সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।২০০৯ সাল। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের বছর দুই পর দেশের উপকূলীয় এলাকায় আবার আঘাত হানে আইলা। এই ঘূর্ণিঝড়ও ক্ষতবিক্ষত করে উপকূলের বসতি-বনাঞ্চল। সে সময় ক্যামেরা কাঁধে পা রেখেছিলাম উপকূলীয় অঞ্চলে। মানুষের জীবন-জীবিকা ও দুর্দশার সাক্ষী হয়েছি। তখন থেকেই কাজের সূত্রে সাতক্ষীরা ও খুলনায় নিয়মিত আনাগোনা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম গাবুরা। দ্বীপ ইউনিয়ন হলেও মূল ভূখণ্ড থেকে দূরত্ব বেশি নয়। সুন্দরবনঘেঁষা জনবসতি বলেই এখানকার মানুষের জীবিকা নিবিড়ভাবে বন ও নদীর সঙ্গে যুক্ত। অধিকাংশ মানুষ মাছ ধরে, বন থেকে মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে। একসময় অনেকে চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে গত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গাবুরার জীবন, জীবিকা ও জীববৈচিত্র্যে বিস্তর পরিবর্তন হয়েছে।
‘দ্য লাস্ট সেভিংস অ্যাট বেঙ্গল ডেলটা’ শিরোনামের ছবিতে রুহুল আমিন শেখ ও ফাতেমা খাতুন
এই গাবুরার এক প্রান্তে রুহুল আমিন শেখ ও ফাতেমা খাতুনের সংসার। ক্যামেরা কাঁধে চলতে চলতেই তাঁদের সঙ্গে পরিচয়। দুজনের সন্তানেরা এখন বড় হয়েছে। আলাদা সংসার তাঁদের। ফাতেমা-রুহুল একাই থাকেন।
জোয়ারের পানি আসে ফাতেমা খাতুন ও রুহুল আমিনের উঠান পর্যন্ত। গোলপাতার ছাউনি দেওয়া তাঁদের কুঁড়েঘর। ঝড়ের বাতাস লাগলে দোলে। তখন ঘরের ভিতসহ অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে দুজন মানুষের। সিডর-আইলার ভয়, কখন না আবার সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও জলবায়ুর পরিবর্তন দেখছি। কীভাবে ঘটছে, ক্যামেরায় তা তুলেও রাখছি। ফাতেমা খাতুন, রুহুল আমিনেরা জানেন না, জলবায়ু পরিবর্তন কী? জানেন না, কেন প্রতিবছর বড় ঝড় এসে মিঠাপানির নদী ছাপিয়ে সমুদ্রের নোনাপানি সবকিছু ভাসিয়ে নোনতা করে দেয়।
করোনা মহামারির সময় লকডাউন ও বিধিনিষেধে রুহুল আমিনের মতো বনজীবীদের সুন্দরবনে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি। এদিকে দীর্ঘদিনের নোনাধরা মাটি ও বাতাসে না হয় কোনো ফসল, না হয় শাকসবজি। গত বছর যেমন তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখি, ঘরে সামান্য কিছু চাল (এক কেজিরও কম) আর কিছু আলু-পেঁয়াজ আছে, যা দিয়ে দুজন হয়তো দুবেলা খেতে পারবেন। তারপর?
তারপর কী হবে, তাঁরাও জানেন না। ফাতেমা খাতুন আর রুহুল আমিনের মতো গাবুরার অধিকাংশ মানুষের গল্পই এই। উপকূলীয় বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে যেন ক্ষুধা আর পানীয় জলের হাহাকার। শুধু গাবুরা থেকেই হাজার হাজার মানুষ জীবিকার আশায় ছুটে এসেছে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সঙ্গে সুখ—ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গাবুরাবাসীর জীবন থেকে। সেদিন ছবি দুটি তুলেছিলাম এই জনপদের মানুষদের কথা ভেবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস সবসময়ই নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশক এই জনপদের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের অধ্যায়। একসময় যে মানুষগুলোর পরিচয় ছিল গর্বিত কৃষক হিসেবে, যাদের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, আজ তারা অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিজেদের আদি পেশা ভুলতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলের মাটি ও পানিতে যে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে, তা শুধু পরিবেশকেই বিপন্ন করেনি; বরং উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার মানচিত্রে এক স্থায়ী ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এনেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। দিগন্তজোড়া আমন ধানের ক্ষেত ছিল এখানকার সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু গত ২৫ বছরে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ার ফলে ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যে জমিতে আগে বছরে দু-তিনবার ফসল ফলত, সেখানে এখন বছরের অধিকাংশ সময় লোনা পানি থৈ থৈ করে। ফলে হাজার হাজার কৃষক তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষি পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো শৌখিন পেশা বদল নয়, বরং এটি হলো সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি বা টিকে থাকার কৌশল। একজন কৃষক যখন দেখেন তার চোখের সামনে সোনার ফসল নোনা পানিতে জ্বলে যাচ্ছে, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
উপকূলীয় জীবিকা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকে পড়া। গত দুই দশকে এই অঞ্চলটি কার্যত চিংড়ি মহলে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সাদা সোনা বা হোয়াইট গোল্ড, কিন্তু এই সোনার পেছনের গল্পটি বেশ করুণ।
কৃষি জমিতে লোনা পানি আটকে চিংড়ি চাষ করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও এটি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন ঘটিয়েছে। কারণ, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে যে পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার চেয়ে অনেক কম শ্রমিকের দরকার পড়ে। ফলে কৃষিজমি যখন ঘেরে রূপান্তরিত হয়, তখন বিপুল সংখ্যক কৃষি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তাছাড়া, এই পেশাগত পরিবর্তনে এক ধরণের শ্রেণি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা ধনী ও বড় জমির মালিক, তারা চিংড়ি চাষ করে আরও ধনী হয়েছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক, যার অল্প জমি ছিল, তিনি লোনা পানির কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একসময়ের স্বাধীন কৃষক আজ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরের পাহারাদার বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। এই পেশাগত অবনমন বা ‘ডি-ক্লাসিফিকেশন’ উপকূলীয় সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের এই পালাবদলে যারা কাজ হারিয়েছেন, তারা কী করছেন? গত দুই দশকে উপকূলে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যা মূলত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া। কৃষিকাজ হারানো মানুষেরা এখন ভ্যান-রিকশা চালানো, ইজিবাইক চালনা, চায়ের দোকানদারি কিংবা ইটভাটায় শ্রম বিক্রির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।
বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বনজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ কিংবা নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা। লোনা পানির কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র বদলাচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যারা নদী বা বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন, তারাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২৪-এর রেমাল পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বহু মানুষ ত্রাণ নির্ভর হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের কর্মজীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন সংসারের হাল ধরতে নারীরাও ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হন। গত দুই দশকে চিংড়ির পোনা ধরা বা রেণু সংগ্রহ উপকূলীয় নারীদের অন্যতম প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোমর সমান লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে এই নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
লোনা পানির সংস্পর্শে তাদের চর্মরোগ, জরায়ু সংক্রমণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হচ্ছে। তবুও, অভাবের তাড়নায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ছাড়তে পারছেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা যেখানে বাড়ির আঙিনায় বা কৃষি কাজে সহায়তা করতেন, এখন তারা লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
যখন স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হন- এলাকা ত্যাগ করা। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এদের বড় একটি অংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু।
গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নিম্নবেতনের শ্রমিকে পরিণত হন। খুলনা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ সাতক্ষীরা, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের শুধু ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন উপকূলের জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রামে এখন কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা কমছে, পড়ে থাকছে শুধু বৃদ্ধ ও শিশুরা।
২০০০ থেকে ২০২৫—এই পঁচিশ বছরে উপকূলের মানুষের জীবিকার ধরণ যেভাবে বদলেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করা উচিত। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ এবং তার ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সংকট যদি এখনই মোকাবিলা করা না যায়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে জনশূন্য লোনা মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা। প্রথমত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে এমন শস্য ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, যাতে কৃষকরা আবার তাদের মূল পেশায় ফিরতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে লোনা পানি প্রবেশ না করে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় যুবকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কৃষি বা চিংড়ির বাইরেও সম্মানজনক পেশা গড়তে পারে। সর্বোপরি, সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
লবণাক্ততা আজ উপকূলের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এই নিয়তির কাছে হার মানলে চলবে না। কৃষকের লাঙল হয়তো আর আগের মতো চলবে না, কিন্তু তাদের কর্মঠ হাতগুলোকে কর্মহীন রাখা যাবে না। উপকূলের মানুষের জীবিকা রক্ষা মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা।চুনকুড়ি নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরছেন শান্তি রানী মণ্ডল। আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস এই সংগ্রামী নারীর।
সুন্দরবন উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় জনপদে প্রতিনিয়ত জীবিকার জন্য যুদ্ধ করছেন হতদরিদ্র মানুষ। নদী থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরে, ইটের ভাটায় কাজ করে চলে এসব মানুষের সংসার।
শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, গাবুরা, রমজাননগর, কৈখালী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নগুলো মূলত সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদ। মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চুনকুড়ি নদীর তীরে চুনকুড়ি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস শান্তি রানী মণ্ডলের। চুনকুড়ি নদীতে জাল ফেলে হরিণা চিংড়ি, বেলেসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ধরেন তিনি। গ্রামে-গঞ্জে বিক্রির টাকা দিয়েই চলে সংসার।
একই ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল জলিল এই প্রতিবেদককে, জানান শান্তি রানী খুব অসহায়। নদীতে মাছ ধরেই সংসার চলে এই সংগ্রামী নারীর। বসবাস করেন চুনকুড়ি নদীর তীরে আশ্রয়কেন্দ্রে। ছোট হরিণা চিংড়ি, বেলে মাছসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ ধরার পর গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন।
সেখান থেকে ৫০-১০০ টাকা বা ১২০ টাকা রোজগার হয়। সেই টাকায় চাল-ডাল তরকারি কিনে সংসার চালান। এছাড়াও এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
উপকূলের পাঁচটি ইউনিয়নে ১৫ হাজার ৯৭৬টি পরিবার রয়েছে একেবারেই হতদরিদ্র। যাদের মাসিক আয় সাত হাজার টাকার নিচে।
উপকুলীয় পাঁচটি ইউনিয়নের হতদরিদ্রদের নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি এনজিও সংস্থা নওয়াবেকী গনমূখী ফাউন্ডেশন (এনজিএফ)। 'পাথওয়েস টু প্রোসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল (পিপিইপিপি) প্রকল্পের আওতায় পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশানের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে সংস্থাটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে তালিকা প্রণয়ন করেছে।
সন্ধ্যার আগে কাঠের বোঝা মাথায় ও হাতে মাছ কিনে নিয়ে ঘরে ফিরছেন এক দিনমজুর।
তালিকায় পদ্মপুকুর ইউনিয়নে ২৩৯৫টি, গাবুরা ইউনিয়নে ৪০১৭টি, রমজাননগর ইউনিয়নে ২৫৬০টি, কৈখালী ইউনিয়নে ২৭১৯টি ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে ৪২৮৫টি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব পরিবারের মাসিক আয় সাত হাজার টাকারও নিচে ও তারা দিনমজুর শেণির।
প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার (কমিউনিটি মবিলাইজেশান) অভিজিৎ নন্দী বলেন, 'পাঁচটি ক্যাটাগরিতে এই জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ২০ শতকের নিচে জায়গা, সাত হাজারের নিচে মাসিক আয়, মাসিক মাথাপিছু আয় ১৮১৫ টাকা, প্রতিবন্ধি ব্যক্তি, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা- এই পাঁচ ক্যাটাগরির মধ্যে তিনটি ক্যাটাগরি মিলে গেলে সেই পরিবারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।'
বিষণ্ন মনে উপকূলে দাঁড়িয়ে এক শিশু।
'উপকূলীয় জনপদের পদ্মপুকুর, গাবুরা, রমজাননগর, কৈখালী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে ১৫৯৭৬টি পরিবারগুলোকে বাছাই করা হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা থেকে সামান্য কিছু বাদ যেতে পারে, যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া চলছে। এ সকল পরিবারের জীবিকা প্রধান উৎস দিনমজুর। এসব পরিবারকে সহায়তার জন্য আমরা ছয়টি কমপোনেন্ট নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, প্রকল্পটি সুবিধাভোগীদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।'বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস সবসময়ই নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশক এ জনপদের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের অধ্যায়। এক সময় যে মানুষগুলোর পরিচয় ছিল গর্বিত কৃষক হিসেবে, যাদের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, আজ তারা অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিজেদের আদি পেশা ভুলতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলের মাটি ও পানিতে যে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে, তা কেবল পরিবেশকেই বিপন্ন করেনি; বরং উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার মানচিত্রে এক স্থায়ী ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এনেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। দিগন্তজোড়া আমন ধানের খেত ছিল এখানকার সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু গত ২৫ বছরে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ার ফলে ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যে জমিতে আগে বছরে দু-তিনবার ফসল ফলত, সেখানে এখন বছরের অধিকাংশ সময় লোনা পানি থৈ থৈ করে। ফলে হাজার হাজার কৃষক তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষি পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো শৌখিন পেশা বদল নয়, বরং এটি হলো সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি বা টিকে থাকার কৌশল। একজন কৃষক যখন দেখেন তার চোখের সামনে সোনার ফসল নোনা পানিতে জ্বলে যাচ্ছে, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
উপকূলীয় জীবিকা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকে পড়া। গত দুই দশকে এই অঞ্চলটি কার্যত চিংড়ি মহলে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সাদা স্বর্ণ বা হোয়াইট গোল্ড, কিন্তু এই স্বর্ণের পেছনের গল্পটি বেশ করুণ।
কৃষি জমিতে লোনা পানি আটকে চিংড়ি চাষ করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও এটি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন ঘটিয়েছে। কারণ, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে যে পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার চেয়ে অনেক কম শ্রমিকের দরকার পড়ে। ফলে কৃষিজমি যখন ঘেরে রূপান্তরিত হয়, তখন বিপুলসংখ্যক কৃষি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তা ছাড়া, এই পেশাগত পরিবর্তনে এক ধরনের শ্রেণি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা ধনী ও বড় জমির মালিক, তারা চিংড়ি চাষ করে আরও ধনী হয়েছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক, যার অল্প জমি ছিল, তিনি লোনা পানির কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একসময়ের স্বাধীন কৃষক আজ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরের পাহারাদার বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। এই পেশাগত অবনমন বা ‘ডি-ক্লাসিফিকেশন’ উপকূলীয় সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের এই পালাবদলে যারা কাজ হারিয়েছেন, তারা কী করছেন? গত দুই দশকে উপকূলে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যা মূলত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া। কৃষিকাজ হারানো মানুষেরা এখন ভ্যান-রিকশা চালানো, ইজিবাইক চালনো, চায়ের দোকানদারি কিংবা ইটভাটায় শ্রম বিক্রির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।
বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বনজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ কিংবা নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা। লোনা পানির কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র বদলাচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যারা নদী বা বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন, তারাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২৪-এর রেমাল পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বহু মানুষ ত্রাণ নির্ভর হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের কর্মজীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন সংসারের হাল ধরতে নারীরাও ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হন। গত দুই দশকে চিংড়ির পোনা ধরা বা রেণু সংগ্রহ উপকূলীয় নারীদের অন্যতম প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোমর সমান লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে দিনের পরদিন চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে এই নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। লোনা পানির সংস্পর্শে তাদের চর্মরোগ, জরায়ু সংক্রমণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। তবুও, অভাবের তাড়নায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ছাড়তে পারছেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা যেখানে বাড়ির আঙিনায় বা কৃষি কাজে সহায়তা করতেন, এখন তারা লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
যখন স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হনÑ এলাকা ত্যাগ করা। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এদের বড় একটি অংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু।
গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নি¤œবেতনের শ্রমিকে পরিণত হন। খুলনা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ সাতক্ষীরা, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন উপকূলের জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রামে এখন কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা কমছে, পড়ে থাকছে কেবল বৃদ্ধ ও শিশুরা।
২০০০-২০২৫ এই পঁচিশ বছরে উপকূলের মানুষের জীবিকার ধরন যেভাবে বদলেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করা উচিত। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ এবং তার ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সংকট যদি এখনই মোকাবিলা করা না যায়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে জনশূন্য লোনা মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা। প্রথমত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে এমন শস্য ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, যাতে কৃষকরা আবার তাদের মূল পেশায় ফিরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে লোনা পানি প্রবেশ না করে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় যুবকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কৃষি বা চিংড়ির বাইরেও সম্মানজনক পেশা গড়তে পারে। সর্বোপরি, সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
লবণাক্ততা আজ উপকূলের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এই নিয়তির কাছে হার মানলে চলবে না। কৃষকের লাঙল হয়তো আর আগের মতো চলবে না, কিন্তু তাদের কর্মঠ হাতগুলোকে কর্মহীন রাখা যাবে না। উপকূলের মানুষের জীবিকা রক্ষা মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা।বাংলাদেশে সমুদ্র উপকূলের মোট দৈর্ঘ্য ৭১১ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, জোয়ার-ভাটাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাভাবিক ঘটনা। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমাগত বেড়ে চলছে। এসব দুর্যোগের কবল থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে বেড়িবাঁধ এবং বনায়নের মাধ্যমে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার কথা অনেকবার শোনা গেছে। তবে ৩-৪ দশক আগের বেড়িবাঁধ নানা দুর্যোগে ভেঙে গেছে। আবার অসাধু ব্যক্তিরা বনায়নের গাছ কেটে চিংড়িঘের তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে উপকূল বরাবর অরক্ষিত। ১৯৬৬ সাল থেকে আমাদের ম্যানগ্রোভ বনায়ন শুরু। দক্ষিণ এবং পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলকে জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূলীয় ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর মূলত উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কারণ হচ্ছে, বেড়িবাঁধের সম্মুখে অবস্থিত ঢাল বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ থেকে রক্ষা এবং উপকূলবর্তী এলাকাসমূহের
কৃষিজমি ও জানমাল রক্ষা করে। উপকূলবতী এলাকাসমূহে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রচলিত নিয়মে সারিবদ্ধভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৃক্ষরোপণ করেও যেখানে জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বরং উপকূলরেখার সম্মুখ অংশে ব্যাপক বনায়নের মাধ্যমে তা প্রতিরোধ সম্ভব হতো, কিন্তু হয়নি।
বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উপকূলীয় বেষ্টনীর ৫০ শতাংশের বেশি সুশোভিত ঝাউবন উজাড় হওয়ার কথা গণমাধ্যমে এসেছে অনেকবার। কিন্তু অসৎ কাঠ ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, বনদস্যুদের নির্বিচারে গাছ কাটা, যথেচ্ছ ও অপরিকল্পিত চিংড়িঘের, লবণ চাষ এবং শিপব্রেকিং ইয়ার্ড তৈরি রোধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়নি। এমনকি বনদস্যুদের সঙ্গে নির্বিচারে বনজঙ্গল ধ্বংস তা-বে কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্ট থাকার কথা অনেকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। যে কারণে বরগুনার প্রমত্ত বিষখালী নদী বারবার ছিনিয়ে নিয়েছে মানুষের আশ্রয়, স্বপ্ন, হাসি। সিডর ও সিডর-পরবর্তী সময়ে বিষখালীর ভাঙনে অনেকবার এলাকার মানুষ হারিয়েছেন ঘর, গাছের ছায়া, উঠানের মাটি। এমনকি স্মৃতির ঠিকানা। তবু তারা হার মানেননি, হার মানেন না। শুধু বরগুনা নয়, এমনই উপকূলবাসীর চিত্র। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বরগুনাসহ উপকূলে আঘাত হেনেছিল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর। গতকাল ছিল সেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ১৮ বছর পূর্তি। ১৮ বছর পর এসেও সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতি মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন উপকূলবর্তী মানুষ। কিন্তু তারা হার মানেন না। আবার জোটবদ্ধ হয়ে স্বপ্ন দেখেন, গভীর প্রত্যয়ে নতুন করে বাঁচার। দেশের জন্য এ এক নির্দয় উপহাস।
আমরা রাজনীতি করি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা নিশ্চিতের জন্য। সেখানে নিজস্ব বিত্তবৈভব নিয়ে মগ্ন থাকি। এ যেন সেই মঙ্গোলীয় শোষণ। আর ব্রিটিশের শোষণ-শাসন, পাকিস্তানিদের শোষণ-শাসন ভেঙে আমরা স্বাধীন হলাম প্রশ্ন আসে, কী পেল জনগণ? দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। তাদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে মাছ, কৃষি, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। কিন্তু জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড় সবকিছু ল-ভ- করে দেয়। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে তেমন কোনো দায়িত্ববোধ কোনো সরকার দেখায়নি। কেন এমনটি হয়েছে, তা অজানা। রাজনীতি মূলত কোন ধরনের মানুষের কথা বলে? চিন্তা থমকে যায় এই ভেবে আমাদের রাজনীতি শোষক না শোষিতের পক্ষে? আর উপকূ লবাসী কোন পক্ষে যাবে! সরকার নিশ্চয়ই তাদের কথা ভাবে। প্রত্যাশা থাকল, অচিরেই তারা নিশ্চিত জীবনযাপন পাবেন। কান্না, দুর্ভাবনা, হতাশা আর ভাঙনের ধ্বনি কাড়বে না স্বপ্ন ও সুন্দর জীবনের পথচলা।বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল যেমন—খুলনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ভোলা, কক্সবাজার প্রভৃতি জেলা আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যের অন্যতম নিদর্শন। কিন্তু এ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জীবিকার টানাপোড়েন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। এ অঞ্চলের মানুষ বছরের অনেকটা সময় কাটান ঝুঁকির মধ্যে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বন্যা যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। কখনো ‘সিডর’ কখনো ‘আইলা’ আবার কখনো ‘আম্পান’ এসে ভেঙে দেয় তাদের বসতভিটা, মারা যায় অনেক মানুষ, জীবজন্তু, পশুপাখি, মাছ।
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত