
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাতাসে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে, বাড়ছে বরফ আচ্ছাদিত অঞ্চলের বরফ গলার পরিমাণ। এতে বাড়ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা, বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও। পরিণামে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বেই স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে পরিবেশে, প্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ মোটেও দায়ী নয়। বরং তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জার্মান ওয়াচে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফটের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনতি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী তারা এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। তাই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণে বাংলাদেশের গ্রহিত কর্মপরিকল্পনার সুফল পাচ্ছে দেশের মানুষ। আবার বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইতোমধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি নিরসনে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মূলত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। অন্যদিকে এন্টার্টিকাসহ হিমালয়ের বরফ গলা জলের প্রবাহে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক বন্যাসহ নদ-নদীর দিক পরিবর্তন। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নদ-নদীর ভাঙন। পাশাপাশি সমুদ্রের পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততাও। এতে দেশের সমুদ্র উপকূলের মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে লবণাক্ত পানি পানে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নারীরা সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে গ্রীষ্ম মৌসুমে মরুকরণের সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্বখ্যাত মরুভূমি গবেষকরা বাংলাদেশকে সতর্কও করে আসছেন বারবার। দেশের এ সমস্যাগুলোকে বাংলাদেশ ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছাড়াও ঋতুভেদে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, নদীভাঙন, ভূমিধস প্রভৃতি মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলা হয় বাংলাদেশকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের ঋতুচক্রের হেরফেরের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও হেরফের ঘটছে। অর্থাৎ আগের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সেই স্বাভাবিক চিত্র এখন আর আমাদের নজরে পড়ে না। এর প্রধান কারণ তাপমাত্রার পরিবর্তন বা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি; এর প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রস্তরের উচ্চতা, মরুকরণ প্রভৃতির মাধ্যমে দেশে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, পরিবর্তন হচ্ছে আমাদের চিরচেনা ষড়ঋতুতে। সাহিত্যে বাংলাদেশকে ষড়ঋতুর দেশ বা বছর-এ ছয় ঋতুর বর্ণনা থাকলেও বাস্তব অর্থে এখন ষড়ঋতু পরিলক্ষিত হয় না। বৃষ্টির সময়ে বৃষ্টি কম বা না হয়ে অন্যসময় হচ্ছে, কম অথবা অতিবৃষ্টি, বন্যা হচ্ছে। অন্যদিকে, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকিয়ে যাচ্ছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে, নদী ভাঙছে। অন্যদিকে নদীর পানির বিশাল চাপ না থাকায় সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা, ততটুকু জায়গায় থাকছে না। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে , বাংলাদেশে কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে বাইন ও সুন্দরীগাছসহ বিভিন্ন গাছের আগা মরা রোগ দেখা দিয়েছে। তাতে আবার নানা ধরনের পাতা ও ফুল খেকো বিভিন্ন রকমের কীটের আবির্ভাবও ঘটেছে। এ ব্যাপারে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ইকোসিস্টেমের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। তাই দেশের কোনো অঞ্চলের জলবায়ুর পরিবর্তন হলে সে অঞ্চলের প্রাণিকুল অথবা কীটপতঙ্গের জীবনধারায়ও পরিবর্তন আসে, প্রাণীর অস্তিত্বও সংকটে পড়ে। এমনও হয়, সেসব অঞ্চলের প্রাণিকুলের বিলুপ্তি ঘটে নতুন প্রাণিকুলের সৃষ্টি হয়। মূলত এভাবেই ওই অঞ্চলের জলবায়ুর প্রভাবে বিভিন্ন প্রজাতির কীটের আবির্ভাব ও পূর্বের প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটছে।
দেশীয় প্রজাতির গাছ-গাছালি হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে বিদেশি গাছের আগ্রাসন। বিদেশি এসব গাছ ও লতাগুল্মের ক্রমাগত বর্ধনের ফলে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে প্রায় এক হাজার প্রজাতির নিজস্ব গাছ। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে- বিদেশি আগ্রাসী গাছগুলো এখন আমাদের দেশীয় প্রজাতির গাছ হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। যেমন: সেগুন, মেহগনি, আকাশমণি, রেইনট্রি, বাবলা, চাম্বল, শিশু, খয়ের ও ইউক্যালিপটাসগাছ এখন অনেকের কাছে দেশীয় প্রজাতির গাছ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। অথচ এগুলো ভিনদেশি গাছ। এসব গাছের কারণে দেশীয় প্রজাতির গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রজাতির গাছগুলোর জন্য প্রচুর জায়গার দরকার হয়। এগুলো দেশি গাছের তুলনায় অনেক দ্রুত মাটি থেকে বেশি পরিমাণে পুষ্টি শুষে নেয়। এ ছাড়া আশপাশে দেশীয় প্রজাতির গাছের বেড়ে ওঠাকে ব্যাহত করে। মূলত এ গাছগুলো ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে বিভিন্নভাবে আনা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এর ফলে কৃষিকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে এতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি, চাষাবাদ ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। তদুপরি অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা এবং তাপমাত্রার ক্রমবৃদ্ধির কারণে বহু প্রজাতির ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আবার আগাছা, পরগাছা, রোগ-বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অঞ্চল ভেদে মাটির গুণাগুণ এবং উপাদানেও তারতম্য ঘটছে। ফলে ফসলের প্রত্যাশিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ইরি-বোরো উৎপাদনে প্রচুর সেচের পানির প্রয়োজন হচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমিগুলোয় লবণাক্ততার কারণে সেচে, চাষে বিপত্তি ঘটছে। আবার লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে চিংড়িচাষেও ধস নেমেছে।
অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলে সেচের পানিতে আরেক বিপত্তি ঘটছে। সেখানকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি হওয়ায় ফসলের মাধ্যমে তা মানবদেহে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ফসলের জমিতে চাহিদা পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ কারণে ফসল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। এমনি অবস্থায় দ্রুতই জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমানো না গেলে শুধু দেশের নিম্নাঞ্চলই প্লাবিত হবে না একই সঙ্গে মরুকরণের ঝুঁকিও বাড়বে। অন্যদিকে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে আমাদের বৃক্ষরাজি, বনজ, জলজ ও কৃষিজ, মৎস্য সম্পদের ওপরেও।
এমনি অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং এর বিরূপ প্রভাব থেকে পরিত্রাণে আমাদের নিজস্ব সম্পদ, মেধা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা দিয়ে নিরন্তর গবেষণার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের পথরেখা নির্মাণ, মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে নদ-নদীর দূষণ, দখল রোধ এবং নাব্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে খালি জায়গায় বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে এবং অনাবাদি ও পতিত জমি দ্রুত চাষের আওতায় আনতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশদূষণ বা বায়ুদূষণ ঘটে এমন ধরনের কাজকর্ম থেকেও আমাদের নিবৃত থাকতে হবে। একই সঙ্গে অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণকারী তথা শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে প্রামাণ্যচিত্রসহ আমাদের আর্জি তুলে ধরতে হবে। এসব করা গেলে রাতারাতি জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব না হলেও কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ুর ভয়াবহ অভিঘাতে বিপর্যস্ত আমাদের জীবনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃষি, প্রকৃতি পরিবেশেও পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের কৃষি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রকৃতিকে রক্ষায় একাধিক জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রয়োজন কৃষির গবেষণা। প্রত্যাশা থাকবে সরকার এই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কৃষিজ উৎপাদন তথা কৃষিতে প্রযুক্তির প্রয়োগ ও অঞ্চলভিত্তিক ফল ফসল উৎপাদন, বিপণনে মনোযোগ দেওয়া হবে। এবং পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় আরও বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা।
দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে আবহাওয়া এবং পরিবেশগত ব্যাপক পরিবর্তন। এসব পরিবর্তন আমাদের জন্য কোন শুভ বার্তা বয়ে আনছে না। এসব হচ্ছে, নেতিবাচক পরিবর্তন। বিশ্ব আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৮টি দেশের উপকূলীয় এলাকায় বিরুপ পরিবেশগত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি এক গবেষণার পর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বিশ্ব্যব্যাপী বায়ুমন্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাপ্ত অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার লাখ লাখ লোক ‘পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে’ পরিণত হবে। তারা বলেছন, উন্নত পরিবেশ, দূষণরোধ প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য দূর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি লাঘব হতে পারে। ওয়াশিংটনস্থ আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ২৭ মাস ব্যাপী ৬০ জন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ এবং ৮টি এশীয় দেশের সরকার এ জরিপ কাজে অংশগ্রহণ করেন। ওয়াশিংটন আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের জরিপে বলা হয়েছে, উপকূলের ব্যাপক এলাকা সাগরের স্ফীত পানিতে নিমজ্জিত হবে এবং ভূমিধ্বসের সৃষ্টি হবে। মিষ্টি পানির প্রবাহে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করবে। উপকূলীয় ব্যাপক এলাকায় মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকোপও বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণাঞ্চলীয় ৮টি দেশ বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বসবাস করে। বিশ্বব্যাপী বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট গ্রীন হাউস প্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক ক্ষতির শিকার হবে পূর্ব এশিয়ার এই দেশগুলো।
‘গ্রীন হাউস এফেক্ট’ এর জন্য বন উজাড়কেই প্রধান কারণ বলে গণ্য করা হয়। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশকে সুন্দর-সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫/৩০ ভাগ বনভূমি থাকা অত্যাবশ্যক। আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ সরকারী হিসাব মতে, শতকরা ১৬ ভাগ। প্রকৃতপক্ষে বনভূমির পরিমাণ আরও অনেক কম হবে। দেশে বনভূমির এই অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত ‘বাংলাদেশে গ্রীণ হাউসের প্রভাব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। গত শতাব্দীর শেষ দিকের তুলনায় গড় তাপমাত্রা বর্তমানে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এখন জলবায়ু ঠান্ডা হবার কোন প্রবণতা নেই বলে গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ দেশে বর্তমানের তুলনায় তাপমাত্রা ১ থেকে ১.৫ জিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০৫০ সার নাগাদ ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা কর হচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গে বর্ষা ঋতুও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
গবেষণা থেকে জানা যায়, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পানি বিভাজন এলাকাতে ভবিষ্যতে বৃষ্টিপাতের বৃদ্ধি দেশে বন্যার ভয়াবহতা বাড়বে। বেশি বৃষ্টিপাত নদীর প্রবাহ বাড়িয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির জন্যে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশকে প্রশমিত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি পেলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দেশের অন্যতম প্রধান এই বনভূমি এখন ধ্বংস এবং বিপর্যয়ের মুখে। সুন্দরবন বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমির প্রায় ১৭.৭৩ শতাংশ। মানুষের লোভ আর বিভিন্ন অপকর্মের কারণে সুন্দরবন তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে প্রায় মরুভূমিতে পরিণত করেছে। সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করছে। ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি সুন্দরবন অঞ্চলে। এ বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর পানির সরবরাহ ও নাব্য কমে যায়। ফলে সুন্দরবনে প্রবাহিত শাখা নদীগুলোর মধ্য দিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি অভ্যন্তরভাগে বহুদূর পর্যন্ত প্রবেশ করে। এর ফলে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ কম লবণাক্ততায় টিকে থাকার উপযোগী উদ্ভিদ সুন্দরী গাছ মরে যাচ্ছে। এছাড়া, মানুষের সচেতনতার অভাবে সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বনভূমি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। আমরা দিন দিন গ্রীন হাউস এফেক্টের নির্মম শিকারে পরিণত হতে চলেছি। দেশের বনাঞ্চলগুলোর সম্পদের অধিক ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণ পরিবেশ ও প্রতিরোধের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফারাক্কা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীর নাব্য সংকটের কারণে দেশের পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার শিকার হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য বনাঞ্চল হুমকির সম্মুখীন। শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বনভূমির অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। দিনে দিনে যে পরিমাণ গাছ কাটা হচ্ছে, তার এক-চতুর্থাংশও রোপন করা হচ্ছে না। গাছ লাগানো হলেও প্রাথমিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অসংখ্য চারাগাছ মারা যাচ্ছে। বিশ্ব পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অভিমত অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্র গর্ভে তলিয়ে যেতে পারে। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেটসহ দেশের অন্যান্য শহরও অব্যাহত পাহাড় কাটার কারণে বৃষ্টির সঙ্গে বালি পড়ছে আবাদযোগ্য জমিতে। পানি নিষ্কাশনের খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে বন্যা সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করছে। লাখ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। এছাড়া, নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক ছিন্নমূল মানুষ। নিজেদের প্রয়োজনেই এখন পাহাড় অক্ষত রাখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সবুজ বুক্ষরাজি এবং শ্যামল প্রকৃতি প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখছে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং আমাদের নিঃশ্বাসের সাথে বের হওয়া বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সইড গ্যাস গ্রহণ করে। অথচ আমরা অবিবেচকের মতো পরিবেশ রক্ষাকারী বৃক্ষরাজি, বনভূমি ও পাহাড় উজাড় করে চলেছি। পরিবেশবিদদের মতে, এক হেক্টর সবুজ বনভূমি ৩.৭ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং ২ টন অক্সিজেন ত্যাগ করে। অনিয়ন্ত্রিত বৃক্ষ নিধনের ফলে এই পরিমান কার্বন-ডাই-অক্সইডের বাতাসে মিশে প্রকৃতিকে করছে শুষ্ক ও গরম। যেসব স্থানে কাঠের বিকল্প হিাসবে অন্যকিছু ব্যবহার করা যায়, সেখানেও কাঠের ব্যবহার হচ্ছে। যেমন দেশের প্রায় ৪ হাজার ইট ভাটাতে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন কয়লা ব্যবহৃত হতে পারে। তা না করে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। চলছে বৃক্ষ নিধন। পরিবশ বিজ্ঞানীদের মতে, দেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জরুরিভিত্তিতে সব রকমের পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন করে তা প্রয়োগ করতে হবে। ইট তৈরির জন্য কাঠের ব্যবহার রোধ করতে হবে। এসব করা না হলে, ভয়াবহ দুর্যোগ সৃষ্টি হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সমস্যা যেহেতু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষপটে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়, তাই আমাদের পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা এবং বনভূমি উজাড়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসাবে ফারাক্কাসহ বিভিন্ন নদীর পানির হিস্যা আদায়ে তৎপর হতে হবে। প্রয়োজনে সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া, দেশী-বিদেশী গবেষক দ্বারা পরিচালিত নিরবচ্ছিন্ন ও গঠনমূলক গবেষণা সেল থাকা জরুরি। বনসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে আরও নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। পরিবেশকে রক্ষা করার কাজে সাফল্য অর্জন করতে হলে সময় থাকতে সতর্ক হতে হবে। শুধু সেমিনার বা সমাবেশই যথেষ্ট নয়, জনগণকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি যুগোপযোগি কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞরা এশিয়ার দক্ষিলাঞ্চলীয় ৮টি দেশের প্রতি সতর্কবাণী উচ্ছারণ করার পাশাপাশি এটাও বলেছেন, উন্নত পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব। আমাদের অবশ্যই এ কথা মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও বাস্তুচ্যুতির সমস্যা যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এ কারণে বিশ্বের দ্বীপদেশ ও সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থিত দেশসহ এশিয়া, আফ্রিকার উনয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশগুলো পড়েছে মহাবিপদে। যদিও কার্বন নিঃসরণের উচ্চহারের জন্য তারা মোটেও দায়ী নয়। এসব দেশগুলোর অধিবাসীরা খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের সম্মুখীন। আর এ সত্যটিই প্রকাশিত হয়েছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বের ১০৯টি দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ অর্থাৎ ১১০ কোটি মানুষ চরম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। সরাসরি জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৯০ কোটি মানুষ, যা মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ। গত ১৭ অক্টোবর ২০২৫, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে। প্রভার্টি হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (ওপিএইচআই) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮৮ কোটি ৭ লাখ মানুষ সরাসরি অন্তত একটি জলবায়ু সমস্যার সম্মুখীন। এর মধ্যে ৬০ কোটি ৮ লাখ মানুষ চরম তাপে, ৪৭ কোটি ৭ লাখ মানুষ দূষণে, ৪৬ কোটি ৫ লাখ মানুষ বন্যায় এবং ২০ কোটি ৭ লাখ মানুষ খরায় ভুগছে। প্রায় ৬৫ কোটির বেশি মানুষ অন্তত দুই ধরনের ঝুঁকিতে, ৩০ কোটির বেশি মানুষ তিন বা চার ধরনের বিপদের সম্মুখীন এবং ১ কোটি ১ লাখ মানুষ ১ বছরে চারটি বিপদেরই সম্মুখীন হয়। ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দারিদ্র্য ও জলবায়ু বিপদের যুগপৎ উপস্থিতি এখন বৈশ্বিক সংকটের অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিশুমৃত্যু হার, বাসস্থান, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ এবং শিক্ষার মতো মৌলিক সূচক। কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, সুচিকিৎসা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিয়য়গুলোও এর সঙ্গে কম জড়িত নয়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক হাওলিয়াং শু বলেন, খরা, বন্যা, তাপদাহ বা বায়ুদূষণের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কিন্তু বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীই এর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার। ভয়ের বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ গোলার্ধের নিম্ন আয়ের দেশগুলো থেকে প্রায় ১৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে পারেন। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ অঞ্চলে। আগামী নভেম্বর মাসে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য কপ-৩০; বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের জন্য একটি সুযোগ হলো যে, সেখানে তাদের জলবায়ু পদক্ষেপকে দারিদ্র্য মোকাবিলার পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল টিপিং পয়েন্টস প্রতিবেদনে ১৬০ জন আন্তর্জাতিক গবেষক জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতিতে নানা অপ্রত্যাবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটছে। এই ক্ষতি থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হবে না। এখনই কার্বন নির্গমন হ্রাস ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার বাস্তবায়নে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে প্রকৃতি হয়তো আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে না। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন উজাড়ের বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা মাত্র ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালেই আমাজন রেইনফরেস্ট ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে। একই সঙ্গে, উত্তর ইউরোপের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা আটলান্টিক মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ স্রোতব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু ভারসাম্যের জন্য বিপদ সংকেত।
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ইতিমধ্যে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১.৩ থেকে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত দুই বছর ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর। এই সময়ে সাগরে তাপপ্রবাহের কারণে বিশ্বের ৮৪ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ এই প্রবাল প্রাচীরগুলোই সমুদ্রের প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রাণের আবাসস্থল। বর্তমানে বিদ্যমান নীতিমালার ভিত্তিতে এই শতাব্দীতে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় ৩.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রকৃতিতে এই পরিবর্তনগুলো এত দ্রুত ঘটায় হতবাক হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা প্রবাল পুনরুদ্ধারের জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। ব্রাজিলের আমাজন রেইনফরেস্টে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন: কপ-৩০। এর মাত্র কিছুদিন আগে বিজ্ঞানীদের এই সতর্কবার্তায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে সারা বিশ্বে। কপ-৩০ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। প্রশান্ত মহাসাগরে অস্ট্রেলিয়া ও হাওয়াই দ্বীপের মাঝামাঝি নয়টি প্রবালদ্বীপ ও দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছোট্ট দেশ টুভালু। নাসার বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে টুভালুর প্রধান প্রবাল দ্বীপ ফুনাফুটির অর্ধেক অংশ সমুদ্রে তলিয়ে যেতে পারে। দেশটির ৬০ শতাংশ জনসংখ্যা এই দ্বীপে বসবাস করে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চায় দেশটি। টুভালুর জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী জানান, তার দেশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে। টুভালুর জনগণ যাতে তাদের দেশে থাকতে পারে, এ জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাস্তব প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। তার ভাষায়, তাদের দেশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র এক মিটার ওপরে। তাই জমি পুনরুদ্ধার, সমুদ্র প্রাচীর নির্মাণ এবং সহনশীলতা গড়ে তোলা তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। তারা আর সময় নষ্ট করতে চান না। টুভালুর বাঁচার জন্য জলবায়ু অর্থায়ন অত্যন্ত জরুরি। এটি এখনই প্রয়োজন, যাতে তারা সময় মতো জলবায়ু সংকটের মোকাবিলা করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে দেশের উপকূলাঞ্চলে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও মৎস্যচাষ। ঝুঁকিতে পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রতিনিয়ত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্ববাস, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ।
গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যের অপরাধের বোঝা বাংলাদেশ টানবে কেন? কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলো শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে, অথচ জলবায়ু তহবিলের ৯৮ ভাগ অর্থ তারা দেয়নি। যা দিচ্ছে, তা ঋণ হিসেবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিপদ আরও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নদীভাঙনের ফলে বাংলাদেশে কী ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে তা সম্প্রতি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছিয়া ইউনিয়নের দুর্গম মন্নিয়ারচরের তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মানববন্ধন থেকে বোঝা যায়। ইতিমধ্যে চার শতাধিক বসতবাড়ি, বিস্তীর্ণ ফসলের জমি, গাছপালা, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে মুন্নিয়ারচর উচ্চবিদ্যালয়, মুন্নিয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মুন্নিয়ারচর বাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকা হুমকির মুখে রয়েছে। জানা য়ায়, যমুনার ভাঙনে নিঃস্ব হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। নদীতে বিলীন হয়ে গেছে কয়েকশ একর জমি। কিন্তু ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

