
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিনেই বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর ও তথ্যে গড়মিল থাকার অভিযোগে আলোচিত বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমসহ মোট তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। শনিবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এই যাচাই-বাছাই কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মিজ আফরোজা আখতার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মনোনয়নপত্র যাচাই করেন। যাচাই শেষে তিনি জানান, নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য দাখিলকৃত ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসংবলিত তালিকা যাচাই করা হয়েছে। এতে একাধিক প্রার্থীর দাখিল করা ভোটার তথ্য, স্বাক্ষর ও জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ফলে বিধি অনুযায়ী তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৩ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পাওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন ডা. শহিদুল আলম। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। এলাকায় তার প্রার্থিতা ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনৈতিক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। তবে যাচাই-বাছাইয়ে তার দাখিল করা ১ শতাংশ ভোটারের তথ্যে সঠিকতা না পাওয়ায় নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুসারে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
ডা. শহিদুল আলমের পাশাপাশি একই অভিযোগে আরও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএ আসফউদ্দৌলা খান ও আসলাম আল মেহেদীর মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের দাখিল করা ভোটার তালিকায় স্বাক্ষরের মিল না থাকা, ভোটার এলাকার অসামঞ্জস্য এবং কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি পাওয়া গেছে। এসব কারণেই তিনজনের মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. ওয়েজ কুরুনীর মনোনয়নপত্র আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, তার মনোনয়নপত্রের কিছু বিষয়ে অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যাখ্যা পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
মনোনয়নপত্র যাচাই শেষে সাতক্ষীরা-৩ আসনে যাদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে তারা হলেন— কাজী আলাউদ্দীন (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপি), হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাসার (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), মোঃ আলিফ হোসেন (জাতীয় পার্টি) এবং রুবেল হোসেন (বিএমজেপি)। এসব প্রার্থী এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মিজ আফরোজা আখতার বলেন, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি মনোনয়নপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। কারও প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়নি। যেসব প্রার্থীর কাগজপত্রে ত্রুটি পাওয়া গেছে কিংবা ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর ও তথ্য সঠিকভাবে মিলেনি, বিধি অনুযায়ী তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তবে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
তিনি আরও জানান, আপিল কর্তৃপক্ষ যদি মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে, সে অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
উল্লেখ্য, সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে এবার মোট আটজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিনেই তিনজনের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আলোচিত বিদ্রোহী প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
এখন আপিল প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা ও তাদের সমর্থকরা। আপিলের ফলাফল অনুযায়ী সাতক্ষীরা-৩ আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা নির্ধারিত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
Tags : সাতক্ষীরা-৩ নির্বাচন ডা. শহিদুল আলম বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়ন বাতিল নির্বাচন কমিশন রিটার্নিং কর্মকর্তা আশাশুনি কালিগঞ্জ জাতীয় নির্বাচন ভোটার তালিকা ১ শতাংশ ভোটার বাংলাদেশ রাজনীতিতে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এদিকে সাতক্ষীরা চারটি আসনে রাত্রি যাচাই-বাছাই শেষে সঠিক তথ্য নিম্নেউল্লেখ করা হলো,ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আফরোজা আখতার জানান, জেলায় মোট ৩৫টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে ২৯টি। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১৯টি মনোনয়ন বৈধ ও ১০টি মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাই শেষে চারজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। শেষ মুহূর্তে বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিবের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক সরদার মুজিব নামে পরিচিত এসএম মুজিবুর রহমানের মনোনয়ন ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর সঠিক না পাওয়ায় বাতিল করা হয়।
এ আসনে আরও মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মো. ইয়ারুল ইসলাম (বাংলাদেশ কংগ্রেস), মো. ইজ্জত উল্লাহ (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), জিয়াউর রহমান (জাতীয় পার্টি), মো. হাবিবুল ইসলাম হাবিব (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল), শেখ মো. রেজাউল করিম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) ও এসএম মুজিবুর রহমান (স্বতন্ত্র)।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে আটজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাই শেষে সাতজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। জাতীয় পার্টির রুহুল আমীন হাওলাদার গ্রুপের প্রার্থী শেখ মাতলুব হোসেন লিয়নের দলীয় মনোনয়নপত্র সঠিক না থাকায় তা বাতিল করা হয়।
এখানে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মুহাম্মদ আব্দুল খালেক (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), মো. আব্দুর রউফ (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল), মো. আশরাফুজ্জামান (জাতীয় পার্টি), জিএম সালাউদ্দীন (আমার বাংলাদেশ পার্টি-এবি পার্টি), মো. ইদ্রিশ আলী (বাংলাদেশ জাসদ), শেখ মাতলুব হোসেন লিয়ন (জাতীয় পার্টি), মুফতি রবিউল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) ও শফিকুল ইসলাম সাহেদ (লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি)।
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে আটজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে চারজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর সঠিক না হওয়ায় বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. শহিদুল আলম, এসএ আসফউদ্দৌলা খান ও আসলাম আল মেহেদীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোঃ ওয়ায়েজ কুরুনীর মনোনয়নপত্র সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
এ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন হাফেজ মুহাম্মদ রবিউল বাসার (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), মো. আলিফ হোসেন (জাতীয় পার্টি), কাজী আলাউদ্দীন (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল), এসএ আসফউদ্দৌলা খান (স্বতন্ত্র), মো. শহিদুল আলম (স্বতন্ত্র), আসলাম আল মেহেদী (স্বতন্ত্র), রুবেল হোসেন (বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি-বিএমজেপি) ও মো. ওয়ায়েজ কুরুনী (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে মোট সাতজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাই শেষে তিনজনের মনোনয়ন বৈধ এবং চারজনের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। ১ শতাংশ ভোটারের তথ্য সঠিক না থাকা, দলীয় মনোনয়নপত্রে ত্রুটি এবং ঋণ খেলাপির কারণে চারজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
এ আসন থেকে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় জাতীয় পার্টির মো. আব্দুর রশীদ, রুহুল আমিন হাওলাদারের স্বাক্ষর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত না হওয়ায় জাতীয় পার্টির হুসেইন মুহাম্মদ মায়াজ, ঋণ খেলাপী থাকায় গণ অধিকার পরিষদের (জিওপি) এইচ এম গোলাম রেজা এবং মোট ভোটারের এর ১ শতাংশ স্বাক্ষর না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুল ওয়াহেদের মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে।
এ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন জিএম নজরুল ইসলাম (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), মো. আব্দুর রশিদ (জাতীয় পার্টি), মো. মনিরুজ্জামান (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল), হুসেইন মুহাম্মদ মায়াজ (জাতীয় পার্টি), এইচএম গোলাম রেজা (গণঅধিকার পরিষদ-জিওপি), এসএম মোস্তফা আল মামুন (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) ও মো. আব্দুল ওয়াহেদ (স্বতন্ত্র)।
জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আফরোজা আখতার জানান, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও আইনানুগভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। আপিলের সুযোগ শেষে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে।