
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক গতকাল জুমার খুৎবা-পূর্ব বয়ানে বলেন, রমজানের শেষ দশক পুরোটাই বেশি বরকতপূর্ণ ফজিলতপূর্ণ। খতিব বলেন, নবী করিম (সা.) একদিন মিম্বারে উঠার সময় পরপর তিন বার আমিন বললেন। জিবরাইল (আ.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজান পেলো অথচ মাগফিরাত অর্জন করতে পারল না সে ধ্বংস হোক; নবী (সা.) বললেন আমিন। জিরাইল (আ.) বললেন, যে ব্যক্তি মা-বাবাকে পেলো আর তাদের খেদমত করে জান্নাত অর্জন করতে পারল না সে ধ্বংস হোক, নবী (সা.) বললেন, আমিন। জিরাইল (আ.) বললেন, যে ব্যক্তির সামনে নবীর নাম উচ্চারিত হলো অথচ দরুদ পড়ল না সে ধ্বংস হোক, নবী (সা.) বললেন, আমিন। খতিব বলেন, এসব ব্যাপারে রাসূল (সা.) উদাসিন ও গাফেল না থাকার তাগিদ দিয়েছেন। মা-বাবার অবাধ্য হলে পরিণাম শুভ হবে না। অথাৎ মা-বাবার ব্যাপারে কোনো উদাসিন থাকা যাবে না।
খতিব বলেন, নবী করিম (সা.) এর সুন্নাতই মুসলিম সভ্যতা। ঈদুল ফিতর রমজানের নিয়ামতের শোকর। নবী করিম (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ আছে। মুসলমানদের ঈদ হচ্ছে দু’টি একটি ঈদুল ফিতর আরেকটি হচ্ছে ঈদুল আজহা। ঈদগাহে যাওয়ার পথে এবং ফেরার পথে তাকবিরে তাশরিক পড়তে হবে। খতিব বলেন, রমজানের ফয়দা কি তাকওয়া ও সংযম ধরে রাখতে হবে। খতিব মাহে রমজানের গুরুত্ব তৎপর্য তুলে ধরে বলেন, মানুষের হক নষ্ট করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তাওবার দ্বারা গুনাহ মাফ হয়, অন্যের হক আদায় হয় না। মাহে রমজানের বিদায়ে বেলায় এখনই পাকা নিয়ত করতে হবে কার কার হক নষ্ট করেছি। তাদের পা ধরে মাফ চেয়ে নিতে হবে। খাঁটি তাওবার জন্য কাজা কাফফরা করতে হবে। নেকির রাস্তায় অগ্রসর হতে হবে। যাতে রমজানের রহমত বরকত নসিব হয়। কারণ রমজান জান্নাতের দিকে মানুষকে ধাবিত করে। রমজানে জান্নাতের সব দরজা খোলা রাখা হয়। খাঁটি তাওবার মাধ্যমে মাগফিরত কামনা করতে হবে। কোনো গুনায় আমরা লিপ্ত আছি। তাওবার প্রথম কথা গুনাহ ছাড়তে হবে। পেছনের গুনার জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং সামনে আর গুনাহ করব না প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। খতিব বলেন, আল্লাহ সবার মাঝে হিম্মত মনোবল দিয়ে রেখেছেন। হিম্মতকে নেক কাজে লাগাতে হবে।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী টঙ্গী পূর্ব আরিচপুর সরকার বাড়ি ঈদগাহ মসজিদুল আকসার খতিব মাওলানা রিয়াদুল ইসলাম মল্লিক গতকাল জুমার খুৎবা-পূর্ব বয়ানে বলেন, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে মুমিন মুসলমানদের কাজে রমজান এসেছে। দেখতে দেখতে শেষও হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন ঈদের অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ। তাই ঈদের দিনে যে কাজগুলো রাসূল (সা.) করতেন আমরাও তা জেনে নেই। অন্যদিনের তুলনায় সকালে ঘুম থেকে উঠা, মিসওয়াক করা, গোসল করা, শরিয়তসম্মত সাজসজ্জা করা, সামর্থ্য অনুপাতে উত্তম পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া যেমনÑ খেজুর ইত্যাদি, সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া, ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকায়ে ফিতর আদায় করা, ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা, বিনা ওজরে মসজিদে আদায় না করা, যে রাস্তায় ঈদগাহে যাবে, সম্ভব হলে ফেরার সময় অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা, পায়ে হেঁটে যাওয়া, ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার সময় আস্তে আস্তে তাকবির পড়তে থাকা। হাদিস শরিফে আছেÑ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন গোসল করতেন। (বুখারি-১/১৩০) মুসলমানদের প্রধান দুই ধর্মীয় উৎসব তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুন্দর ও সাধ্যের ভেতর সবচেয়ে উত্তম পোশাক পরিধান করা সুন্নত। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছেÑ নবী করিম (সা.) প্রতিটি ঈদে ডোরাকাটা পোশাক পরিধান করতেন। (সুনানে বায়হাকি) ঈদুল ফিতরের দিন ইদগাহে যাওয়ার আগে সামান্য কিছু পানাহার করা সুন্নত। তবে ঈদুল আজহার দিন পানাহার ব্যতীত ঈদগাহে গমন করা ও নামাজের পর নিজের কোরবানির গোশত দিয়ে প্রথম খাবার গ্রহণ করা সুন্নাত। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, নবীজি (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন সকালে কিছু খেজুর খেতেন। অন্য এক বর্ণনা মতে, তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন। (বুখারি-৯৫৩) ঈদগাহে যাতায়াতের সময় ঈদুল ফিতরের দিন তুলনামূলক নি¤œস্বরে তাকবির বলা আর ঈদুল আজহার দিন উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা সুন্নাত। ঈদগাহে যাতায়াতের রাস্তা পরিবর্তন করা সুন্নাত। যাওয়ার সময় এক রাস্তা দিয়ে গমন করা আর ফেরার সময় অন্য রাস্তা ব্যবহার করা সুন্নাত। খতিব বলেন, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, নবীজি (সা.) ঈদের দিন ঈদগাহে আসা-যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তন করতেন। (বুখারি-৯৮৬) কোনো ধরনের অপারগতা না থাকলে পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করা সুন্নাত। ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করতেন এবং পায়ে হেঁটে ঈদগাহ থেকে প্রত্যাগমন করতেন। (তিরমিজি-১২৯৫) খতিব বলেন, ঈদের আনন্দের পর মুমিন মুসলমান ছয় রোজা পালন করলে বছরজুড়ে রোজা রাখার সওয়াব পাবেন। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিতÑ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসের রোজা রাখল এবং শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, এটি (শাওয়ালের ছয় রোজা) তার জন্য সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য সওয়াব রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাসের ছয় রোজা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।
কামরাঙ্গীরচর রহমতিয়া জামে মসজিদের খতিব মুফতি সুলতান মহিউদ্দিন জুমার বয়ানে বলেছেন, দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর উদযাপনের জন্য প্রস্তুত সকলে। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। যারা একমাস সিয়াম সাধনা করেছেন, নেক আমলের প্রতিযোগিতা করেছেন, তারাবি, তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলিলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেছেন ঈদের দিন মূলত তাদের প্রতিদান প্রাপ্তির দিন। এই ঈদ-আনন্দ আর খুশি তাদের জন্য।
ঈদের দিন আল্লাহ তা’আলা রোজাদারকে শুধু ক্ষমা নয়, তাদের গুনাহসমূহ নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেন। আর যারা রমজানে ইবাদত করেনি এই দিন তাদের জন্য আনন্দের দিন নয়। বরং লাঞ্ছনার দিন। তিনি আরো বলেন, ঈদ আনন্দের নামে কোন নাজায়েজ বিনোদন করা যাবে না, আমাদের ঈদ উৎসবে নাচ-গান, ঢোল- তবলা নাই, আলোকসজ্জা, আতশবাজি, ফটকাবাজিও নাই, আছে শুধু “আল্লাহু আকবার” তাকবীর ধ্বনি, আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা। খতিব নামাজ শেষে ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মুসলমানসহ মুসলিম উম্মার মুক্তির জন্য বিশেষ দোয়া করেন।এরই মধ্যে বিদায় হয়েছে রহমত, বরকত ও নাজাতের মাস পবিত্র রমজান। এখন মহাবরকতের বারতা নিয়ে চলছে পবিত্র শাওয়াল মাস। রমজানে মাসব্যাপী যারা সিয়াম সাধনা করেছেন তাদের জন্য এ মাসে শুভ সংবাদ রয়েছে। তা হলো শাওয়াল মাসের ৬ রোজা। হজরত আবু আইউব আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা রাখল এবং এ রোজার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল সে যেন গোটা বছর রোজা রাখল’ [মুসলিম]।
হাদিসে উল্লেখিত ছুম্মা অর্থ অতঃপর, ক্রমধারা বা ধারাবাহিকতার অর্থে ব্যবহৃত হয়। এদিক থেকে হাদিসটি প্রমাণ করে যে, আগে রমজানের রোজা পূর্ণ করতে হবে। যার ওপর রমজানের রোজা কাজা আছে সে আগে তার কাজা করবে তারপর শাওয়ালের রোজায় ব্রতী হবে। কারণ রাসূল (সা.) বলেছেন, যে রমজানের রোজা রাখবে অর্থাৎ পুরোপুরি। আর যার ওপর কাজা রয়ে গেছে সে তো রোজা পুরা করেছে বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ ওই রোজাগুলোর কাজা আদায় না করে।
গুরুত্ব ও ফজিলত : আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ বান্দা তখনই লাভ করবে যখন নেক আমল করবে। আল্লাহর রহমত লাভের জন্য উছিলা আবশ্যক। তা হলো নেক আমল। বান্দা যখন প্রকৃতভাবে স্রষ্টাকেই ভালোবাসে তখন তার জন্য কঠিন থেকে কঠিনতম আমলও সহজ হয়ে যায়। বান্দা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে অগ্রসর হয়, আল্লাহর অশেষ রহমত তার দিকে দৌড়িয়ে অগ্রসর হয়। বান্দা যখন আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে তাঁর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সামান্যতম আমল তাঁর দরবারে পেশ করে, আল্লাহ তখন বান্দার এই আমলকে ১০ থেকে ৭০ ও ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। হযরত উবাইদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব? তখন রাসূল (সা.) বললেন, তোমার উপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে, কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখ এবং রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের ৬ রোজা রাখ, তাহলেই তুমি সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে’ (তিরমিযি)।
মহান আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি একটি নেক কাজ করে সে আল্লাহর অনুগ্রহে ১০টি নেকি পাবে। একটি ভালো কাজের প্রতিদান হিসেবে ১০ গুণ বৃদ্ধির ওয়াদা করা হয়েছে। কোনো স্থানে ৭০ গুণ, কোনো স্থানে ৭০০ গুণ আবার কোথাও সীমাহীন বলে (ওয়াল্লাহু উইদাআফু লিমাই ইয়াশাআ) বর্ণনা করা হয়েছে। এ জন্য বলা হয়, ১০, ৭০ ও ৭০০ দ্বারা আধিক্যতা বর্ণনা করা উদ্দেশ্য, নির্দিষ্ট সংখ্যা বর্ণনা করা উদ্দেশ্য নয়।
রোজা মানুষের গুনাহমাফির মাধ্যমে বান্দাকে নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল করে। রোজার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। একজন মানুষের জীবন সুন্দর ও স্বচ্ছভাবে যাপনের জন্য যে ধরনের গুণ-বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন, রোজা তা সৃষ্টি করে। ধর্মপ্রাণ মুসলমান ব্যক্তি যাতে শুধু মাহে রমজানের ফরজ রোজা রেখে থেমে না যান বরং তিনি কীভাবে সহজেই পূর্ণ বছরটা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দা ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে থাকতে পারেন এবং কী করে চিরস্থায়ী জান্নাতের বাসিন্দা হতে পারেন এবং পরকালে তিনি কীভাবে সফলকাম থাকতে পারেন রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতের সামনে এই পথ সুস্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন।
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে মানব জাতিকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। মহান সৃষ্টিকর্তা চান, বান্দা যেন সর্বদা ইবাদত-বন্দেগি করে। এমন অনেক পথই আল্লাহতাআলা বান্দার জন্য খোলা রেখেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতের সামনে তা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। অল্প নেক আমলের বিনিময়ে আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহের পাত্র হওয়ার জন্য নবী করিম (সা.) কর্তৃক বর্ণিত সহজ পন্থাসমূহ থেকে একটি অতি সহজ পন্থা হলো শাওয়াল মাসের ৬টি নফল রোজা। বান্দা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই রোজা রাখবে তখন আল্লাহ তাকে পূর্ণ একটি বছর রোজা রাখার সওয়াব দিয়ে দেবেন। মহান আল্লাহ পাক হাদিছে কুদসিতে এরশাদ করেন, ‘বান্দা-বান্দীরা নফল বা সুন্নত পালনের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে থাকে।’ পবিত্র শাওয়াল মাসে ৬টি রোজা খাছ সুন্নত বা মুস্তাহাবের অন্তর্ভুক্ত এবং বহু ফজিলতের কারণ।
হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, রমজানের রোজা দশ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ৬ রোজা দু’মাসের রোজার সমান। সুতরাং এ হলো এক বছরের রোজা। শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার এই আমলটা সহজ হলেও এর ফজিলত কতই না মহান। কারও পক্ষে সহজেই সম্ভব নয় এক বছর লাগাতার রোজা রাখা। অথচ এই আমলটা বিরাট ফজিলতসম্পন্ন ও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব।
আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) বলেন, শাওয়াল মাসে রোজা রাখার তাৎপর্য অনেক। রমজানের পর রাখা রমজানের রোজা কবুল হওয়ার আলামত স্বরূপ। কেননা আল্লাহ তাআলা কোন বান্দার আমল কবুল করলে, তাকে পরেও অনুরূপ আমল করার তৌফিক দিয়ে থাকেন। নেক আমল কবুলের আলামত ও প্রতিদান বিভিন্নরূপ। তার মধ্যে একটি হলো পুনরায় নেক আমল করার সৌভাগ্য অর্জন করা। তাই নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত বাকি এগার মাসেও চালু রাখা চাই। কেননা যিনি রমজানের রব, বাকি এগার মাসের রব তিনিই আল্লাহ।
এ ছাড়া শাওয়ালের ৬ রোজা রাখার আরও ফায়দা হচ্ছে, কেয়ামতের দিন ফরজ আমলের কমতি নফল আমল দিয়ে পূরণ করা হবে। যেমন রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের রব ফেরেশতাদেরকে বলেন অথচ তিনি সবকিছু জানেন- তোমরা আমার বান্দার নামাজ দেখ; সেকি নামাজ পূর্ণভাবে আদায় করেছে- নাকি নামাজে ঘাটতি করেছে। যদি পূর্ণভাবে আদায় করে থাকে তাহলে পূর্ণ নামাজ লেখা হয়। আর যদি কিছু ঘাটতি থাকে তখন বলেন, দেখ আমার বান্দার কোন নফল নামাজ আছে কিনা। যদি নফল নামাজ থাকে তখন বলেন, নফল নামাজ দিয়ে বান্দার ফরজের ঘাটতি পূর্ণ কর। এরপর অন্য আমলের হিসাব নেয়া হবে’ [আবু দাউদ]।
হজরত সুফিয়ান ছাওরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মক্কায় তিন বছর ছিলাম। মক্কাবাসীর মধ্য থেকে জনৈক ব্যক্তি প্রত্যহ জোহরের সময় মসজিদে হারামে এসে বাইতুল্লাহ তওয়াফ করার পর নামাজ পড়ে আমাকে সালাম দিয়ে চলে যায়। ফলে তার ও আমার মাঝে হৃদ্যতা ও সম্প্রীতির সৃষ্টি হয়। হঠাৎ সে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে ডাকল এবং বলল, আমি মারা গেলে তুমি আমাকে নিজ হাতে গোসল দেবে, নামাজ পড়বে এবং দাফন দেবে। ওই রাতে তুমি আমাকে কবরে একাকী রেখে চলে আসবে না। তুমি আমার কবরের কাছে রাতযাপন করবে এবং মুনকার-নকিরের সওয়ালের সময় আমাকে সহায়তা করবে। সুতরাং আমি তাকে নিশ্চয়তা দিই। আমি তার আদেশ মোতাবেক তার কবরের কাছে রাতযাপন করি। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম। হঠাৎ ঘোষকের ঘোষণা শুনলাম, হে সুফিয়ান, তোমার রক্ষণাবেক্ষণ ও তালকিনের প্রয়োজন নেই। আমি বললাম, কীসের জন্য? তিনি বললেন, রমজানের রোজা এবং রমজান-পরবর্তী শাওয়ালের ৬টি রোজার কারণে। আমি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। অজু করে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পরলাম। অতঃপর আমি আবার একই স্বপ্ন দেখলাম। সুতরাং আমি উপলব্ধি করলাম যে, এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে নয়। সুতরাং আমি চলে গেলাম এবং বলতে লাগলাম, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে রমজানের রোজা এবং শাওয়ালের ৬টি রোজা রাখার তৌফিক দান করুন।
মাসয়ালা : শাওয়ালের ৬ রোজা এবং রমজানের কাজা রোজা এক সাথে এক নিয়তে আদায় করলে শুধুমাত্র রমজানের রোজা আদায় হবে শাওয়ালের সুন্নত রোজা আদায় হবে না।
রমজানের কাজা রোজা আদায় করা ফরজ যা কুরআন শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। আর শাওয়ালের ৬ রোজা আদায় করা সুন্নত বা মুস্তাহাব যা হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।
যখন দু’টি ভিন্ন ভিন্ন রোজা একটি অপরটির ওপর গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে প্রাধান্য পাবে তখন যেটি প্রাধান্য পাবে সেটি আদায় হয়ে যাবে অন্যটি আদায় হবে না।
যদি কেউ একই রোজার মধ্যে রমজানের কাজা রোজা এবং মান্নতের রোজার নিয়ত করে তবে ইস্তেহসান হিসেবে রমজানের কাজা রোজা আদায় হবে।
নারীদের পিরিয়ডের জন্য কাজা রোজা রেখে তার পরে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখা যায় অথবা আগে শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রেখে তার পরে বছরের সুবিধামত অন্য সময়ে কাজা রোজা আদায় করা যায়। দুইটাই জায়েজ, যার কাছে যেটা সুবিধাজনক সেভাবে রোজা পালন করবেন, তবে জেনে রাখা ভালো, আগে কাজা রোজা আদায় করা উত্তম। কারণ, কাজা রোজা আদায় করা ফরজ আর শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখা সুন্নাত।
তবে কারো যদি এমন কোন ওজর থাকে যার ফলে তিনি শাওয়াল মাসে রমজানের কাজা রোজা রাখতে গিয়ে শাওয়ালের ছয় রোজা রাখতে পারেননি। যেমন- অসুস্থতা, সফর বা মহিলাদের বিশেষ কোনো শারীরিক অবস্থায় নিফাস (প্রসবোত্তর স্রাবগ্রস্ত) হন এবং গোটা শাওয়াল মাস তিনি রমজানের রোজা কাজা করেন তাহলে তিনি জিলকদ্ব মাসে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখতে পারবেন। কারণ এ ব্যক্তির ওজর শরিয়তে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু কোন ওজর ছাড়া কেউ যদি ৬ রোজা না রাখে এবং শাওয়াল মাস শেষ হয়ে যায় তাহলে সে ব্যক্তি এর সওয়াব পাবেন না।
বান্দার ওপর আল্লাহর কত দয়া যে তিনি অল্প আমলের বিনিময়ে অধিক বদলা দেবেন। এ রোজা করা যাবে মাসের শুরু-শেষ-মাঝামাঝি সব সময়। ধারাবাহিক ও অধারাবাহিক, পরপর ৬টি রোজা রাখতে হবে এমন কোনো কথা নেই। যেভাবেই করা হোক না কেন রোজাদার অবশ্যই এর সওয়াবের অধিকারী হবে যদি আল্লাহর কাছে কবুল হয়। মহান শরিয়ত প্রণেতা ফরজের আগে-পরে নফল প্রবর্তন করেছেন যেমন- ফরজ সালাতের আগে-পরের সুন্নতগুলো এবং রমজানের আগে শাবানের রোজা আর পরে শাওয়ালের রোজা। এই নফলসমূহ ফরজের ত্রুটিগুলোর ক্ষতি পূরণ করে। কারণ রোজাদার অনর্থক বাক্যালাপ, কুদৃষ্টি প্রভৃতি কাজ থেকে সম্পূর্ণ বাঁচতে পারে না যা তার রোজার পুণ্যকে কমিয়ে দেয়।আরবি চান্দ্র বছরের দশম মাস শাওয়াল। হজের মাসের একটিও এ মাস। এ মাস থেকেই হজের উদ্দেশ্যে মুসলিম উম্মাহ পবিত্র নগরী মক্কায় গমন শুরু করেন। এ মাসের প্রথম পবিত্র ঈদুল ফিতর হওয়ায় এ মাসের আমলের বরকতও অনেক বেশি।মহান আল্লাহ মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে একমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)। আল্লাহ তায়ালার একান্ত ইচ্ছা তাঁর প্রত্যেক বান্দা তাঁর ইবাদত সম্পন্ন করার মাধ্যমে ইহ ও পরকালীন জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে। ইবাদত মূলত দুই প্রকার। ফরজ ইবাদত; যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। নফল ইবাদত; যেমন- নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ, দান-খয়রাত, নফল রোজা রাখা ইত্যাদি।আর মাহে রমজানের শিক্ষা আমরা কিছুটা হলেও অর্জন করতে পেরেছি। রমজানের শিক্ষা থেকে আমরা এতটুকু শিখতে পেরেছি যে তাকওয়া অর্জন করে, পরিপূর্ণভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি-হানাহানি পরিত্যাগ করে আমরা ভাই ভাই হয়ে গেছি। রমজান আমাদের শিখিয়েছে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে হবে এবং আগামী ১১ মাস আল্লাহর আদেশ-নিষেধ যথাযথ মেনে চলতে হবে।এক মাস রোজা রেখেই যেন বান্দা রোজাকে ভুলে না যায়, সে জন্য প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখের রোজা, আশুরার রোজা, ৯ জিলহজ আরাফার দিনের রোজাসহ অন্যান্য নফল রোজার বিধান রেখেছে ইসলাম। ফরজ নামাজের কমতিগুলো পোষাতে যেমন নফল নামাজ রয়েছে, তেমনি ফরজ রোজার পরও শাওয়ালের সুন্নত রোজা রয়েছে। এই নফলগুলো ফরজের ত্রুটিগুলোর ক্ষতিপূরণের জন্য। রোজাদার যদি অনর্থক বাক্যালাপ, কুদৃষ্টি প্রভৃতি কাজ থেকে সম্পূর্ণ বাঁচতে না পারে, তাহলে তার রোজার পুণ্য কমে যায়। আর কমতি পুণ্যকে পূর্ণ করতেই শাওয়ালের ছয়টি রোজা।শাওয়ালের ছয়টি রোজার মাধ্যমে রমজানের রোজার শুকরিয়া আদায় করা হয়। যখন কোনো বান্দার আমল আল্লাহ তাআলা কবুল করেন তখন তাকে অন্য নেক আমলের তাওফিক দেন। আমাদের পূর্বসূরিদের অনেকে রমজানের পর ছয় মাস আল্লাহর দরবারে এ জন্য কাঁদত, যেন রমজানে কৃত ইবাদত কবুল হয়। ইবাদত কবুল হওয়ার আলামত হলো আগের অবস্থার উন্নতি হওয়া। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘মৃত্যু পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদত করো।’ (সুরা : আল-হিজর, আয়াত : ৯৯)রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও শাওয়ালের রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রাখার নির্দেশ দিতেন। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ (মুসলিম : ২/৮২২)রমজানের ৩০টি রোজার সঙ্গে শাওয়ালের ছয়টি রোজা যুক্ত হলে মোট রোজার সংখ্যা হয় ৩৬টি। আর প্রতিটি পুণ্যের জন্য ১০ গুণ পুরস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে কোরআনুল কারিমে। তাহলে ৩৬টি রোজার ১০ গুণ হলে ৩৬০টি রোজার সমান (এটি পুরস্কারের দিক থেকে)। অর্থাৎ সারা বছর রোজার সমান সওয়াব হবে। হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রমজানের রোজা ১০ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান। সুতরাং এ হলো এক বছরের রোজা।’ (নাসায়ি : ২/১৬২) শাওয়ালের ছয়টি রোজা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নত। মাসের শুরু-শেষ কিংবা মাঝামাঝি—সব সময়ই রাখা যায় এ রোজাগুলো। একনাগাড়ে অথবা মাঝে ফাঁক রেখে পৃথকভাবেও রাখা যায়। শাওয়াল মাসে শুরু করে শাওয়াল মাসে শেষ করলেই হলো। তবে ঈদুল ফিতরের পর শাওয়ালের প্রথম দিকে একসঙ্গে ছয়টি রোজা রাখাই উত্তম। আর রমজানের কাজা রোজা থাকলে প্রথমে কাজা রোজা রাখবে।পরিশেষে, আমরা মাহে রমজানের অনুশীলন বাকি ১১ মাস কাজে লাগাব। মহান আল্লাহ আমাদের তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করার তাওফিক দান করুন। আমিনআল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে মানবজাতিকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। এমন অনেক পথ আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের সামনে তা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। অল্প নেক আমলের বিনিময়ে আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহের পাত্র হওয়ার জন্য নবী করিম (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত অমিয় বাণীতে প্রদত্ত উত্তম পন্থাসমূহ থেকে একটি অতি সহজ পন্থা হলো শাওয়াল মাসের ছয়টি নফল রোজা। বান্দা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই ছয়টি নফল রোজা রাখবে, তখন আল্লাহ তাকে পূর্ণ একটি বছর রোজা রাখার সওয়াব দিয়ে দেবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পূর্ণবছরই রোজা রাখল।’ (মুসলিম: ১১৬৪)
শাওয়াল মাসের ছয়টি নফল রোজা পালন সারাটি বছর রোজা রাখার সওয়াব প্রাপ্তির এমনি একটি পরম সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। একজন ব্যক্তি যখন রমজান মাসের রোজা রেখে তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসেও ছয়টি রোজা পালন করল, সে এই রোজার কারণে আল্লাহর দরবারে পূর্ণ একটি বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব পেয়ে গেল। হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে যে ‘রমজানের রোজা ১০ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান; এই হলো এক বছরের রোজা।’ অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা শেষ করে ছয় দিন রোজা রাখবে, সেটা তার জন্য পুরো বছর রোজা রাখার সমতুল্য।’ (আহমাদ: ৫/২৮০, দারেমি: ১৭৫৫)
কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতাস্বরূপ শাওয়ালের ছয়টি নফল রোজার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা মুস্তাহাব।
মাহে রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের মধ্যে ছয়টি রোজা রাখার ফজিলত কতই না মহান! কারও পক্ষে সহজেই সম্ভব নয় এক বছর লাগাতার রোজা রাখা। অথচ এই নেক আমলটা বিরাট ফজিলত সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব। একদা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সারা বছর রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘নিঃসন্দেহে তোমার ওপর তোমার পরিবার-পরিজনের হক বা অধিকার রয়েছে।’ অতঃপর তিনি বললেন, ‘মাহে রমজানের এবং তার পরবর্তী দিনগুলোরও প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারে রোজা রাখবে। সুতরাং যখন তুমি এই রোজাগুলো রাখবে তখন যেন তুমি সারাটা বছরই রোজা রাখলে।’
বান্দার ওপর আল্লাহ কতই না পরম দয়ালু ও অশেষ মেহেরবান যে তিনি অল্প আমলের বিনিময়ে অধিক সওয়াব দেবেন। বান্দা যখন আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে তাঁর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সামান্যতম আমল তাঁর দরবারে পেশ করে, আল্লাহ তখন বান্দার এই আমলকে ১০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। আল্লাহর এ দয়া ও অনুগ্রহ বান্দা তখনই লাভ করবে, যখন বান্দা নেক আমল করবে। তাই বান্দা যেন আল্লাহর রহমতকে হাতছাড়া না করে, বরং অল্প নেক আমলের বিনিময়েই যেন সে আল্লাহর অফুরন্ত দয়া ও অশেষ অনুগ্রহের অধিকারী হয়ে যায়। সৎ কর্ম সম্পাদনের প্রতিফল সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘কেউ কোনো সৎ কর্ম করলে সে তার ১০ গুণ পাবে এবং কেউ কোনো অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিদান দেওয়া হবে।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘অনন্তর কেউ অণু পরিমাণ সৎ কর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।’ (সূরা আজ-জিলজাল, আয়াত: ৭-৮)
কোনো কিছুতেই যাতে শাওয়ালের নফল রোজাগুলো ছুটে না যায় এবং কোনো ব্যস্ততাই যেন মানুষকে অধিক সওয়াব অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শাওয়ালের ঐচ্ছিক রোজা মাসের শুরু থেকে শেষ সময় পর্যন্ত পালন করা যাবে। ধারাবাহিক ও অধারাবাহিক, যেভাবেই হোক না কেন, রোজাদার অবশ্যই এর সওয়াবের অধিকারী হবেন, যদি আল্লাহর দরবারে রোজা কবুল হয়। তবে যার ওপর মাহে রমজানের রোজা কাজা আছে, সেই ব্যক্তি আগে কাজা আদায় করবে, তারপর শাওয়ালের ঐচ্ছিক রোজা পালনে ব্রতী হবে। কারণ, ওয়াজিব আদায়ের দায়িত্ব পালন নফল আদায়ের চেয়ে অধিক গুরুত্ব রাখে। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মাহে রমজানের পূর্ণ রোজা রাখবে, আর যার ওপর কাজা রয়ে গেছে সে তো রোজা পুরা করেছে বলে গণ্য হবে না, যতক্ষণ ওই রোজাগুলো কাজা আদায় না করে।’ (মুগনি: ৪/৪৪০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ফরজের আগে-পরে সুন্নত ও নফল প্রবর্তন করেছেন। যেমন—ফরজ নামাজের পূর্বাপর সুন্নতগুলো এবং মাহে রমজানের আগে শাবানের ঐচ্ছিক রোজা আর পরে শাওয়ালের নফল রোজা। এই নফল ইবাদতগুলো ফরজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোর ক্ষতি পূরণ করে। কারণ, রোজাদার কখনো অনর্থক বাক্যালাপ, কুদৃষ্টি প্রভৃতি খারাপ কাজ থেকে সম্পূর্ণরূপে বাঁচতে পারে না, যা তার রোজার সওয়াব কমিয়ে দেয়।