
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: বাংলাদেশের উপকূল, যা একসময় সবুজ ধানের দিগন্তজোড়া মাঠ আর স্বাদু পানির প্রাচুর্যের জন্য পরিচিত ছিল, আজ ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করা লবনাক্ততার শিকার। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে কৃষিজমি ও স্বাদু পানির উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে, যা গত প্রায় দুই দশকে (২০০০-২০২৫) এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তন আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনি সংকেত।
লবণাক্ততা উপকূলীয় কৃষিব্যবস্থার জন্য বড়ো হুমকি। এর প্রধান শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। উচ্চ লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয় যে, কিছু এলাকায় ৪-৫ বছর ধান চাষ করা সম্ভবই হয়নি। আবার ২০২৪ এর ঘূর্ণিঝড় রেমাল তেমনই প্রভাব রেখে গিয়েছে অনেক অঞ্চলে।
লবণাক্ততা মাটির উর্বরতাকেও নষ্ট করে দিচ্ছে। এটি মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরিয়ে ফেলে এবং উপকারী অণুজীব মেরে ফেলে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ চাষযোগ্য জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে এখানকার মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কম এবং নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে স্বাদু পানি নিয়ে। লবণাক্ত পানি ভূ-পৃষ্ঠের নদী-খাল এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দূষিত করছে, যা সেচ ও পানীয় জলের তীব্র অভাব তৈরি করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় অঞ্চলে পানীয় ও সেচের পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। এই সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই দশকে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকায় একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ঐতিহ্যবাহী কৃষি কাজ ছেড়ে মানুষ বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের দিকে ঝুঁকে পড়া। মাটি ও পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণেই তারা ধান চাষের বদলে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে উপকূলের অনেক পরিবার তাদের জীবিকার ধরণ পরিবর্তন করে নিয়েছে।
চিংড়ি চাষের পাশাপাশি অনেকে দিনমজুরি, ভ্যান চালানো, দোকানদারি এবং অন্যান্য অ-কৃষি কাজে যুক্ত হচ্ছেন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো বাধ্য হয়ে অভিবাসন। কৃষিজমি হারিয়ে, মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন কেবল তাদের অর্থনৈতিক সংকট বাড়াচ্ছে না, বরং সামাজিক বন্ধনকেও নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
পরিবেশগত কারণ: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশকে ত্বরান্বিত করছে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশে ৮টি বড় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে, যা কয়েক মিলিয়ন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং উপকূলের কৃষিজমিকে লবণাক্ত পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে।
মানবিক ও আর্থ-সামাজিক কারণ: ফসলের ক্ষতি হওয়ায় কৃষকদের আয় কমে যাচ্ছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। এর চেয়েও মারাত্মক হলো স্বাস্থ্যগত ক্ষতি। লবণাক্ত পানি পান ও ব্যবহারের ফলে মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভবতী নারীদের প্রি-এক্লাম্পশিয়া ও গর্ভপাত, চর্মরোগ এবং শ্বাসকষ্টের মতো ভয়াবহ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করছে।
চাহিদা ও বাজার: আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা চিংড়ি চাষকে উৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে, নগরায়ন গ্রামীণ মানুষকে শহরে কাজের সন্ধানে আকর্ষণ করছে, যা গ্রামের কৃষিব্যবস্থাকে দিনদিন পঙ্গু করে দিচ্ছে। এছাড়া, সরকারি সহায়তা অপর্যাপ্ত হওয়ায় কৃষকরা প্রায়ই এনজিওগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও উপকূলের মানুষ টিকে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তারা লবণ-সহনশীল ধানের জাত (যেমন, ব্রি ধান-৪৭, বিনা ধান-৮) চাষ করছে, উঁচু জমিতে বা ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি আবাদ করছে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে অনেক অভিযোজন কৌশলই টেকসই নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা হিতে বিপরীত হচ্ছে। যেমন, চিংড়ি চাষ বিকল্প আয়ের পথ খুলে দিলেও তা জমির লবণাক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করছে। এটিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ অভিযোজন’ বা Maladaptation বলা হয়। এছাড়া, দুর্বল অবকাঠামো (নাজুক বেড়িবাঁধ যা সামান্য দুর্যোগেই ভেঙে যায়), আর্থিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা অভিযোজন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছ
উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ততা এখন আর কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক ও আর্থ-সামাজিক সংকট। এই সংকট আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন বা স্বল্পমেয়াদী প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, এবং দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা।
সমন্বিত উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা (ICZM): কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো পরিকল্পনাকে এক ছাতার নিচে এনে লবণাক্ততা মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো: দুর্বল বেড়িবাঁধের পরিবর্তে শক্তিশালী ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
টেকসই বিকল্প জীবিকা: চিংড়ি-কাঁকড়া চাষের মতো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবিকার পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ‘নীল অর্থনীতি’ (Blue Economy) নির্ভর জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পরিকল্পিত পুনর্বাসন: যারা অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসনের আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস সব সময়ই নদীর জোয়ারভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশক এই জনপদের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের অধ্যায়। একসময় যে মানুষগুলোর পরিচয় ছিল গর্বিত কৃষক হিসেবে, যাদের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, আজ তারা অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিজেদের আদি পেশা ভুলতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলের মাটি ও পানিতে যে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে, তা কেবল পরিবেশকেই বিপন্ন করেনি; বরং উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার মানচিত্রে এক স্থায়ী ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এনেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। দিগন্তজোড়া আমন ধানের ক্ষেত ছিল এখানকার সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু গত ২৫ বছরে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ার ফলে ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যে জমিতে আগে বছরে দু-তিনবার ফসল ফলত, সেখানে এখন বছরের অধিকাংশ সময় লোনা পানি থইথই করে। ফলে হাজার হাজার কৃষক তাদের বাপদাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষি পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো শৌখিন পেশা বদল নয়, বরং এটি হলো সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি বা টিকে থাকার কৌশল। একজন কৃষক যখন দেখেন তার চোখের সামনে সোনার ফসল নোনা পানিতে জলে যাচ্ছে, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
উপকূলীয় জীবিকা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকে পড়া। গত দুই দশকে এই অঞ্চলটি কার্যত চিংড়ি মহলে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে, সাদা সোনা বা হোয়াইট গোল্ড, কিন্তু এই সোনার পেছনের গল্পটি বেশ করুণ।
কৃষিজমিতে লোনা পানি আটকে চিংড়ি চাষ করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও এটি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন ঘটিয়েছে। কারণ, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে যে পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার চেয়ে অনেক কম শ্রমিকের দরকার পড়ে। ফলে কৃষিজমি যখন ঘেরে রূপান্তরিত হয়, তখন বিপুলসংখ্যক কৃষিশ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তা ছাড়া, এই পেশাগত পরিবর্তনে এক ধরনের শ্রেণিবৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা ধনী ও বড় জমির মালিক, তারা চিংড়ি চাষ করে আরও ধনী হয়েছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক, যার অল্প জমি ছিল, তিনি লোনা পানির কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একসময়ের স্বাধীন কৃষক আজ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরের পাহারাদার বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। এই পেশাগত অবনমন বা ‘ডি-ক্লাসিফিকেশন’ উপকূলীয় সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের এই পালাবদলে যারা কাজ হারিয়েছেন, তারা কী করছেন? গত দুই দশকে উপকূলে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যা মূলত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া। কৃষিকাজ হারানো মানুষেরা এখন ভ্যান-রিকশা চালানো, ইজিবাইক চালনা, চায়ের দোকানদারি কিংবা ইটভাটায় শ্রম বিক্রির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বনজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ কিংবা নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা। লোনা পানির কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র বদলাচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যারা নদী বা বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন, তারাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২৪-এর রেমাল-পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বহু মানুষ ত্রাণনির্ভর হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের কর্মজীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন সংসারের হাল ধরতে নারীরাও ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হন। গত দুই দশকে চিংড়ির পোনা ধরা বা রেণু সংগ্রহ উপকূলীয় নারীদের অন্যতম প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোমর সমান লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে এই নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। লোনা পানির সংস্পর্শে তাদের চর্মরোগ, জরায়ু সংক্রমণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। তবুও, অভাবের তাড়নায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ছাড়তে পারছেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা যেখানে বাড়ির আঙিনায় বা কৃষিকাজে সহায়তা করতেন, এখন তারা লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
যখন স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হন এলাকা ত্যাগ করা। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এদের বড় একটি অংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু।
গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নিম্নবেতনের শ্রমিকে পরিণত হন। খুলনা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ সাতক্ষীরা, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন উপকূলের জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রামে এখন কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা কমছে, পড়ে থাকছে কেবল বৃদ্ধ ও শিশুরা।
২০০০ থেকে ২০২৫Ñ এই পঁচিশ বছরে উপকূলের মানুষের জীবিকার ধরন যেভাবে বদলেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করা উচিত। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ এবং তার ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সংকট যদি এখনই মোকাবিলা করা না যায়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে জনশূন্য লোনা মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা। প্রথমত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে এমন শস্য ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে, যা উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, যাতে কৃষকরা আবার তাদের মূল পেশায় ফিরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে লোনা পানি প্রবেশ না করে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় যুবকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কৃষি বা চিংড়ির বাইরেও সম্মানজনক পেশা গড়তে পারে। সর্বোপরি, সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা লবণাক্ততার সঙ্গে খাপখাইয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরাসহ বঙ্গোপসাগর উপকূলের মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও পরিবেশ। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকার ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে বসতভিটা ও কৃষিজমি প্লাবিত হয়। তীব্র হয়েছে সুপেয় পানির সংকট।
বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা। এদিকে পরিবেশ সংরক্ষণে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সময় নানান কর্মসূচি পালন করা হলেও উপকূলের মানুষের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংকট ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে প্রাণ ও প্রকৃতি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘটা বেড়েছে।
পাশাপাশি পরিবেশবিধ্বংসী মানবিক কর্মকাণ্ড উপকূলের পরিবেশ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল করে তুলেছে। উপকূলের বাসিন্দারা জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন লবণাক্ততার প্রভাব প্রকট। অনিয়ন্ত্রিতভাবে লবণপানিতে বাগদা চিংড়ি চাষের কারণে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।অনেক কৃষক পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের আবদুর রহিম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিনিয়ত সুন্দরবনসংলগ্ন নদনদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝড় জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। লবণপানিতে জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বাঁধ ভেঙে তার ৫ বিঘা ধানের খেত প্লাবিত হয়।জমিতে লবণপানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তিনি ধান চাষ বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন। এদিকে মিঠাপানির অভাবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় সুন্দরী ও গরান গাছের মৃত্যু বাড়ছে, যা বনজ পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। পাশাপাশি লবণাক্ত পানি প্রবেশে উপকূলের বহু এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবারকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ গ্রামের আমেনা খাতুন জানান, ঘূর্ণিঝড় আইলা ও আম্পানে জলোচ্ছ্বাসে তাদের এলাকায় মিঠাপানির পুকুরগুলো ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়। লবণপানিতে ভরে যায়। এরপর থেকে তাদের খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। এখন তাদের বাড়ির চার কিলোমিটার দূর থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অঞ্চলে সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। আইলা, সিডর, আম্পান ও ইয়াস-এর মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকার ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে বসতভিটা ও কৃষিজমি প্লাবিত হয়। এতে বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা, যাদের অনেকেই ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা বলছেন, কপোতাক্ষ, কুলপেটুয়া, চুনা, বেতনা ও মরিচ্চাপ নদ পলি পড়ে ও অবৈধ দখলের কারণে নাব্য হারিয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ দূষণকে আরও তীব্র করে তুলছে। পরিবেশবিদ অধ্যক্ষ আশেক-ইলাহি বলেন, সাতক্ষীরার উপকূল রক্ষায় দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী পুনঃখনন, ব্যাপক বনায়ন এবং লবণসহিষ্ণু কৃষি প্রযুক্তি চালু করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পরিবেশ ও জনজীবন আরও বড় সংকটে পড়তে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার বলেন, প্রতি বছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৯ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ড গাবুরা ব-দ্বীপে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। সুপেয় পানির সংকট দূরীকরণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং জেলা পরিষদের অর্থায়নে মিঠাপানির পুকুরগুলো খনন করা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ পুকুর থেকে মিঠাপানি সংগ্রহ করে খাওয়ার পানির চাহিদা মেটাতে পারছে।জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা। নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে, কিন্তু জীবনযুদ্ধে উপকূলের নারীদের দুঃখ শেষ হয় না। নোনা পানির এলাকার মানুষ চিন্তিত তদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাদের পরিবর্তনের জীবনচিত্র লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির চেহারা বদলে যাচ্ছে বিশেষ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের। পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। প্রতিনিয়ত উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। টিকে থাকতে হচ্ছে সংগ্রাম করে। প্রকৃতির গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ায় জনজীবনে এসেছে পরিবর্তন। প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের। প্রাকৃতিক বৈরী প্রভাবের ফলে জীববৈচিত্র্যও ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। সময়ের বিবর্তনে উপকূল অঞ্চলের জীবনধারায় এসেছে নানা পরিবর্তন। প্রতিটি মানুষের পেশা বদলে যাচ্ছে। বছরের পর বছর যারা মাছ বিক্রি করত তারা অন্যান্য পেশার দিকে ঝুঁকছে।
কেউ কেউ শহরের দিকে পা বাড়াচ্ছে। কৃষক আর চাষাবাদের দিকে এগোয় না। চাষাবাদের মাধ্যমে দেনাপাওনা পরিশোধ করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। তারা পিতৃভূমি হারিয়ে ফেলছে। ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। বিশুদ্ধ খাবার পানিরও সংকট দেখা দিচ্ছে। দেশের উপকূলের ১৯ জেলায় ৪ কোটির বেশি মানুষের বসবাস; যা দেশের আয়তনের শতকরা ৩২ ভাগ। উপকূল অঞ্চলের একটি সম্প্রদায় মুন্ডা। ধারণা করা হয়, জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য ভারত থেকে ৩০০ বছর আগে এ ভূখণ্ডে আসে তারা। বর্তমানে এদের অবস্থান খুলনা বিভাগের বেশ কয়েকটি জায়গায়। তার মধ্যে খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার দেবহাটা ও তালা উপজেলা উল্লেখযোগ্য। পেশা হিসেবে এরা বেশিরভাগই দিনমজুরি করে। অনেকে আবার সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের ওপর নির্ভর বলতে মূলত মধু সংগ্রহ, মাছ শিকার এসব। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের স্বাভাবিক জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করতে পারায় তৎকালীন শাসকরা সুন্দরবনের গাছ কেটে বসতি গড়তে মুন্ডাদের এ দেশে এনেছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি তাদের। আজও সুন্দরবন ঘিরেই তাদের জীবনমরণ। তবে ভালো নেই তারা। সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি, ভেটখালী, তারানিপুর, সাপখালী, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ, কাশিপুর, কচুখালী এলাকায় বসবাস করে মুন্ডারা। জেলার দেবহাটা ও তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে মুন্ডাদের বসতি। সাতক্ষীরা উপকূলে মুন্ডা জনগোষ্ঠী রয়েছে আড়াই সহস্রাধিক। এ ছাড়া খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় তাদের বসতি রয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনেও এদের বসতির চিহ্ন মেলে। কম্পাট মুন্ডা, খাঙ্গার মুন্ডা, খাড়িয়া মুন্ডা, পাথর মুন্ডা, দেরগে মুন্ডা, সাঙ্কা মুন্ডা ও মাঙ্কী মুন্ডা- বাংলাদেশে এ সাত মুন্ডা গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সুন্দরবন এলাকার মুন্ডাদের জীবনজীবিকা বনের ওপরই নির্ভরশীল।
মুন্ডা পরিবারের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অভাব পুঁজি করে সৃষ্টি হয়েছে এ সম্প্রদায়ের কষ্টের জীবন। জমিজমা যা ছিল তা-ও হারিয়েছে নানা কারণে। বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হয় অধিকাংশকে। আগে মুন্ডাদের প্রধান জীবিকা ছিল সুন্দরবনের গাছ কাটা। বিশেষ করে গোলপাতা ও গরান কাঠ কাটা ছিল তাদের অন্যতম কাজ। বর্তমানে অনেকে আদি পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত। বাঙালির মতো মুন্ডারা কৃষিকাজে নিয়োজিত হলেও অধিকাংশই ভূমিহীন। তাই এ অঞ্চলের মুন্ডারা দিনমজুরির ভিত্তিতে মাছ ধরে। অন্যের জমিতে বেতনভুক কাজ, নৌকা নির্মাণ, কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। পরিবেশের বিপর্যয়ে প্রভাব পড়েছে মুন্ডা নারীদের জীবনেও। মুন্ডা নারীরাও আজ ঘরের বাইরে নানা কাজ করে। জাল বোনা, সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ- কাঁকড়া ধরা, মৌ সংগ্রহসহ সব ধরনের কাজে দেখা যায় মুন্ডা নারীদের। এ ছাড়া গৃহপালিত পশুর দেখভাল, কৃষি থেকে শুরু করে নানা কাজে অংশ নেয় তারা।
‘ইটভাটার কাজ কী আমরা জানতাম না, আইলার পর আমাদের চারপাশের অনেকেই এখন ইটভাটায় কাজ করি। কার ইচ্ছা করে বলুন নিজের বাড়ি ছেড়ে দূরে কাজ করতে যেতে। তাও আমাদের যেতে হয়, পেটের ক্ষুধা তো কারও কথা শোনে না। আগে কত ভালো সময় ছিল, আমরা চাষাবাদ করতাম। যদিও অন্যের জমিতে ফসল ফলাতাম তাও পরিবারের সঙ্গে থাকতে তো পারতাম। আমাদের সম্প্রদায়ের যারা এ অঞ্চলে থাকি, তাদের বেশিরভাগেরই সেই অর্থে চাষের জমি নেই। যতটুকু আছে, আমরা চেষ্টা করতাম ফসল ফলাতে। আমরা প্রতিদিন মজুরির ভিত্তিতে কাজ করি, সেটা হতে পারে কৃষিকাজ, মাছ চাষ কিংবা অন্য কোনো টুকিটাকি কাজ। আর সেজন্যই আমরা এ এলাকায় দিনমজুর হিসেবে পরিচিত।
এখনও কিন্তু আমরা দিনমজুরি করি, তবে আমাদের এখানে ফসল উৎপাদন কম কারণ কয়েক দিন পরপর ঘূর্ণিঝড়, বন্যার প্রকোপ ঘটে। আর এসব কিছু মানেই আপনারা জানেন আমাদের লোকালয়ে লবণপানির প্রবেশ। পুরো এলাকায় আপনি যেখানে যাবেন সেখানে অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য জমির ফসল হয় না, এ গল্প শুনবেন। আমাদের এ অঞ্চলের চারদিকে নদীতে যখন বন্যা হয়, পাড় ভেঙে গিয়ে লবণপানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। তবে অনেকে আবার চিংড়ি চাষের জন্য নিজেরাও নালা কেটে লবণপানি প্রবেশ করায়। এ সমস্যা না হয় আমরা কিছু একটা করে বন্ধ করতে পারি, কিন্তু দিনে দিনে নদীর পানির সঙ্গেও তো লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ সমস্যা কী করে সমাধান করব, তা জানা নেই। আর সমস্যা তো একটা না, ওই আইলার পর থেকে নানান ধরনের রোগ আমাদের দেখা দিচ্ছে। চুলকানি থেকে শুরু করে পেটের রোগ, জ্বর কী নেই তার মধ্যে। আমাদের মেয়েরা আরও বেশি ধুঁকছে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যায়। এ অঞ্চলে শুধু আমরা মুন্ডারা না, সব মেয়ের বাচ্চা জন্মানোর সময় সিজার করতে হয়। যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বিপদের মুখে। আর এসবের ফলস্বরূপ আমাদের ছেলেমেয়েরাও ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না, হয়তো তারাও ভবিষ্যতে আমাদের মতো দিনমজুর হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন শরৎ মুন্ডা, যার বাস খুলনার কয়রা উপজেলার টোপখালী। পেশায় দিনমজুর।
পোড়াকাটলা এলাকার বাসিন্দা মিতা রানী (৪৫) বলেন, ‘আমার তলপেট খুব ব্যথা করে, কোমরের অংশ অবশ হয়ে যায়, মনে হয় পেটের ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নিচে নেমে আসছে। তা ছাড়া প্রচণ্ড সাদা স্রাব হয় আর চুলকায়। ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। আর প্রসাব করতেও খুব কষ্ট হয়। গ্রামের ডাক্তাররা জরায়ু কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এ বয়সে অপারেশন করাতে স্বামী রাজি হননি। আপাতত চিকিৎসা নিচ্ছি। কিন্তু খুব বেশি হলে ১০-১৫ দিন ভালো থাকি।’
শেফালী বেগম (৩৮) বলেন, ‘আমার আমার বাড়ি সাতক্ষীরার দাতিনাখালী। ফলে জন্ম থেকেই নোনা পানির সঙ্গে বসবাস। তবে আগের তুলনায় যেন নোনাভাব বেড়েছে। আস্তে আস্তে নোনাভাব এত বাড়ে যে পুকুরের পানি মুখেই নিতে পারি না। অথচ তাতেই গোসলসহ সব কাজ করতে হয়। আমাদের চর্মরোগ ও জরায়ুতে সমস্যা হচ্ছে।’
ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত পেলেই ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয় উপকূলের মানুষকে
পরিবেশকর্মীদের একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলীয় এলাকায় নোনা পানিতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে নারীরা। এতে তাদের জরায়ুতে নানা রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত এমনকি অপরিণত শিশু জন্মের হার বেড়েছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ, গোসল, কৃষি, গবাদি পশু পালন, চিংড়ির পোনা ধরাসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নারীরা লিউকোরিয়াসহ সাধারণ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক নারীকে অল্প বয়সে অস্ত্রোপচা