
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। ৭টি উপজেলা, ৭৭টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই জেলায় চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৪২৪ জন। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তাই সাতক্ষীরায় ভোটের মাঠে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো সংকট।
জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই জেলার মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে আছে। প্রতিবার জাতীয় নির্বাচন এলেই দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বিভিন্ন পথসভা জনসভায় প্রার্থীদের মুখে শোনা যায় মানুষের সমস্যা সমাধানের নানা আশ্বাস। নদীভাঙন রোধ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি- প্রতিটি নির্বাচনি প্রচারণায় এসব প্রতিশ্রুতি নতুন করে উঠে আসে।
তবে ভোটারদের অভিযোগ, এসব আশ্বাস নতুন নয়। আগের নির্বাচনগুলোতেও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ দিনেও সমস্যাগুলোর স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ফলে প্রতিশ্রুতির ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। তাই এবারের নির্বাচনের শুধু বক্তব্য বা ইশতেহার নয়, অতীতের কাজ ও বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনা করেই সঠিক প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে চান জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এ জনপদের ভোটাররা। ইতিমধ্য সাতক্ষীরা উপকূলের ক্ষতবিক্ষত এলাকার মানুষের টেকসই মজবুত ভেড়িবাধ সহ জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নির্বাচনী নানা দলের প্রার্থীরা। তারা উপকূলীয় মানুষের পাশে যেয়ে বিভিন্ন প্রার্থী বিভিন্ন কায়দায় ভোট বাগিয়ে নেওয়ার জন্য ভোটারদেরকে পুনর্বাসন সহ নানা ধরনের সহযোগিতার জন্য ভিন্ন ভিন্ন আশ্বাস দিচ্ছেন।
কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, ইছামতি, মরিচ্চাপসহ একাধিক নদীর ভাঙনে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ, দেবহাটা উপজেলার বহু পরিবার একাধিকবার বসতভিটা হারিয়ে এখন নিঃস্ব। ভাঙন রোধে খণ্ড খণ্ড প্রকল্প নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান না থাকায় সমস্যাটি দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।
বেড়িবাঁধ ভাঙন ও লবণপানির আগ্রাসন
উপকূল রক্ষার প্রধান ভরসা বেড়িবাঁধ। কিন্তু জরাজীর্ণ ও অপরিকল্পিত বাঁধ সামান্য জোয়ার বা নিম্নচাপেই ভেঙে পড়ে। ফলে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে লবণপানি। নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, মিঠাপানির উৎস ও মৎস্য ঘের। এতে করে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব এখানকার স্থায়ী সমস্যা।
আইলা, আম্পান, বুলবুল, ফণি, ইয়াসসহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাতক্ষীরার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করেছে। দুর্যোগের সময় ত্রাণ এলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, টেকসই বাসস্থান ও বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ না থাকায় মানুষ আবারও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসে বাধ্য হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘প্রতিবার নির্বাচন এলে আমাদের এলাকায় নেতারা আসেন, নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার কথা বলেন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। কিন্তু ভোট শেষ হলেই আর কেউ এদিকে ফিরে তাকান না। দুর্যোগ বা পূর্ণিমার জোয়ার এলেই বেড়িবাঁধ ভেঙে বা বাঁধ ছাপিয়ে লবণপানি ঘরে ঢুকে যায়, খাওয়ার পানির জন্য ব্যবস্থা না থাকায় অনেক দূরে যেতে হয়। গত সরকারের সময় এখানে টেকশই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখন কাজ হচ্ছে ধীর গতিতে। এই বাঁধ কবে শেষ হবে জানি না। যারাই নির্বাচিত হোক, তারা যেন আমাদের এই বাঁধের কাজ শেষ করে।’
একই এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে বড় জোয়ার এলেও পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। বেড়িবাঁধ যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। জায়গা জমি না থাকায় এখানে বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটে। আগেও অনেক নেতাদের প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। তাই এবার ভেবেচিন্তেই নিজের ভোট দিতে চাই।’
আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের নদীভাঙন কবলিত এলাকা বিছট গ্রামের বাসিন্দা আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমার ঘর-বাড়ি জমি সব নদীতে চলে গেছে। কয়েকবার জায়গা বদল করে এখন খাস জমিতে বাস করি। এখনো নিশ্চিত কোনো ঠিকানা নেই। নির্বাচনের সময় সবাই ভোট চাইতে আসে, বলে ভাঙন বন্ধ করবে। বাঁধ করে দেবে। কিন্তু ভাঙন বন্ধ হয় না। আমরা এমন একজন মানুষ চাই, যিনি সত্যিই আমাদের বিপদে পাশে দাঁড়াবেন। আমাদের জন্য কাজ করবেন।’
এই উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের হাওলাদার বাড়ি গ্রামের বৃদ্ধ রইচ উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘ এই জীবনে আমি অনেক নির্বাচন দেখেছি। প্রতিবারই নেতারা ভোটের জন্য এই এলাকায় আসেন। তারা বলেন, উপকূলের উন্নয়ন হবে, পানি সমস্যা দূর হবে। কিন্তু বয়সের এই সময়ে এসেও সেই একই কষ্ট ভোগ করছি। এবার আমরা এমন কাউকে চাই, যিনি কথা কম বলবেন, কাজ বেশি করবেন।’
সুন্দরবন ঘেঁষা জেলা হলেও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কারণে এখানে বননির্ভর জীবিকার সুযোগ সীমিত হয়েছে। এই এলাকায় কোনো বড় শিল্পকারখানা না থাকায় তরুণদের জন্য নেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ। কৃষি ও মৎস্য খাতে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগের অভাব স্পষ্ট। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে খুলনা, যশোর কিংবা ঢাকায় চলে যাচ্ছেন। অনেক তরুণ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মৌখালী গ্রামের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামে থাকলে পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারতাম। কিন্তু বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় উপায় নেই। আমাদের এলাকায় অনেকে ইট ভাটায় কাজ করে। আমিও কয়েকবার ভাটায় গিয়েছি। তবে সেখানে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। টাকাও কম। এজন্য বর্তমানে ঢাকার একটি বস্তিতে বসবাস করে রিকসা চালাচ্ছি। তবে আমার পরিবার গ্রামে থাকে।’
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমাদের এলাকার অনেক তরুণ এখন গ্রামে থাকে না। কেউ খুলনায়, কেউ ঢাকায়। এখানে যদি কাজের পরিবেশ থাকত, তাহলে কেউ পরিবার ছেড়ে বাইরে যেত না। নির্বাচনের সময় সবাই কর্মসংস্থানের কথা বলেন, কিন্তু ভোটের পর সেই কথার কোনো বাস্তবতা দেখি না।’
কর্মসংস্থানের অভাবে উপকূল থেকে মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা প্রসঙ্গে শ্যামনগরের উন্নয়নকর্মী গাজী ইমরান বলেন, ‘এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের স্থায়ী সুযোগ না থাকায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। কৃষি ও মৎস্য খাতে সম্ভাবনা থাকলেও প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও বাজার সংযোগের অভাবে স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে এখানকার অনেক মানুষ দেশের বিভিন্ন ইটভাটায় কাজ করতে চলে যায়। এর ফলে বছরের প্রায় ৬ মাস এই এলাকাগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে।’
পর্যটন সম্ভাবনাতেও অবকাঠামো সংকট
সুন্দরবনের পশ্চিমাংশে পর্যটনের বড় সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং অনুমতি প্রক্রিয়ার জটিলতায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস সবসময়ই নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশক এই জনপদের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের অধ্যায়। একসময় যে মানুষগুলোর পরিচয় ছিল গর্বিত কৃষক হিসেবে, যাদের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, আজ তারা অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিজেদের আদি পেশা ভুলতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলের মাটি ও পানিতে যে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে, তা কেবল পরিবেশকেই বিপন্ন করেনি; বরং উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার মানচিত্রে এক স্থায়ী ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এনেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। দিগন্তজোড়া আমন ধানের খেত ছিল এখানকার সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু গত ২৫ বছরে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ার ফলে ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যে জমিতে আগে বছরে দু-তিনবার ফসল ফলত, সেখানে এখন বছরের অধিকাংশ সময় লোনা পানি থৈ থৈ করে। ফলে হাজার হাজার কৃষক তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষি পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো শৌখিন পেশা বদল নয়, বরং এটি হলো সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি বা টিকে থাকার কৌশল। একজন কৃষক যখন দেখেন তার চোখের সামনে সোনার ফসল নোনা পানিতে জ¦লে যাচ্ছে, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
উপকূলীয় জীবিকা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকে পড়া। গত দুই দশকে এই অঞ্চলটি কার্যত চিংড়ি মহলে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সাদা সোনা বা হোয়াইট গোল্ড, কিন্তু এই সোনার পেছনের গল্পটি বেশ করুণ।
কৃষি জমিতে লোনা পানি আটকে চিংড়ি চাষ করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও এটি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন ঘটিয়েছে। কারণ, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে যে পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার চেয়ে অনেক কম শ্রমিকের দরকার পড়ে। ফলে কৃষিজমি যখন ঘেরে রূপান্তরিত হয়, তখন বিপুল সংখ্যক কৃষি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তাছাড়া, এই পেশাগত পরিবর্তনে এক ধরণের শ্রেণি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা ধনী ও বড় জমির মালিক, তারা চিংড়ি চাষ করে আরও ধনী হয়েছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক, যার অল্প জমি ছিল, তিনি লোনা পানির কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একসময়ের স্বাধীন কৃষক আজ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরের পাহারাদার বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। এই পেশাগত অবনমন বা ‘ডি-ক্লাসিফিকেশন’ উপকূলীয় সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের এই পালাবদলে যারা কাজ হারিয়েছেন, তারা কী করছেন? গত দুই দশকে উপকূলে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যা মূলত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া। কৃষিকাজ হারানো মানুষেরা এখন ভ্যান-রিকশা চালানো, ইজিবাইক চালনা, চায়ের দোকানদারি কিংবা ইটভাটায় শ্রম বিক্রির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বনজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ কিংবা নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা। লোনা পানির কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র বদলাচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যারা নদী বা বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন, তারাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২৪-এর রেমাল পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বহু মানুষ ত্রাণ নির্ভর হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের কর্মজীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন সংসারের হাল ধরতে নারীরাও ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হন। গত দুই দশকে চিংড়ির পোনা ধরা বা রেণু সংগ্রহ উপকূলীয় নারীদের অন্যতম প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোমর সমান লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে এই নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। লোনা পানির সংস্পর্শে তাদের চর্মরোগ, জরায়ু সংক্রমণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হচ্ছে। তবুও, অভাবের তাড়নায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ছাড়তে পারছেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা যেখানে বাড়ির আঙিনায় বা কৃষি কাজে সহায়তা করতেন, এখন তারা লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
যখন স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হন এলাকা ত্যাগ করার। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এদের বড় একটি অংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু।
গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশা চালাতে, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নিম্নবেতনের শ্রমিকে পরিণত হতে। খুলনা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ সাতক্ষীরা, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন উপকূলের জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রামে এখন কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা কমছে, পড়ে থাকছে কেবল বৃদ্ধ ও শিশুরা।
২০০০ থেকে ২০২৫ এই পঁচিশ বছরে উপকূলের মানুষের জীবিকার ধরণ যেভাবে বদলেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করা উচিত। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ এবং তার ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সংকট যদি এখনই মোকাবিলা করা না যায়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে জনশূন্য লোনা মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা। প্রথমত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে এমন শস্য ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, যাতে কৃষকরা আবার তাদের মূল পেশায় ফিরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে লোনা পানি প্রবেশ না করে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় যুবকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কৃষি বা চিংড়ির বাইরেও সম্মানজনক পেশা গড়তে পারে। সর্বোপরি, সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
লবণাক্ততা আজ উপকূলের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এই নিয়তির কাছে হার মানলে চলবে না। কৃষকের লাঙল হয়তো আর আগের মতো চলবে না, কিন্তু তাদের কর্মঠ হাতগুলোকে কর্মহীন রাখা যাবে না। উপকূলের মানুষের জীবিকা রক্ষা মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা।সাতক্ষীরা উপকূলের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধের পাশে ঝুপড়ি ঘরে থাকেন সখিনা খাতুন। ১৬ বছর আগে স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন। এখন স্থানীয় কাঁকড়া খামারে তিন হাজার টাকা বেতনে কাজ করে সংসার চালান ৪৬ বছরের এই নারী। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিধ্বস্ত হয়েছিল তার ঘর। স্থানীয় এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘরটি পুনরায় নির্মাণ করেন। ঋণ শোধ হওয়ার আগেই পরের বছর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘর। আবারও ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘর করেন। গত জুলাই মাসে খোলপেটুয়া নদীর পানিতে প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘর। ভাঙা-গড়ার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম যেন তার নিত্যসঙ্গী। জীবনের গ্লানি টানতে টানতে এখন ক্লান্ত তিনি। অনেকটা উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছেন।
ভাঙা-গড়ার নিয়তিতে পড়েছেন সখিনার মা আলেয়া বেগমও। তার ঘরটি ভেঙেছে পাঁচবার। প্রতিবারই ঋণ নিয়ে ঘর করেছেন। এভাবে ঘর নির্মাণ করতে করতে তারা এখন নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত।
শুধু সখিনা কিংবা তার মা আলেয়া বেগম নন; প্রতি বছর নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলের বাসিন্দারা। দিনদিন বাড়ছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা। সহায়-সম্পদ হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। নেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এভাবে ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে উপকূলে। এতে সহায়-সম্পদ হারানোর পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসার অভাব, নারী-শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা জীবনযাত্রা ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে। উপকূলের এমন অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, উপকূলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এলাকায় কাজ না থাকায় বাড়িতে নারীদের রেখে কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন পুরুষরা। তখন পরিবারের নারী-শিশুরা নানা নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সখিনা খাতুন বলেন, ‘এ বছর বড় ধরনের ঝড় আসেনি। সেজন্য ঘরটি টিকে আছে। কিন্তু ঘরের কিছু অংশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় পড়ায় সরিয়ে নিতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। না হলে ভেঙে দেবে বলে নোটিশ দিয়েছে। ঘর সরাতে অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু টাকা পাবো কোথায়?’
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দুর্গবাঢী এলাকার সদানন্দ মন্ডল বলেন, ‘আমাদের কষ্টের শেষ নেই। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমার ঘর অনেকবার ভেঙেছে। ২০১৯ সালে ফণীতে বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। স্থানীয় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে আবারও ঘর তুলি। বছর না ঘুরতেই আম্পানের আঘাতে ভেঙে যায়। আবার ঋণ নিয়ে ঘর করলে পরের বছর ইয়াসে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এরপর আমার মামা এলাকা ছেড়ে চলে যান। তার ঘরটি আমাকে দিয়ে যান। গত জুলাই মাসে বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরটি। দুর্যোগে বারবার ঘর ভাঙে, বারবার ঋণ নিয়ে ঘর করি। ভ্যান চালিয়ে ঋণ শোধ করি। এভাবে জীবন চলে না। মন চায় অন্য জায়গায় চলে যাই। কিন্তু যাওয়ার জায়গা নেই।’
প্রতাপনগরের হাওলদারবাড়ি এলাকার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আম্পানে আমাদের ঘরবাড়ি চলে গেছে নদীতে। শুধু আমার নয়, এলাকার অনেকের ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে। আত্মীয়-স্বজন কারও ঘর নেই। আমার বড়ভাই খুলনায় চলে গেছেন। আমি এখন শ্বশুরবাড়িতে থাকি। কখন এই ঘর ভেঙে যায় সে আতঙ্কে আছি।’
দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার মিজানুর রহমান বলেন, ‘খরা, ঝড়, বৃষ্টি ও নদীভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আইলার পর থেকে গোটা এলাকা উদ্ভিদশূন্য। লবণাক্ততার কারণে সব গাছ মারা গেছে। এলাকায় বসবাস করা খুবই কষ্টের। বাঁধের অবস্থা নাজুক। বেড়িবাঁধ হলে পানি প্রবেশ করতো না। বাঁধ না থাকায় প্রতিবছর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। পুরো বছর সুপেয় পানির অভাবে থাকতে হয়। খুব খারাপ অবস্থায় আছি আমরা।’
প্রতাপনগরের স্বেচ্ছাসেবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছর দুর্যোগে এলাকার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কোথায় গেছেন জানি না। এলাকায় কাজ নেই। সুপেয় পানির সংকট। ফলে মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয়দের কাছে শুনেছি, এলাকার অনেকে খুলনা, নড়াইল ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। যারা আছেন তারা খুব কষ্টের মধ্যে দিন পার করছেন।’
প্রতাপনগরের বাসিন্দা ও গ্রাম্য চিকিৎসক আব্দুস সবুর বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর দুই বছর ধরে পুরো ইউনিয়নের প্রতিটি বাড়িতে জোয়ার-ভাটা চলছিল। জোয়ার-ভাটার কারণে অনেকের বাড়ি খালে বিলীন হয়ে গেছে। সেসব মানুষ কোথায় চলে গেছেন জানি না, তারা আর ফেরেননি।’
তিনি বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে পুরো ইউনিয়নের মানুষ। লবণাক্ত পানিতে বসবাস করার ফলে চর্মরোগ, কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগ লেগেই আছে। লবণাক্ত পানির জন্য নারীদের অকাল গর্ভপাত ঘটছে। ফলে বাড়ছে না জনসংখ্যা। কৃষিজমি নেই বললেই চলে। যা আছে তাতে ফসল হয় না। গো-খাদ্যের চরম সংকট। চিংড়ি চাষে দেখা দিয়েছে মন্দা। এখানে মানুষের বসবাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের একপাশে কপোতাক্ষ নদ আরেক পাশে খোলপেটুয়া নদী। দুই নদীর ২৫-৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশ এলাকা জরাজীর্ণ। প্রতিবছর নদীগুলোর পানি বাড়লেই লোকালয়ে ঢুকে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। বাঁঁধগুলো ষাটের দশকে তৈরি। এরপর নামমাত্র সংস্কার হয়েছে। দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও মাছের ঘের ভেসে নিঃস্ব হয়ে যায় মানুষ। দুর্যোগের পর তারা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে, পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথায় বসবাস করবে, কোথায় যাবে এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে। ফলে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এখানে আশ্রয়কেন্দ্র নেই। স্থায়ী বাঁধ না হওয়ায় প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে উপকূল।’
ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকা
উপকূলীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল বলেন, ‘দিনদিন পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ছে। সে কারণে দুর্যোগও বাড়ছে। এসব দুর্যোগ বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় সাতক্ষীরা উপকূলে আঘাত হানে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে লবণাক্ততা বাড়ছে। মাছ চাষ, কৃষি ও চাষাবাদ ব্যাহত হয়েছে। এখানের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস চিংড়ি চাষ। অথচ এখন চিংড়ি চাষ কমে গেছে। বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়ছে। এখানের পুরুষরা তাদের সন্তান-স্ত্রীদের রেখে অন্য এলাকায় কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন। অনেকে এলাকায় ফিরছেন না। অনেক পুরুষ অন্য এলাকায় গিয়ে বিয়ে করে স্থায়ী হচ্ছেন। ফলে বোঝা টানতে হচ্ছে নারীদের। অনেক ক্ষেত্রে ওই পরিবারের নারীরা হয়রানির শিকার হন। এখানে বসবাসের জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করলে কয়েক বছর পর এসব এলাকায় মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক আশেক-ই-এলাহী বলেন, ‘খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূলকে বিশেষ দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা করতে হবে। এই ঘোষণার ফলে সরকারের নজর পড়বে। সেইসঙ্গে সমন্বিতভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য একটি কমিটি দরকার। যারা প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারকে দেবে। তার আলোকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবে সরকার।’
জেলা পরিসংখ্যান অফিসার রকিব হাসান বলেন, ‘২০০১ সালের জনশুমারির তথ্য অনুয়ায়ী উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার জনসংখ্যা ছিল তিন লাখ ১৩ হাজার ৭৮১ জন। এর মধ্যে নারী এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৮৭ জন এবং পুরুষ এক লাখ ৬০ হাজার ২৯৪ জন। ২০১১ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, তিন লাখ ১৮ হাজার ২৫৪ জন। এর মধ্যে নারী এক লাখ ৬৪ হাজার ৮১৩ এবং পুরুষ এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৪১ জন। এই তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১০ বছরে এই উপজেলার ১২ ইউনিয়নের জনসংখ্যা বেড়েছে চার হাজার ৪৭৩ জন। তবে নারীর সংখ্যা বেড়েছে ১১ হাজার ৩২৬ জন। অপরদিকে পুরুষের সংখ্যা কমেছে ছয় হাজার ৮৫৩ জন। ২০২২ সালের জনশুমারির জেলাভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও উপজেলাভিত্তিক প্রতিবেদন হতে আরও তিন-চার মাস লাগবে। তখন এলাকার মানুষের চিত্র জানা যাবে। তবে আমাদের ধারণা, এখানে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অনেক মানুষ এলাকা ছাড়া হয়েছে। সে কারণে অনেকে গণনার বাইরে রয়ে গেছেন।’
জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় এলাকায়। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও মাটির লবণাক্ততা উপকূলের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতের সময় অধিক শীত, গরমে প্রচণ্ড গরম এবং বর্ষায় অতিবৃষ্টির ফলে বন্যা বাড়ছে। এছাড়া জলোচ্ছ্বাসে নদীভাঙন বাড়ছে। ফলে এসব এলাকার মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘২০০৭ সালের পর এই অঞ্চলে ২০টির অধিক ঝড় আঘাত হেনেছে। ২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় রেশমি নারগিস আঘাত হানে। ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। ২০১৩ মহাসেন, ২০১৫ সালে কোমেন, ২০১৬ সালে রোয়ানু, ২০১৮ সালে তিতলি ও গাজা সেভাবে প্রভাব না ফেললেও ২০১৯ সালের ৪ মে ফণী, ২০২০ সালের ২০ মে আম্পান এবং ২০২১ সালের ২৩ মে ইয়াসের আঘাতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলীয় মানুষ। তবে সিত্রাংয়ের তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।’
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) সাতক্ষীরা উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. বাবুল আক্তার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় দিন দিন লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলের মাটি ও পানি পরীক্ষা করে দেখেছি, মার্চ-এপ্রিলের পর থেকে ২০-২৫ ডিএস মিটার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। এপ্রিলের আগে ১০-১২ ডিএস মিটার পাওয়া যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় ৮ ডিএস মিটারের নিচে লবণাক্ততা কখনও নামে না। লবণাক্ততা ৩-৪ ডিএস মিটার থাকলে ধান উৎপাদন কঠিন হয়ে যায়। নিয়মিত এই মাত্রার লবণাক্ততার মধ্যে মানুষ বসবাস করলে শারীরিকভাবে বিভিন্ন সমস্যা হয়। প্রতিবছর যেভাবে লবণাক্ততা বাড়ছে তাতে একসময় উপকূলীয় এলাকা বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়বে। লবণ সহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের গাছ উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।’
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই এলাকার কৃষিজমি কমে গেছে। সে কারণে অনেক মানুষ ইটভাটা এবং দিনমজুর হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় কাজের জন্য যান।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত