প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ৩, ২০২৬, ৯:৫৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ নভেম্বর ১১, ২০২৩, ৪:১৩ পি.এম
![]()
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জনপদ চুয়াডাঙ্গা। এ জেলার উত্তর-পশ্চিমে মেহেরপুর আর উত্তর-পূর্বে কুষ্টিয়া। মাথাভাঙ্গা নদী অববাহিকার জনপদকে বলা হয় গরুর রাজধানী। রাজধানী থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরের চুয়াডাঙ্গার গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে গবাদি পশুর হাজারো খামার।
গতকাল শুক্রবার থেকে দুই দিনব্যাপী মেলা ঘিরে চুয়াডাঙ্গার টাউন ফুটবল মাঠে আকর্ষণীয় সব পশু নিয়ে বসে কয়েক হাজার খামারির মিলনমেলা। মেলা প্রাঙ্গণে হালকা শীতের সকালে পাতলা কুয়াশার চাদর। এরই ফাঁকে উঁকি দিতেই মাঠের চারদিকে প্যান্ডেল, ভেতরে সারি সারি ঘর। সেখানে শোভা পাচ্ছে নানা রং ও হরেক জাতের গরু। বিশাল দেহের এসব গরু সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
গরুমেলা ঘিরে গ্রামীণ জনপদের খামারগুলোতে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রস্তুতির কমতি নেই। নিজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গরু মেলায় ওঠাতে প্রস্তুত খামারিরা। মাঠের এক পাশে বানানো হয়েছে মঞ্চ। সেখানে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গতকাল মেলা উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাহিদ রশীদ। মেলার আয়োজক সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন এ সময় তুলে ধরেন খামারিদের সুখ-দুঃখের কথা।
তিনি বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর এবারই প্রথম প্রান্তিক পর্যায়ে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা নিয়ে ‘ত্রি-জেলা গরুমেলা’ করা হচ্ছে। তৃণমূলের খামারিদের উৎসাহ দেওয়া, অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রশিক্ষণ ও তাদের দুঃখ-দুর্দশা ভাগাভাগি করে নিতে এমন আয়োজন সারাদেশেই করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাংস উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও কয়েক বছর ধরে আমিষ পণ্যটির দাম বেড়েই চলেছে। তবে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে কাজ করা গেলে মাংসের দাম কমানো সম্ভব বলে মনে করেন ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, ‘মাংসের চাহিদা পূরণে ব্রাহামা জাতের গরু উৎপাদনে এক দশক আগে নানা প্রকল্প নেয় সরকার। খামারিরাও জাতটি লালনপালন করে যখন সাফল্যের মুখ দেখেন, তখন থেকে এটি আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশি জাতের গরু কৃত্রিম প্রজননের জন্য চার ধরনের সিমেন প্রস্তুত করে। আরসিসি, নর্থ বেঙ্গল গ্রে, শাহিওয়াল ও মুন্সীগঞ্জ– এসব জাতের গরু থেকে শুধু মাংস উৎপাদন সম্ভব। দুই বছর বয়সী এ জাতের একটি গরুর মাংস হয় ১২০-১৫০ কেজি। বিপরীতে দেশি গরুর সঙ্গে এসব জাতের পরিবর্তে ব্রাহামার মতো উন্নত জাতের সংকরায়ন করা হলে একই বয়সী গরু থেকে সমান শ্রমে ২৫০-৩০০ কেজি মাংস আহরণ করা সম্ভব। এই একটি পদক্ষেপেই মাংসের উৎপাদন খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব, যা সরাসরি মাংসের দাম কমাতে সাহায্য করবে।’
অনুষ্ঠানে প্রান্তিক খামারিরা বলেন, এ দেশে দুধ ও মাংসের জন্য ভালো জাত দরকার। যেসব অঞ্চলে দুধের গাভি ভালো হয় না, গরম বেশি, ঘাসের জোগান কম, সেখানে ব্রাহামা ব্যবহার করা যেতে পারে মাংসের জন্য। এ হিসেবে কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে মাংসের গরু তৈরির রাজধানী।
এখানকার মানুষ দুধের গরু চান না। বিপরীতে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দুধ উৎপাদন হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য কম দামি গরুর মাংস দরকার, যা ব্রাহামার মাধ্যমেই সম্ভব হবে বলে জানান তারা।
এ সময় সচিব ড. নাহিদ রশীদ বলেন, মাংসের কথা বিবেচনা করে ব্রাহামা আমদানি, প্রজনন ও লালন-পালনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আমরা চিন্তা করব। এ নিয়ে সব পক্ষের মতামত নেব।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুরের পর জমে ওঠে গরুমেলা। টানা অবরোধের কবলে থাকা চুয়াডাঙ্গা শহর ও আশপাশের মানুষ দলে দলে ছুটে আসেন মেলায়। নানা প্রান্ত থেকে আসেন ৩ হাজারের বেশি খামারি। এ আয়োজনে গরু প্রদর্শন ছাড়াও ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, র্যাম্প শো। কম দামে গরুর সুষম খাদ্য তৈরি ও জাত উন্নয়নবিষয়ক দুটি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন বিশেষজ্ঞরা।
র্যাম্প শো মানেই আলোর ঝলকানি, সাজপোশাক, সুরের তালে তালে ক্যামেরার সামনে নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাকে মডেলদের নানা ভঙ্গিতে হেঁটে চলা। কিন্তু চুয়াডাঙ্গায় ব্যতিক্রমী র্যাম্প শোতে হেঁটেছে সুসজ্জিত গরু। একেকটি গরু যেন একেকটি মডেল। বিশাল মঞ্চে হেলেদুলে শাহিওয়াল, হোলেস্টাইন ফ্রিজিয়ান ও ব্রাহামা দর্শকদের মনোযোগ কাড়ে। গতকাল মেলায় বিভিন্ন জাতের ২৫০টি গরু তোলা হলেও বাছাই করা ৩৮টি হেঁটেছে র্যাম্পে।
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা জানান, শিক্ষিত তরুণরা আধুনিক পদ্ধতিতে ষাঁড় পালনে ঝুঁকছেন। মূলত সবার সঙ্গে সবার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠাই এ প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য। মেলার শেষ দিন আজ শনিবার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার।