
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : শ্যামা প্রসাদ নামটি পশ্চিমবন বিভাগের সুন্দরবন ও ফরেস্ট বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ও বনজীবীদের কাছে বনদস্যুদের চেয়ে আতঙ্কের নাম। শুধু আতঙ্ক নয় ,যে সুন্দরবন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের প্রাণ রক্ষা করছে, অথচ আজ পশ্চিম সুন্দরবন এক শ্যামা প্রসাদের এর কারণে নীরবে কাঁদছে তার নানা মুখি অপকর্মের কারণে। শ্যামাপ্রসাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। সাবেক বন কর্মকর্তা ও জেলেদের মধ্যে থেকে দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। শ্যামাপ্রসাদের আরেক নাম সুন্দরবন ধাবাংসের অধিনায়ক। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের কৈখালী স্টেশনে যোগদান করেছেন মাত্র তিন সপ্তাহ এর মত বেরিয়ে আসছে তার বিরুদ্ধে নানামুখী দুর্নীতি নিয়ম ও অপকর্মের অভিযোগ। সুন্দরবনে পহেলা এপ্রিলের আগেই ২৩ টি নৌকা প্রবেশ করিয়ে একশত ড্রাম,মধু আহারন করে ৫০ ড্রাম যারা আহরণ করেছে তাদের দিয়েছে বাকি ৫০ ড্রাম প্রধান বন সংরক্ষক আবুল হোসেন চৌধুরীকে দিবে বলে আড়ালে রেখেছে। এছাড়া বনোজিবিদের পাশ দেওয়ার পরেও অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশের জন্য অতি নৌকা থেকে সপ্তাহে দুই হাজার টাকা অতিরিক্ত নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় শতশত বনজীবী ও এলাকাবাসী। এছাড়া বনজীবীদের কাছ থেকে মাছ কাঁকড়ার পাশে সপ্তাহে ৭০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে কিন্তু সিটি পাসে মাত্র দেখানো হচ্ছে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা থেকে ২৬০ টাকা। বাকি লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করছেন কৈখালী স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ ও সরকারি অঘোষিত ক্যাশিয়ার খায়রুল আলম। এছাড়া প্রতিদিন সুন্দরবনের নদীখাল থেকে অবৈধভাবে ২৫ থেকে ৩০টলার ও নৌকা অবৈধভাবে প্রবেশ করিয়ে পারশে মাছের রেনু পোনা আহরণ করাচ্ছেন এবং এই পোনা ভেটখালী বাজারে ভোর সকাল থেকে সকাল ১১ টা পর্যন্ত অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এর সাথে কোটি কোটি অন্য মাছের পোনা বিনষ্ট হচ্ছে বিনিময় স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ পাচ্ছেন প্রতিদিন ১০০০ করে টাকা। সর্বমোট সেখান থেকে শ্যামাপ্রসাদের আয় প্রতিদিন ২৫ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা এর সাথেও জড়িয়ে রয়েছে সরকারের অঘোষিত ক্যাশিয়ার খায়রুল আলম। এছাড়া শ্যামাপ্রসাদের মাধ্যমে সুন্দরবন থেকে কৈখালী স্টেশন এলাকা দিয়ে প্রতিদিন শত মেট্রিক টন,শামুক ঝিনুকপাছার হচ্ছে। এই শ্যামা প্রসাদ আওয়ামী লীগের আমলে নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের ক্যাডার ছিলেন বলে পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়ে দাপটের সাথে চাকরি করেছেন ভয় করেননি কোন সংসদ সদস্য ,জনপ্রতিনিধি, সহ খোদ,বনমন্ত্রী ও প্রধান সংরক্ষকের। এভাবেই প্রভাব খাটিয়ে সুন্দরবনের পশ্চিম অপূর্ব বিভাগের ভালো ভালো স্থানে পোস্টিং নিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা করেছেন আলিশান বাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্স ও নানা অট্টলিকার মালিক হয়েছে। যাহা দুর্নীতি দমন কমিশন ও ডিপার্টমেন্ট তদন্ত করলে তার অনিয়মের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে অতি সহজেই। আওয়ামী লীগের আমলে তার দাপটের কারণে প্রভাবশালী বন কর্মকর্তারাও তার কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়ে। এসবের কারণে কয়েকবার সাময়িক বরখাস্ত হয়েছে কিন্তু তাতেও আটকে রাখতে পারেনি শ্যামাপ্রসাদ কে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগের খতিয়ান টিস্যু পেপার বানিয়ে ফেলে দিয়ে আবার বল তবে চাকরি করছে।
খুলনার সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন এর দুর্নীতি- ঘুষ লেনদেন সহ নানা অপকর্মের সাক্ষী শ্যামা প্রসাদ রায়। যার ক্ষমতা বলে এতদিন পশ্চিম সুন্দরবনে নিজে নানা অপকর্ম করে কোন প্রকার শাস্তি ভোগ করেননি। অথচ সেই ডিএফও দীর্ঘ চার বছর পর ৫ই আগস্টের এই প্রতিবেদক বন উপদেষ্টা রেজওয়ান আহসানের কাছে একটি অভিযোগের পর বদলি করা হয় তাকে। শুধু ডিএফও নয় খুলনার উচ্চপদস্থ অধিকাংশ কর্মকর্তা কর্মচারীকে বদলি করা হলেও অজানা কারণে পশ্চিমবন বিভাগে এখনো একটানা ২৪ বছর অবস্থান করছেন শ্যামা প্রসাদ রায়। ওই ঘটনায় উল্লেখযোগ্য ছিলেন তৎকালীন সাতক্ষীরা সহকারী বন সংরক্ষক ইকবাল হোসেন চৌধুরী ও কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান। শুধু তাই নয় শ্যামাপ্রসাদ রায় নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য খোদ ফরেস্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জেলে বাউলীদের,দিয়ে মামলা করান।
সম্প্রতি ফরেস্টের পশ্চিম বন বিভাগে অবৈধ হরিণ শিকার, অভয়ারণ্যে মাছ ধরা, গাছ কাটা সহ বিভিন্ন বিষয়ের সুন্দরবনকে নিরাপদ রাখতে কঠিন অবস্থান নেওয়ায় সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থান থেকে হরিণের মাংস ও অবৈধ জেলেদের ধরে শাস্তির আওতায় আনা হয়। অথচ যাদেরকে শাস্তির আওতায় এনেছিল বন বিভাগ, সেই সকল অপরাধীদের উস্কানি দিয়ে ফরেস্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করান শ্যামাপ্রসাদ রায়। এ নিয়ে ফরেস্ট পশ্চিম বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় সৃষ্টি হয়।
শ্যামাপ্রসাদ রায় এর অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে খুলনার স্থানীয়, জাতীয় ও অনলাইন সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিউজ প্রকাশিত হলেও কোন সুফল মেলেনি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি অনিয়ম আর অপকর্মের কারণে হয়েছে একাধিক মামলা। অভিযোগ দেওয়া হয়েছে ফরেস্টের বিভিন্ন দপ্তরে। সর্বশেষ গত ৮ ই সেপ্টেম্বর শাহাবুদ্দিন শাম নামের এক ব্যক্তি স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ দেওয়া হয় । এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ফরেস্টের সাবেক ৬ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক সহ ৬টি দপ্তরে এ অভিযোগের অনুলিপি প্রদান করেন।
একজন ফরেস্ট কর্মকর্তা হয়েও খুলনা রিভারভিউ পার্ক (সাবেক নাম শেখ রাসেল ইকোপার্ক) এর গাছ লাগানোর টেন্ডার নিয়ে তিনি বাহিরের লেবার না খাটিয়ে ফরেস্ট কর্মচারী দের দিয়ে গাছ লাগিয়েছেন। চারার পরিবর্তে বীজ রপন করে । যতটা গভীরে মাটি খুঁটে খুঁড়ে গাছ লাগানোর কথা ছিল তা সঠিকভাবে প্রয়োগ না করায় গাছগুলো এখন নষ্ট হয়ে গেছে। এখান থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন শ্যামা প্রসাদ ।
এর আগে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে বিষ দিয়ে মাছ শিকারে সহায়তা, বোর্ড লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়ন ও অনুমতিপত্র দিতে কয়েকগুণ বেশি অর্থ গ্রহণ, জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, মারধরসহ বিতর্কিত নানা অভিযোগ রয়েছে। তার কর্মকাণ্ড নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সভায় ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তবে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বন বিভাগ। ফলে স্থানীয়দের পাশাপাশি হুমকিতে পড়েছে সুন্দরবন।
স্থানীয়রা জানান, কয়রার বন আদালতের বিচারক শ্যামাকে সতর্ক করেছিলেন। তাই শ্যামা ক্ষিপ্ত হয়েআওয়ামী লীগের,তিনি নেতা পরিচয় দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে ৭০ মামলা কয়রার বন আদালত থেকে পাইকগাছা বন আদালতে নিয়ে গেছেন।
২০১৯ সালের অক্টোবরে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস নামে এক জেলে। তাতে নীল কমল এলাকায় অভয়ারণ্য মাছ শিকারে অতিরিক্ত ঘুষ আদায় ও জেলেদের মারধরের অভিযোগ করা হয়েছিল।
ওই বছরের একই মাসে কয়রার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেন। ২০১৮ সালে কালাবগি ফরেস্ট স্টেশনে কর্মরত থাকার সময়ে তার বিরুদ্ধে দাকোপ থানায় চাঁদাবাজির মামলা করেছিলেন জেলেরা।
এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে কৈখালী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) শ্যামা প্রসাদ বলেন, ‘আমি ভালো কাজ করি বলেই আমার সমালোচনা হয়। এতে আমার কিছু আসে যায় না। অফিসারদের ম্যানেজ করতে পারলে সব ঠিক থাকে সে কারণে আমি তো শুধু নিজের পকেট বোঝাই করি না যেমন এই দেখেন ৫০ ড্রাম মধু যাচ্ছে প্রধান বংশ সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরী স্যারের বাসায়। এটা দেখলে স্যার আমাকে ওকে দিবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফরেস্ট কর্মচারী বলেন, আমাদের দিয়ে শেখ রাসেল ইকো পার্কের কাজ করিয়েছেন শ্যামাপ্রসাদ পঅথচ তিনি এ সকল কাজ নিজে নামে বেনামে টেন্ডার নিয়ে করেছেন। আমাদের তো আর ফরেস্ট অফিস কারোর ব্যক্তি অর্থ উপার্জনের জন্য রাখেনি ,কিন্তু আমরা যেহেতু চাকরি করি বাধ্য হয়ে আমাদের বসের কথা শুনতে হয়।
ফরেস্টের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা এই ব্যক্তিটাকে নিয়ে খুবই কষ্টে আছি ভাই ,কিন্তু বলার আর কিছু করার নেই। তার ক্ষমতার উৎস যে কোথায় তা এত বছরের চাকরি জীবনেও খুঁজে পেলাম না। আমাদের সকলেরই বদলি হয় কিন্তু তার বদলি হয় না। বিভিন্ন মহল দিয়ে মামলা হামলা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সুন্দর একটি পরিবারকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমবন বিভাগ একজন ব্যক্তির জন্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে এর থেকে মুক্তি কোথায়, আমরা নিজেরাও জানিনা ভাই।
এ বিষয়ে সিএফ ইমরান আহমেদ বলেন, যদি কারোর বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘদিন এক পদে থাকা এসব বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি দ্রুত এর সমাধান হবে।তবে চাকরির ক্ষেত্রে একজন আর একজনকে দমিয়ে রাখতে যদি কোন হয়রানি মূলক মামলা বা অপতৎপরতা চালায় আমরা প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এ ব্যাপারে কথা হয় প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরীর সাথে তিনি এই প্রতিবেদককে অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে বলেন ভাই বিশ্বাস করেন আমি এক পিল পরিমাণে মধু শ্যামাপ্রসাদের কাছে চাইনি সে যদি এই সমস্ত দুর্নীতি করে থাকে আমার নাম ভাঙিয়ে তাহলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে আগে সরকারের এখন নেই বর্তমান সরকার খুব কঠোর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি আরো বলেন শ্যামাপ্রসাদের জীবনটাই কেটে গেল অভিযোগ আর অভিযোগের কারণেই তার বিরুদ্ধে আসলেই কোন কিছু করার সময় এখন এসেছে সে কারণে একটু অপেক্ষা করেন ব্যবস্থা অবশ্যই হয়ে যাবে।
কথা হয় খোদ জলবায়ু, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আব্দুল আবাল মিন্টু মহোদয়ের সাথে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন,খাইছেরে এতদিন যা পারছিল করছিল কিন্তু এই সমস্ত অপকর্মের খবর আমার কাছে অহরহ আসছে এবার আর পার পাবে না শ্যামাপ্রসাদ বলেন আর যে প্রসাদ বলেন না কেন আমি সুন্দরবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বহুবিধ দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছি শুধু আপনি নয় আমার এই সামান্য মেয়াদে উপকূলের অনেক সাংবাদিকরা আমাকে ফোন করে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শত অভিযোগ করেছে। তিনি আরো বলেন সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু বন বিভাগের দুর্নীতি রয়ে যায় এবার আর রয়ে যাবে না এর একটা সমাপ্ত আমি ঘটাবই এই মর্মে আপনাদেরকে আমি আশ্বস্ত করতে চাই আপনারা আমাকে সব ধরনের সহায়তা করবেন আমার পাশে থাকবেন আমি সুন্দরবনের দুর্নীতি জিরোতে নিয়ে আসবো তাই কারো চাকরি থাকলেও আর কারো গেল এটা আমার যায় আসে না আমার সরকার দুর্নীতি বন্ধের জন্য জনগণের কাছে বদ্ধপরিকর।