
সিরাজুল ইসলাম : আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান ভাষাশহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয় ও স্বাতন্ত্রের দাবি ঊর্ধ্বে তুলে ধরার ঐতিহাসিক দিন। মাতৃভাষার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ জাগ্রত তারুণ্যের প্রতিনিধিরা ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে শাসকদের লেলিয়ে দেয়া পুলিশের গুলিতে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। তাদের সেই আত্মত্যাগের বিনিময়ে শাসকরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছিল। অন্যদিকে, ভাষার জন্য জীবন দেয়ার বিরল ইতিহাস রচনার সুবাদে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। হাজার বছরের লালিত স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও আত্মমর্যাদার দাবিকে অগ্রাহ্য করার বিরুদ্ধে বায়ান্নতে রুখে দাঁড়ানোর শাণিত চেতনার পথ বেয়ে দেশের মানুষ পরবর্তী প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনার মধ্যে মহান ভাষাশহীদদের আত্মদান এবং এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ফল্গুধারার মতো প্রবাহমান ছিল। আজকের এইদিনে আমরা মহান ভাষাশহীদদের অমলিন স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।
ব্রিটিশভারতে বাংলা ভাষাভাষীরা শুধু সংখ্যার দিক দিয়েই নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার দিক দিয়েও অগ্রগণ্য ছিল। ব্রিটিশমুক্ত ভারতে লিংগুয়াফ্রাংকা কী হবে, তা নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে তখন উর্দু ও হিন্দির পাশে বাংলার দাবিও উঠে আসে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ওই দাবি পেশ করেন এবং বলেন, বাংলার লিংগুয়াফ্রাংকা হওয়ার যোগ্যতা অন্য দুই ভাষার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। তখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এই অভিমত অনেকেরই পছন্দ হয়নি। তারা বাংলার পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধাপ্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বাংলার দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে সে সময়ের প্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত আছেন। তিনি হিন্দির পক্ষে রায় দেন। অথচ, তিনিই উপমহাদেশ ও বাংলাভাষার প্রথম কবি, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এখানে সংক্ষেপে স্মরণ করা যেতে পারে, বাংলা সর্বভারতীয় ভাষাসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভাষা হিসেবে গণ্য হলেও বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যকার একটি শ্রেণি-বিভিন্ন সময়ে এ ভাষাকে যথাযথ মূল্য দিতে চায়নি। এই ভাষায় প্রথম সাহিত্যচর্চা করেছেন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকরা। শেষ পর্যন্ত তারা ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকের অত্যাচার-নির্যাতনে দেশছাড়া হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে নেপালের রাজদরবারে। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বাংলা ভাষায় ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় গ্রন্থের অনুবাদ করতে দেয়নি। বলেছে, যারা এটা করবে, তারা রৌরব নরকে যাবে। মধ্যযুগেও বাংলাভাষা বিদ্বেষ লক্ষ্য করা গেছে। বিদ্বেষীদের উদ্দেশ্যে তাই কবি আবদুল হাকিমকে বলতে হয়েছে, ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ উপমহাদেশ ও বাংলাভাগের পর পাকিস্তানের শাসকরা বাংলার মর্যাদা দিতে রাজি হয়নি। তাদের নারাজির প্রতিবাদেই সংগঠিত হয় ভাষা আন্দোলন। ভাষাশহীদরা বুকের রক্ত ঢেলে বাংলার মর্যাদা সুরক্ষা করেন। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য, এ দেশের মানুষ ভাষাপরিচয়ে বাঙালি। ধর্মীয় পরিচয়ে অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। এই দুই পরিচয়ের কোনোটিই পরিত্যাগযোগ্য নয়। এই দু’য়ের মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই দুই পরিচয়ের একটি অস্বীকার করার অর্থ হলো, জাতীয় স্বাতন্ত্রকে অস্বীকার করা। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটা অতুল্য গৌরবের বিষয় যে, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়। কিন্তু যে ভাষার মর্যাদার জন্য বায়ান্নর প্রজন্ম সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে দাবি আদায় করেছিল, তার ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি। এখনো প্রশাসন, আদালতসহ সর্বত্র বাংলাকে মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। আমাদের ব্যর্থতা এই যে, এতদিনেও আমরা মাতৃভাষার মর্যাদা যথাযথ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারিনি। এখন তো ভাষা ওপর নানা অনাচার, অত্যাচার, যথেচ্ছাচার চলছে, নানাভাবে ভাষার অবমূল্যায়ন হচ্ছে, অবমাননা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বেসরকারি রেডিও, সংবাদপত্র, বই-পুস্তক ইত্যাদিতে ভাষার চরম বিকৃতির জোয়ার চলছে। শব্দ ব্যবহার, বানান ও উচ্চারণে চলছে স্বেচ্ছাচারিতা। অবশ্য ভাষা, ব্যকরণ, বানান ইত্যাদি নিয়ে কিছু কাজও হচ্ছে, যা আশাব্যঞ্জক। এসব কাজের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ভাষার বিকৃতি ও যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে সর্বজনগ্রাহ্য একটি রীতি-পদ্ধতি প্রবর্তন করা না গেলে ভাষাকে সুরক্ষা করা যাবে না। স্বীকার করতে হবে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি এবং সামাজিক ব্যবস্থায় অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এর মূলে রয়েছে বিদেশি অপসংস্কৃতির আগ্রাসন। বিশ্ব দরবারে বাংলাকে এবং বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে বাংলা ভাষার ব্যাপক বিস্তারে আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের অশেষ ভূমিকা রয়েছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের এই দেশে তারা ইসলাম সম্পর্কে যা কিছু জেনেছে ও শিখেছে, বাংলা ভাষার মাধ্যমেই শিখেছে। ইসলামবেত্তারা পবিত্র কোরআন ও হাদিস অনুবাদ থেকে শুরু করে ইসলামী ইতিহাস-ঐতিহ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নিরলসভাবে গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং করছেন। এসব গ্রন্থাদি অন্য যেকোনো গ্রন্থ থেকে সর্বাধিক পঠিত। মসজিদে জুমা পূর্ব খুৎবাও বাংলায় দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ইমামরাও বাংলা ভাষার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারে ভূমিকা রাখছেন। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বাংলা ভাষার বিস্তার ও পরিচর্যায় আলেম-ওলামা ভূমিকা পালন করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। অথচ, তাদের এই বিশেষ কর্মের স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া হয় না। আমরা মনে করি, ইসলামী গ্রন্থ রচিয়তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা পদক দিয়ে উৎসাহিত করা উচিত।
বাংলাদেশের যে পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস তা সংরক্ষণ ও অব্যাহত চর্চা, অনুসরণ, অনুশীলনের মধ্যেই জাতীয় প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ নির্ভরশীল। এর ব্যত্যয় ও বৈপরীত্য দেখা গেলে দেশ ও জাতির জন্য সেটা হুমকি স্বরূপ। রাজনীতি নিয়ন্ত্রক শক্তি হলেও ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা তার সহায়ক না হলে ওই রাজনীতি তার সক্ষমতা হারাতে বাধ্য। এ জন্যই জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পাশাপাশি ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা ইত্যাদির চর্চা, বিকাশ, প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, রাজনীতি এখন যথাযথ অবস্থানে নেই। সেখানে বিভেদ-বিভ্রান্তি ব্যাপক। অন্যদিকে, ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর বহিরাগত আগ্রাসন মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে চেতনা ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে, সে চেতনা তুল্যমূল্যে অনুসরণ হচ্ছে না। জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য এটা এক অশনিসঙ্কেত। ভাষা আন্দোলন বলি কিংবা স্বাধীনতা যুদ্ধ বলি, সবকিছুর মূলে লক্ষ্য ছিল, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি, বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এ আকাক্সক্ষার অন্তর্গত অপরিহার্য বিষয়। এমতাবস্থায়, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের অবিনাশী চেতনাই আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারে।আজকের বিশ্বায়নের প্রবল ¯্রােতধারায় শুধু জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয় স্বাতন্ত্র্য, জাতীয়তাবোধ যে নীরবে-নিঃশব্দে ক্ষয়ে যাচ্ছে তাই নয়, জাতীয় ভাবধারার মাধ্যমে যে ভাষা তাও ক্রমে ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছে। বিশ্বায়নের একালে বহুজাতিক করপোরেশনের স্বার্থে বিশ্বব্যাপী এককেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিজয় নিশ্চিত করতে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যেহেতু সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা, তাই ভাষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। বেশ কিছু ভাষার অপমৃত্যু ঘটেছে এরই মধ্যে। ২০০১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি জনসমষ্টি ইংরেজিকে ব্যবহার করছে তাদের প্রথম ভাষা হিসেবে। আরো ২৫ কোটি মানুষের কাছে ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা। প্রায় ১০০ কোটি মানুষ এ মুহূর্তে ইংরেজি শিক্ষায় গভীরভাবে মনোযোগী। অনেকের ভবিষ্যদ্বাণী, ২০৫০ সালে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসমষ্টির ভাষা হবে ইংরেজি। বিশ্বায়নের এ যুগে বিশ্বময় যোগাযোগের মাধ্যম হয়েছে ইংরেজি। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে ইংরেজিতে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি। তাই আজ ইংরেজি শুধু একটি ভাষা নয়, এটি এখন এক নব্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এভাবে আজকের এককেন্দ্রিক বিশ্বে একদিকে যেমন বিশ্বের একক ভাষা হিসেবে ইংরেজির অবস্থান ক্রমে ক্রমে অপ্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে উঠছে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বের প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে প্রতি সপ্তাহে দু’টি এবং প্রতি বছরে শতাধিক ভাষা অপমৃত্যুর কবলে পড়ছে। অনেক বিজ্ঞজনের ধারণা, এই শতাব্দীর শেষ প্রান্তে বিশ্বের শতকরা ৬০ থেকে ৯০ ভাগ ভাষার ভাগ্য বিড়ম্বনা ঘটতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সংস্থা ইউনেস্কোর অধিবেশনে ২১ ফেব্রæয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাই ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্টগুলোয় (বর্তমানে এই সংখ্যা ১৯৩) ২১ ফেব্রæয়ারি পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ইউনেস্কোর এ সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের একটি বিশিষ্ট অর্জন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করল এবং বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের উজ্জ্বল অধ্যায়টি বিশ্ব ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হলো।
২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে মাতৃভাষার দাবিতে সংগ্রামরত পূর্ব বাংলার দামাল ছেলেদের কথা উচ্চারিত হচ্ছে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে সেসব তরুণের আত্মদানের কথা। পরম শ্রদ্ধা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে রফিক, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, শফিউর রহমান, ওয়ালিউল্লাহসহ নাম না জানা আরো অনেক শহীদকে। ঢাকার শহীদ মিনার এখন শুধু ঢাকার নয়, এই শহীদ মিনার সারা বিশ্বের। হয়ে উঠেছে নতুন নতুন সংগ্রামের পবিত্র স্মারক, বিজয়ের প্রতীক, অনুপ্রেরণার উৎস। এই শহীদ মিনার এখন কম্পিত হচ্ছে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষের পদচারণায়। আজও যারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের ভাষাকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর সংগ্রামে রত, তারা বারবার স্মরণ করবেন পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতার সংগ্রামী চেতনাকে। উদ্বুদ্ধ হবেন রক্তদানের মধ্য দিয়ে অভীষ্ট লক্ষ অর্জনে। তাই এখন রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার শুধু বাংলাদেশের কৃতী সন্তান নন, তারা আজ সমগ্র বিশ্বের, যেমন ১৮৮৬ সালের পয়লা মে শিকাগো নগরীর হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমকালের দাবিতে আত্মদানকারী শ্রমিকরা শেষ পর্যন্ত শুধু শিকাগো নগরীর থাকেননি। তারাও বিশ্বময় শ্রমজীবীদের প্রতিনিধিতে রূপান্তরিত হন। এদিক থেকে বলতে কোনো দ্বিধা নেই, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসরূপে একুশে ফেব্রæয়ারির তাৎপর্য এখন বিশ্বময় বিস্তৃত।
ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহন। শিল্পকর্ম ও অগ্রগতির ধারক। ভাষার ওপর তাই কোনো আঘাত এলে সমগ্র জাতি শঙ্কিত হয়ে ওঠে। হয় আতঙ্কিত। উদ্যোগ নেয় সেই আঘাত প্রতিহত করতে। যুক্তিবুদ্ধির সহায়তায় তা সম্ভব হলে ভালো। তা না হলে অগ্রসর হয় রক্তাক্ত পথে। এগিয়ে যায় আত্মদানের পথে। পূর্ববাংলায় যে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৮ সালে, তার মাধ্যমে এই জাতির সংকল্পই প্রতিফলিত হয়। একুশে ফেব্রæয়ারি এরই চ‚ড়ান্ত রূপ। একুশে ফেব্রæয়ারির জন্ম একদিনে হয়নি, হয়নি এক যুগেও। এছাড়া একুশে ফেব্রæয়ারি শুধু ভাষা সংরক্ষণের আন্দোলন ছিল না। ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবনবোধ, সাহিত্য-সংস্কৃতি স্বাতন্ত্র্য, জাতির আধ্মাতিক সত্তা সংরক্ষণের সংগ্রামের মূর্ত রূপ ছিল একুশে ফেব্রæয়ারি। বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাই এ দিনের গুরুত্ব এমন হৃদয়গ্রাহী। একুশের সংগ্রাম একদিকে যেমন এই জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক তেমনি তার স্বপ্নসাধ পূর্ণ করার নির্দেশকও। বিশ্বায়নের প্রবল ¯্রােতে যখন একটি একটি করে ভাষার অপমৃত্যু ঘটছে, তখন ওই সব ভাষাভাষী বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে। বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন তাদের শিল্প-সংস্কৃতির মূল গ্রন্থি থেকে। সাম্প্রতিককালে মৃতভাষার সারিতে এলো ম্যাসাচুসেটসের ক্যাটওয়া, আলাস্কার এয়াক, লাটভিয়ার লিভোনিয়ান প্রভৃতি। এসব ভাষা ব্যবহারকারী দেশজ সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তারা এক ধরনের যাযাবর গোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে, কেননা তারা পারবেন না বিদেশি আচার-অনুষ্ঠানকে পুরোপুরি আত্মীকরণ করতে। তাই নিজস্ব ভাষা সংরক্ষণের দাবি অনেকটা সহজাত, মৌলিক, আদিম। এ দাবি যতদিন শক্তিশালী থাকবে, একুশের প্রেরণা ততদিন থাকবে চিরঞ্জীব এবং তাও সমগ্র বিশ্বে। বাংলা ভাষা সম্পর্কে অবশ্যই নেই তেমন কোনো হতাশা। কেননা, বিশ্বায়নের একালে বাংলাভাষীদের বাংলা ছাড়াও শিখতে হবে অন্য ভাষা, বিশেষ করে ইংরেজি। ইংরেজি শিখেই তীব্র প্রতিযোগিতার এই সময়ে শুধু টিকে থাকতে হবে তা নয়, বিজয়ী হতে হবে। সমানতালে পা মিলিয়ে দ্রæতগতিতে চলতে হবে। কাক্সিক্ষত লক্ষ অর্জন করতে হবে। তাই বাংলাদেশেও ইংরেজি শেখার গতি ত্বরান্বিত হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আকর্ষণ ইংরেজির প্রতি বৃদ্ধি পাবে ভীষণভাবে। কিন্তু সেই ঝড়ে অথবা টর্নেডোতে বাংলা ভাষা উড়ে যাবে না। ১০০ বছর পরেও বাংলা ভাষা এ দেশে প্রথম ভাষা হিসেবে টিকে না থাকলেও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে এর স্ট্যাটাসের কোনো হেরফের হবে না। কিন্তু বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যূন ৫৭টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর যে স্বতন্ত্র শব্দাবলি রয়েছে এবং এসব শব্দের পেছনে যে ইতিহাস রয়েছে, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানের জীবন্ত কাহিনী রয়েছে, তার ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়ে যেতে পারে ইংরেজির ব্যাপক প্রভাবে। অথচ এই শব্দাবলি বাংলা ভাষাকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতেও সমৃদ্ধ করবে ভয়ঙ্করভাবে। এ বিষয়ে এ দেশের বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীদের ভেবে দেখতে হবে। একুশে ফেব্রæয়ারি পূর্ববাংলায় যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এখনো যেসব জনপদে মাতৃভাষার দাবিতে সংখ্যাহীন তরুণ-তরুণী সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন, বিশেষ করে বিশ্বায়নের এই কালে, একুশে ফেব্রæয়ারি শুধু বাংলাভাষীদের অহঙ্কার হয়ে না থেকে প্রতিবাদী একুশ কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়ানোর প্রত্যয়রূপে জাগ্রত থাকতে পারবে কী? একুশে ফেব্রæয়ারির ইতিহাস কিন্তু সাধারণ ছাত্র-জনতার ইতিহাস। এই ইতিহাসের নায়ক অথবা মহানায়ক তারাই। কোনো দল অথবা দলীয় নেতার নেতৃত্বে এর জন্ম হয়নি। দেশের চিন্তাবিদ-বুদ্ধিজীবীরা তাদের যুক্তিবাদী সৃজনশীল লেখনীর দ্বারা সমাজজীবনে এর ক্ষেত্র রচনা করেন। দেশের স্বাধীনচেতা মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণরা সেই উর্বর ক্ষেত্রে রক্তবীজ বপন করেন। ফলে এই সোনালি ফসল। এই তরুণদের সংগ্রামী চেতনা সমগ্র সমাজে ছড়িয়ে পড়ে গড়ে তোলে এক অজেয় শক্তি। তাই পরবর্তী সময়ে রাজনীতিকে দান করে নতুন দ্যোতনা। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় এক নতুন চিৎশক্তি। সৃষ্টি হয় নতুন ইতিহাস। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ওই সব শহীদ এবং বীর যোদ্ধাদের যাদের রক্ত, অশ্রæ ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা একুশে ফেব্রæয়ারির মতো এই স্মরণীয় দিবসটি লাভ করেছি। এ দিনের সৃষ্টিতে তরুণরা রক্তাক্ত অবদান রাখলেও এখন তা বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ৭৩ বছর পার হয়ে গেছে; কিন্তু আজো অমলিন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। ১৯৪৭ পরবর্তী আমাদের জাতীয় জীবনের সব জাগরণ, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনার মূলে জড়িয়ে আছে এ মাসের স্মৃতি। ভাষার লড়াইকে কেন্দ্র করে অভ্যুদয় ঘটে একটি স্বাধীন দেশের। বিশ্বে এ গৌরবের অধিকারী একমাত্র আমরাই। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের উৎসধারা ফেব্রুয়ারি মাসের আগমনে স্মরণে যাদের নাম সবার আগে আসে তারা হলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় জীবন দিতে হয়েছিল পরিচিত এই ক’জন যুবকসহ আরো কয়েকজনকে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং সূত্র অন্বেষণ করতে গেলে সবার আগে মনে আসে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কথা। এর পরই আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর আবুল কাসেম এবং তারই প্রতিষ্ঠিত সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের নাম। প্রফেসর আবুল কাসেম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৭ দিনের মাথায় ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’। আর এর মধ্য দিয়ে সে দিন থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম। তমদ্দুন মজলিস ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর একটি পুস্তিকা আকারে ভাষা আন্দোলন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। ১৮ পৃষ্ঠার এ পুস্তিকার নাম ছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’। অন্য দিকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিলগ্নে জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের অনুরূপ পদক্ষেপ হিসেবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করে বক্তব্য রাখেন। জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করে ‘পাকিস্তানের ভাষাসমস্যা’ নামে একটি নিবন্ধ রচনা করেন। এতে তিনি বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে তা রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হবে বলে মতপ্রকাশ করেন। এটিকে তিনি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিবিরোধী বলেও অভিমত প্রকাশ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এ বক্তব্যে তৎকালীন বাঙালিসমাজ উদ্দীপ্ত হয়। কমরেড পত্রিকায় ‘দি ল্যাংগুয়েজ প্রবলেমস অব পাকিস্তান’ নামে ১৯৪৭ সালের ৩ আগস্ট নিবন্ধনটি প্রকাশ হয়। সে কারণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষা আন্দোলনের উৎসপুরুষ নামে পরিচিত। ক্রমে দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস। দেশ-বিদেশে সর্বত্র বাড়ছে ফেব্রুয়ারি আর ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক প্রাণচাঞ্চল্য। ১৯৯৯ সালে জাতিসঙ্ঘের ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি এবং ২০১০ সালে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে সারা বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস পালনের পক্ষে প্রস্তাব পাসের ফলে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এখন বিশ্ব ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় ঘটনা।আমাদের দেশে প্রতিবছরই একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয় সরকারিভাবে শহীদ দিবস হিসেবে। ১১ জ্যৈষ্ঠ যেমন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কাজী নজরুল ইসলামকে, ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়াকে ঠিক তেমনি ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমরা স্মরণ করি বাংলা ভাষার সংগ্রামের অমর শহীদদের। এ দিনে শহীদদের স্মৃতিফলকে মাল্য দান করা হয়। চলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, স্মরণসভা বক্তাদের ভাষণ ইত্যাদি। বিভিন্ন স্থানে পৃথক সভার মাধ্যমে চলে ভাষা সংগ্রামের শহীদদের বীরত্ব গাথা নিয়ে আলোচনার এক অঘোষিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। রাজধানী ঢাকাতে কেন্দ্রীয়ভাবে শহীদ দিবস উদযাপিত হলেও দেশের সর্বত্র দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালিত হয়। পত্র-পত্রিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দিবসটি যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে দেশের বাইরেও বিভিন্ন স্থানে উদযাপিত হয়ে থাকে।
বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিবন্ধে ভাষা আন্দোলনকে সামনে রেখে অনেকেই আলোচনা করেন। বাংলা ভাষার সংকট, সমস্যা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন আলোচনা হয় তেমনি ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়েও কথা হয়। বাংলা ভাষার সংকট নিয়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা কেবলমাত্র বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনের গ-িতেই আবদ্ধ থাকে। অথচ একুশের আন্দোলন বাংলাদেশের বাইরে বলতে গেলে গোটা বিশ্বেই প্রচারিত।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষা। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ছোট্ট হলেও রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষা হওয়ার কারণে বিশ্ব ভাষা অঙ্গনে বাংলা ভাষার স্থান অনেক উঁচুতে স্বীকার করতেই হয়। এটা গোটা বিশ্বের বাংলাভাষীদের কাছে গৌরবের ব্যাপার। বিশেষ করে জাতিসংঘের সদর দপ্তর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বাংলা ভাষাকে যথোচিত সম্মান প্রদান করায় এ ভাষা ও দেশের মান ও পরিচিতি যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই ফাল্গুন আর ফাল্গুন মানেই বসন্তÍ। বাসন্তিÍ কৃষ্ণচূড়ার মাথায় ফোটে রক্ত রঙের পুষ্পরাজি, তা বাতাসে দুলে মনে করিয়ে দেয় একুশের ভাষা শহীদদের কথা, ভাষা সংগ্রামের কথা।
বাংলা ভাষা-রাষ্ট্রভাষা হওয়ার জন্য আমরা গর্বিত। হয়তো বা আরও গর্বিত হওয়া সম্ভব ছিলÑ বাংলা ভাষা যদি ব্রিটিশ ভারতের এক আধা রাজ্যের রাষ্ট্র ভাষার পরিবর্তে গোটা স্বাধীন ভারতেরই রাষ্ট্রভাষা হতো। আমাদের পূর্ব প্রজন্মের মনীষীরা এ ব্যাপারে তৎপর থাকলেও সংকীর্ণমনা রাজনীতির ডামাডোলে তা চাপা পড়ে যায়। কংগ্রেস মহল হিন্দির পক্ষে আর প্রভাবশালী কিছু মুসলমান উর্দুর পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। এ দুই মতবাদের বিপক্ষে বাংলাভাষী অঞ্চল হতে বাংলাকে ভারতের সাধারণ ভাষা করার জন্যও দাবি তোলা হয়। এ নিয়ে বহু বৈঠক হয়। বিভিন্ন বৈঠকে শহীদুল্লাহ, প্রমুখ মনীষী ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপন করেন। এ দাবিতে জনমত সৃষ্টি হলেও প্রতিবাদের মুখে আর তৎকালীন সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপের জন্য তা অর্জিত হয়নি।
১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে দেশ ভাগের প্রাক্কালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উর্দুভাষী ড. জিয়াস উদ্দিন আহমদ এ অভিমত ব্যক্ত করেন যে, কংগ্রেস স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দিকে গ্রহণ করার পর স্বাভাবিকভাবেই উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা উচিত। জিয়াস উদ্দিন সাহেবের বক্তব্যকে খ-ন করে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা নামে এক নিবন্ধ প্রকাশ করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। নিবন্ধটি আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই তারিখে।
পূর্ব পাকিস্তানের জবান শীর্ষক এক নিবন্ধে আব্দুল মনসুর বলেন, উর্দু নিয়ে এ ধস্তাধস্তি না করে আমরা যদি সোজাসুজি বাংলাকেই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে গ্রহণ করি, তাহলে পূর্ব-পাকিস্তান প্রবর্তনের সাথে সাথে আমরা বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজেরাই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নে হাত দিতে পারব। এ লেখাটি প্রকাশিত হয় মোহাম্মদীতে ১৯৪৩ সালে।
১৯৪৪ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য নিবন্ধে কবি ফররুখ আহমদ লিখেনÑ পাকিস্তানের অন্তÍত পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এ কথা সর্ববাদী সম্মত হলেও আমাদের এ পূর্ব পাকিস্তানেরই কয়েকজন তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলা ভাষার বিপক্ষে এমন অর্বাচীনের মতো মত প্রকাশ করেছেন, যা নিতান্তÍই লজ্জাজনক। অবশ্য শেষ পর্যন্তÍ তা টিকেনি।
দেশ স্বাধীন হলো। ১৯৪৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন অধ্যাপক বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের উদ্যোগে ‘পাকিস্তান তমুদ্দুন মজলিস’ নামে এক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। মোহাম্মদ তোয়াহার ভাষায়, বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা যায় কিনা তা নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রমহলে প্রথম চিন্তÍার সূত্রপাত করে এ সংগঠন। এরাই প্রথম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি তোলে এবং ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত করে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেন। প্রথম দিকে ছাত্রছাত্রীদের বাংলাভাষা রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে বেশ অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেয়াওত খাঁ ছিলেন অবাঙালি। তিনি অবশ্য রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থক এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন। অধ্যাপক খাঁর ভাষায় পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ সারা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। কাজেই বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ন্যায্য, স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত।
১৯৪৮ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে ভাষা প্রশ্নে পূর্ব-পাকিস্তানের বেশির ভাগ সদস্যই সরকারি প্রস্তাবের ওপর সংশোধনী বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, রাষ্ট্রভাষা সে ভাষাই হওয়া উচিত বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ যে ভাষা ব্যবহার করেন। যদি ২৯ নং বিধিতে ইংরেজি ভাষা সম্মানজনক স্থান পেতে পারে, পরিষদের কার্যাবলী উর্দু এবং ইংরেজির মাধ্যমে চলতে পারে, তাহলে বাংলা যা ৪ কোটি ৪০ লাখ লোকের ভাষা কেন সম্মানজনক
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত