
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মহামারি করোনার কারণে সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষিদের যেন দুর্দিন কাটছে না। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে নদী ভাঙ্গনে মাছের ঘের প্লাবিত হওয়ায় চিংড়ির সাতক্ষীরার চাষিদের কপালে উঠেছে চিন্তার ভাঁজ। ঠিক সেই সময় উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে আধা নিবিড় পদ্ধতি।
সাতক্ষীরার উপকূলী শ্যামনগর উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চলতি বছর আধা-নিবিড় (সেমি ইনটেনসিভ) পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করে সফল হয়েছেন ওই এলাকার চিংড়ি চাষিরা। সাধারণ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করে যে উৎপাদন হয়, তার চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বেশি চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে আধা নিবিড় পদ্ধতিতে বলে জানান মৎস্য চাষিরা।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, পাঁচ বছরে জেলায় রপ্তানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ১৪৬ টন। এর মধ্যে বাগদা চিংড়ি এক লাখ ১৮ হাজার ৩০৮ টন। গলদা চিংড়ির পরিমাণ ৩৩ হাজার ৮৩৭ টনের মতো। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২৫ হাজার ৩৫৪ টন বাগদা ও ৬ হাজার ৩৪ টন গলদা চিংড়ি। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৪৮৫ টন বাগদা ও ৬ হাজার ১০৬ টন গলদা, ২০১৭-১৮ বাগদা ২০ হাজার ৯৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫২৫ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাগদা ২১ হাজার ৪৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫৪২ টন এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৮৭ টন বাগদা ও ৮ হাজার ৬৩০ টনের মতো চিংড়ি উৎপাদন হয়। উৎপাদিত এসব চিংড়ির রপ্তানিমূল্য ৭ হাজার ৬০৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জেলায় বছরে প্রায় ৬০ হাজার নিবন্ধিত ঘেরে চিংড়ি চাষ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জেলার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের ২৫ জন চিংড়ি চাষি আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করে সফল হয়েছেন। কমিউনিটি বেজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ অ্যান্ড একুয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ, মৎস্য অধিদপ্তর, জাতিসংঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার যৌথ এক প্রকল্পের মাধ্যমে উৎসাহিত হয়ে এ চাষে মনোনিবেশ করেন তারা। এ পদ্ধতিতে একটি এক বিঘা মৎস্য ঘেরে প্রায় ১২ হাজার চিংড়ি পোনা ছাড়া যায়। যা প্রায় ৪ মাসের মাথায় বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। গত বছ
বাংলাদেশ একটি অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এদেশে রয়েছে সামুদ্রিক খাবারজাত শিল্পের জন্য অসাধারণ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ৭১০ কি.মি উপকূলীয় অঞ্চল। লোনা পানির চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের জন্য যথাযথ পরিবেশ। বাংলাদেশের আরোহিত মৎস্য সম্পদের প্রায় ৮০ভাগ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে আছে ২৮ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৮৭ প্রজাতির মাছ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি কৃষি। মৎস্যচাষ কৃষি খাতের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনায় একটি খাত। রপ্তানি খাতের মধ্যে চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী রপ্তানি পণ্য। দেশের মোট উৎপাদিত চিংড়ির বেশিরভাগই উৎপাদিত হয় দেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং কক্সবাজার এলাকায়। হিমায়িত চিংড়ি বাংলাদেশের একটি শতভাগ কৃষিভিত্তিক ও রপ্তানীমুখী শিল্পখাত। সারাদেশের গ্রামগঞ্জের প্রায় দেড় কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ি ও মাছ উৎপাদন, বিপনন, প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানীতে নিয়োজিত রয়েছে। হিমায়িত খাদ্য দেশের রপ্তানী বাণিজ্যে অত্যন্ত পুরোনো একটি খাত। নানা চড়াই উৎরাই অতিক্রম করে দীর্ঘ প্রায় পাঁচদশক ধরে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আসছে। বর্তমানে চিংড়ি রপ্তানি করে যে আয় তার পরিমাণ জাতীয় আয়ের শতকরা প্রায় ৭.৮ ভাগ। রপ্তানি আয়ে চিংড়ির অবদান প্রায় ৮.৫ভাগ।
খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন পাইকগাছায় নোনা পানির চিংড়ি চাষ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। মৎস্য চাষি ঘের মালিক ও জমি মালিকরা অবস্থান নিয়েছেন লবণ পানিতে চিংড়ি চাষের পক্ষে। অন্যদিকে মিষ্টি পানিতে ধান ও মাছ চাষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অপর একটি পক্ষ। এ মতবিরোধে চিংড়ি চাষি সমিতি লবণ পানিতে চিংড়ি চাষের করার পক্ষে সভা-সমাবেশ করেছে। অপর পক্ষ মিষ্টিপানিতে ধান চাষ ও মাছ চাষের পক্ষে সভা-সমাবেশ করেছে। বড় একটি অংশ চায় নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ অব্যাহত থাকুক। অন্যদিকে কিছু লোক নোনা পানির চিংড়ি চাষ চাচ্ছে না, তারা নোনামুক্ত কৃষিকাজের পরিবেশ চায়। তবে তারা উল্লেখযোগ্য কোন চাষাবাদের সাথে জড়িত নহে। তারাই চাচ্ছে নোনামুক্ত মিষ্টি পানিতে ধান ও মাছ চাষ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইকগাছায় প্রায় চার দশক লবন পানিতে চিংড়িসহ মৎস্য চাষ করা হচ্ছে। এ এলাকা লবন পানি অধ্যাশিত। তাই নিচু এলাকাকে চিংড়ি চাষের জোন তৈরি করতে হবে। আর যে বিলের জমি মিষ্টি পানিতে ধান চাষ করার উপযোগী সে সকল জমিতে পর্যায়ক্রমে লবণ পানি উঠানো বন্ধ করে ধান ও মাছ চাষের আওতায় আনতে হবে। তার আগে টেকসই বেড়ীবাধ নির্মাণ, স্লুইস গেট ও পানি নিস্কাশনের খাল খনন করে ধান চাষের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
চিংড়ি চাষ বলতে প্রধানত উপকূলীয় এলাকায় বাগদা চিংড়ির চাষকেই বোঝায়। যেখানে জোয়ার ভাটার প্রভাব রয়েছে সে এলাকা একক চিংড়ি চাষের জন্য উপযোগী। খুলনা জেলার চিংড়ি খামার গুলোর অধিকাংশই উপকূলীয় বাঁধের ভিতরে অবস্থিত। এগুলি এককভাবে চিংড়ি চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। খামারকে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে বেষ্টনী বাঁধের ব্যবস্থা রাখা। বেষ্টনী বাঁধ সাধারণত ২-৩ মিটার উঁচু হয়, যেন সর্বোচ্চ জোয়ারের সময় ও বাঁধের ওপর দিয়ে পুকুরে পানি ঢুকতে না পারে। এছাড়া খামারে পানি ও চিংড়ির পোনা ঢুকানোর জন্য হেড ক্যানেল ব্যবস্থা থাকে। প্রকল্প থেকে প্রয়োজনে পানি নিষ্কাশনের জন্য ফিডার ক্যানেল থাকে। অনেক সময় অভ্যন্তরীণ বাঁধ নির্মাণ করে খামারে পোনা প্রতিপালনের জন্য ছোট ছোট নার্সারি পুকুর তৈরি করা হয়। খামারের প্রতিটি পুকুরে সঠিক মাত্রায় পানির গভীরতা বহাল রাখতে স্লুইস গেট এর ব্যবস্থা থাকে। স্লুইস গেট চিংড়ি খামারের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। বড় আকৃতির প্রধান স্লুইস গেট ফিডার ক্যানেলের মুখে বসাতে হয়। অল্প ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার জন্য সাধারণত কাঠের গেট ব্যাবহার করা হয়। শীতকালে ঘেরের ভিতর জোয়ারে লোনা পানি ঢুকিয়ে চিংড়ি চাষ করা হয়। জোয়ারের পানির সঙ্গে চিংড়ির লার্ভা ও অন্যান্য লোনা পানির মাছের পোনা প্রবেশ করে। বর্ষার শুরুতে জুন-জুলাই মাসে চিংড়ি ধরে নেওয়া হয়। বর্ষার আগে চিংড়ি আহরণ করে একই ঘেরে মিষ্টি পানিতে ধান ও অন্য মাছ চাষ করা হয়। উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীতে বছরের প্রায় সাড়ে ৬ মাস মিষ্টি পানির প্রবাহ ও বাকী প্রায় সাড়ে ৫ মাস লোনা পানির জোয়ার ভাটার প্রবাহ থাকে।
১৯৮০র দশক থেকে উপকূলীয় এলাকার মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায় হিসেবে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। আবার ৮০’র দশক থেকেই বাড়তে শুরু করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও জলোচ্ছ্বাস। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘনঘন শক্তিশালী সাইক্লোনের আঘাত হানা, প্রচন্ড জলোচ্ছ্বাস ও চরম তাপমাত্রার মতো নানান জলবায়ু বিপদ কবলিত হয় দেশর উপকূল। এতে প্রতিনিয়ত নদীর কূল উপচে ফসলি জমিতে অনুপ্রবেশ শুরু করে নোনা পানি। নষ্ট হতে থাকে ক্ষেতের ফসল। উপকূলের লাখো চাষি ধান ক্ষেত লোনা পানিতে প্লাবিত করে। বিকল্প হিসেবে এসব ছোটবড় পুকুর বা ঘেরে ব্ল্যাক টাইগার প্রন প্রজাতির চিংড়ি চাষ শুরু করেন। এতে সমর্থন দিয়েছিল তৎকালীন সরকারও। কৃষকেরা যেহেতু লোনা পানি ঠেকাতে পারছেন না, ফসলের ক্ষতি মাঝেমধ্যেই হচ্ছে তাহলে লোনা পানিতে ক্ষেত ডুবিয়ে তাতে চিংড়ি চাষ করলে বরং বাড়তি দুই পয়সা রোজগার হবে। এই কৌশল একটা পর্যায় পর্যন্ত কাজেও এসেছিল। এসময় রপ্তানি বাজারে সফল হয়ে বাংলাদেশে সাদা সোনা খ্যাতিলাভ করে চিংড়ি চাষ। সরকারিভাবে চিংড়িকে রপ্তানির সম্ভাবনায় ভরপুর এক পণ্য হিসেবেও দেখা হয়। বেসরকারি সহায়তা সংস্থাগুলো ধান চাষ থেকে চিংড়ি চাষের রুপান্তরকে জলবায়ু সহনশীলতা তৈরির বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান হিসেবে প্রশংসা করে। এভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার একর জমিকে চিংড়ি চাষের আওতায় আনা হয়।
স্বাধীনতার পর মাত্র ২.৩৮ কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি শুরু হয়। তার ধারাবাহিকতায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে শুধুমাত্র হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে ৩,৭৬৮ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। ২০২৩-২৪ অর্থ বছর পর্যন্ত ৫,০০০ কোটি টাকার উপরে রপ্তানি আয় উন্নীত করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে হিমায়িত মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করে আসছে। আমদানিকারক দেশসমূহের মধ্যে-ইউনাইটেড কিংডম (গ্রেট ব্রিটেন), নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ষ্পেন, গ্রিস, সাইপ্রাস, পর্তুগাল, রাশিয়া, ইউএসএ, জাপান, চায়না, সৌদি-আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারত অন্যতম।
বিশ্বের সর্বত্র বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সকল প্রকার প্রাকৃতিক আমিষ জাতীয় উপাদানের মধ্যে চিংড়ি হচ্ছ একটি অত্যন্ত মূল্যবান উপাদেয় খাদ্য। বিশ্বের চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বাংলাদেশ চিংড়ি সম্পদে খুবই সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে চিংড়ি একটি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিংড়ি চাষের সম্ভাবনা অতি উজ্জ্বল। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পোশাক শিল্পের পরেই চিংড়ির স্থান। চিংড়ি চাষে কাঁচামাল, চিংড়ির পোনা এ দেশের প্রাকৃতিক উৎস হতে সহজেই পাওয়া যায়। চিংড়ি চাষ বর্তমানে একটি শিল্প হিসেবে চিহ্নিত। এ শিল্পে স্বল্প ব্যয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, দিঘি এবং দেশের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরের ৪৮০ কি.মি. তটরেখা বরাবর ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক এলাকাসমূহে চিংড়ি চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানীয় কৌশলে প্রায় অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চিংড়ি চাষ হয়ে আসছে। উৎপাদনের উপকরণ খরচ, জমির ইজারা মূল্য, শ্রমিকের মজুরি এবং পোনার কম মূল্য, অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে মাটি ও পানির গুণগত মান, বাজারে আকর্ষণীয় মূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভজনক বিধায় বাংলাদেশের চিংড়ি চাষের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল।
বর্তমানে বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১,৪০,০০০ হেক্টর জমিতে চিংড়ির চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা অঞ্চলে ১,১০,০০০ হেক্টর ও কক্সবাজার অঞ্চলে ৩০,০০০ হেক্টর। এছাড়াও দেশের ১৬টি জেলায় প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমি গলদা চিংড়ি চাষের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের মিঠা পানিতে বিশেষ করে ধানক্ষেতে গলদা চিংড়ি চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এদেশের শুধুমাত্র চিংড়ির পোনা ধরার কাজেই জড়িত আছে ২-৫ লাখ লোক। তাছাড়া চিংড়ি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজে প্রায় দেড় থেকে ২ লাখ লোক জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশে চিংড়ি চাষ প্রধানতঃ প্রচলিত ও আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে হচ্ছে। যার শতকরা ৭৫ শতাংশ জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে এবং উৎপাদন হার হলো প্রতি হেক্টরে ২০০-২৫০ কেজি। বাংলাদেশের বিশাল চিংড়ি চাষ এলাকায় আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ, সুষ্ঠু পরিকল্পনা, চাষ পদ্ধতির সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক চাষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চিংড়ি উৎপাদন অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে স্বাদু পানি, হালকা লবণাক্ত ও সামুদ্রিক লোনা পানিতে প্রায় ৬৭ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া যায়। তবে গলদা চিংড়ি স্বাদু পানিতে চাষযোগ্য। যেহেতু মিঠা পানির চিংড়ি বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ জলাশয় যেমন-পুকুর, ডোবা, দিঘি, খাল, বিল, নদ-নদীতে এবং লোনা পানির চিংড়ি সাগরের লোনা পানি, ম্যানগ্রোভ এলাকা ও উপকূলীয় জলাশয়ের লবণাক্ত পানিতে পাওয়া যায়। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন যা বাংলাদেশে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা জুড়ে অবস্থিত। এটি চিংড়ির একটি প্রাকৃতিক বিরাট আবাসস্থল।
১৯৮০র দশক থেকে উন্নয়ন সংস্থাগুলো উপকূলীয় এলাকার মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায় হিসেবে চিংড়ি চাষকে উৎসাহিত করেছে। অথচ বিগত বহুবছর যাবৎ চিংড়ি চাষযোগ্য এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়নি। ভরাটকৃত খাল-বিল পুনঃখনন, বেড়িবাঁধ নির্মাণে কোন কাজ হয়নি। বেড়িবাঁধ ভাঙলে মেরামত করা হয়। এর সামাজিক উদ্বেগগুলিকে তারা পরোয়া করেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শিল্প থেকে সিংহভাগ আয়ের সুবিধা পাচ্ছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও ধনী জমি মালিকেরা। দারিদ্র্য দূরীকরণে খুব সামান্যই অবদান যোগ হয়েছে।
বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল একটি দেশ। লোনাপানিতে মৎস্য সম্পদ চাষ অর্থনীতিতে অবদানও রাখছে। চিংড়ি বাংলাদেশের একটি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। আমাদের দেশের অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর এবং বিশাল উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে চিংড়ি চাষের বিপুল সম্ভাবনা। এদেশের জলাশয়ে রয়েছে ৬৭টি প্রজাতির চিংড়ি। তবে প্রধানত গলদা ও বাগদা এই দুইটি প্রজাতির চিংড়িই চাষ হয়ে থাকে। গলদা মিঠাপানির পুকুর-দিঘীতে আর বাগদা উপকূলীয় এলাকায় চাষ হয়ে থাকে। চিংড়ি বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য। তাই চিংড়ি চাষে এদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রক্রিয়াজাতকৃত হিমায়িত চিংড়ি ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি শিল্প খাত আজ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। বর্তমানে এ খাতের অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত বাগদা ও গলদা চিংড়ি দেশের স্থানীয় বাজারের সাথে অসম প্রতিযোগীতায় পড়েছে। বর্তমানে হ্যাচারিগুলোতে যে বাগদা চিংড়ির পোনা পাওয়া যায় তার অধিকাংশই সংক্রামক যুক্ত, ফলশ্রুতিতে চাষাবাদের সময় অধিকাংশ পোনা মারা যায়। বিগত বহুবছর যাবৎ চিংড়ি চাষযোগ্য এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন যথাঃ ভরাটকৃত খাল-বিল পুনঃখনন, বাঁধ নির্মাণ, চিংড়ি চাষের ঘের খনন, বিদ্যুৎ সংযোগ ইত্যাদি তেমন কাজ পরিকল্পিত ও কাক্সিক্ষত মাত্রায় হয়নি। যা চিংড়ি চাষ বৃদ্ধি করার জন্য একান্ত আবশ্যক। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট উপকূলীয় এই তিন জেলায় বসবাসকারী মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস লোনা পানিতে মৎস্য চাষ। বঙ্গোপসাগরের খুবই কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় উক্ত এলাকায় বছরের অধিকাংশ সময়ে লোনা পানির আধিক্য দেখা যায়। বর্ষা মৌসুমে মাটির লবনাক্ততার তীব্রতা একটু কমলেও লোনার যে প্রকোপ থাকে তাতে মিঠা পানির মাছ বা ফসল ফলানো খুবই দুরূহ। সেকারণে এই এলাকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস হরেক প্রজাতির লোনা পানির চিংড়ি চাষ। বাগদা ও হরিনা চিংড়ি, যার মধ্যে অন্যতম। দ্রুত বর্ধনশীল ও অধিক লাভজনক এই চিংড়ি চাষের ফলে একদিকে যেমন দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয় অন্যদিকে সরকারের কোষাগারে জমা পড়ে বিপুল পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা। সুস্বাদু এই চিংড়ির বাইরের দেশগুলোতে যথেষ্ট কদর রয়েছে। সেকারণে চিংড়ি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চিংড়ি থেকে মোট আয়ের শতকরা ৫০ ভাগ আসে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে চাষকৃত চিংড়ি থেকে। ঐ অঞ্চলের লোনা পানিতে চাষকৃত বাগদা ও হরিণা চিংড়ি স্বাদে খুবই সুস্বাদু এবং প্রোটিন ও আয়োডিন সমৃদ্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিসরে দক্ষিণবঙ্গের চিংড়ির বেশ সুনাম আছে। সেজন্য দেশের পরিমন্ডলে প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। এর ফলে দেশীয় অর্থনীতি যেমন চাঙ্গা হচ্ছে পাশাপাশি সরকারের কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রা যোগানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবদান রাখছে চিংড়ি। তাই সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম অর্থকারী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ি চাষ প্রকল্প। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য কিছু অনাকাঙ্খিত কারণে চিংড়ি রপ্তানিতে কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও চলতি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে তা অনেক কমে গেছে। যেখানে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি থেকে দেশের কোষাগারে জমা পড়েছে ৪০ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার, দেশীয় টাকার অংকে যেটা ৪ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার সমতুল, সেখানে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই খাতে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ৫০ কোটি ডলার ধরা হলেও অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বরে চিংড়ি রপ্তানি খাতে আয় ৩১.৪৭ শতাংশ কমেছে। রপ্তানিকারকদের তথ্যমতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশি চিংড়ির দুই বড় বাজার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে চিংড়ির চাহিদা কমে গেছে। ফলে চিংড়ি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যে কারণে মানভেদে প্রতি কেজি চিংড়ির দাম ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। পক্ষান্তরে চিংড়ি বা খাদ্যের দাম বেড়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা কমে যাওয়া অন্যদিকে চিংড়ির খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিরা চিংড়ির নায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
প্রান্তিক পর্যায়ের চিংড়ি চাষিদের দাবি ‘পূর্বের তুলনায় চিংড়ির উৎপাদন খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে’, আবার চিংড়ির বাজারদর কমে প্রায় অর্ধেক হয়েছে। এতে করে সবদিক থেকে তারা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে চিংড়ির পোনা ও চিংড়ি খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে বলেও চিংড়ি চাষিরা দাবি করেছে। যেমন, এক বছর আগেও প্রতি বস্তা (৩৪ কেজি) গমের ভুসি ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ১ হাজার ৯০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এক বছরের ব্যবধানে ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা পালিশ কুঁড়ার দাম ৬০০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ২৫ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ফিশ ফিড ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা সয়াবিন খইল ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৭১০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। চিংড়ি চাষি তথা ঘেরমালিকদের দাবি, একদিকে তাদের বেশি দামে চিংড়ির খাদ্য কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে চিংড়ি বিক্রির সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। তার ওপর বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভাইরাসসহ চিংড়ির নানা ধরণের রোগব্যাধির কারণে মাত্রারিক্ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বারবার ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার কারণে চিংড়ি চাষিরা চিংড়ি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় চিংড়ির কদর কমে যাওয়ার নানাবিধ কারণ থাকলেও চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করে ওজন বাড়ানোর বিষয়টিকে অনেকে দায়ী করছে। এই অপদ্রব্য পুশের ব্যাপারে একটু বিস্তারিত বলতে চাই। দক্ষিণবঙ্গে বাড়ি হওয়ায় ছোট থাকতে দেখে এসেছি চিংড়ি চাষের সফলতায় বরাবরই চাষিদের মুখে প্রাণবন্ত হাসি। চিংড়িঘেরে যখন চিংড়ি বাজারজাতকরণের উপযোগী হয় তখন ঘেরমালিক চিংড়ি ধরার ব্যবস্থা করে। চিংড়ি ধরার খুব সহজ পদ্ধতি হচ্ছে অমাবস্যা এবং পূর্ণিমা তিথিতে চিংড়ি ঘেরে লম্বা নেট টাঙিয়ে তার মাথায় একধরণের ফাঁদ বসানো হয়। দেশীয় ভাষায় যাকে আমরা ‘আটন’ বলি। সন্ধ্যায় আটন বসিয়ে রেখে দিলে ভোরে সেগুলো চিংড়িতে ভরে যায়। ঘেরমালিক তথা চিংড়ি চাষিরা আটন থেকে চিংড়ি নিয়ে বিক্রির উদ্দেশে বাজারে নিয়ে যায়। চিংড়ি ক্রয়ের জন্য এসব এলাকায় অল্প দূরত্ব পরপর মাছের আড়ৎ আছে। যেখানে চিংড়ি থেকে শুরু করে যাবতীয় মাছ কেনাবেচা করা হয়। অন্যান্য সময়ে আটনে অল্পস্বল্প চিংড়ি ধরা পড়লেও স্বভাবতই অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে চিংড়ি বেশি ধরা পড়ে। এসময়ে খুব ভোরে চিংড়ি চাষিরা চিংড়ি ধরে আড়তে নিয়ে আসে। সকাল ৯ টার ভিতরেই এসব মাছের আড়ৎগুলোতে বেচাবিক্রি শেষ হয়ে যায়। আড়তে চাষিদের চিংড়ি বিক্রির পরে কয়েক জনের হাত বদলে সেগুলো প্যাকেটজাত করা হয় বাইরে রপ্তানির জন্য। এসময় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের একটা মহল ওৎপেতে থাকে অসাধু উপায়ে তাদের ব্যবসায়িক মুনাফা বাড়ানোর জন্য।
এসব অসাধু ব্যবসায়ী চিংড়িকে ওজনে বেশি করার জন্য নানা ধরণের অপদ্রব্য পুশ করে। ডাক্তারি সিরিঞ্জের মাধ্যমে দূষিত পানি, ফিটকিরি, জেলি, ভাতের মাড়, সাগু বা ময়দা জ্বালিয়ে ঘন করা দ্রবনসহ নানা ধরণের অপদ্রব্য চিংড়ির মধ্যে প্রবেশ করায়। এসব অপদ্রব্যের ঘন দ্রবন চিংড়ির ভিতরে প্রবেশের পরে আর বাইরে বের হতে পারেনা। ফলে চিংড়ির সামান্য ওজন বাড়ে। এই বাড়তি ওজনের ফায়দা নেওয়ার জন্য অর্থকারি ও লাভজনক সম্পদকে পুরোপুরি বিনষ্ট করার জন্য একটা মহল হরহামেশাই এই অকাজ করে যাচ্ছে। তবে একটা সময়ে এভাবে চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করে ওজন বাড়ানোর রীতি ব্যাপকহারে প্রচলিত থাকলেও প্রশাসনের কড়া নজরদারির তাগিদে বর্তমানে এর প্রকোপ কমেছে। কিন্তু চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বর্তমানেও প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ রোধ করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, মোটা অংকের অর্থদ-, পুশকৃত চিংড়ি জব্দ করে ধ্বংস ও বায়েজাপ্ত ঘোষণা ছাড়াও নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কিন্তু চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ কোনভাবেই বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছেনা। চিংড়ি চাষিরা এই অপদ্রব্য পুশ করার সাথে কোনরকম যোগসূত্র না থাকলেও ক্ষতির পাল্লা তাদের উপর গিয়ে পড়ছে। তাছাড়া চিংড়িতে বিভিন্ন অপদ্রব্য পুশ করা অব্যাহত থাকায় দেশে ও বিদেশে চিংড়ির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশের বাজারে দেশের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। চিংড়িতে যদি অপদ্রব্যের উপস্থিতি মেলে তাহলে বিদেশীরা কখনো আমাদের থেকে চিংড়ি নেবে না। হচ্ছেও তাই। চিংড়ি রপ্তানির পরিসংখ্যানে গেল বছরেরে চেয়ে এবছরের বেহাল দশা তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। আবার বিদেশে চিংড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দাম পড়তে শুরু করেছে। তাই চিংড়ি চাষিসহ এলাকাবাসীর দাবি অচিরেই চিংড়িতে এই অপদ্রব্য পুশ করা বন্ধ হোক।
অসাধু ব্যবসায়ীদের অপদ্রপব্য পুশ করে কেজি প্রতি চিংড়ির সর্বোচ্চ ওজন ১০০ গ্রাম মত বাড়াতে পারে। যার ফলে তাদের হাত বদলে চিংড়ি যখন পরবর্তী ক্রেতার হাতে যায় সেখানে চিংড়ির মান ভেদে হয়ত কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেশি লাভ করতে পারে। প্রতিকেজি চিংড়ির মূল্য যদি ৮০০ টাকা হয় তাহলে অপদ্রব্য পুশ করে ১০০ গ্রামের বাড়তি মূল্য ৮০ টাকা লাভ হবে। কিন্তু চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করার ফলে চিংড়ির পুষ্টি গুনাগুন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। চিংড়ির পচনকে তরান্বিত করে। তাই বলা যায়, স্বাদ ও পুষ্টিতে ভরপুর চিংড়িকে অপদ্রব্য পুশ করে যারা খাওয়ার অনুপযোগী করে বিষক্রিয়া ছড়াচ্ছে তারা কেবলমাত্র চিংড়ি চাষিদের বিপদে ফেলছে না, গোটা দেশের অর্থনীতিকে ও পিছিয়ে দিচ্ছে। সামান্য কিছু মুনাফার জন্য মানুষ নামের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে সম্পূর্ণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে চিংড়ি চাষি, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, সর্বোপরি দেশের অর্থনীতি। এতে হুমকির মুখে পড়েছে হোয়াইট গোল্ড নামে খ্যাত দেশের দ্বিতীয় রপ্তানি পণ্যটি।
চিংড়ি চাষ তুলনামূলক লাভজনক ব্যবসা হলেও এখানে নানা ধরণের প্রতিবন্ধক্তা আছে। কেননা বর্তমানে নানা ধরণের রোগ বালাই আক্রমণের ফলে চিংড়ি ধরার উপযোগী হওয়ার আগেই মারা যায়। যেখানে চিংড়ি চাষিদের অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাগদা বা হরিনা চিংড়ি চাষে সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় সার্বক্ষণিক লোনা পানি এবং পর্যাপ্ত জোয়ার ভাঁটা। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে তুলনামূলক বৃষ্টি বেশি হওয়ায় পানির লবনাক্ততা কমে যায়। এজন্য বর্ষা মৌসুমে বাগদা বা হরিনা চিংড়ির উৎপাদন তুলনামূলক কমে যায়। জানুয়ারি থেকে জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত বাগদা বা হরিনা চিংড়ি চাষের সর্বোত্তম সময়। কিন্তু জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত চিংড়ি ঘেরে পানি থাকেনা। যেসব নদ-নদী থেকে চিংড়ি ঘেরে পানি সরবরাহ করা হয় সেগুলো অধিক পলি জমা হয়ে ভরাট হয়ে গেছে। সেইসাথে দখলদারদের দৌরাত্মে বছরের অধিকাংশ সময় এসকল নদ-নদীতে পর্যাপ্ত পানি পৌঁছায় না। ফলে চাষিরা তাদের ঘের বা জলাশয়ে চিংড়ি চাষের উপযোগী পানি পায়না এবং সময়মত চিংড়ির পোনা ছাড়তে পারছেনা, যেটা চিংড়ি চাষের প্রতি চাষিদের অনীহা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব নদ-নদী খননের মত কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও সেখানে কাজে অনেক ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে চিংড়ি চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত