
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বিশ্বের প্রায় ৩৭০ মিলিয়ন আদিবাসী স্থায়িত্বশীল, কার্বন নিরপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্বন-নেতিবাচক জীবনযাত্রা পরিচালনা করে; যার কারণে তারা হাজার হাজার বছর টিকে আছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে উল্লেখ্যযোগ্য অবদান রাখতে পারছেন। প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় আদিবাসীদের একটি সম্পর্ক রয়েছে। কেননা বিশ্বের বেশির ভাগ আদিবাসীদের ‘বাস’ খুবই প্রকৃতিঘনিষ্ঠ! তাদের জীবন ও জীবিকাও খুবই বেশি প্রকৃতিনির্ভর। বাংলাদেশে ৪৫টি আদিবাসী রয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে এই আদিবাসী মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৩০ লাখ, যা পৃথিবীর অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, জীবনপ্রণালী প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। প্রকৃতি ছাড়া আদিবাসীদের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না; একটি আদিবাসী শিশু জন্মের পর থেকে প্রকৃতির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। কারণ এই প্রকৃতির কাছেই সে প্রয়োজনীয় সবকিছুই পেয়ে থাকে। চাষাবাদ থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, জ্বালানি, আসবাবপত্র, ঔষধ, খাবার-দাবার সবকিছুই আদিবাসীরা প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করে থাকে। বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, খাসি, গারো, পাত্র, ওরাঁও, হাজং, খারিয়া, মুন্ডাসহ অনেকগুলো আদিবাসী বাস করেন। আদিবাসীরা নানান বঞ্চনা, প্রতারণা ও হয়রানির মধ্য দিয়ে তাদের জীবন পরিক্রমা পরিচালনা করেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধা, স্বীকৃতি না পেলেও তারা তাদের মতো করেই এদেশের সমৃদ্ধ উন্নয়ন, অগ্রগতি ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় নিরবে অবদান রেখে যাচ্ছেন। নিজ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে যাওয়ার কৌশল তাদেরকে শিখতে হয় সেই ছোট্টকাল থেকে। এই সংগ্রামময় জীবনে প্রকৃতি তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ায়। তাই তো পাহাড়ের বুকে তারা আশ্রয় নিয়ে নতুন স্বপ্ন রচনা করতে প্রয়াসী হয়, পাহাড়-গাছপালা, লতাপাতা, পশুপাখি, ঝরণা, ছড়া থেকে শিখে নেয় তাদের জীবন ও জীবিকাকে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল।
আদিবাসীদরকে জমির জন্য, ভিটে মাটির জন্য, জুমের জন্য এবং নিজ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য আজীবন সংগ্রাম ও লড়াই করতে হয়েছে। আদিবাসীরা পাহাড় পোড়ে না, গাছ কাটে না, জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে না! কৃষি কাজের জন্য তারা পতিত ও অব্যবহৃত নেড়া পাহাড়ে গাছ রোপণ করে, জৈব সার ব্যবহার করে এবং ফসলে কোন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার না করে উৎপাদন করে। সারা বিশ্বের মানুষ যখন কোন না কোনভাবে প্রাণবৈচিত্র্য হরণ ও প্রকৃতি বিনাস প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠী পাহাড়-বন-জঙ্গলনির্ভর জীবন পদ্ধতি পরিচালনা করে প্রকৃতি ও পরিবেশকে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে অবদান রেখে চলেছেন। আদিবাসীদের এলাকায় গেলে বিশেষ করে খাসিদের গ্রামের গেলে লাখ লাখ দেশি গাছপালা, গুল্ম ও লতা দেখা যায়। প্রাকৃতিকভাবেই এসব গাছপালা ও গুল্ম জন্মলাভ করে। এসব গাছপালা ও গুল্ম নিধন না করে আদিবাসীরা এগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন তাদের নিজস্ব প্রয়োজনেই! তাই তো বলা হয়, যেখানে আদিবাসীদের ‘বাস’ রয়েছে সেখানে এখনও বন টিকে রয়েছে, টিকে রয়েছে হাজারো দেশীয় গাছপালা ও প্রাণবৈচিত্র্য। অথচ দেশে আজ দেশীয় প্রজাতির বদলে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির গাছের বনায়ন চলছে। এসব আগ্রাসী গাছগুলোকে এদেশের পাখি চেনে না, পোকামাকড় চেনে না, চেনে না অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণ ও জীবন। তাই এসব আগ্রাসী গাছের ফুল ও ফল তারা খেতে পারে না। ফলশ্রুতিতে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তসংস্থানে বসবাসকারী প্রাণ ও জীবনের খাদ্যচক্র ব্যাহত হচ্ছে। খাদ্যশৃঙ্খলে অশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার কারণে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে খাদ্যাভাবের কারণে। কিন্তু আদিবাসীদের এলাকায় এখনও অনেক প্রাণী ও ক্ষুদ্র প্রাণ রয়েছে। প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব করেই তাদের জীবন ও জীবিকা আবর্তিত হয়।
আমরা সবাই কমবেশি জানি যে, বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকাংশে প্রাকৃতিক সম্পদকেন্দ্রিক। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যতা তাদের জীবন ও জীবিকাকে যেমন সহজতর করে তুলে তেমনি এসব প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হলে, অপ্রতুল হলে তাদের এই জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হতে বাধ্য। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানান দুর্যোগ প্রকৃতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাসস্থান, খাদ্যচক্র এবং জীবনকে ব্যাহত করেছে। কোন কোন প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে খাদ্যশৃঙ্খলে নানান পরিবর্তনের কারণে। আবার কোন কোন প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিও পরিলক্ষিত হয়েছে, যা প্রকৃতির পরিবেশকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্য হ্রাস পাওয়ায় প্রকৃতিতে সম্পদের যোগান কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আদিবাসীদের নিজস্ব কৌশল ও উদ্যোগ রয়েছে। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনে তারাই সবচে’ বেশি ক্ষতিগ্রস্ততার শিকার হচ্ছেন সেহেতু এ পরিবর্তন মোকাবিলা করে কীভাবে নিজের জীবন-জীবিকা ধরে রাখা যায় সে বিষয়ে আদিবাসীদের নিজস্ব জ্ঞান ও কৌশল রয়েছে। এসব কৌশল ও জ্ঞানের গুণেই এত প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও তারা আজও টিকে আছেন, আজও নিজেদের জীবন-জীবিকা পরিচালনা করছেন। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে আদিবাসীদের বৃহত্তর কোন উদ্যোগ না থাকলেও প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে তারা অভিযোজন এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রশমন (গাছ রোপণ) করেই টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আদিবাসীরা যে কৃষি চর্চা করেন, যে জীবিকা পরিচালনা করছেন, সেগুলো পরিবেশবান্ধব এবং কম কার্বন নিঃসৃত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী হিসাবে বলা যেতে পারে যে, তারা জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে অবদান রেখে চলেছেন নিরন্তরভাবে। খাসিরা বংশপরম্পরায় কম কার্বনভিত্তিক জীবিকা পরিচালনা করে আসছেন। পানচাষের জন্য তারা প্রচুর গাছপালা সংরক্ষণ করেন, প্রয়োজনে বন্ধ্যা জমিতে নতুন গাছপালা রোপণ করেন। জীবিকার তাগিদেরই তারা এ কাজটি করে আসছেন। আমরা জানি, গাছপালা কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম অনুঘটক হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সইড। খাসিরা সামাজিক বনায়ন তো করেই থাকেন উপরোন্তু তারা দীর্ঘদিন থেকে প্রাকৃতিক বন রক্ষা করে আসছেন। বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য আদিবাসীরাও সাধ্যমতো প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করেন। তারা প্রকৃতির কোন ক্ষতি না করেই তাদের প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন-জীবিকা পরিচালনা করেন।
আদিবাসীদের এলাকায় এখনও অসংখ্য প্রজাতির দেশী গাছপালা ও উদ্ভিদ থাকায় নানান প্রজাতির পশু-পাখি, সরীসৃপ, অণুজীব সেখানে বসতি স্থাপন করে। বলা হয়, প্রতিবেশ বা পরিবেশ-প্রকৃতির সাথে আদিবাসীদের একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের কারণে আদিবাসীরা হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতিতে টিকে রয়েছেন। আদিবাসীরা তাদের পুষ্টি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সামাজিক এবং আত্মিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাই নিজের প্রয়োজনেই তাদেরকে প্রকৃতি ও বন সংরক্ষণ করতে হয়। প্রকৃতিতে দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে গত কয়েক দশক থেকেই আদিবাসীরা প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা তাপমাত্রার পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত ও তুষারপাতের গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন এবং ঋতুর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে আসছে সেই দীর্ঘদিন থেকে। তাদের এই বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, জ্ঞান ও অনুশীলনগুলো যার সাহায্যে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে অভিযোজন করে আসছে সেগুলোকে কোনভাবে ছোট করে দেখা উচিত নয়। কারণ এই জ্ঞান, অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণের গুণেই অনন্য জাতিগোষ্ঠী হিসেবে তারা হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারছেন।
আদিবাসীরা তাদের জীবনের মাধ্যমে বন রক্ষা করে চলেছে। মজার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে বর্তমানে যেখানে বন রয়েছে সেখানে আদিবাসীদের বাস রয়েছে। সেটা সুন্দরবন, মধুপুর, সিলেটের পাহাড় ও টিলা সব এলাকাতেই বিভিন্ন আদিবাসীরা বসবাস করে এসব বনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বন সংরক্ষণ এবং জীবিকার তাগিদে নতুন বন সৃষ্টির মাধ্যমে আদিবাসীরাই পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন। এসব বন এবং বনের বিভিন্ন উপাদান তথা উদ্ভিদ, প্রাণীসহ নানান অণুজীব মানুষের কল্যাণ বয়ে এনেছে। আদিবাসীরা এসব প্রাণবৈচিত্র্য স্মরণাতীত কাল থেকে রক্ষা ও সংরক্ষণ করে আসছেন। তাই তো বলা হয় প্রকৃতির সাথে আদিবাসীদের একটি আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।
প্রকৃতি থেকে আদিবাসীরা জীবন পরিচালনার সব ধরনের উপাদান সংগ্রহ করেন। এসব উপাদান বা সম্পদ যাই বলি না কেন সেগুলো মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে। বিজ্ঞানভিত্তিক যেসব গবেষণা পরিচালিত হয়েছে সেগুলোতে বলা হয়েছে প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেশ, প্রজাতি এবং জেনেটিক বৈচিত্র্যের অস্তিত্ব মানুষের স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও যত্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি প্রদান, সংক্রামক ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধ এবং দুর্যোগজনিত বিভিন্ন ঝুঁকি হ্রাস করতে এসব প্রাকৃতিক উপাদান বিশেষ ভূমিকা রাখে। শুধু তাই নয়, প্রাণবৈচিত্র্য বলতে গেলে প্রায় সব ধরনের ঐতিহ্যবাহী ও সিন্থেটিক ঔষুধপত্র তৈরির উপাদান ও উপকরণ প্রদান করে। মানবস্বাস্থ্যের জন্য প্রাণবৈচিত্র্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, প্রাণবৈচিত্র্য মানুষের রোগবালাই নিরাময় ও রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও উপকরণ প্রদান করে। বিশ্বের প্রায় ৭৫% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন গাছ-গাছড়া থেকে তৈরি করা প্রাকৃতিক ঐতিহ্যবাহী ঔষুধের ওপর নির্ভর করে। এছাড়া বর্তমান বিশ্বে সিন্থেটিক যেসব ঔষুধপত্র রয়েছে সেগুলোর ৬০% প্রাথমিক উৎস হচ্ছে প্রাকৃতিক গাছ-গাছড়া বা উদ্ভিদ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মানবসভ্যতায় আদিবাসীদের বিশাল অবদান রয়েছে। কেননা প্রকৃতি, পরিবেশ ও বন ধ্বংস করার সাথে তাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই; বরং প্রকৃতি ও বনকে জীবনের অন্যতম বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেই তাদের জীবন ও জীবিকা পরিচালনা করেছেন; প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করেছেন অনেক সেবা এবং বিনিময়ে প্রকৃতি ও বনকে রেখেছেন সজীব ও জীবন্ত।
আন্তঃনির্ভরশীলতা সম্পর্ক যত বেশি হবে ততবেশি লাভবান হবে মানুষ নিজে। কারণ একমাত্র মানুষই প্রকৃতির সব ধরনের উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ হলে মানুষ তো বটেই প্রকৃতির বিভিন্ন প্রাণও উপকৃত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনও প্রশমিত হবে। কেননা যতগুলো কার্বন নির্গত হবে সেগুলো শোষণ করার মতো গাছ ও বন থাকবে। আদিবাসীরা তাদের জীবন ও জীবিকা দিয়েই প্রকৃতি, বন ও পরিবেশ রক্ষা করে চলেছেন। কম কার্বন জীবন-জীবিকা পরিচালনার মধ্য দিয়েই তারা পৃথিবীকে জলবায়ু দুর্যোগ থেকে রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আজ বিশ্বের সবচে’ বেশি আলোচিত সমস্যা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। বন উজাড় ও প্রকৃতি ও পরিবেশ বিনাসের কারণে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ এদেশের মানুষের অভিযোজনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নানান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০০৮ সালে সরকার বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে যা Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan সংক্ষেপে (BCCSAP) নামে পরিচিত। এই কৌশলপত্র প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতির সাথে বাংলাদেশের মানুষের অভিযোজনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া। বাংলাদেশ সরকার এই কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে জলবায়ু সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিমধ্যে নিয়েছে এবং আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার পথে রয়েছে। আমরা মনে করি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিভিন্ন ধরনের সরকারি উদ্যোগে আদিবাসীদের অর্ন্তভুক্ত করলে আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা যেমন সুরক্ষা পাবে তেমনিভাবে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে সরকারও সফল হবে। কেননা আদিবাসীরা তো তাদের জীবন-জীবিকা দিয়েই এসব কাজ করে আসছেন। এছাড়া আদিবাসীদের বন ও প্রকৃতিনির্ভর জীবিকা স্বীকৃতি দিয়ে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে হবে। এতে করে প্রাকৃতিকভাবেই বন, পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষিত হবে।৯ই আগষ্ট, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের এই বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম’, যা বর্তমানে খুবই প্রাসঙ্গিক। জীবন ধারণের জন্য শুধুমাত্র কোভিড-১৯ এ নয় প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছে বাংলাদেশের আদিবাসীরা। মহামারির মারাত্মক প্রভাব পুরো বিশ্বের সাথে সাথে আদিবাসীদের ওপরও পড়েছে। আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক অস্বীকৃতির রাষ্ট্রে শুধু কোভিড-১৯ এ না সেটা অহরহ আদিবাসীদের ওপর পরিচালিত অন্যায় নির্যাতন, উচ্ছেদ, জবর দখল, অগ্নিসংযোগ, হত্যাকাণ্ড, বঞ্চনা, বৈষম্য মহামারির রূপ ধারণ করেছে। প্রকৃতির বরপুত্র আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত প্রকৃতি-পরিবেশ, বন-জঙ্গল রক্ষা করে গেলেও সেখান থেকে তাদেরকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ, বিতাড়িত করা হচ্ছে। যার দরুণপ্রভাব প্রকৃতি- পরিবেশের ওপর পড়ছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. পল এপ্সটিন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগসংক্রমণ বিষয়ক এক গবেষণায় বলেছেন, “মানুষই তার প্রকৃতি -পরিবেশকে বসবাসের অযোগ্য করেছে তাদের অবিমৃষ্য ক্রিয়াকলাপের দ্বারা।” কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রামেও কিন্তু আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অন্যান্য অধিকারের প্রশ্নগুলো এড়ানো যাবে না। করোনা মহামারিতেও আদিবাসীরা বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জীবন-জীবিকা অতিবাহিত করছে। এই সংগ্রাম যেন থেমে থাকার সংগ্রাম নয়। এই সংগ্রাম অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের সংগ্রাম, সমতলে আলাদা পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের সংগ্রাম, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম, ভাষা রক্ষার সংগ্রাম, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য রক্ষার সংগ্রাম। আদিবাসীদের ভূমি দখল, উচ্ছেদের মত ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। করোনাকালীন সময়েও সেটা বন্ধ থাকেনি। বিভিন্ন অনলাইন নিউজে সেগুলো উঠে এসেছে বারবার। কিছু শিরোনামগুলো তুলে ধরা হল, ‘আর কত উচ্ছেদ হবে ভূমিপুত্ররা।’ ১৬ জুন আমাদের সময়, ‘তানোরে আদিবাসী পল্লীর পুকুর দখলের অভিযোগ’, ১৪ জুন সোনালী সংবাদ, ‘বান্দরবানে উচ্ছেদ আতঙ্কে চাক আদিবাসী’, ২৪ জুলাই জনজাতির কণ্ঠ, ‘নওগাঁয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শতাব্দীপ্রাচীণ শশ্মাণ জবর দখলের চেষ্টা’, ২৫ জুলাই সমকাল, ‘পোরশায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শত বছরের পুরাতন শশ্মাণ জবর দখলের চেষ্টা’, ২৪ জুলাই ইত্তেফাক, ‘সাত দফা দাবিতে গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বিক্ষোভ’, ২০ জুন প্রথম আলো, ‘ঘোড়াঘাটে তহশীলদারের ভুল রিপোর্টের কারণে আদিবাসীদের জায়গা জমি হারাতে হচ্ছে’, ৮ জুলাই দিনাজপুর নিউজ২৪, ‘জুলুম দখলের প্রতিবাদে চাপাইনবাবগঞ্জে রাজোয়ার সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ সমাবেশ’, ১৮ জুলাই দ্য ডেইলি স্টার, ‘আদিবাসীদের নামে মিথ্যা মামলা নির্যাতন: চাপাইনবাবগঞ্জে প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল’, ১৯ জুলাই সমকাল, ‘সম্পাদকীয়: গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বিক্ষোভ-ক্ষোভ নিরসন করুন’ ২১ জুলাই জনজাতির কণ্ঠ, ‘ভূমিকেন্দ্রিক সমস্যা ছাড়াও করোনাকালীন খাদ্য সংকটেও পড়ে যায় আদিবাসীরা।’
প্রচারিত শিরোনামগুলোর মধ্যে কিছু তুলে ধরা হল ‘খাদ্যের অপেক্ষায় আদিবাসী গ্রামগুলো’ ২৬ এপ্রিল নয়া দুনিয়া, ‘দিনাজপুরে ত্রাণের দাবীতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ’ ২০ এপ্রিল দিনাজপুর নিউজ, ‘লকডাউনে আদিবাসী গ্রামগুলোতে খাদ্য সংকট: মতামত’, ১৮ এপ্রিল বিডি নিউজ২৪, ‘শহর থেকে গ্রামে আসা আদিবাসীদের খাদ্য সহায়তা দরকার’, ১৫ জুন জনজাতির কণ্ঠ, ‘করোনা পরিস্থিতিতে আদিবাসীদের পর্যাপ্ত সহায়তার আহ্বান’ আইনিউজ বিডি, ‘ত্রাণ সহায়তাবঞ্চিত গাইবান্ধার ঘরবন্দি ১২০০ সাঁওতাল পরিবার’, ১ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টার, ‘সাঁওতালদের পাশে কেউ নেই’ ৩১ মার্চ সমকাল। মহামারি সময়েও আদিবাসী নারীর ধর্ষণের নিউজ উঠে এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। তারমধ্যে ‘চুনারুঘাটে সাঁওতাল কিশোরীকে দলবেধে ধর্ষণ’, ২২ জুন জনজাতির কণ্ঠ, ‘ধর্ষিত সাঁওতাল কিশোরীর ছবি প্রকাশ: প্রতিবাদ’, ২৪ জুন জনজাতির কণ্ঠ। এছাড়াও ‘দীঘিনালায় এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ পাহাড়ী মেয়ে’, ২৭ জুলাই জন জাতির কণ্ঠ, ‘হিলিতে আদিবাসী ভ্যানচালকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার’, ২ আগষ্ট কালের কণ্ঠ উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য বিষয় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে প্রণোদনাবঞ্চিত আদিবাসীদের চরম বৈষম্য বিগত ৩১ জুলাই প্রথম আলো পত্রিকায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আদিবাসীদের অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে রাষ্ট্র বরাবর নীরব ভূমিকা পালন করেছে। অধিকার প্রশ্নের প্রতুত্তোরে দেখা যায় ব্রিটিশ আমলে আদিবাসীদের পৃথক আবাসভূমি ও পৃথক শাসনব্যবস্থা ছিল। এমনকি পাকিস্তান আমলে ১৯৫৬ ও ৬২ সালের সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল।পরবর্তী দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয়কে হরণ করে বাঙালি নামে আখ্যায়িত করা হয়। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্মারক গ্রন্থে দেখতে পাই পরবর্তীতে সংসদ উপনেতা ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান সাজেদা চৌধুরীও সে সময় সংসদে বলেছিলেন, “সংবিধানে তাদের উপজাতি বা আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তবে তারাও আজকে সাড়ে সাতকোটি বাঙালির সঙ্গে স্বাধীন এবং তাদেরও বাঙালি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।”
সেই প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নও ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন “একটি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার চেয়ে একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কি অধিক মর্যাদাজনক নয়?” ৭২ সালের সংবিধানে আদিবাসীদের অস্বীকার করে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক রূপ পরিলক্ষিত হয়। ‘নিজভূমে পরবাসী ২০০৬, মেসবাহ কামাল ও অন্যান্য’ গ্রন্থে রাশেদ খান মেনন বলেন, “১৯৭২ এ রচিত বাংলাদেশের সংবিধান নিশ্চিত ভাবেই একটি উত্তম বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সংবিধান। কিন্তু এই সংবিধানের প্রজাতন্ত্র, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এমনকি মৌলিক অধিকার ভোগের কোথাও বাংলাদেশের চৌহদ্দির মধ্যে সংখ্যালঘু ৩৭টি জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে উল্লেখ নেই। সংবিধানে এই জাতিগোষ্ঠির অস্তিত্বের অনুল্লেখ রাষ্ট্র কর্তৃক তাদের উপেক্ষা করার এবং বৈষম্যমুলক আচরণ করার পথকেই প্রশস্ত করে দিয়েছে।” সংবিধানে শুধু জাতিগতভাবে নয়, ভাষাগত ক্ষেত্রেও আদিবাসীদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। সংবিধানে ৩ নম্বর ধারায় শুধুমাত্র রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।” এর মাধ্যমে দেশের অন্যন্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে কার্যত স্বীকার করা হয়নি। সংবিধান প্রণয়নের পর অনেকবার সংশোধন করা হল কিন্তু আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়গুলো বরাবরই এড়ানো হয়েছে। পরিশেষে বলতে চাই যে আদিবাসী বান্ধব রাষ্ট্র না হলে আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের স্বীকার হবে। করোনাকালীন সময়েও করুনার পাত্র হয়ে নয় বরং আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অন্যান্য অধিকার প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।
এখন বিবেচনা করা যাক, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখ- অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কোলানিয়াল কিনা? তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক হবে। কারণ অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতি স্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যে সকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন, তারা স্যাটেলার। কারণ এই সংজ্ঞার উপাদানগুলো ইংলিশ OR শব্দ দ্বারা বিভক্ত। আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্য জাতি। আর্যরা উত্তরবঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চাকমা, মারমা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কোলানিয়াল। আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মের বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধির ও গৌরবের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের আদি পুস্তক চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাল রাজারা বাঙালি ছিলেন, যেমন ছিলেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়।
এখন খুব সংক্ষেপে আইএলও কনভেনশনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য, আইন ও রাজনৈতিক বিষয়ের দিকে আলোকপাত করা যাক। বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলো শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক ও আইনি কাঠামো মেনে চলছে না। একই সাথে পরিবর্তন এসেছে ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারাতেও। রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে। শুরুতেই চাকমাদের নিয়ে কথা বলা যায়। চাকমাদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক কাঠামো কোনো কালে ছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণিত নয়। বর্তমানে চাকমারা প্রাচীনকালের বিভিন্ন চাকমা রাজার নানা বীরত্বগাঁথার কথা বলে থাকেন। চাকমাদের লেখা বইতেই বলা হচ্ছে, এগুলো কিংবদন্তি। কিংবদন্তি ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে কিন্তু ইতিহাস হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত নয়।
মোগল আমলে বিভিন্ন মুসলিম নামধারী চাকমা রাজার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু তারা মোগল সুবাদার, চাকমা নয়। চাকমারা তাদের রাজা মেনে নিয়েছিল ও মানতে বাধ্য হয়েছিল। আজকের চাকমা রাজার কাঠামোটি ব্রিটিশদের দেয়া। এর প্রকৃত নাম সার্কেল চিফ। কার্যত তা কালেক্টর বা প্রধান খাজনা আদায়কারী। মোগল বা ব্রিটিশরা তাদের রাজা বলে কোনো সনদ দেয়নি। ব্রিটিশ সরকার সমতলের জমিদারদের জমিদারী বা প্রধান খাজনা আদায়কারী। মোগল বা ব্রিটিশরা তাদের রাজা বলে কোনো সনদ দেয়নি। ব্রিটিশ সরকার সমতলের জমিদারদের জমিদারী দিলেও সার্কেল চিফদের জমির মালিক ছিল ডিস্ট্রিক্ট সুপারিনটেনডেন্ট তথা সরকার। কিন্তু খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে চাকমা সার্কেল চিফ নিজেকে সামন্ত রাজায় পরিণত করেন খাজনা আদায়ের নানা আচার যোগ করে। সাম্যবাদী এমএন লারমা শুরুতে এই সামন্ততন্ত্রের শোষণ থেকে উপজাতীয় জনগণকে মুক্তি দিতে সমাজতান্ত্রিক (বামধারা) আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কিন্তু ’৭২-এর সংবিধান ইতিহাসের গতি পাল্টে দিলেও সন্তু লারমা ও দেবশীষ রায়ের সেই দূরত্ব এখনো বিদ্যমান ভেতরে ভেতরে। কিন্তু এমএন লারমার প্রতিষ্ঠিত জেএসএস বা পরবর্তীকালের ইউপিডিএফ কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কাঠামো নয়, এটি অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো। তাছাড়া সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরাই এখন বিএনপি, আওয়ামী লীগের মতো বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনীতির সাথে জড়িত। এভাবেই চাকমা সমাজেরও নানা পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে উপজাতীয় সংস্কৃতি প্রধানত ধর্ম থেকে উৎপন্ন কিন্তু বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা বাদে অন্যান্য উপজাতীয় জনগোষ্ঠী গড়ে ৯০ ভাগ ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। মারমা ও ত্রিপুরাদের মধ্যেও প্রায় ৫০ ভাগ খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। চাকমাদের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম। কিন্তু চাকমাদের আদি ধর্ম বৌদ্ধ নয়। ব্রিটিশ আমলে রানী কালিন্দী রায়ের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার আগে চাকমা রাজারা মুসলমান ছিলেন। মোগল আমলের পূর্বে তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করত। এভাবে ধর্ম পরিবর্তনের সাথে সাথে উপজাতি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক, আচার-রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির প্রভাবেও পাল্টে গেছে জিবন যাপনও। কয়েকটি অনুষ্ঠান ছাড়া নাগরিক ও সচ্ছল উপজাতিদের নিজস্ব পোশাকের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় না। সেখানকার মিশনারিরাও ধর্মান্তরিত উপজাতিদের পূজা-অর্চনায় বাধা দেয় না, আদিবাসী তকমা ধরে রাখার জন্য।
নিজস্ব বর্ণমালার কথা বলে যদি কেউ বাংলা বর্ণমালা বর্জন করে তাহলেও আদিবাসী বলে আখ্যায়িত করার কোনো কারণ নেই। যদি আদিম পদ্ধতিতে জীবন যাপনের কথা বলা হয়, তাহলে পৃথিবীর আদিম পেশা হচ্ছে কৃষি ও শিকার। সে বিচারে বাংলার কৃষক ও জেলেদের আদিবাসী বলতে হয়। এক কথায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিচারেও বাংলাদেশের উপজাতিরা আদিবাসী নয়।
চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে যারা উস্কে দিতে চায় তারা জানেন না যে, এখানে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও জাতি তাত্ত্বিক তিন দিক থেকে অভিবাসী।

