
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় জেলা। বাংলাদেশের একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,কৃষি ও মৎস্য চাষের জন্য বিখ্যাত এ জেলা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)–এর তথ্য অনুযায়ী ২২ লাখ জনসংখ্যার এ জেলাটিতে ২০-২৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এ জেলায় রয়েছে একটি মেডিকেল কলেজ, দুটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ৪৪টি কলেজ। ৮টি উপজেলায় বিভক্ত এই জেলা পিষ্ট হচ্ছে বেকারত্বের কবলে। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে ফিরছে মা–বাবার কাছে। মিলছে না কাঙ্ক্ষিত চাকরির দেখা। হাজার হাজার বেকার যুবক হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। বিসিএস আর সরকারি চাকরির পেছনে ছুটে শেষ হচ্ছে অনেকের বয়স। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও মিলছে না পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ।
বিশাল এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বাপ-দাদার পেশা হিসেবে কৃষি ও মৎস্য চাষ বেছে নিলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ আর সুযোগ-সুবিধার অভাবে হতে পারছেন না উদ্যোক্তা। সমাজের চোখে ছোট হওয়ার ভয়ে শিক্ষিত বেকারেরা কৃষি বা মৎস্য চাষকেও গ্রহণ করেন না। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষ করে বেকারের তকমা নিয়ে শূন্য পকেটে ঘুরছেন এক অফিস থেকে অন্য অফিসে চাকরির সন্ধানে। বেকার নামক অভিশাপ থেকে বাঁচতে অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন রাজধানীর বিভিন্ন গার্মেন্টে।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে সম্ভাবনাময় একটি বিশাল যুব সমাজ। অর্থের অভাব,পারিবারিক চাপ, হীনম্মন্যতা আর হতাশায় অনেকে বেছে নিচ্ছেন বিকল্প পথ। মানসিক শান্তির খোঁজে কেউ যুক্ত হচ্ছেন মাদকের আড্ডায়, কেউবা অর্থের অভাবে বিসর্জন দিচ্ছেন নীতিনৈতিকতা; করছেন চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো মানবতাবিবর্জিত কাজ। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ৬২ লাখের বেশি,যেখানে শুধু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৫৪ লাখ।
বিশালসংখ্যক এই বেকার যুবসমাজ তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। এ জেলায় ২২ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে পাঁচ লক্ষাধিক মৌসুমি বেকার রয়েছেন। কারণ, বর্ষার মৌসুমে আশাশুনি, শ্যামনগর ও তালা উপজেলার নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি হয়। ফলে কর্মসংস্থান হারানোর পাশাপাশি শত শত পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়েন। ভূমিহীন এ জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করলেও বড় একটি অংশ শ্রম বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করে, যারা মৌসুমি বেকারে পতিত হয়। জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২ অনুযায়ী দেশে মোট ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সর্বশেষ জেলা হওয়ায় প্রযুক্তিগতভাবে অনেক পিছিয়ে আছে জেলাটি। শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য গড়ে ওঠেনি বড় কোনো শিল্পকারখানা। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় না। এ ছাড়া জেলার বেশির ভাগ মানুষ কৃষি ও মৎস্য চাষের উপর নির্ভরশীল হলেও তৈরি হচ্ছে না উদ্যোক্তা। প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে মিলছে না চাকরি। সাম্প্রতিককালে কিছু যুবক ব্যক্তি পর্যায়ে মৌ চাষ ও মধু সংগ্রহের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেটিও ব্যাহত হচ্ছে।
২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি কর্তৃক সাতক্ষীরাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছিল। সেটি বাস্তবায়িত হলে এ জেলার কৃষিপণ্য দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হবে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়াও কৃষি ও মৎস্য খাতকে আধুনিকায়ন, কারিগরি শিক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান প্রকল্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও শিক্ষিত এ বেকার জনগোষ্ঠীকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে পারলে তারা নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হতে পারবে, পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
শহরের তুলনায় গ্রামে দারিদ্রতার হার বেশি সবচেয়ে বেশি দারিদ্র বরিশাল বিভাগে, জেলা মাদারীপুর, উপজেলা ডাসার * সবচেয়ে কম দারিদ্র চট্টগ্রাম বিভাগে, জেলা নোয়াখালী * গুলশান-বনানী নয়, সবচেয়ে কম দরিদ্র মানুষ থাকেন ঢাকার পল্টন
সামগ্রিকভাবে দেশের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, শহরের তুলনায় গ্রাম এলাকায় দারিদ্র্যতার হার বেশি। দেশের বিভাগীয় দারিদ্র্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি দ্রারিদ্রসীমার নিচে রয়েছে বরিশাল বিভাগের মানুষ। আর জেলায় সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মাদারীপুর। উপজেলা বিবেচনায় সবচেয়ে গরিব মাদারীপুরের ডাসার।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২’ এ তথ্য উঠে এসেছে। বিবিএসের পভার্টি অ্যান্ড লাইভলিহুড স্ট্যাটিসটিকস সেল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিআইসিসি সম্মেলন কক্ষে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের মো. মাহবুব হোসেন। বিশেষ অতিথি বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির উপপ্রধান সিমোন লসন পার্চমেন্ট। বিবিএসের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, বিবিএস ও এসআইডির কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মানচিত্রে দেখা গেছে, ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে মানচিত্রে তা দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি দেশের গ্রাম এলাকায় দারিদ্র্যতা কমে শহর এলাকায় বেড়েছে। ২০২২ সালের খানা আয় ব্যয় জরিপে গ্রাম এলাকার দারিদ্র্য ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, দারিদ্র্য মানচিত্রে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২২ সালের খানা জরিপে শহর এলাকায় দারিদ্র্য ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ; দারিদ্র্য মানচিত্রে তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিবিএসের দারিদ্র্য মানচিত্রে দেখা যায়, দেশের বিভাগীয় দারিদ্র্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আর চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে কম দারিদ্র্যতার হার, ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মাদারীপুর জেলা। এ জেলায় দারিদ্র্যতার হার ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ, আর সবচেয়ে কম দরিদ্র নোয়াখালী জেলায় ৬ দশমিক ১ শতাংশ। আর উপজেলা হিসেবে ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ দারিদ্র্যতা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মাদারীপুরের ডাসার। আর সবচেয়ে কম দরিদ্র ঢাকার পল্টনে। এ এলাকায় দারিদ্র্যতা ১ শতাংশ।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্য বেড়েছে সিলেট, রংপুর, খুলনা ও ঢাকা বিভাগে। বরিশালে দারিদ্র্যের হার বেশি হলেও তা আগের ২৬.৯ শতাংশ থেকে ০.৩ শতাংশ কমে হয়েছে ২৬.৬ শতাংশ।
তথ্য বলছে, ঢাকার পল্টনে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে কম। এ এলাকার মাত্র এক শতাংশ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ঢাকায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কামরাঙ্গীরচরে, ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। ভাষানটেকে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ, মিরপুরে ১২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। এমনকি রাজধানীর ধনী এলাকা হিসেবে পরিচিত বনানীতে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। এছাড়া দারুস সালামে ১১ শতাংশ, যাত্রাবাড়ীতে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আদাবরে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বসবাস করে। অন্যদিকে ঢাকার নিউমার্কেটে ১ দশমিক ৭ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বসবাস করে। এছাড়া রমনায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, মতিঝিলে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, কোতোয়ালিতে ২ দশমিক ৯ শতাংশ, গুলশানে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, গেন্ডারিয়ায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ধানমন্ডিতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।
২০১৭ সালের ক্রয়ক্ষমতা সমতারভিত্তিতে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা হলো দৈনিক আয় ২ দশমিক ১৫ ডলার। অর্থাৎ, দৈনিক ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম আয় করা মানুষ দরিদ্র বলে গণ্য হবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে বিত্তশালী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তর অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। দেশে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে সামনে আসা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে এতে।বিশ্ব ঐতিহ্যের অপরুপ শোভামন্ডিত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলীয় অঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার আইবুড়োনদীর কোলঘেঁষে অবস্থিত মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রাম। এই গ্রামের জেলেপল্লীতে বসবাস করে স্বপন সরদার ও ভারতী সরদার। ২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর তাদের পরিবারে দ্বিতীয় সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহণ করে ফুলঝুরি সরদার। দুই ভাই ও বোনের মধ্যে সে ছোট। তার বাবা সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরে ও মা গৃহিনী। ২০১৮ সালে ৭ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আর পড়া লেখাপড়ার সৌভাগ্য হয়নি ফুলঝুরি সরদারের।
বাবা-মায়ের অভাব অনটনের সংসারের মধ্যে পড়ালেখা করতে না পেরে বাবার কাঁকড়া ও মাছ ধরা পেশায় সহযোগিতা করতো ফুলঝুরি সরদার। দৈনিক ৫০-১০০ টাকা করে আয় করত সে। এক পর্যায়ে সে জানতে পারে উত্তরণ মথুরাপুর গ্রামে মাছ ও কাঁকড়া শিল্পের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে জড়িত শিশুদেরকে নিয়ে একটি লার্নিং সেন্টার শুরু হতে যাচ্ছে। এ সময় ভুলে যাওয়া পড়ালেখাকে পুনরায় ধরে রাখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে ফুলঝুরি।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী হিসাবে অর্ন্তভূক্ত হয়ে সে নিয়মিত পড়ালেখা চলমান রাখে। লার্নিং সেন্টারে পড়ালেখার পাশাপাশি দর্জি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ফুলঝুরি সরদারের বাবার মাত্র ৩ শতক খাস জমিতে মাটির বেড়া ও কাঁচা দেয়ালের ঘর। বাবার আর্থিক সহযোগিতা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং দর্জি পেশার কাজকে ধরে রাখার জন্য নব উদ্যমে কাজ শুরু করে সে। এতে দৈনিক ১০০ থেকে ১২০ টাকা আয় হয়।
এক সময়ে পেটে ভাত কিংবা পরোনের ন্যূনতম চাহিদামতো কাপড় ঠিকমতো জুটত না, তবুও সে দমেনি। হার মানেনি দারিদ্র্যের কাছে। নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার পথে হাঁটছে। যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দারিদ্র্য দূর করে পরিবারের দুঃখী বাবা-মার মুখে হাসি ফোটানোই তার মূল লক্ষ্য। এজন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি দর্জির কাজ করে সার্থক হয়েছে। স্বপ্নপূরণের দিকে এগিয়ে চলছে ফুলঝুরি। জীবনযুদ্ধে নেমে শত বাধা পেরিয়ে সে দেখিয়েছে বিশেষ কৃতিত্ব।
ফুলঝুরি সরদার জানায়, সে লেখাপড়ার পাশাপাশি টেইলার্সে কাজ করবে। ভালভাবে কাজ শিখে সে সফল নারী দর্জি হয়ে নিজেই টেইলার্সের মালিক হবে। বাবা-মায়ের সংসারের কষ্ট দূর করবে। যতদিন নিজে একটি দোকান করতে না পারবে ততদিন এভাবেই কাজ করে যাবে। নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় সে।
উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক নাজমা আক্তার বলেন, শ্যামনগর উপজেলায় মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনি, গাবুরা ও কাশিমাড়ী ইউনিয়নে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই চার টি ইউনিয়নের চারটি লার্নিং সেন্টারে ৩৫০ জন শ্রমজীবী শিশুকে শিক্ষাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই শিশুরা নিয়মিত লার্নিং সেন্টারে এসে লেখাপড়া করছে এবং এরমধ্য থেকে ২৫ জন ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সুইং মেশিন ও টেইলরিং এবং ২৫ জন ইলেকট্রনিকস ও মোবাইল সার্ভিসিংয়ের বিষয়ে তিন মাসের কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। এছাড়া এই সকল শ্রমজীবী শিশুদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও সুযোগ বৃদ্ধির জন্য শিশুদেরকে নিয়ে বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অসীম কুমার মৃধা বলেন, উত্তরণের এডুকো প্রকল্পের এই কার্যক্রম উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সোহাগ হোসেন জানান, মূলত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত স্কুল বহির্ভূত শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে আনার জন্যই এ ব্যবস্থা। এটি দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া উপকূলীয় এলাকায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস ও মোবাইল সার্ভিসিং এবং সুইং মেশিন ও টেইলরিং প্রশিক্ষণ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ বল মনে করেন তিনি।সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব সামলাচ্ছেন এ অঞ্চলের নারীরা। লবণাক্ততা, জীবিকা সংকট ও ঘন ঘন দুর্যোগে বিপর্যস্ত এসব এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাবে পুরুষরা শহরমুখী। ফলে পরিবারের সব দায়িত্ব এসে পড়েছে নারীদের কাঁধে।
সংসার চালানো থেকে শুরু করে সন্তান লালন-পালন, নিরাপদ পানি সংগ্রহ ও আয়-রোজগার সবকিছু মিলিয়ে তাদের দৈনন্দিন কাজের চাপ অন্য অঞ্চলের নারীদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। প্রাকৃতিক, শারীরিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও এ অঞ্চলে পরিবারের সকল দায়িত্ব নারীদেরকেই পালন করতে হচ্ছে।
শ্যামনগরের মেয়েরা সাবালিকা হওয়ার পর থেকেই প্রকৃতির কাছে তারা কতটা অসহায় তা বুঝতে শুরু করে।
তাদের ভাগ্যটা এরকম যে বুঝলেও কিছু করার থাকে না। শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একজন মানুষের পুরো জীবনের ওপর কীভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ শ্যামনগরের নারীকূল।
জীবনের বিভিন্ন বাঁকে তাদের যে লড়াই, ত্যাগ ও অবর্ণনীয় কষ্টের বয়ান তার খবর কি রাখে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী তারা? না, এ খবর কেউ রাখে না।
উপকূলীয় শ্যামনগরের কলবাড়ি এলাকার একটি সরকারি গুচ্ছগ্রামে বাস করছে ১৭ বছর বয়সী কিশোরী বুলবুলি (ছদ্মনাম)। তার রয়েছে অবর্ণনীয় জীবনসংগ্রাম। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙণ ও দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত তিনি।
বুলবুলি বর্তমানে স্থানীয় একটি পলিটেকনিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে বা ভ্যানে করে স্কুলে যাতায়াত করতে হয় তাকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার মা দিনমজুরি ও রান্নার কাজ করে সংসার চালান।
তিনি জানান, তার বাবা বহু বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে থাকেন না। মাঝে মাঝে ফোনে যোগাযোগ হলেও কোনো আর্থিক বা মানসিক সহায়তা দেন না। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি তার মাকে একাই সংগ্রাম করতে দেখেছেন।
স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকেও বুলবুলি চরম সংকটে রয়েছেন। তার মাসিক শুরু হয় ১২ বছর বয়সে। তখন থেকেই অতিরিক্ত রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, কোমর ও পা ব্যথা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাসিক সাত থেকে আট দিন স্থায়ী হয় এবং অনেক সময় রক্তপাত স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, চুলকানি ও ত্বকের এলার্জির সমস্যায় ভুগছেন তিনি। স্থানীয় ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকসহ একাধিক জায়গায় চিকিৎসা নিলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। একজন গাইনি চিকিৎসক আলট্রাসনোগ্রাফি ও পরীক্ষার পর জরায়ুতে প্রাথমিক সমস্যার ইঙ্গিত দেন এবং নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে অভাবের কারণে বুলবুলি পূর্ণ ডোজের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না।
মাসিকের সময় পুকুরের দূষিত পানিতে গোসল করতে বাধ্য হওয়ায় সংক্রমণ ও অস্বস্তি আরও বেড়ে যায় বলে জানান তিনি। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বুলবুলি জানান, মাসিকের ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেক সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে হয়।
পরীক্ষার সময় এই সমস্যা হলে পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব পড়ে। তবুও তিনি পড়াশোনা ছাড়তে চান না।
তার একমাত্র স্বপ্ন মায়ের কষ্ট লাঘব করা এবং মানুষের মতো মানুষ হওয়া।
গাবুরা গ্রামের জামিলা, তারও রয়েছে অপরিমেয় জীবন সংগ্রাম। জানিয়েছেন তিনি সে কথা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
তিনি বলেন, আমার পরিবারে আগে খাবারের তেমন কোন অভাব ছিল না। ছোট বেলায় ঘরে মাংস, দুধ, ঘি সবই ছিল। এখন সব কিছুই কিনে খাওয়া লাগে। সাথে নিজের ও স্বামীর চিকিৎসা খরচের ঘানি টানতে হচ্ছে।
জামিলা বলেন, ‘এই সংসারের সবকিছুর দায়িত্ব আমার। আগে স্বামী কাম করত, এখন তিনি অসুস্থ। আমি না কামাইলে ঘরে ভাত উঠবে না। দোকান করি, সেলাই করি, ছিট কাপড় আর জুতা বিক্রি করি। ছেলে এখন বড় হইছে, সেও একটু আয় করে। কিন্তু সংসারের হিসাবটা আমার হাতেই। আগে ভাবতাম পুরুষ মানুষই সব চালায়, এখন বুঝি সময় বদলাইছে, না দাঁড়াইলে সংসার ভাঙে।’
লবণাক্ততার কারণে তার জরায়ুতে টিউমার হয়। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তার জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি সাত-আট বছর রক্ত ভাঙার সমস্যায় ভুগছি।
শেষে ডাক্তারে বলল জরায়ুতে টিউমার, অপারেশন ছাড়া উপায় নাই। অপারেশন করতে ৪০ হাজার টাকা খরচ হইছে, সাত ব্যাগ রক্ত লাগছে। স্বামীর কোনো সাহায্য পাই নাই। ছেলে আর আমার নিজের ব্যবসার টাকায় অপারেশন করেছি। অপারেশনের আগের দিন আমি প্রায় মরার মতো ছিলাম।’
তবে স্বামী থাকার পরও সংসার নেই জামিলার। তার নিজের উপার্জন দিয়ে তিনি নিজেই চলতে পারছে না উল্লেখ করেন। স্বামীর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি অসুস্থ মানুষ। কাজ করতে পারেন না ঠিকমতো।
শ্যামনগরে থাকে, টুকটাক ব্যবসা করেন। আমি একা কামাই করি, ওই লোককে পুষবো কেমনে? তাই আলাদা থাকি। ডিভোর্স হয় নাই, কিন্তু সম্পর্ক নাই অনেক বছর। সংসার চালাইতে গেলে আবেগে বসে থাকলে হয় না।’
জামিলা বলেন, ‘এখানে আগের মতো আর কিছু নাই। জমি নাই, পুকুর নাই। সব কিছু কিনে খাইতে হয়।
আগে আব্বার আমলের সময় এই এলাকায় অভাব ছিল না। এখন লবণ পানি, কাজের অভাব, সব মিলায়া মানুষ টিকতেই পারতেছে না। শরীর খারাপ থাকলেও কাজ থামানো যায় না, কারণ থামলে খাওয়া বন্ধ।’
ময়না গ্রামের কেয়ার জীবনের গল্পও অনেকটা একই রকম। তার দুই সন্তানের জন্মের সময় দুইবার সিজার করতে হয়েছে। একবার অ্যাপেন্ডিক্স ও জরায়ুর অপারেশনসহ মোট চারবার সার্জারি করতে হয়েছে। ঋণের কিস্তি দিতে দিতেই তার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। এদিকে তার স্বামী থাকলেও স্বামীর আয় না থাকায় পরিবারের সকল দায়িত্ব এখন কেয়ার কাঁধে।
কেয়া বলেন, ‘আমার স্বামী দিনমজুর। মাসে খুব বেশি টাকা পায় না। এই ইনকামে ঘর চালানো খুব কঠিন।
আমার চিকিৎসা, ছেলেমেয়ের খরচ, ঋণের কিস্তি – সব মিলিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাই। আমি অসুস্থ মানুষ, তবুও সংসারের হিসাবটা আমার মাথাতেই ঘোরে। না ভাবলে তো চলেই না।’
তিনি বলেন, ‘খাওয়ার পানির জন্য আমাকে এক কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। কলস কাঁধে করে আনি। এই পানি শুধু খাওয়ার জন্য রাখি। রান্না, গোসল, বাথরুম – সব জায়গায় লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হয়। পানির এই কষ্টটা মেয়েদের উপর দিয়েই যায়।’
শরীর খারাপ থাকলেও কাজের চিন্তা মাথা থেকে যায় না উল্লেখ করে কেয়া বলেন, ‘এখানে কাজের কোনো ঠিক নাই। নদীর পানি বাড়ে, লবণাক্ততার সমস্যাও বাড়ে। তখন কাজ কমে যায়। শুধু স্বামীর আয়ের ওপর ভর করে সংসার চালানো যায় না। এখন সংসারে কী আগে হবে, কী পরে হবে – এই সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হয়।
আগে এসব চিন্তা করতাম না। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, আমাকে না ভাবলে সংসারই চলবে না।’
শ্যামনগরের উপজেলা নারী উন্নয়ন বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক এই এলাকার মানুষের জীবনযাপনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাবে তাদের সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই এলাকার মানুষের সমাজ, পরিবার, স্বাস্থ্য, আয়সহ নানান ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ঘন ঘন মাইগ্রেশনের কারণে এ এলাকার পরিবার ব্যবস্থা অন্য এলাকার চেয়ে ভিন্ন।
তালাক ও স্বামী পরিত্যক্তার হার অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। পুরুষরা কাজের জন্য অন্য এলাকায় যাওয়ায় পরিবারের প্রায় সকল কিছু নারীদের সামলাতে হয়।
এখানে শীতকালে কাজ না থাকায় পুরুষরা অন্য এলাকায় কাজের জন্য চলে যায়। এসময়টিতে নারীদের পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। কারণ পুকুর, জলাশয়গুলো শুকিয়ে যায়। এই সময়ে নারীদের বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে কষ্ট বেশি হয় বলে জানান তিনি।
এই এলাকায় ৩০ টির বেশি এনজিও তাদের বিভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। সরকারি বিভিন্ন খাতের নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হয় বলে জানান এই কর্মকর্তা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসান শাফী এই এলাকার মানুষ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা থেকে দেখেছি যে আমরা এখানে শুধু নারীদের ব্যক্তিগত সহনশীলতা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপের কারণে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গভীর রূপান্তর প্রত্যক্ষ করছি। লবণাক্ততা, জীবিকা সংকট ও ঘন ঘন দুর্যোগের ফলে পুরুষদের বড় একটি অংশ কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, আর এর ফলে বাস্তবে পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব নারীদের কাঁধে এসে পড়ছে। গাবুরার বহু পরিবারে নারীরাই এখন আয়, সন্তান লালন-পালন, পানি সংগ্রহ এবং অসুস্থ স্বজনের দেখভাল ইত্যাদি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। অথচ জমির অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তারা সবচেয়ে অবহেলিত। এর ফলে এক ধরনের ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ তৈরি হচ্ছে, যেখানে নারীরা পরিবার ও সমাজ টিকিয়ে রাখছেন, এবং শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সবচেয়ে বেশি বহন করছেন।
এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে জলবায়ু পরিবর্তন এখানে শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বরং একটি গভীর লিঙ্গভিত্তিক স্বাস্থ্য ও ন্যায়ের সংকট। সরকারের অভিযোজন পরিকল্পনা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতিতে যদি শ্যামনগরের নারীদের এই বাস্তব ঝুঁকিকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিবেচনা না করা হয়, তাহলে জলবায়ু অভিযোজন কার্যকর হবে না এবং বিদ্যমান বৈষম্য আরও গভীর হবে।দেশে যত গরিব মানুষ আছে, তার এক-তৃতীয়াংশেরই বাস ঢাকা বিভাগে। আর সবচেয়ে কম দরিদ্র মানুষ থাকে সিলেট বিভাগে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের দরিদ্র মানুষের ৩২ দশমিক ৩ শতাংশই বাস করে ঢাকা বিভাগে। আর সিলেটে বাস করে মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ দরিদ্র মানুষ। বেশি মানুষ বাস করে বলেই ঢাকা বিভাগে গরিব মানুষের সংখ্যাও বেশি।
অন্যদিকে জেলাওয়ারি হিসাবে কুষ্টিয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে কম, ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি কুড়িগ্রামে। এই জেলার ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষই গরিব।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল বুধবার এই দারিদ্র্য মানচিত্র প্রকাশ করা হয়।
খানা আয়-ব্যয় জরিপে উল্লিখিত দারিদ্র্য হারের সঙ্গে দারিদ্র্য মানচিত্রের তথ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। মানচিত্রটি প্রণয়ন করা হয়েছে খানা জরিপ ও আদমশুমারির পরিসংখ্যান সমন্বয় করে। খানা জরিপ অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশের দারিদ্র্য হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মানচিত্র অনুযায়ী, এ হার ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক সূত্র বলছে, দারিদ্র্য হারের গরমিলের কারণ হলো, খানা জরিপ করা হয় কিছু নির্ধারিত খানা ধরে। আর আদমশুমারিতে দেশের প্রত্যেক মানুষকে গণনা করা হয়। দারিদ্র্য মানচিত্র প্রণয়নে খানা জরিপ থেকে গরিব মানুষের শুধু মৌলিক চাহিদার উপাত্তগুলো নেওয়া হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার সঙ্গে খানা জরিপের মৌলিক চাহিদার উপাত্তগুলো সমন্বয় করতে গিয়েই দারিদ্র্য হারে কিছুটা হেরফের হয়েছে। আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যাকে দারিদ্র্য হার দিয়ে ভাগ করলে গরিব মানুষের হিসাব পাওয়া যাবে। সে অনুযায়ী দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি।
দারিদ্র্য মানচিত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে জানান, গরিব মানুষের হার কমাতে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। গরিব মানুষের আয় বাড়লে দারিদ্র্য হার কমবে। গরিব মানুষের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আর গরিবের সংখ্যা কমে যাওয়ার পর আয়-বৈষম্য কমানোর নীতি-সহায়তা দিতে হবে। বর্তমানে রাষ্ট্র ধনী মানুষকে আরও ধনী হওয়ার নীতি-সহায়তা দিয়ে থাকে।
একই রকম মত দিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে কাজের সুযোগ অপেক্ষাকৃত বেশি। তাই সেখানে বেশি গরিব মানুষ ভিড় করে। যদি অন্য বিভাগগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবে দারিদ্র্য হার কিছুটা দ্রুত গতিতে কমানো যেত। তাঁর মতে, দারিদ্র্য হার কমানোর প্রবণতা ত্বরান্বিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য কৃষি, শ্রমঘন শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে।
গতকাল প্রকাশিত দারিদ্র্য মানচিত্র অনুযায়ী, সার্বিকভাবে ঢাকা বিভাগের পর বেশি গরিব মানুষ বাস করে চট্টগ্রামে, ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে ১৫ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বরিশাল বিভাগে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
কোনো বিভাগে বসবাসকারী মানুষের কত শতাংশ দরিদ্র, সে তথ্যেরও উল্লেখ রয়েছে মানচিত্রে। তাতে দেখা যাচ্ছে, রংপুর বিভাগে যত মানুষ বাস করে, তার ৪২ শতাংশই দরিদ্র।

