
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশ প্রকৃতির রঙে ভরপুর একটি দেশ। নদী, হাওর, বন, উপকূল, পাহাড় ও দ্বীপ—এ ছোট্ট দেশের দৃশ্যপটে রয়েছে অসাধারণ বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্য শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশ প্রকৃতির রঙে ভরপুর একটি দেশ। নদী, হাওর, বন, উপকূল, পাহাড় ও দ্বীপ—এ ছোট্ট দেশের দৃশ্যপটে রয়েছে অসাধারণ বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্য শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং দেশের অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পও এ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করেই প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণে যায়। কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান-খাগড়াছড়ি, সিলেটের চা-বাগান—সব জায়গাতেই ছুটির সময় প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয়। ফলে অঞ্চলের অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হয়, ঠিক তেমনি পর্যটনের সঙ্গে বাড়ছে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ, বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণ, যা দেশের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন অঞ্চলগুলো বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়াগুলোর অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে বর্তমানে প্রায় ১২টি অঞ্চলকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ অঞ্চলগুলো এমন জায়গা যেখানে প্রকৃতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল এবং সামান্য অব্যবস্থাপনাও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব অঞ্চলকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল জোন ঘোষণা করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চল, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, গাজীপুরের কয়েকটি বনাঞ্চল এবং উপকূলের বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকা। এসব জায়গা পরিবেশগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বিরল প্রাণী, উদ্ভিদ, সামুদ্রিক জীব, প্রবালসহ বিভিন্ন প্রজাতির অস্তিত্ব টিকে আছে, যা কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।
কিন্তু পর্যটনের অতি দ্রুত বৃদ্ধি এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা এসব এলাকার পরিবেশকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে প্লাস্টিক দূষণ থেকে। বাংলাদেশের মতো দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার অতি সহজলভ্য এবং সস্তা হওয়ায় এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে। পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, সফট ড্রিংকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ, স্ট্র, প্লাস্টিকের কাপ-প্লেট, আইসক্রিমের মোড়ক, টুথপেস্ট-শ্যাম্পুর স্যাশে—সব মিলিয়ে মানুষের ভোগ্যপণ্যের একটি বিশাল অংশই প্লাস্টিকনির্ভর। পর্যটন এলাকায় তো এ ব্যবহারের মাত্রা আরো অনেক বেশি। মানুষ ঘুরতে আসে, খাবার খায়, ছবি তোলে—কিন্তু তাদের ব্যবহার করা প্লাস্টিকগুলো বেশির ভাগই সঠিকভাবে ডাস্টবিনে যায় না। হাওয়ায় উড়ে, বালুর শরীরে পড়ে থাকে অথবা জোয়ারের সঙ্গে সমুদ্রে মিশে যায়।
এছাড়া শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমও প্লাস্টিক দূষণ বাড়ায়। প্যাকেজিং শিল্প, বাজার থেকে ফেলা প্লাস্টিক মোড়ক, এমনকি মাছ ধরার জাল—সবকিছুই নদী ও উপকূলে বর্জ্য হিসেবে পৌঁছে যায়। তদুপরি বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার বেশি হওয়ায় বন্যা, সাইক্লোন ও জোয়ারের কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলের জমে থাকা প্লাস্টিক দূরবর্তী ইকোলজিক্যাল জোনে ভেসে গিয়ে জমা হয়। এসবই সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের সংবেদনশীল ইকোসিস্টেমে প্লাস্টিক দূষণকে আরো গুরুতর করছে। প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব বিস্তৃত ও গভীর। প্রথমেই জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদী ও সাগরের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে, যা মাছ, চিংড়ি, কচ্ছপ, ডলফিন, পাখি ও জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে ঢুকে শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবারেও চলে আসে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বড় আকারের প্লাস্টিক যেমন মাছ ধরার জাল, পলিথিনের গাদা, প্লাস্টিক রিং ইত্যাদি নানা প্রাণীর ঘাড়, পাখা বা পায়ে জড়িয়ে তাদের চলাফেরা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করে, অনেক প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদন হয়, যার অর্ধেকই একবার ব্যবহারের জন্য তৈরি। একবার ব্যবহারের প্লাস্টিকই পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে বড় কারণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ দশমিক ৭ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার বড় অংশ পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ঢাকায় প্রতিদিন কয়েকশ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়—এটি দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকের সমান। সারা দেশে যে পরিমাণ প্লাস্টিক তৈরি হয় তার আংশিক পুনর্ব্যবহার হয়। বাকিটা প্রবেশ করে নদী, খাল, হাওর, সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলে। পর্যটন অঞ্চলগুলোর প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা আরো অনেক বেশি।
কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। ছুটির দিনে এখানে প্রতিদিন এক থেকে দুই লাখ মানুষ ভ্রমণে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারের সৈকতে প্রতিদিন প্রায় কয়েক টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়। এর অর্ধেকেরও বেশি হলো পানির বোতল, সফট ড্রিংকের বোতল, ফাস্টফুড প্যাকেট ও পলিথিন ব্যাগ। সৈকত পরিষ্কার করার কাজ প্রতিদিনই হয়, কিন্তু প্লাস্টিকের পরিমাণ এত বেশি যে সব সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। বালির ভেতরে হাজার হাজার ছোট প্লাস্টিকের টুকরো, যাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়, জমা হতে থাকে। জোয়ার আসলে সেগুলো সমুদ্রের দিকে ভেসে যায়। প্লাস্টিক সমুদ্রের লোনা পানির সংস্পর্শে এসে আরো ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে পড়ে এবং এই ছোট কণাগুলো মাছ, শামুক, ঝিনুক ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। এভাবে প্লাস্টিক মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে এসে মানুষের স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে। আজ বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫ গ্রাম প্লাস্টিক খাচ্ছে, যা একটি ক্রেডিট কার্ডের সমান। বাংলাদেশের মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ মাছের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব আরো বেশি।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। কিন্তু পর্যটকদের ভিড় এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে দ্বীপটি তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। সেন্ট মার্টিনে শীতের সময় প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার পর্যটক যায়, যদিও দ্বীপটির পর্যটক ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ৫০০ থেকে এক হাজার মানুষ। পর্যটকরা দ্বীপে যেকোনো জায়গায় প্লাস্টিক ফেলে যান। খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, স্ট্র, চকোলেটের মোড়ক—সবখানে ছড়ানো থাকে।
আরেকটি বড় ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল অঞ্চল হলো সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকা। সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। সুন্দরবনে বছরে প্রায় দুই লাখের বেশি পর্যটক যান। সুন্দরবনের নদী-খালে পর্যটনবাহী লঞ্চগুলোর অধিকাংশই প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে ফেলে দেয়। পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, থার্মোকল, গ্লাস—সব নদীতে জমা হতে থাকে। ২০১৮-২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে সুন্দরবনের নদীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক মাছের পেটে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাঘ, হরিণসহ বনজ প্রাণীরা দূষিত পানি পান করার কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল। এটি শুধু একটি হাওর নয়, বরং একটি বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি বা রামসার সাইট। অসংখ্য দেশী-বিদেশী পাখির বিচরণভূমি, মাছের উন্নত প্রজনন ক্ষেত্র, জলজ উদ্ভিদের বিশাল বৈচিত্র্য—সব মিলিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর আমাদের জীববৈচিত্র্যের জন্য অমূল্য সম্পদ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হাওরটির ওপর প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে প্লাস্টিক দূষণের প্রধান উৎস হলো স্থানীয় জনবসতি, পর্যটন কার্যক্রম এবং এলাকা দিয়ে যাওয়া নৌ-পরিবহন। পর্যটকদের ব্যবহৃত পানির বোতল, স্ন্যাকসের প্যাকেট, স্ট্র, কাপ, পলিথিন ব্যাগ ইত্যাদি অনেক সময় নৌকা থেকে সরাসরি পানিতে ফেলে দেয়া হয়। বর্ষার সময় পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও বাজারের বর্জ্যও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পদার্থ বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভেসে এসে হাওরে জমা হয়। এ প্লাস্টিক বর্জ্য কয়েক দশক ধরে না পচে পানিতে ভেসে থাকে এবং ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণিকায় ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপ নেয়।
প্লাস্টিক শুধু পরিবেশকেই দূষণ করছে না, বরং মানুষের স্বাস্থ্য, জীবজন্তুর জীবন, অর্থনীতি এবং পর্যটন শিল্পকেও ক্ষতি করছে। প্লাস্টিক ভাঙতে ৪৫০-১০০০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এর মধ্যে অনেক রাসায়নিক মাটি ও পানিতে মিশে দূষণ সৃষ্টি করে। প্লাস্টিক পোড়ালে ডাইঅক্সিনসহ নানা বিষাক্ত উপাদান বাতাসে মিশে শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, হরমোনজনিত সমস্যা, ত্বকের জ্বালা-যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। বর্জ্য সঠিকভাবে না থাকায় ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে প্লাস্টিক বর্জ্য সাইক্লোনের সময় পানির সঙ্গে মিশে ঘরবাড়ি, চাষাবাদ ও পানির উৎস দূষিত করে।
প্লাস্টিক দূষণ এত ভয়াবহ হওয়ার মূল কারণ হলো সমাজে সচেতনতার অভাব, পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ তেমন দেখা যায় না। পর্যটন স্থানে বর্জ্য ব্যাবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট ডাস্টবিন থাকলেও অনেক সময় সেগুলো ভেঙে থাকে বা সংগ্রহ করা হয় না। পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। পর্যটকদের অধিকাংশই দায়িত্বশীল আচরণ করেন না।
যদিও সমস্যাটা বড়, কিন্তু এর সমাধান অসম্ভব নয়। পৃথিবীর অনেক দেশ ইতোমধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশও চাইলে ধাপে ধাপে এ নিয়ম চালু করতে পারে। পর্যটন অঞ্চলে প্লাস্টিক-ফ্রি জোন তৈরি করা যেতে পারে। সব হোটেল ও রিসোর্টকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। দোকানগুলোতে কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। কক্সবাজার এবং সেন্ট মার্টিনে প্রবেশের সময় প্লাস্টিকসামগ্রী পরীক্ষা করে আটকে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সৈকত পরিষ্কার অভিযান নিয়মিত করতে হবে। বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লান্ট গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আচরণ পরিবর্তন। পর্যটক যদি নিজের ব্যবহৃত প্লাস্টিক সঠিকভাবে ফেলে আসার অভ্যাস না গড়ে তোলে, তবে যেকোনো নিয়মই ব্যর্থ হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ শিক্ষা ও প্লাস্টিক দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় জনগণকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বাংলাদেশের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন অঞ্চলগুলোকে রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো জাতির দায়িত্ব। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচব। পরিবেশ দূষণ বাড়লে আমাদের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পর্যটন ও পরিবেশকে সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হলে এখনই প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো জরুরি।
আমরা যদি প্লাস্টিক দূষণ কমাতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি বিপর্যস্ত বিশ্ব রেখে যাব। তাই এখনই সময়—পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রচলন, প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালন করার।
প্রকৃতি পাগল মানুষ সময়-সুযোগ পেলেই পর্যটনের নেশায় ঘুরে বেড়ায়। দেশ–বিদেশ ঘুরে বেড়ানো, খাওয়া, থাকা, বিনোদন ও যাতায়াতের কড়িটি সঙ্গে নিয়ে যিনি পর্যটন করেন তিনিই পর্যটক। পায়ে হেঁটে পর্যটনের দিন শেষ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন পর্যটনকে ‘শিল্প’ হিসেবে সম্মানিত করেছে। পর্যটন একটি আকর্ষণ ও একজন পর্যটক ‘জ্ঞান পিপাসু’। পত্র-পত্রিকা বা বই পড়ে জ্ঞান লাভ আর ভ্রমণে জ্ঞান লাভের মধ্যে আদিগন্ত তফাত বিদ্যমান। তাই জানার নেশায় পর্যটক ঘুরে বেড়ান দেশ দেশান্তরে। নিজ দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়া, থাকা-খাওয়া, বিনোদন সবকিছুর খরচ বহন করতে হয় নিজেকেই। তার ব্যয় করা অর্থই হয় অন্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস। কাজেই যেকোনো দেশের জন্য পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ একটি লাভজনক ব্যাপার। সমীক্ষায় জানা গেছে, যেকোনো বর্ধনশীল আয়ের রপ্তানি বাণিজ্যের চেয়েও বেশি লাভজনক এই পর্যটন শিল্প।
প্রকৃতির প্রসারিত হস্ত চুম্বনকারী হিমালয় কন্যা নেপাল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়াকে পর্যটন শিল্পের উদাহরণ হিসেবে দেখানো যেতে পারে। এই কয়েকটি দেশের বড় রাজস্ব আয় অর্জিত হচ্ছে পর্যটন শিল্প থেকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পর্যটকের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য সযত্নে রক্ষা করছেন ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি, প্রত্ন-নিদর্শনসমূহ, গড়ে তুলছেন নিত্য-নতুন আকর্ষণীয় কীর্তিসমূহ। স্বচক্ষে জ্ঞান আহরণ ও চিত্ত বিনোদনের জন্য মানুষ তাই দেখতে ছুটে যাচ্ছে-আসছে। ভ্রমণের ফলে পরিচিত হচ্ছে ভিন্ন প্রকৃতির সঙ্গে।
অনুসন্ধিৎসু মানুষ আহরণ করছে অন্য দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জ্ঞান। এরই ফলে মানুষে মানুষে বাড়ছে সম্প্রীতি, ভালোবাসা। বিকশিত হচ্ছে জ্ঞানের ভান্ডার। সম্প্রসারিত হচ্ছে সভ্যতা, বাড়ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
পর্যটন শিল্পের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ১৩ কোটির বেশি মানুষ সরাসরি জড়িয়ে। ২০১০ সালে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ করেছেন ৯০ কোটি লোক। এ শিল্প থেকে আয় হয়েছে ৫০ হাজার কোটির বেশি মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাপী এই শিল্পের প্রসার প্রমাণ করে, প্রকৃতির কাছ থেকে চিত্তবিনোদনের ও জ্ঞানের পাঠ নেওয়ার প্রতি মানুষের ঝোঁক দিনে দিনে আরও বাড়বে। ভুটান, নেপাল ও ভারতের কাছাকাছি দেশ বাংলাদেশ। বহির্বিশ্বের মিডিয়াগুলোতে বাংলাদেশকে প্রচার করা হয় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, বৃষ্টি, খরা, বস্তি, ভুখা-নাঙ্গা মানুষ, বর্জ্য, ভূমিকম্প ও হরতালের দেশ হিসেবে। এদিক থেকে ছোট এই দেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। যেখানে সচ্ছলতা, শান্ত ও নিরুদ্বিগ্ন পরিবেশ, সেখানেই মানুষ যেতে চায়। অশান্তি, কোলাহল ও কদর্যতায় পা বাড়াতে না চাওয়াই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের এমন নাজুক উপস্থাপনায় বিদেশে বাংলাদেশি মাত্রই লজ্জিত হন। পর্যটকদের কথা বাদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অসম্ভব নিম্নচাপের শিকার এ দেশের জনগণ—তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ দেশে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আছে কিন্তু এর মাঝেও বহমান জীবন একেবারে তিক্ত নয়। বাইরের মিডিয়াগুলোতে বাংলাদেশের উপস্থাপনা সেভাবেও হতে পারে, যাতে পর্যটকের আকর্ষণ বাড়ে। কারণ এ দেশের ভূমি ও হাজার বছরের ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ। বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার বৌদ্ধ বিহার, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, ছোট কাটারা, বড় কাটারা, মোগল পাঠান যুগের ঐতিহাসিক মসজিদ, ঈদগাহ, সোনারগাঁ ইত্যাদির ঐতিহ্য এখানে রয়েছে। রয়েছে একটি অনন্যসাধারণ সুন্দরবনত, যার সমপর্যায়ের আর একটি অঞ্চল পৃথিবীতে নেই। আছে কুয়াকাটা ও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, পাহাড় ঘেরা পার্বত্য এলাকা চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগানসমূহের অপার সৌন্দর্য, রামু, গজনি, দুর্গাপুর, বিজয়পুর, মাধবকুণ্ড। এর কোনটিতে গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র, কিন্তু অনেকগুলোতেই পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুবিধা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। না হলে এ দেশ নিতান্ত ছোট দেশ মালদ্বীপের চেয়ে পর্যটনের আয়ে কেমন করে এত পেছনে পড়ে থাকে? প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে কয়েক মাইল পরিধির টোগো দ্বীপ পর্যটন খাতে প্রতি বছর বাংলাদেশি টাকায় আয় করছে ২ হাজার কোটি টাকা আর বাংলাদেশে এ খাতে যে আয় হয়ে থাকে, তা নগণ্য। এ হিসাব আমাদের জন্য লজ্জাজনক।
স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের বরাদ্দ তেমন নেই। কোনো শিল্পকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বাহন হিসেবে নিতে হলে তার বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যার দরকার। পরিকল্পিত ও বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মোদ্যোগ গ্রহণ না করে ফল পেতে চাইলে তা কখনো সম্ভব হয় না। শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, বক্তৃতা-বিবৃতি, সেমিনার, কিছু হোটেল-মোটেল নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পর্যটকদের যাতায়াত, নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার সুবিধাসহ সবকিছুর সুবন্দোবস্ত থাকা আবশ্যক। শহর, নগরগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা ইত্যাদি নিশ্চিত করা গেলে পর্যটনের ভালো ভবিষ্যৎ আশা করা যেতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা দুর্গম এলাকায়, বিশেষত যাতায়াত ব্যবস্থার সুবন্দোবস্ত না থাকায় এ সৈকত এখনো পর্যটকদের কাছে দুর্গম বলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা বেশি বলে অনেকে বলে থাকেন। এখানে বেড়াতে এসে অনেকে দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে থাকেন। পর্যটকদের জন্য ‘নুলিয়া’দের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে গোসলে গিয়ে এজন্য অনেকেই বিপদে পড়েন ও প্রাণ হারান। কাজেই স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ অবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া পর্যটন শিল্প বিকাশের কথা ভাবাই ঠিক না। এ ছাড়া যে সব স্থানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সেগুলোর সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতা বজায় রাখা আবশ্যক। একই সঙ্গে দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানে সময়োচিত বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে পর্যটন শিল্প বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাখ্যা করে বলার কিছু নেই। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শিল্প বিকাশের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়ে থাকে। অর্থনৈতিকভাবে কমজোরি মেরুদণ্ডের হতাশাগ্রস্ত দেশে সমস্যার পর সমস্যা থাকে। উৎপাদন ব্যাহত, কলকবজা বন্ধ—এমন অবস্থা প্রায়ই ঘটছে। লাভের চেয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে বেশি। বৈদেশিক সাহায্য আর ঋণ ছাড়া দেশের চাকা চলে না। তখন পর্যটনশিল্প থেকে যথেষ্ট আয় বাড়ানোর চিন্তা এ দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিষয় ছাড়াও অভ্যন্তরীণ পর্যটন বিষয়ক ভাবনা-চিন্তা করার সময় এসেছে। আমাদের দেশে এখনো ব্যাপকভাবে পর্যটনের প্রতি আগ্রহ দেখা যায় না। এর জন্য বিভিন্ন স্পট তৈরি করে আনুষঙ্গিক সুবিধা ও নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং এর প্রচার চেষ্টা চালাতে হবে। অভয়ারণ্য তৈরি করে সেখানে বাংলো বা ভ্রমণের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো রেখে তার ভেতরেই তৈরি করতে হবে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। ভ্রমণ যাতে সুলভ ও আনন্দদায়ক হয়, সে ব্যবস্থা করা গেলে স্থানীয় বা দেশীয় পর্যটক আকর্ষণ করা সহজ হবে।
পর্যটন পর্যটকের জন্য রহস্যময়, রোমাঞ্চকর ও অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ পাঠ্য পুস্তকের মতো। শুধু এর অভিজ্ঞতাটা চাক্ষুষ। অন্তর্চক্ষু, কল্পনা আর পরতে পরতে অভিজ্ঞতার তুলিতে আঁকা পর্যটন একটি গাথা। এ যেন পর্যটকের কাছে ‘দেবে আর নেবে, মিলবে, মিলাবে’–এর মতো। মানুষের প্রতিদিনের জীবন শৃঙ্খলবদ্ধ। একটু বেহিসেবি হলেই যেন সবকিছু ওলট–পালট হয়ে যাবে। অথচ মানুষের মন বলে একটি কথা আছে। মানুষের মন বৈচিত্র্যমুখী। তীব্র পিয়াসি, সৌন্দর্য সন্ধানী। তাই ভ্রমণ ‘বিলাস’ হলেও কাম্য। আর এই বিলাসের অর্থই একটি দেশের আয়ের উল্লেখযোগ্য উৎস হয়ে দেশটিকে কিছুটা হলেও উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারে।
একুশ শতককে বিশ্বব্যাপীই পর্যটনের স্বর্ণ সম্ভাবনা ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে পর্যটনে মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণে ব্যাপকতা দেখা দেয়। বিমান চলাচল মানুষের দুর্নিবার ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে। দেশে দেশে সীমান্ত বিধিনিষেধ হয়েছে সহজ, প্রতিযোগিতামূলকভাবে ভ্রমণের ব্যয় হ্রাস করা হচ্ছে। যাতায়াত সহজ, আনন্দ ভ্রমণের সুযোগ প্রায় অবারিত হয়ে পড়ায় সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণের উৎসাহ–উদ্দীপনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করত না। এখন অবকাশযাপনে বিদেশ গমন অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। এর মাঝে মধ্যবিত্ত শ্রেণিও জড়িত হচ্ছে। উন্নত দেশ ছাড়াও মাঝারি দেশগুলোতে আনন্দ ভ্রমণের সুযোগ গ্রহণ করছে অনেকেই।
উন্নত বিশ্বের পর্যটকদের কাছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব লাভ করছে। এ অঞ্চলের ভূ–প্রাকৃতিক অবস্থা প্রাচীন, রয়ে গেছে বিপুল ঐতিহাসিক সম্পদ ও নিদর্শন। প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলে প্রকৃতিনির্ভর জীবন পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। নানা বৈচিত্র্য মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, অকৃপণ পানিরাশি, বন, পাহাড়ের ভূস্বর্গিক সমাহার পাশ্চাত্যের পর্যটকদের এমন আকৃষ্ট করছে। এক সময় যা ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, পরবর্তীতে জাপানের একচেটিয়া, তা এখন অন্যান্য অঞ্চলে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেমে নেই। তারাও এই প্রতিযোগিতামূলক শিল্পকে হাতের মুঠোয় বাগাতে চায়। এই শিল্পকে লুফে নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেপাল, মালদ্বীপ। যে সব দেশ কঠোর রক্ষণশীল বলে পরিচিতি ছিল তারাও এ শিল্পের ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরে অপেক্ষাকৃত নমনীয়ভাব প্রদর্শন করছে। যেমন—চীন, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার। এসব দেশ এক সময় বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ রেখেছিল। বর্তমানে তারা বাস্তবতা উপলব্ধি করে তাদের সীমান্ত দ্বারে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে। এর ফলে এসব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভ্রমণ আগের চেয়ে সহজ হয়ে উঠেছে। এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পর্যটনের নতুন দিগন্ত খুলে যাওয়ায় সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ছে। শিল্পে প্রতিযোগিতা হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে যে এগিয়ে যাবে, জয়ও তার সঙ্গে অগ্রসর হবে।
পর্যটন শিল্প বিকাশের সুযোগ ও সম্ভাবনা বাংলাদেশের কপালে জ্বল জ্বল করছে। এখন এটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হলে এ শিল্প এখানে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশে পর্যটনের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগই একমাত্র উদ্যোগ। সরকার বা সরকারি উদ্যোগের সীমাবদ্ধতার কথা সব ক্ষেত্রেই আমাদের শোনা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। তাই পর্যটনে কিছু বৈচিত্র্য ও সুযোগ সৃষ্টির জন্য বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হয়। এ ক্ষেত্রে নিভৃত অঞ্চলের সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানগুলোতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলাসহ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির জন্য বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হয়। এ ক্ষেত্রে নিভৃত অঞ্চলের সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানগুলোতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলাসহ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করার কথা আমরা বলেছি।
যেমন সমুদ্র বেষ্টিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ, সোনারগাঁ, সিলেটের জাফলং, মাধবকুণ্ড, হামহাম বা শেরপুরের ঝিনাইগাতি, নকলা বা গজনীকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপায়িত করা যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে জায়গাগুলোর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড় এলাকার চা-বাগান, হাওর–বিল এলাকা বা আকর্ষণীয় স্থানে পর্যটন সুবিধা নিশ্চিত করে এই শিল্পের বিকাশ করা যেতে পারে। আমরা এর আগেও বলেছি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ববাহী শিল্প বিকাশের অন্যতম শর্ত সে দেশের প্রশান্ত পরিবেশ। পরিবেশ সুন্দর থাকলে, মানবিক পরিবেশ সুস্থ থাকলে, তবেই পর্যটন শিল্পের বিকাশ লাভ কন্টকমুক্ত হবে, সন্দেহ নেই।
পর্যটন আজ কেবল একটি বিনোদন বা অবকাশযাপনমূলক খাত নয়—এটি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী পর্যটনকে বলা হয় “শান্তির শিল্প” ও “অর্থনীতির অনুঘটক”, কারণ এটি একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তেমনি অন্যদিকে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।
বিশ্বের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো—যেমন মৌরিশাস, মালদ্বীপ, ফিজি, কিংবা বাহামা—পর্যটনের ওপর নির্ভর করে তাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ১০.৫ শতাংশ এবং এতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এ খাতের বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিনোদন, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়—যা একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতও একইভাবে সম্ভাবনাময় ছিল, এখনো আছে। আমাদের পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন, ঐতিহাসিক স্থান ও লোকসংস্কৃতি—সবকিছুই পর্যটনের জন্য অনন্য সম্পদ। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বিশাল সম্ভাবনাময় শিল্পটি এখনো কাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিকল্পনার অভাবে পিছিয়ে আছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশি পর্যটকদের ব্যয় কমেছে প্রায় ১৫৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ, যা এই খাতের সংকট স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিদেশি পর্যটকদের আগমন কমে যাওয়ায় পর্যটন এখন মূলত দেশীয় ভ্রমণকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত জাতীয় পর্যটননীতি, যা টেকসই উন্নয়ন, নিরাপত্তা, প্রচার, অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে জোর দেবে। পর্যটন খাতকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে, যাতে এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি শক্তিশালী খাতে পরিণত হয়।
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত