
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। যার কুমতি নেই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলেও কিন্তু বাড়ে না মোকাবেলা ও ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারের বরাদ্দ।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বৈশ্বিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। যার প্রভাবে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বাড়ছে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ছে দেশ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের বাজেট বরাদ্দ সেভাবে বাড়ছে না। বরং গত কয়েক অর্থবছরের পরিসংখ্যানে উল্টো চিত্রই দেখা গেছে।
তথ্য বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ দিয়েছিল সবশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তার চেয়ে কম বরাদ্দ দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এবারের বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটবে বলে আশা পরিবেশবাদীদের।
দেশের আবহাওয়া প্রতিনিয়ত রূপ বদলাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বাড়ছে তাপমাত্রা। প্রতিকূল এ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হাঁসফাঁস জনজীবনে। অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ায় প্রকট হচ্ছে পরিবেশগত হুমকি।
বাজেটে আমাদের জলবায়ু খাতের বরাদ্দগুলো পরিকল্পনা মাফিক ও পর্যাপ্ত হচ্ছে না। আগামী পাঁচ বছরে কোথায় কোথায় ঝুঁকি বাড়বে, সে অনুযায়ী অ্যাসেসমেন্ট করে বাজেট হওয়া উচিত।- এম জাকির হোসাইন খান
জলবায়ু পরিবর্তনের এ বিরূপ প্রভাবে শুধু মানুষ নয়, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতিও। এ অবস্থায় অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। কিন্তু বাংলাদেশে বছরজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা নিয়ে সভা-সেমিনার হলেও, পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো নিয়মিত তৎপরতা দেখালেও সরকার সে অর্থে অর্থ বরাদ্দ বাড়াচ্ছে না।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের গত কয়েক বছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা এক লাফে ৭৩১ কোটি টাকা কমিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ২৭১ কোটি ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা।
২০২০-২১ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থায়ন আরও কমে বরাদ্দ দাঁড়ায় ১ হাজার ২৪৬ কোটি টাকায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে সেটি আরও কমে হয় ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়ে হয় ১ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। সবশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকায়। সে হিসাবে আট বছর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয় যে অর্থ বরাদ্দ পেয়েছিল, পরের অর্থবছরগুলোতে সেই বরাদ্দের পরিমাণ ছিল তার চেয়েও কম।
উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বাড়ছে তাপমাত্রা। প্রতিকূল এ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হাঁসফাঁস উঠছে জনজীবনে। অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ায় প্রকট হচ্ছে পরিবেশগত হুমকি
সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। বছর বছর এসব আকস্মিক দুর্যোগে দেশের মানুষ দীর্ঘ ক্ষতির মুখে পড়লেও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় নেই যথাযথ কর্মপরিকল্পনা। রাষ্ট্র এ খাতে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয়ও করছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে হারে জাতীয় বাজেটের আকার বাড়ছে সে হারে জলবায়ু ও দুর্যোগ প্রশমন খাতে বরাদ্দ বাড়ছে না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রতিনিয়ত আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় এ মন্ত্রণালয় বাজেটে বরাদ্দ পাচ্ছে কম।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ই নয়, বরাদ্দ বাড়াতে হবে পানি সম্পদ, এলজিইডি ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে। কিন্তু সেসব মন্ত্রণালয়েও উল্লেখযোগ্য হারে বরাদ্দ বাড়ছে না। যেটুকু বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে দুর্যোগ
সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রিমালে উপকূলীয় এলাকার ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৫ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ঘরবাড়ি। এছাড়া রিমালের প্রভাবে ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ২০ জেলায় ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। আম্ফানের তাণ্ডবে মারা যান ১৬ জন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ, রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্টসহ অবকাঠামোর পাশাপাশি ঘরবাড়ি, কৃষি এবং চিংড়ি ঘেরসহ মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এই যে হিট ওয়েভ চালু হয়েছে এটি অব্যাহত থাকবে এবং মাত্রাও বাড়বে। এজন্য জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে সরকারি-বেসরকারিভাবে আমাদের প্রচুর অর্থ প্রয়োজন।- মো. লিয়াকত আলী
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ঘূর্ণিঝড় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ১৬ জনের প্রাণহানি ও ৪০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে শিশুসহ অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ১৮ জনের প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০২১ সালের ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ৯ জনের মৃত্যু এবং ক্ষতিগ্রস্ত হন ৯৫ হাজার মানুষ। ২০২৩ সালে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ঘূর্ণিঝড় মোখা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ রিমালের তাণ্ডবে দেশের ১৯ জেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের অনুকূলে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমের জন্য ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ৫ হাজার ৫০০ টন চাল, ৯ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন, শিশুখাদ্য কিনতে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ও গোখাদ্যের জন্য ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসাইন খান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাজেটে আমাদের জলবায়ু খাতের বরাদ্দ পরিকল্পনা মাফিক ও পর্যাপ্ত হচ্ছে না। আগামী পাঁচ বছরে কোথায় কোথায় ঝুঁকি বাড়বে, সে অনুযায়ী অ্যাসেসমেন্ট করে বাজেট হওয়া উচিত। যেমন- আমরা কিন্তু জানতাম ঘূর্ণিঝড়গুলো আসবে। সে অনুযায়ী পর্যাপ্ত বাজেট এ খাতে রাখিনি। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বাজেট তৈরি করতে হব সারা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ বিপর্যয়ের মুখে। বায়ু মন্ডলে পূঞ্জিভূত গ্রিনহাউস গ্যাস উৎসারণের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নানা প্রাকৃতিক দূর্য্যােগের সৃষ্টি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও কৃষি কাজে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা নেই বললেই চলে। তবে বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম।
৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালের জুন মাসে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘের মানব পরিবেশের ওপর প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের ২৭ তম অধিবেশনের প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ঐ সম্মেলনের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারনে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপূর্ব লীলাভুমি বাংলাদেশ। সবুজ বন, নদী, নালা ও জলপ্রপাত এদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য আরও মনোরম করেছে। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষও বিভিন্ন ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির উৎস হুমকির মুখে পড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্য্যােগের নানা কারনে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলি আক্রান্ত হয়েছে। জনজীবনে নেমে এসেছে নানা বিপর্যয়। বিশ্বে মানুষের যত রকম ঝুঁকি রয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণতা তার মধ্যে অন্যতম। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য মুলত কার্বন ডাই অক্সাইড কে দায়ী করা হয়। কিন্তু এর সাথে মিথেন, নাইট্রস অক্সাইড, ক্লোরো ফ্লরো ইত্যাদি গ্যাস বিশেষ ভুমিকা রাখে। গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ হচ্ছে। মানব সভ্যতার অগ্রগতি, প্রযুক্তি ও শিল্প উন্নয়নে নির্মাণকারী কারখানা, শিল্প কারখানা থেকে বায়ু মন্ডলে সিএফসি গ্যাস যুক্ত হচ্ছে। মানুষের অসচেতন কর্মকান্ডের ফলে বায়ু মন্ডলে এসব গ্যাস যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতায় ভুমিকা রাখছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সময় এবং অবস্থানে পরিবর্তিত হয়। এখন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ার কারণে আর্কটিক অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়েছে। স্থলভাগের উপরিভাগের বায়ুর তাপমাত্রাও সমুদ্রের উপরে প্রায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে তীব্র তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছে। একারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, ভূমিকম্পন, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় ধস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন, পানিরস্তর নিচে নেমে যাওয়া, অসময়ে অধিক বৃষ্টি ও অধিক খরাসহ বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্য্যােগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে হিমালয়ের বরফ, উত্তর মেরু ও এ্যান্টাকটিকার বরফ গলতে শুরু করেছে। সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। গত ১০০ বছরে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ১৫ সে. মি. থেকে ২৫ সে. মি.। বছরে বৃদ্ধির হার ১.৫ সে. মি. থেকে ২.৫ সে. মি.। যা গত ৩০০ বছরের ১০ গুন। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশংকা তাপমাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী শতকে সমুদ্রের উচ্চতা বছরে বৃদ্ধি পাবে ৩০ সে. মি. থেকে ৪০ সে. মি.। এর ফলে পৃথিবীর অনেক নি¤œ অঞ্চল তলিয়ে যাবে। বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর ৫ লক্ষ মানুষ মৃত্যু বরণ করবে। পৃথিবীর ১০ ভাগ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। বছরে প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম পরিমান ক্ষতি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ু মন্ডলের পুঞ্জিভুত গ্রীন হাউস গ্যাস উৎসারণে বিশ্ব উষ্ণায়নে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে দক্ষিণ পশ্চিম উপকুলীয় এলাকায় ক্রমাগত ঝুঁকি বাড়ছে। সাগরে প্রতিনিয়ত নি¤œচাপ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, কৃষিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পানি, প্রাণী সম্পদ ও নগর উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন বড় চালেজ্ঞ হয়ে দাড়িয়েছে। জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হচ্ছে এবং ভূমি, বনাঞ্চল, শিল্প, বাসস্থান, পশু সমস্যা প্রকট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন মারাক্তক ঝুঁকিপুর্ণ। বৃষ্টিপাত ও মাটির লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ঘুর্নিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা আশাংকা করছে আগামী ৫০ বছরে বিশ্বরে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী থেকে ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সমুদ্র পৃষ্ঠ ১ মিটার বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাবে।
বাংলাদেশে ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় সমুদ্র তটরেখা রয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন উপকূল ঘিরে রয়েছে ১২৫ কিলোমিটার এবং কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত ৮৫ কিলোমিটার। সমুদ্র উপকূল বরাবর রয়েছে গঙ্গা ও মেঘনা অববাহিকায় অবস্থিত প্রশস্ত জোয়ারভাটা সমভূমি এবং অসংখ্য নদী মোহনার ব-দ্বীপ। নদী সঙ্গমের ব-দ্বীপগুলো ও সমুদ্রে তটরেখা বরাবর ভূ-খ- প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। উপকুলীয় ১৩ জেলার ৬৩ উপজেলার ৫৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৮৭৬ একর জমি তলিয়ে যাবে। যা দেশের মোট জমির ১৫.৮ ভাগ। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে আংশিক তলিয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন বিজ্ঞানীরা। এতে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হবে। মানুষের জীবন ও জীবিকায় নেমে আসবে বিপর্যয়। বিপন্ন হবে উপকুলীয় অঞ্চল।
মানব সভ্যতার উন্নয়ন কাযক্রমে মানুষের অসচেতন কর্মকান্ডে আমাদের কৃষি, বনজ, পানি, মৎস্য সম্পদ সমুহ ও জীব বৈচিত্র্য ঝুঁকিতে পড়েছে। আরো অনিশ্চয়তায় পড়বে যদি দ্রুত জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে। তাই আর চুপ করে বসে থাকলে হবে না। সবাইকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। বিশ্ব উষ্ণায়নে যে সমস্ত গ্যাস দায়ী আমাদের অসেচতন কর্মকান্ডে সে সমস্ত গ্যাস সম্মেলিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিহার করতে হবে। উন্নত বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে গ্রীন হাউস গ্যাস উৎসারণ করে বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। বিশ্ববাসিকে সুস্থভাবে বাচার জন্য আবহাওয়া, জলবায়ু ও বিশুদ্ধ বায়ু নিশ্চিত করতে হবে। তাই দায়ী উন্নত দেশগুলিকে এর সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীতে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য আবহাওয়া ও জলবায়ু নিশ্চিত করতে হবে বিশ্ববাসীকে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণকে আরও সচেতন করতে হবে।
আধুনিকায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী। পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু। কোনো এলাকা বা ভৌগোলিক অঞ্চলের ৩০-৩৫ বছরের গড় আবহাওয়াই হচ্ছে জলবায়ু। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা নামে অধিক পরিচিত। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে ‘গ্রিনহাউস প্রভাব’ বলা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের শুধু একটি কারণ নয়, অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরো কার্বনসহ বিষাক্ত গ্যাসের নিঃসরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ, গ্রিনহাউস গ্যাস ও মানব সৃজিত কর্মকাণ্ড দ্বারা পরিবেশদূষণ। যেমন- পারমাণবিক বিস্ফোরণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য, কলকারখানা ও গাড়ি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, বেশি বেশি ফসল পাওয়ার জন্য জমিতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ গাছ কেটে সবুজ ধ্বংস অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পকারখানা স্থাপন, ইটের ভাটা, জ্বালানি ইত্যাদি।
পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নানা প্রকারের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন- অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। যার ফলে জ্ঞান ও মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণে প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আবহাওয়ার মৌসুমি ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (CRI) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের ওপর।
উল্লেখ্য, ওই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্তের বিচারে বিশ্বব্যাপী গবেষকরা বাংলাদেশকে পোস্টার চাইল্ড (Poster Child) হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।
গবেষনায় বলা হয়, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে যাবে। আর উপকূলীয় এলাকায় এখন যে ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার, তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটিতে।
জলবায়ু গবেষক ড. আহসান চৌধুরী বলেন, গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত তালিকার শীর্ষে আছে ঠিকই, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা নেই। তবে আমরা আন্তর্জাতিক ফোরামে জোর দাবি তুলতে পারি। কারণ, কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা একেবারে নগণ্য। এ জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলো। তারা এর ক্ষতিপূরণ দেবে বলেও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি বলেন, আশঙ্কা করা হচ্ছে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষ বাড়িঘর হারাবে ২০৫০ সালের মধ্যে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বন্যাপ্রবণ এলাকায় দেখা যায়, প্রতিবছরই নদীভাঙনে শত শত বাড়িঘর বিলীন হয়ে যায়। এরাই তো বাস্তুচ্যুত। এ বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক তহবিল দরকার। আবার আমাদের সরকারের জলবায়ু অভিযোজনে অগ্রাধিকার প্রকল্প নিতে হবে। এ জন্য আসন্ন বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ রিসার্চ কেন্দ্রের গবেষক ড. এহতেশামুল কবির বলেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি হচ্ছে মানুষেরই ভুলের কারণে। এটা আসলে প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়। এ জন্য বাস্তুচ্যুতদের অধিকার আদায়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে জোর দাবি জানাতে হবে আন্তর্জাতিক ফোরামে। এখন সময় এসেছে, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতদের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ প্রটোকল থাকা উচিত।
আবহমান কাল থেকে এ দেশে ঋতুবৈচিত্র্য বর্তমান ছিল, ছয়টি ঋতুর বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদাভাবে এ দেশে উপলব্ধ হয়; গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত-শীত- বসন্ত -এই ছয় ঋতুর কারণে দেশটিকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয়। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল চলে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ দেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকে, তাই জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এ সময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময়ই বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। এ ছাড়াও মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের আগমুহূর্তে কিংবা বিদায়ের পরপরই স্থলভাগে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, জল-ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, যার আঘাতে বাংলাদেশ প্রায় নিয়মিতই আক্রান্ত হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও তার ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে এখন দেশের ছয়টি ঋতুর বৈশিষ্ট্যই পাল্টে যাচ্ছে।
২০০০ সনে প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে কক্সবাজার উপকূলে বছরে ৭.৮ মিমি. হারে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। গত চার দশকে ভোলা দ্বীপের প্রায় তিন হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ২১০০ সাল নাগাদ সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মি. উঁচু হতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১৮.৩ অংশ নিমজ্জিত হতে পারে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্রমতে, রাজশাহীর উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সনে পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট, ২০০০ সনে তা নেমে ৬২ ফুট এবং ২০০৭ সালে তা নেমে যায় ৯৩.৩৪ ফুটে। স্বাভাবিক বন্যায় দেশের মোট আয়তনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। বর্তমানে বন্যার সংখ্যা ও তীব্রতা দুটিই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন সিডর আক্রমণ করার মাত্র দুই বছরের মধ্যে শক্তিশালী সাইক্লোন নার্গিস ও আইলা এবং ২০১৩ সালের মে মাসে মহাসেন (আংশিক) আঘাত হেনে কৃষিকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উফশী ধানের ফলন কমে যাবে এবং গমের রোগের আক্রমণ বাড়বে। বাংলাদেশে বর্তমানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে গম চাষ সম্ভব হবে না। ধান গাছের কচি থেকে ফুল ফোটার সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি হলে এবং অতি নিম্ন তাপে (২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে) শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে। ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় যদি অতি উষ্ণ তাপ থাকে তাহলে চিটার সংখ্যা থোড় অবস্থার চেয়ে বেশি হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার কারণে ধান গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ধান গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে, ধানের চারা দুর্বল হয় এবং ফসলের জীবনকাল বেড়ে যায়।
১৮৫০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৭৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ৫০ বছরের প্রতি দশকে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত ১০০ বছরের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। গত ২০১২ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বিংশ শতাব্দীর চেয়ে ০.৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
সম্প্রতি ‘নাসা’ একটি ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে। গত ৪০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার এমান্ডসন সাগরের কাছে থাকা কিছু গ্লেসিয়ার (বরফের সিট) এমনভাবে গলে গেছে যে, তা আর কোনোভাবেই বরফ হয়ে ফিরে আসবে না। ওই গ্লেসিয়ার যদি সম্পূর্ণ গলে যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১.২ মিটার বেড়ে যাবে। আর যদি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার সমস্ত বরফ গলে যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৩.৫ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার পাশাপাশি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকাতেও বরফ ক্ষয়ের একই প্রবণতা লক্ষ্ করা যাচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের বরফের চূড়ার ক্ষয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আরও ভয়াবহ অশনি সংকেত দিচ্ছে। যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আগাম ধারণা আগামী দুই-তিন দশকেই আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে চীন ও বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপদে পড়বে বলে নাসা সতর্ক করে দিয়েছে।
সাইক্লোন সিডরে সাড়ে ৩৪ লাখ মানুষের বাড়িঘর ভেসে গিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালে ওই ধরনের সাইক্লোনে তিন মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস হবে। এতে ৯৭ লাখ লোকের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। ২০৮০ সাল নাগাদ সমুদ্রস্তর ৬৫ সেন্টিমিটার উঁচু হলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ৪০ শতাংশ উৎপাদনশীল ভূমি হারাবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় দুই কোটি মানুষ খাবার পানিতে লবণাক্ততার সমস্যার মুখে পড়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে বন্যার ঝুঁকিও বাড়বে। বন্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে।
২০১৬ সালে ৭ নভেম্বর মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মারাকাশ জলবায়ু সম্মেলন। এটা ছিল ২২তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্বের ৫৪টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা। ১২০টি দেশের মন্ত্রী বা মন্ত্রপর্যায়ের প্রতিনিধিরিাও এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট খরা, বন্যা ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে বাস্তচ্যুত জনগণের ক্ষতি ও সমস্যার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিতে সব দেশের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের উল্লেখ করে বলেন, ‘ওই সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল। এখন ওই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় ওই সিদ্ধান্তকে কাজে পরিণত করার সময়। শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বকে আরও নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিশ্চিন্ত স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানান, জলবায়ু চুক্তিতে অনুস্বাক্ষরের মাধ্যমে সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারির। ’
সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার আগে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন তার বক্তব্যে ধনী দেশগুলোকে ২০২০ সালের মধ্যে তাদের প্রতিশ্রুত এক হাজার কোটি ডলার দ্রুত পরিশোধের আহ্বান জানান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ওই তহবিলের সাহায্য নিয়ে যাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কাজ করতে পারে- এর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মারাকাশে ১২ দিনব্যাপী ২২তম জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনায় আশাব্যঞ্জক কিছুই পরিলক্ষিত হয়নি। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে সমালোচনা করেছে বিশ্বের অধিকাংশ জলবায়ুবিষয়ক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠন।
বিশ্বে সকল ভারী কারখানা ও যান্ত্রিক যানবাহন যে কার্বন নিঃসরণ করে, তার শতকরা ৮০ ভাগই হচ্ছে উন্নত ও ধনী দেশগুলোর দ্বারা। কিন্তু বিশ্বের সব রাষ্ট্রই তার দ্বারা আক্রান্ত। নিঃসরিত কার্বন বায়ু প্রবাহের দ্বারা সব দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। কাজেই কার্বন নিঃসরণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোর সাহায্যে ধনী দেশগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে এই যে, প্যারিস সম্মেলনে ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো পুরোপুরি রক্ষিত হচ্ছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে অসহায় দরিদ্র মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে নারী, শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী ও শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ এবং এই পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞাত নয়। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে তার পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। এই অবস্থায় করণীয়ই বা কী হবে, সে সম্পর্কেও তারা ওয়াকিবহাল নয়। তাই জলবায়ু সম্পর্কে নারী ও শিশুসহ বাংলাদেশের মানুষকে ভালোভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং কাজ করতে হবে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত