথাগুলো মনে রাখবেন। বক্তব্যে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে নিজ নিজ গুনে ক্ষমা করবেন! ধন্যবাদ।

