
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ছাগল পালন ও সবজি চাষে জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা। পুরুষনির্ভর পরিবারের নারীরা সবজি ও পশু পালন করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি জীবনমান উন্নয়নেও সক্রিয় হচ্ছেন।
দক্ষিণ অঞ্চলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার মাটি লবনাক্ত হওয়ায় এসব অঞ্চলের পুরুষরা সাধারণত চিংড়ি চাষে ঝুঁকে পড়েন। আর হতদরিদ্র পরিবারগুলোর পুরুষরা চিংড়ি ঘেরে ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে এসব পরিবারের নারীদের প্রয়োজনীয় কিছু পেতে দিনের পর দিন পুরুষদের উপর নির্ভর করে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হতো। এই অপেক্ষার পালাকে আরও ভারী করে তোলে প্রতি বছরের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
বর্তমানে দিন বদলের যাত্রায় এসব অঞ্চলের নারীরা এখন পরিবারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। এমনকি সন্তানের লেখাপড়ার খরচও বহন করছেন অনেক নারী। জাতীয় পর্যায়ের একটি অলাভজনক ও অরাজনৈতিক বেসরকারি উন্নয়নমূলক সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের সহযোগিতা নিয়ে দুই উপজেলার নারীরা এখন স্বাবলম্বী। আর্থিকভাবেও সমৃদ্ধ। এখন তারা স্বামীর আয়ের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থেকে টুকিটাকি খরচ নিজেরাই বহন করছেন। অনেকেই পুরো সংসারই পরিচালনা করছেন।
ট্রান্সিশন ফান্ড প্রজেক্টের (এএসডি) মাধ্যমে আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া, প্রতাপনগর এবং শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, মুন্সীগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের জীবনমান উন্নয়নে সক্রিয় গৃহিণীদের ছাগল, ভেড়া, সবজি বীজ এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এসব ছাগল, ভেড়া পালন এবং সবজি চাষ করে নারীরা স্বপ্ন পূরণে সক্ষম হচ্ছেন।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পোড়াকাটলা গ্রামের মুরারী সরদারের স্ত্রী অর্চনা রানী জানান, স্বামীর উপার্জনের উপরই নির্ভর করে সংসার চলতো। সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের সহযোগিতা নিয়ে প্রথমে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করেছিলাম। সবজির ফলন ভালো হওয়ায় নিজেরা খাওয়ার পর বাজারে বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা হাতে এসেছে। এরপর বড় পরিসরে বাড়ির আঙিনাসহ পাশের জমিতে সবজি চাষের পরিকল্পনা নিয়েছি।
এছাড়া ছাগল পালন করেও মোটা অংকের টাকা উপার্জন করেছেন অর্চনা রানী। তিনি বলেন, ‘এখন সংসারে স্বামীর পাশাপাশি নিজেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে পারি। সন্তানের লেখাপড়ার কিছু খরচ দিতে পারি।’
একই ইউনিয়ানের ভামিয়া গ্রামের সুচিত্রা আউলিয়া বলেন, অভাবের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির স্বামীর উপর নির্ভরশীল ছিলাম। বর্তমানে এই এনজিওর সহযোগিতা নিয়ে ছাগল পালন শুরু করে অনেক লাভবান হয়েছি। একটি ছাগল থেকে এখন পাঁচটি ছাগলের মালিক হয়েছি। এছাড়া বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করি। সবজি নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বিক্রি করি। ফলে আমাদের দরিদ্রদের সংসার অনেক স্বচ্ছল হয়েছে।
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের নাকনা গ্রামের নিরঞ্জন মন্ডলের স্ত্রী তাপসী গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি ছাগল পালনে দুটি বাচ্চা পেয়েছেন। একটি বিক্রি করে সংসারে কাজে ব্যয় করেছেন। সংসারের চাহিদা পূরনের পর বাড়ির আঙিনার সবজি বিক্রি করে তিনি আয় করেছেন আট হাজার টাকা। আগের তুলনায় এখন তাদের সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে বলে জানান তিনি।
একইভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন শ্যামনগর উপজেলার ভামিয়া গ্রামের কলেজছাত্রী পিংকি রানী। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়িতে পশু পালন ও সবজি চাষ করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারেও সহযোগিতা করছেন। এখন আর কারও কাছে টাকা চাইতে হয় না তার।
শ্যামনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহিরুল ইসলাম বলেন, তারা বিনামূল্যে ছাগল, ভেড়া ও হাঁস দিচ্ছেন। এটি একটি দারুন উদ্যোগ। আধুনিক পদ্ধতিতে পশু পালনের প্রশিক্ষণ আমরা ইতোমধ্যে দিয়েছি। এছাড়া যখন যে টিকা আমাদের হাতে আসবে তা দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিসার এস এম এনামুল বলেন, লবনাক্ত এলাকায় উন্নত জাতের বীজ দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। আমরাও ইতিমধ্যে আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষাবাদের জন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমাদের কাছে উন্নতজাতের বীজ এলে আমরাও এই নারীদের মধ্যে বিতরণ করবো।
ফ্রেন্ডশিপের প্রজেক্ট ম্যানেজার শহীদুল ইসলাম বলেন, আমরা দুই বছর মানুষের পাশে ছিলাম। তাদের মূলধন গঠনে অবদান রাখার চেষ্টা করেছি। এখন অনেকই স্বাবলম্বী। আগামীতে এ ধরনের প্রজেক্ট হাতে এলে আবারও তাদের পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রায় নারীর অবদান উল্লেখযোগ্য। কৃষির উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। আদি পেশা কৃষির সূচনা হয় নারীর হাত ধরেই। ঘরের কাজের পাশাপাশি তারা কৃষি কাজও করে আসছে বহুকাল থেকে। আগে গ্রামীণ সমাজে পুরুষরাই মাঠে কৃষি কাজ এবং নারীরা রান্নাবান্না আর সন্তান লালনপালন নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। বর্তমানে প্রত্যক্ষভাবে কৃষিকাজে এগিয়ে এসেছে নারীরা। তারা পুরুষের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে রবিশস্য উৎপাদন, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন, সবজি ও মৎস্য চাষ, বনায়ন এসব কাজে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমান অবদান রাখছে।
ফসলের ক্ষেতে ধানের বীজ বপন করা থেকে শুরু করে সার দেওয়া, আগাছা দমন, কীটনাশক ছিটানো, ধান কেটে ঘরে তোলাসহ সব কাজই নারীরা করছে। অনেকেই আবার বাড়ির পাশে কিংবা উঠানে অনাবাদি জায়গায় শাক-সবজি, ফলফলাদির আবাদ করে সংসারে বাড়তি রোজগারের পথ করে নিচ্ছে। এতে পরিবারের খরচ মিটানোর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও তাদের অবদান বাড়ছে।
দেশের একটি সমৃদ্ধ খাত চা-শিল্প। এখানে পাহাড়ি নারী চা শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন থেকে শুরু করে আজকে কৃষির প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীর অবদান বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষি সম্প্রসারণ সেবা কার্যক্রমের আওতায় উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে নারীরা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।
দেশের মোট শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নারী। নারী শ্রমশক্তির মধ্যে ৬৮ শতাংশই কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত রয়েছেন কৃষি কাজে। বলা চলে, কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি নারী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যানে নারীর এ উপস্থিতির হিসাব নেই। এমনকি কৃষি কাজে জড়িত বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের কোনো মূল্যায়নও করা হয় না। এখনো গ্রামীণ সমাজে কৃষি ও চাষের কাজকে নারীর প্রতিদিনের কাজের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। সেখানে মজুরি প্রদানের বিষয়টি অবান্তর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নামমাত্র মজুরি দেওয়া হয়।
কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির ৫০ লাখই নারী শ্রমিক। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী। এ সময়ে দেশে কৃষি, বন ও মৎস্য খাত এবং পশু ও হাঁস-মুরগি পালন প্রভৃতি কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৩৭ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ লাখ হয়েছে। এ বৃদ্ধির হার ১১৬ শতাংশ। যদিও এসব নারী শ্রমিকের ৭২ শতাংশই অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিক।
বর্তমানে পেশা বদলের কারণে কৃষি, বন ও মৎস্যখাতে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমেছে ১০ দশমিক চার শতাংশ। ফসলের বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এমন কি বিপণন পর্যন্ত বেশিরভাগ কাজ নারী এককভাবেই করে। কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যানে নারীর এ উপস্থিতির কোনো হিসাবে স্বীকৃতি নেই। এমনকি কৃষিকাজে জড়িত এ বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিকের তেমন কোনো মূল্যায়নও করা হয় না।
নারীরা এখনও বিভিন্নভাবে বৈষ্যমের শিকার হচ্ছে। কৃষি উপকরণ, সারবীজ, কৃষি উপকরণ, কৃষক কার্ড ও ঋণের বেশিরভাগ সুবিধা পুরুষ কৃষক পান বলে অভিযোগ রয়েছে। এখনও গ্রামীণ সমাজে কৃষি ও চাষের কাজকে নারীর প্রাত্যহিক কাজের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। ভূমির মালিকানা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষের হাতে। ফসল উৎপাদনের ২১টি ধাপের ১৭টিতেই নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ রয়েছে।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য কৃষিতে নারী শ্রমিকের অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। গ্রামীণ নারীর শ্রম নির্ঘণ্ট শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যারা কাজের সঙ্গে জড়িত অথবা কাজ করছে না কিন্তু কাজ খুঁজছে এমন জনগোষ্ঠীকে শ্রমশক্তি হিসেবে ধরা হয়। সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতেই যুক্ত হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ কর্মসংস্থান। শ্রমশক্তির হিসাব অনুযায়ী ৩০ শতাংশ নারী কেবল শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ নারী গৃহকর্মে সরাসরি অবদান রাখছে। এদের বিরাট অংশ কৃষানি, কিন্তু শ্রমশক্তির বিবেচনায় তা যথাযথভাবে উঠে আসছে না।
নারী কৃষি শ্রমিকদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করে কৃষক হিসেবে তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন তরান্বিত হবে। কৃষকের অধিকার আদায়ে কৃষিশ্রম আইন প্রতিষ্ঠাসহ একটি কৃষি কমিশনও গঠন করা জরুরি। আইন প্রণয়ন এবং এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল টেকসই কৃষি উন্নয়র সম্ভব। ফলে কৃষক ও কৃষি শ্রমিক উভয়েরই স্বার্থ রক্ষা সম্ভব। নারী কৃষি শ্রমিকদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দান, একই ধরনের কাজে পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করা, সরকারি কৃষি কর্মকান্ডে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া, কৃষিকাজে নারী শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, প্রান্তিক সুবিধাদি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নারী কৃষি শ্রমিক তথা কৃষানিদের অগ্রাধিকার দেওয়াসহ আরো বেশকিছু পদক্ষেপ নিলে উন্নয়নের পথ সুগম হবে।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১-তে মোট তিনটি ভাগে ৪৯টি অধ্যায় রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ১৬ দশমিক ১ বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের সবক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, ১৬ দশমিক ৯ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে নারীর অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা, ২৩ দশমিক পাঁচ সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেওয়া, ২৩ দশমিক ১০ জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষি ও গার্হস্থ্য শ্রমসহ সব নারী শ্রমের স্বীকৃতি প্রদান করা, ৩১ দশমিক তিন কৃষিতে নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। এসব ধারা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষিতে নারী শ্রমিকদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়। শুধু তা-ই নয় নারীর ভাগ্যোন্নয়ন হলে নারীরা এ দেশের কৃষি উন্নয়নসহ অন্য উন্নয়ন সমৃদ্ধিকে আরও বেগবান করতে পারবে।
বর্তমান সরকার নারী ও কৃষিবান্ধব সরকার। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জোরদারে সরকারের খাস জমি বিতরণ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রাপ্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার নারী কৃষানি কার্ড প্রবর্তন করেছে। একই সাথে নারী কৃষকরা যাতে বিনা জামানতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে পারে এবং সরকারি খাস জমি বিতরণে যাতে অগ্রাধিকার পায় সে জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষি উন্নয়ন ও কৃষি অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে নারী কৃষি শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে অবশ্যই নারীর প্রতি বৈষম্যহীন সব উন্নয়ন ধারা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ সংবিধানে ২৮ নং অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যেই নারীর সমঅধিকার ও সমমূল্যায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি সবার সচেতনতা দরকার।
বাংলাদেশে সময়টা এখন নারীর। সত্যিকারার্থেই দেশে চলছে নারীর ক্ষমতায়ন। নারীর সংস্পর্শে বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম জীবনধারা। দেশের নারী সমাজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তারা বদলে দিচ্ছে দেশকেও। ক্ষমতায়ণের দিক থেকে নারীরা সবচেয়ে এগিয়ে গেছে।
যেমন- দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, সংসদ উপনেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা নারী এবং স্পিকারও নারী। বর্তমান সংসদে ২০ জন নারী সরাসরি নির্বাচনে সংসদ সদস্য রয়েছেন। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০ উন্নীত করা হয়েছে। এ গেল নারীর সরাসরি ক্ষমতায়ণের দিক।
ক্ষমতায়ণের অন্যদিকগুলো যেমন- সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনীতে সাহসিকতার সঙ্গে তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে।
এছাড়াও বিচারপতি, সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, নির্বাচন কমিশনার, রাষ্ট্রদূত, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা কাজ করে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তারা অনেক অবদান রাখছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে জানা যায়, দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশী। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত প্রায় ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৮২ হাজার ৫৫৮ জন নারী। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত গামেন্টস শিল্প। এ শিল্প খাতে শতকরা ৮০ ভাগ কর্মী নারী। সর্বোপরি দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহারকারীও নারী।
দেশের উন্নয়নে তারা সর্বত্র অবদান রাখছে। তেমনি তাদের জীবন মানেরও উন্নতি ঘটছে। পাশাপাশি তারা ক্ষমতায়ণে অগ্রসরমান। এক্ষেত্রে দেশের পাবর্ত্য এলাকা এবং উপকূলীয় এলাকাও পিছিয়ে নেই। নানাবিধ কারণে উল্লেখিত এলাকার মানুষেরা অনেকটা পশ্চাৎপদ। কিন্তু যুগ ও কালের পরিবর্তনে তারা দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে এখন অনেক দূর এগিয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় ১৭ জেলার নারীরা।
উপকূলীয় নারীরা একসময় ছিল নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তার ওপর ছিল ধর্মান্ধতা। তারা ঘরের বাইরে বেরোতে চাইতো না। দরজার চৌকাঠ না পেরোনো অনেক নারীকে জীবন-জগতের জ্ঞানের আলো স্পর্শ করেনি। বৈষয়িক দিক থেকেও তারা ছিল অনভিজ্ঞ। চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে ছিল একেবারে নির্বিকার। সেই উপকূলীয় নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। অর্থাৎ জেগে উঠেছে তারা। কৃষিখাতে অবদান রাখছে। এমনকি তারা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিতে কার্পণ্য করছে না। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রমের বিভিন্ন পরিকল্পনার অগ্রগতির ধারায় তারা অংশগ্রহণ করছে। এছাড়াও তারা ক্ষুদ্র শিল্প খাতে নানাভাবে অংশগ্রহণ করছে। এতে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতায়নের দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে।
উপকূলীয় লক্ষ্মীপুরের জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও জেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, উপকূলীয় এলাকায় নারী ক্ষমতায়ণে অনেক দূর এগিয়েছে। তারা নানাভাবে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। আগের মতো তাদের গোঁড়ামি নেই। তারা আগে ঘরের বাইরে যেতো না। এখন তারা ঘর থেকে বের হচ্ছে। যারা শিক্ষিত হচ্ছে তারা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এজন্য তারা ঋণও পাচ্ছে সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে। ফলে তাদের জীবন পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টে যাওয়ায় তারা আজ সমাজে অবহেলিত নয়। সমাজকে তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভান্বিত করছে। তবে কুটির শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারলে উপকূলীয় নারীরা আরো কাজের সুযোগ পাবে।
ভোলার বোরহান উদ্দিন উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহফুজা ইয়াসমিন বলেন, গত ৯-১০ বছরে উপকূলীয় জেলা ভোলায় নারীর ক্ষমতায়ণ অনেক বেড়েছে। মেয়েদের লেখাপড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় চারদিকে পানি আর পানি। এ ভূ-পরিবেশে নারীকে উঠিয়ে আনা কঠিন। কেননা, এখানে দারিদ্র্য, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, বাল্যবিয়ের মতো অভিশাপ রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্য থেকে নারীরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। তারা হাঁপ ছাড়তে পারছে। আর এসবের মূলে রয়েছে উপকূলীয় এলাকায় সরকারের পাইলট প্রকল্প। এসব প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে নারীরা বেশি সুবিধা পাচ্ছে। তাই নারীদের এখন হাটে-বাজারে, মাঠে-ঘাটে সব জায়গায় দেখা যায়। স্থানীয় সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে এ নারীরা। এটুআই প্রকল্পে তারা অংশগ্রহণ করতে পারছে। এ সুযোগ উপকূলীয় এলাকার দুর্গম এলাকায় পৌঁছে গেছে। তাছাড়া ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার প্রশিক্ষণে নারীরা সুযোগ বেশি পাচ্ছে। তবে গ্রামীণ তৃণমূলে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা এলে তখুনি নারীর ক্ষমতায়ণ প্রতিষ্ঠা পাবে। সরকারের সদিচ্ছার বর্হিপ্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন স্তরে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
নারী ক্ষমতায়ণে মধ্যবিত্তের চেয়ে দরিদ্র শ্রেণীর নারীরা বেশি এগিয়েছে- এমন মন্তব্য বরিশাল মহিলা পরিষদের নেত্রী রহিমা সুলতানা কাজলের। তিনি বলেন, দুর্গম চর এলাকায় নারীরা এখন ঘরে বসে থাকে না। তারা কৃষি কাজে অংশগ্রহণ করছে। এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা, ভিজিএফ ও ৪০ দিনে খাদ্য কর্মসূচিতে মেয়েরা সুবিধা পাচ্ছে। তাদের মধ্যে কোন স্থবিরতা নেই। তাদের কর্মসংস্থান বাড়ছে। তারা মোবাইল ব্যবহার করছে। যেখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই, সেখানে সোলার ব্যবহার করছে। আগে তারা ঘরে থেকে বের হতো না, এখন তারা স্থানীয় সরকারের সাথে জড়িত। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে সদস্যদের মধ্যে মেয়েদের বাধ্যতামূলক রাখা হচ্ছে। রহিমা সুলতানা বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, শিশু দিবস, মানবাধিকার দিবস সম্পর্কে শুধু শিক্ষিত মেয়েরা যে জানে তা নয়, নারী ক্ষমতায়ণের জোয়ারে এখন উপকূলীয় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অশিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত মেয়েরাও এসব দিবসের দিন তারিখ জানে।
নারী ক্ষমতায়নে ও নারী অধিকার বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন। পাশাপাশি নারী ক্ষমতায়ণে প্রসার ঘটায় জাতিসংঘের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করছে। বাংলাদেশ এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড, প্লানেট চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জ, শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা আনার স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কোর ‘শান্তিবৃক্ষ’সহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। আর এসব কারণে নারী ক্ষমতায়ণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের উপরে। এ তথ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’র। তাদের মতে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে।
নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের এ অর্জনের মূলে রয়েছে সরকারের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১। এ আইনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ণের পাশাপাশি সমাজে ও রাষ্ট্রে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার ওপর জাতীয় বাজেটে ২০০৯ সাল থেকে সরকার পর্যায়ক্রমে জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেট প্রণয়ন শুরু করে। এর মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয় নারীর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষমতায়ণ সুসংহত করতে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দও বেশি দেয়া হয়। আর এর সুফল সব নারীরা, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার নারীরা বেশি পেয়ে যাচ্ছে। কেননা, সরকার পশ্চাৎপদ ও দুর্গম এলাকার প্রতি বেশি নজর দিচ্ছে। তাই ওই সব এলাকায় নারীর জীবনমানের উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়ণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

