
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের প্রশংসা ইইউ’র
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব : আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি
রাজনৈতিক বিরোধ অবসানে সংলাপের বিকল্প নেই : জাতীয় পার্টি
বিশেষ প্রতিবেদক : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর জন্য ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচনের আগে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে ১৫ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছে। গত রোববার প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় আসে। তাদের আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রতিনিধি দলটি সরকারের কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের সদস্য, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অনেকের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে। ইতোমধ্যে প্রতিনিধি দলটি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ, জাতীয় সংসদেও প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সাথে আলোচনা শেষ করেছে।
বৈঠক শেষে জানা যায়, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া সংস্কারগুলোর প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল। এর মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগের যে ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছিল এতদিন, সেটি ছেড়ে দেওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসা করেছেন তারা। বিষয়টি খুবই ‘অ্যাপ্রিসিয়েট’ বলছেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের প্রধান ইইএএস’র জ্যেষ্ঠ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ সেলোরি রিকার্ডোর নেতৃত্বে ইইউর চার জন প্রাক-প্রতিনিধি দলের সদস্য বৈঠকে অংশে নেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ দিমিত্রা লোননাউ, আইন বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিনা দোস রামোস আলভিস, ইইউ ডেলিগেশনের চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স ড. ব্রেন্ড স্পানিয়ার এবং ইইউ ডেলিগেশনেরপরিটিক্যাল অফিসার সেবাসটেইন রিগার ব্রাউন।
দেশের প্রধান তিন দলের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দলগুলি জানায়:
॥ আওয়ামী লীগ: অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সম্ভব ॥
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামো অনুযায়ী নির্বাচন চায় বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান, সার্বভৌমত্ব, আইনি ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তারা আগামী নির্বাচন দেখতে চান। তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চান। আমরাও বলেছি, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সম্ভব।
সফররত প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে মোট ৬৬টি আইন সংস্কার হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগই ৫৫টি করেছে। এগুলোর মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাকে স্বাধীন, টেকসই এবং নির্বাচন সুষ্ঠু করতে আইনের আমূল পরিবর্তন রয়েছে। এর মধ্যে এক-এগারোর সরকার ৫টি এবং বাকি সব সরকার মিলে ৬টি আইন সংস্কার করেছে। একটি ফানডামেন্টাল নির্বাচনের জন্য করণীয় সব করেছে আওয়ামী লীগ। একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে সরকারের নেওয়া এসব উদ্যোগের প্রশংসা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল।
তিনি আরও বলেন, তারা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে আশ্বস্ত হয়েছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। সংলাপ নিয়ে প্রতিনিধিদল কোনো কথা বলেনি। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা সংসদ বিলুপ্তির বিষয় নিয়েও প্রতিনিধি দল কোনো কথা বলেনি।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হবে। এখানে পার্লামেন্ট বিলুপ্তির প্রশ্নই ওঠে না। সরকারের পদত্যাগ প্রশ্নই ওঠে না। তত্বাবধাক সরকার ফেরানোর প্রশ্নই ওঠে না।
ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে বৈঠকে যোগ দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মি আহমেদ, ঢাকা-১৭ আসনের নৌকার প্রার্থী মোহাম্মদ এ আরাফাত, সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জহির, গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।
॥ আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি ॥
গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, আগামীতে জনগণের ভোটে নির্বাচন সম্ভব কি না তা জানতে চেয়েছে ইইউ প্রতিনিধিদল। আমরা বলেছি দেশে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নেই। আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে দেশের মানুষ ভোট দিতে পারবে না।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। কারণ এরা ভোটের দিন তো দূরে থাক, এখনই নির্বাচনের চুরি শুরু করে দিয়েছে। ডিসিদের বদলি করেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের পোস্টিং দিচ্ছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। হাত কেটে দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির জনসভায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল পদযাত্রায় হামলা করা হয়েছে। শুধু তাই না বিএনপির নেতাদের মামলার বিচার যাতে তরান্বিত হয় সেজন্য চেষ্টা করছে। যাতে তারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারেন। এ কাজগুলো তো অব্যাহতভাবে চলছে।
বৈঠকে বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সঙ্গে ছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল হোসেন জবিউল্লাহ। অন্যদিকে রিকার্ডো চেলারির নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলে ছিলেন ছয়জন।
॥ জাতীয় পার্টি: রাজনৈতিক বিরোধ অবসানে সংলাপের বিকল্প নেই ॥
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলকে জাতীয় পার্টি জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিরোধ অবসানে সংলাপের বিকল্প নেই। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে মতভেদ রয়েছে, তা কাটাতে অবশ্যই এই সংলাপের প্রয়োজন। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের একথা জানান জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।
জাতীয় পার্টি মহাসচিব চুন্নু গণমাধ্যমকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক দফা নিয়ে আছে। বিএনপি সরকারের পদত্যাগ চায়, আর আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন চায়। জাতীয় পার্টির এক দফা হলো, আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। আমাদের অবস্থান হলো এই দেশের মানুষও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। সংলাপ ছাড়া সমাধান হবে না। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে সরকারকেই সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলেন, ইইউ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে।
বৈঠকে জাতীয় পার্টির পক্ষে ছিলেন দলের চেয়ারম্যান এবং সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের, মহাসচিব চুন্নু এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বিশেষ দূত মাসরুর মওলা।