
ডেস্ক রিপোর্ট : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য।
গত শনিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বলরুমে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “বাংলাদেশে এখনো অনেকে আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের কীভাবে পুনর্বাসন (রিকনসিলেয়েশন) করা হতে পারে?” জবাবে স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত তারেক রহমান সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ একটি উত্তর দেন। তিনি বলেন, “আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর থেকে বহু আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। সমালোচকদের ভাষায় ‘স্বৈরাচারী’ ও ‘দমনমূলক’ কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত না থাকলেও দলীয় সম্পৃক্ততার কারণে অনেকেই ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাস্তবতা হলো আওয়ামী লীগের এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভোটার রয়েছে। ব্যালটে দলটির অনুপস্থিতিতে তাদের সমর্থকদের বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে।
এনডিটিভি বলছে, নতুন সরকারকে এখন সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। একদিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমনে থাকা ক্ষোভ মোকাবিলা, অন্যদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর যে নির্বিচার রাজনৈতিক মামলার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, সেই চক্রে না জড়ানো। এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ভুয়া ও হয়রানিমূলক মামলা বাতিলের পাশাপাশি সহিংসতায় প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা নিশ্চিত করাও জরুরি হবে।
এনডিটিভি বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের ভোটের বড় অংশ বিএনপির ঝুলিতে গেছে, যদিও দলটি ভোট বর্জনের ডাক দিয়েছিল। যারা ভোট দিতে চেয়েছেন, তাদের সামনে কার্যত দুটি বিকল্প ছিল- বিএনপি অথবা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অধিকাংশ ভোটার বেছে নিয়েছেন বিএনপিকে।
এনডিটিভি’র দাবি, এই যে ভোট একদিকে ঘুরে যাওয়ার ব্যাপারটা ঘটেছে, এর পেছনে একটি প্রধান কারণ হলো জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-উভয় দলই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করে।
বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং স্বাধীনতার পরও তাদের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। ফলে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী ভিত্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভোটারদের একাংশের কাছে দলটি সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
তারেক রহমানের ‘সমতার বাংলাদেশের’ প্রতিশ্রুতি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের অঙ্গীকার ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলে। ছবি: সংগৃহীত
তারেক রহমানের ‘সমতার বাংলাদেশের’ প্রতিশ্রুতি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের অঙ্গীকার ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলে। ছবি: সংগৃহীত
এনডিটিভি বলছে, সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যেও বিএনপি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যারা ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে পরিচিত। তারেক রহমানের ‘সমতার বাংলাদেশের’ প্রতিশ্রুতি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের অঙ্গীকার ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলে।
এনডিটিভি বলছে, এ নির্বাচনে নারী ভোটাররাও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। জামায়াতের শীর্ষ নেতার নারীর নেতৃত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষ্যের ঘোষণা অনেক নারী ভোটারকে বিএনপির দিকে ঠেলে দেয়। এমনকি জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভেতরকার মতপার্থক্যও প্রকাশ্যে আসে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নিয়ে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বও বিএনপির পক্ষে কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আন্দোলনকে অনেকে স্বতঃস্ফূর্ত মনে করলেও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ ‘ডিপ স্টেটের’ প্রভাব হিসেবে দেখেছেন। ভবিষ্যতে যেকোনো দল একইভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বাদ পড়তে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে অনেক ভোটার স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন বলে মনে করছে এনডিটিভি।
ভারতীয় এই সংবাদমাধ্যম বলছে, আওয়ামী লীগের ভোটার অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কৌশলগত প্রচার, ভাসমান ভোটারদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত যোগাযোগ- কোনো কিছুই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়নি বিএনপি। সুইং ভোটার ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিজেদের পক্ষে টানতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হয়, যাতে জামায়াত বদলে বিএনপিই হয়ে ওঠে তাদের পছন্দ। এখন সরকার গঠনের পর সত্যিকারের আইনের শাসন জারি করাটাই বিএনপি ও তারেক রহমানের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত