
অব্যবস্থাপনা,ওষুধ সংকট ও চিকিৎসক সংকটের মাঝেও সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা সরকারি হাসপাতাল
শহিদ জয়,যশোর : ওষুধ সংকট, চিকিৎসক ও কর্মীদের অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বহির্বিভাগের বৈকালিক সেবা বন্ধ থাকার মতো একের পর এক অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেও ২০২৫ সালে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন আট লাখ ১১ হাজার ৯৩৮ জন রোগী। এসময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন দুই হাজার ৯৭১ জন রোগী।
বছরজুড়ে হাসপাতালটিকে ঘিরে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রোগী মৃত্যুর অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে এলেও জেলা ও আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য এখনো এই সরকারি হাসপাতালই চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল।
চিকিৎসায় অবহেলা ও রোগী মৃত্যুর অভিযোগ
চলতি বছরে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল কর্তব্যরত চিকিৎসকদের অবহেলা এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা। একাধিকবার চিকিৎসক না থাকা কিংবা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
গত২ডিসেম্বর শ্বাসকষ্ট নিয়ে করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি হওয়া শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান (৭০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। স্বজনদের অভিযোগ,চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই তার মৃত্যু হয়। এঘটনায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের আসবাবপত্র ভাঙচুর এবং কর্তব্যরত চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলেন।
এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি দুপুরে পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন নজরুল ইসলাম। চিকিৎসা না পেয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা। নিহত নজরুল ইসলাম শহরের বারান্দীপাড়া বউবাজার এলাকার মৃত বাবু মিয়ার ছেলে। এ ঘটনার জেরে মৃতের ছেলে ইমরান হোসেনসহ স্বজনরা দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক ইফতে খায়রুল আলম শুভর ওপর চড়াও হন।
এ ধরনের একাধিক ঘটনায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বাড়তে থাকে।ওষুধ সংকট ও চুরির ঘটনা বছরজুড়ে হাসপাতালটিতে সরকারি ওষুধের তীব্র সংকট ছিল। হাজার হাজার রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল থেকে সরকারি ওষুধ ও সরঞ্জাম চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
১ জুলাই হাসপাতালের মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মী কার্টনভর্তি ওষুধ এক কর্মকর্তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়েন। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া ২৬ অক্টোবর হাসপাতালের তৃতীয় তলার মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের সামনে আইয়ুব হোসেন (৪৫) নামে এক স্বেচ্ছাসেবককে সরকারি ওষুধ চুরির অভিযোগে আটক করা হয়। তিনি ঝিকরগাছা উপজেলার মাগুরা অমৃতবাজার গ্রামের মৃত বজলুর রহমানের ছেলে।এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে হাসপাতাল এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ধার হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ও চাকু, যা হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পরিসংখ্যানে যশোর জেনারেল হাসপাতাল
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে মোট সেবা নিয়েছেন: ৮,১১,৯৩৮ জন ,ইনডোর রোগী: ৯৯,১৬৪ জন,জরুরি বিভাগ: ১৯,১৯৩ জন
বহির্বিভাগ: ৭,১২,৭৭৪ জন,এ সময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন,মোট মৃত্যু: ২,৯৭১ জন
নারী: ১,১৯৫ জন,পুরুষ: ১,৬০১ জন,শিশু: ১৭৫ জন,বৈকালিক সেবা বন্ধে ভোগান্তি
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর হাসপাতালের পরিশোধসাপেক্ষ বৈকালিক বিশেষজ্ঞ সেবা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্বল্প খরচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
নাগরিকদের দাবি,যশোর ঘোপ সেন্ট্রাল রোড এলাকার মাহফুজুর রহমান, আক্তার হোসেন, মিরাজ আহমেদসহ একাধিক সচেতন নাগরিক বলেন,হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার, ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত এবং চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো গেলে বিপুল সংখ্যক রোগীকে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান,জনবল সংকট ও সীমিত বাজেটের মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ওষুধ সংকট ও অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

