জন্মভূমি রিপোর্ট : আজ ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের মধ্যদিয়ে শুরু হচ্ছে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনে এবার ক্ষমতাসীন দলের প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী দূর্বল। যেকারণে আওয়ামীলীগ মণোনীত প্রার্থীরা অনেকটাই রিলাক্সমুডে আছেন। তবে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়ানোটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। গত ১২ জুন খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন। ভোট পড়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩৩টি। অর্থ্যাৎ ৪৭.৮৮% ভোট কাষ্ট হয়েছিলো। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারণে ভোটার উপস্থিতি অনেকটাই বেড়েছে বলে মনে করেন খুলনার রাজনৈতিক নেতারা। তবে জাতীয় নির্বাচনে এ সুযোগটি নেই। বিরোধীদল হিসেবে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনেরমতো দলের নির্বাচনে না আসায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের। ক্ষমতাসীন দলের খুলনার নেতারা বলেছেন, প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে ভোটাররা উজ্জীবিত হবে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড নিয়েই তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাবেন।
মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, নির্বাচনে যদি ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার উপস্থিত হয় তাতেও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কূটনীতিকরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চেয়েছেন। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে। ভোটার উপস্থিতি হয়তো একটু কম হবে। আমাদের সংবিধানে তো এমন কোনো বিধান নেই যে ন্যূনতম কত শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ না করলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। অংশগ্রহণমূলক বলতে জনগণের অংশগ্রহণ বোঝায়। বাংলাদেশের ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সব বয়সী- সকলে মিলেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মানেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তিনি বলেন, ভোটাররা নিজেদের মন থেকেই আসবেন। কারণ তারা উন্নয়নের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে। তাদের যে আগ্রহ সেটা প্রমাণ করার জন্যই তারা আসবেন। তাদের উৎসাহিত করার জন্য আমাদের বিশেষ কিছু করতে হবে না। আমাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার কারণে তারা আসবেন।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম ডি এ বাবুল রানা বলছেন, বিগত দুই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি বেশি হবে। বিশেষ কোনো দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও নির্বাচনে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পক্ষে আগ্রহের বিষয়টি প্রমাণ করার জন্যই ভোটাররা ভোট দিতে আসবেন। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের উৎসাহিত করতে আওয়ামী লীগের বিশেষ কিছু করতে হবে না।
আওয়ামীলীগের সংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী এস এম কামাল হোসেন বলেন, সব কিছুকে উপেক্ষা করে আমার বিশ্বাস গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকরূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সারা বাংলাদেশের জনগণ ভোটকেন্দ্রে যাবে, উৎসবমুখর পরিবেশে তারা ভোট দেবে। আমি মনেকরি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে পারলে একটা আলাদা অনুভূতি হতো। যারা প্রতিপক্ষ সবাই শক্তশালী। কিন্তু এটাবাস্তবসত্য বিএনপিসহ যে জোট, সেই জোট নির্বাচনে আসলে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতো। কিন্তু যারা আছে তাদের দিয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের অংশগ্রহণ কিনা, সেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে আমরা বিশ্বাস করি। এই নির্বাচনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে ভোটকেন্দ্রে নেওয়া আমার এবং আমাদের সাথে দলের যে সমস্ত নেতৃবৃন্দ কাজ করছে, তাদের মূল চ্যালেঞ্জ। ভোটকে যাতে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, কেউ আমাদের ভেতরে ঢুকে নির্বাচনের দিনে ভোট প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে এমন কাজ না করতে পারে এটাও আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। আমরা এ ব্যাপারেওসতর্ক থাকবো।
এদিকে খুলনা আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, খুলনায় মহানগরীসহ জেলার ছয়টি আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১০ লাখ ৮৪ জন ও নারী ভোটারের সংখ্যা ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৮৪ জন। এছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৪ জন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ১৮ লাখ ১ হাজার ২ জন। এবার ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮০ জন।
খুলনা-১ আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ননী গোপাল মন্ডল। এই আসনে সরকারী দলের এই প্রার্থী এগিয়ে থাকবেন এটা নিশ্চিত। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক সচিব প্রশান্ত কুমার রায় প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। সমর্থনকারীদের জাল স্বাক্ষর ও নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর না করায় স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায়ের প্রার্থীতা বাতিল হলে আপীলের মাধ্যমে প্রার্থীতা ফিরে পেয়েছেন। সচিব থাকাকালে তিনি এলাকার বেশকিছু উন্নয়ন কাজ করেছেন। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছেন কাজী হাসানুর রশিদ। ননী গোপাল মন্ডল জয়ী হবেন এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। খুলনা-২ ও খুলনা-৩ আসনে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দি নেই। খুলনা-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরর হমানের ভ্রাতুস্পুত্র শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল জয়লাভ করবেন এটা প্রায় নিশ্চিত।
এক সময়ের শ্রমিক অধ্যাষূত খুলনা-৩ আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন। তুখোড় রাজনীতিবিদ এই প্রথম মনোনয়ন পেলেন। এ আসনের বর্তমানসংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এবার দলীয় মনোনয়ন পাননি। স্বতন্ত্রও দাড়াননি। ফলে এ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দি না থাকায় এস এম কামালের জয়সু-নিশ্চিত বলা যায়।
খুলনা-৪ আসনে আওয়ামীলীগের টিকেট পাওয়া বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুসসালাম মুর্শেদী হেভিওয়েট প্রার্থী। এখানে মনোনয়ন বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম মোর্তজা রশিদী দ্বারার মনোনয়ন আপীলেও টেকেনি। তিনি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। আদালতের মাধ্যমে মনোনয়ন ফিরে পেলে এ দুজনের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। এসএম মোর্তজা রশিদী দ্বারা হলেন প্রভাবশালী জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক হুইপ প্রয়াত এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার ভাই। সুজা এলাকায় অনেক উন্নয়ন করেছেন। সেকারণে এ আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন এস এম মোর্তজা রশিদী দ্বারা প্রার্থীতা ফিরে পেলে কঠিন লড়াইয়ের সম্মূখীন হবেন বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদী। আর দ্বারা প্রার্থীতা ফিরে না পেলে সহজেই জয়লাভ করবেন সালাম মূর্শেদী।
খুলনা-৫ আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। এ আসনে তিনি একাধিকবার বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আরেক হেভিওয়েট আওয়ামীলীগ নেতা ও ফুলতলা উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আকরাম হোসেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে তিনি চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু স্বতন্ত্র শেখ আকরাম হোসেন ঋণ খেলাপী হওয়ার কারণে তার প্রার্থীতা বাতিল হয়েছে। আপীল করেও প্রার্থীতা ফিরে পাননি। তিনিও হাইকোর্টের স্বরনাপন্ন হয়েছেন। এখন আদালতের মাধ্যমে তিনি যদি প্রার্থীতা ফিরে পান তাহলে এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এটা নিশ্চিত।
আওয়ামীলীগ নেতা ও ফুলতলা উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আকরাম হোসেন আদালতের মাধ্যমে প্রার্খীতা ফিরে পাবেন বলে আশ প্রকাশ করেছেন। আর ফিরে না পেলে খুব সহজেই ৫ বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন নারায়ণ চন্দ্র চন্দ।
খুলনা- ৬ আসনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী রয়েছেন মো.রশীদুজ্জামান। তিনি সাবেক পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ আসনে জাতীয়পার্টির হেভিওয়েটপ্রার্থী হলেন মো. শফিকুলইসলাম মধু। তিনি জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদেও প্রতিদ্বন্দিতা করেছেন। শফিকুল ইসলাম মধু আপীলের মাধ্যমে প্রার্থীতা ফিরে পেয়েছেন। এ আসনেলড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা আছে এ আসনে। তবে একটি সূত্র বলেছে ক্ষমতাসীন দল যদি শরীকদের জন্য এ আসনটি ছেড়ে দেয় তাহলে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম মধুর জয়ের সম্ভাবনা শতভাগ নিশ্চিত বলা যায়। তবে সবকিছ নির্ভর করবে কেন্দ্রের সমঝোতার উপর।
এদিকে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামীলীগের নতা-কর্মীরা।
খুলনা মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এম ডি এ বাবুল রানা বলেন, আমরা প্রচার-প্রচারণায় খুলনার উন্নয়নের দিকগুলোকে বেশী গুরুত্ব দেব। তিনি বলেন, দলীয় নির্বাচনী ইশতেহার এবং খুলনার ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সাধারণ ভোটারদের কাছে তুলে ধরবো। গত ১৩ নভেম্বর খুলনার জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯টি চলমান প্রকল্প উদ্বোধন করেন। ওই সভায় খুলনার উন্নয়নে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে আরো ১৮ দফা দাবি প্রধানমন্ত্রীর নিকট তুলে ধরা হয়। এসব বিষয়গুলো আমরা প্রচার-প্রচারণায় তুলে ধরবো। আশাকরি খুলনার মানুষ তাদের প্রয়োজনে স্বতঃস্ফুতভাবে ভোট কেন্দ্রে যাবে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত