
ডেস্ক রিপোর্ট : আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। মব তৈরি করে রাতের অন্ধকারে ভিসিকে বাসভবন অবরুদ্ধ ও তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ব্যানার টানিয়ে পদত্যাগ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, এবার ভাঙচুর করা হয়েছে রক্তাক্ত কুয়েট কর্ণার। সবগুলো ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগের আঙ্গুল ছাত্রদলের নেতাকর্মীর দিকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি'র জয়লাভের পরপরই শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের একটি অংশের এমন বেপরোয়া ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ভুগছেন সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী কুয়েট ক্যাম্পাসে ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া দুটি অংশ মতবিরোধের মাধ্যমে শুরু করে চরম সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। অতীতে ছাত্রলীগের নারকীয় রাজনীতির শিকার সিংহভাগ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বহিরাগত অস্ত্রধারীদের নিয়ে হামলা চালায়। দিনভর চলা সেই সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত হন। এ ঘটনায় দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল কুয়েট। পরে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ৩৭ জনকে অভিযুক্ত করে ৩২ জনকে সতর্ক এবং ৫জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। এদিকে কলংকজনক হামলার ঘটনার বর্ষপূর্তিতে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয় ওই ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীরা। কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারী) রাতে তারা কুয়েট ছাত্রকল্যাণ কার্যালয়ের প্রদর্শনী কক্ষে সেদিনের ঘটনার আলোকচিত্র, তদন্ত রিপোর্ট, নিউজ কাটিং দিয়ে ‘রক্তাক্ত কুয়েট কর্ণার’ সাজায়। রাত সোয়া ১২ টার দিকে কাজ শেষে তারা ফিরে গেলে ১০/১২ জন ছেলে এসে সবকিছু ভাংচুর করে চলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী জানান, আমরা প্রদর্শনী রুমে কাজ করার সময়েই ওদের কয়েকজন এসে বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করে যায় এবং আমরা বের হওয়ার পরে ওরা ওখানে প্রবেশ করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় ছাত্রদলের একজন নেতার নেতৃত্ব একদল শিক্ষার্থী রাত ১২:৩২ মিনিটে রক্তাক্ত কুয়েট কর্নারে প্রবেশ করছে। ১২:৩৭ মিনিটে তারা কর্নার ত্যাগ করে। প্রদর্শনী রুমের ভেতরে কোন ক্যামেরা নেই। কুয়েট ছাত্রকল্যাণ পরিচালক প্রফেসর ড. বি এম ইকরামুল হক বলেন, কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি একটা গ্রুপ কুয়েটকে আবারও অশান্ত অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে। ১৩ তারিখ রাতে যারা ভিসির বাসভবনে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, রক্তাক্ত কুয়েট কর্ণারেও তাদরেকেই প্রবেশ করতে দেখা গেছে। অতীতে যেভাবে গেস্ট রুম কালচার চালু ছিল, সিনিয়ররা জুনিয়রদের ডেকে নিতো, এখনও আবার সে রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৮ ফেব্রুয়ারীর ঘটনা শিক্ষার্থীদের ট্রমার ভেতরে ফেলেছিল। আমরা চেষ্টা করছিলাম সেখান থেকে তাদেরকে বের করে স্বাভাবিক শিক্ষা জীবন ফিরিয়ে দিতে। আমাদের উদ্যোগ বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমি দপ্তরে মিটিং আহবান করেছি। সবার পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবো। সিসি টিভি ফুটেজে কাউকে সনাক্ত করতে পেরেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারীর সহিংসতার ঘটনায় ৬ মাসের সাজাপ্রাপ্ত ছাত্রদল নেতা সাফওয়ান আহমেদ ইফাজকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। কুয়েটের ভিসি প্রফেসর ড. মাকসুদ হেলালি জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমার কাছে এসে একটা প্রোগ্রাম করতে চায় বলে মৌখিকভাবে জানিয়েছিল। পরে সেখানে কি হয়েছে আমি জানিনা। অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে কুয়েট ছাত্রদল নেতা সাফওয়ান আহমেদ ইফাজের সাথে যোগাযোগ করা হলে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে বলেন, ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের দপ্তরের প্রদর্শনী কর্ণারটি নিজেদের ছবি দিয়ে তারা এক বছরের বেশি সময় দখল করে রেখেছে। এটা কুয়েটের সম্পত্তি, ছাত্রশিবিরের সম্পত্তি না। কিন্ত শিবির এটাকে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করেছে। তাই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাতে এটা মুক্ত করেছে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ অনেক ভালো এবং শান্তিপূর্ণ- দাবি ইফাজের। অপরদিকে কুয়েটের একাধিক সূত্র জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দিন রাতে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা সাফওয়ান আহমেদ ইফাজের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও কর্মচারীদের একটি অংশ মব তৈরি করে পদতাকে বাধ্য করার জন্য ভিসির বাসভবন ঘেরাও করে। এ সময় তারা বাসভবনে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করলেও দরজা না খোলায় ঢ়ুকতে পারেনি। তবে হ্যান্ড মাইকে ভিসি প্রফেসর ডঃ মাকসুদ হেলালিকে গেটের বাইরে এসে তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বারবার ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তিনি বাইরে বের না হওয়ায় তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ সময় কুয়েট শিক্ষা বিভাগের কম্পিউটার অপারেটর ও সদ্য সমাপ্ত কর্মচারী সমিতির পরাজিত নেতা মুহাম্মদ ইমদাদুল হক (এমদাদ মোড়ল) ও সিনিয়র অফিস সহায়ক (কর্মচারী) মোঃ সাইফুল ইসলামকে হ্যান্ড মাইক হাতে ভিসির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এই মবকাণ্ডে কুয়েটের একজন অপসারিত ভিসি ইন্ধন দেন বলে তথ্যে উঠে উঠেছে। বিশেষ করে তিনি অপসারিত হলেও কুয়েটের একটি গেস্ট রুম দখল করে সেখানে শিক্ষক- কর্মচারী ও ছাত্রদের একটি অংশকে বিপথগামী করতে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্রমূলক মিটিং অব্যাহত রেখেছেন বলেও সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে কুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ডঃ মাকসুদ হেলালী এ প্রতিবেদককে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য একটি পক্ষ অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে নির্বাচনের পরদিন মব সৃষ্টি করে তাকে জোর করে পদত্যাগ করানোর চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু বিষয়টি তিনি আগে থেকেই আঁচ করতে পারায় তারা ব্যর্থ হয়। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে পুলিশ এসে মবকারীদের সরিয়ে নেয়। দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সরকার তাকে ভিসি নিয়োগ দিয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তেই তিনি কুয়েট ছাড়বেন। কোন মবের কাছে মাথানত করবেন না।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত