
একাধিক বিষয় সামনে রেখে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশসহ একাধিক সংস্থা
খুলনা(১২ এপ্রিল)
তিন বছরের শিশু মুসকান জানে না তার বাবা আর কখনও তাকে আদর করবেনা। মা ও ফুফুর কোলে বসে এপাশ ওপাশ ঘুরে ফিরে খুঁজছে তার বাবাকে। তাকে প্রতিবেশীরা শান্তনা দিচ্ছে একটু পরেই বাবা বাড়ি আসবে আর তোমাকে আদর করবে। কিন্তু সে জানেনা দুর্বৃত্তের হাতে শনিবার দিবাগত গভীর তার বাবার মৃত্যু হয়েছে।
আজ রোববার দুপুরে নগরের খালিশপুর নয়াবাটি এলাকায় ১০ নং ওয়ার্ড তাতী দলের সভাপাতি নিহত সোনামিয়ার বাসায় গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।
শনিবার দিবাগত গভীর রাতে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে তাঁতী দল ১০ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মো. সোনামিয়া (৩৮) নিহত হন। শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে খালিশপুর নয়াবাটি এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনায় জড়িত কাউকে পুলিশ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি। নিহত সোনামিয়া নয়াবাটি এলাকার বাসিন্দা জব্বার সরদারের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানায়, খালিশপুর নয়াবাটি এলাকায় সোনামিয়ার একটি ভ্যারাইটিজ স্টোর ছিল। প্রতিদিন গভীর রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যেতেন তিনি। শনিবার রাত ১২টার দিকে দোকানে থাকা অবস্থায় একটি মোটরসাইকেলে কয়েক যুবক এসে তাঁর ওপর হামলা চালান। দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।
খালিশপুর থানার এসআই পলাশ কুমার রায় বলেন, ‘রাত ১২টার পর ঘটনাটি ঘটলেও আমাদের সাড়ে ১২টার পরে জানানো হয়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। সোনামিয়ার মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট শেষে মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
জানতে চাইলে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) উপকমিশনার সুদর্শন কুমার রায় বলেন, সোনামিয়া গত রাতে দোকানে বসে ছিলেন। একটি মোটরসাইকেলে আসা তিন যুবক তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। তিনি প্রাণ বাঁচাতে দোকান ছেড়ে দৌড় দিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি কোম্পানির গোডাউনে আশ্রয় নেন। সেখানে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পাগলের ন্যায় প্রলাপ করছে নিহতের মা মরিয়ম বেগম ও তার স্ত্রী সাথী বেগম। তারা হত্যাকারীদের ফাঁসির জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি তুলছে।
এদিকে হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচনে কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে খালিশপুর থানা পুলিশ ও সিআইডি।
আজ রোববার দুপুর সাড়ে ১২ টার কিছুক্ষণ পর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে খুলনার ১০ নং ওয়ার্ড তাতী দলের সভাপাতি সোনামিয়ার ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। মরদেহ এলাকায় নিয়ে গেলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতরণা হয়। আসরবাদ জানাজা শেষে গোয়ালখালি কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে পরিবার জানিয়েছে।
আজ দুপুর ১ টার পরে খালিশপুর নয়াবাটির মোড়ে তার দোকানের সামনে গিয়ে দেখা যায় রাস্তার ওপর রক্তের ছোপ রয়েছে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠনটি আজ বন্ধ। সেখানে এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরণের আবেগ কাজ করতে দেখা যায়।
এলাকার বাসিন্দা তালহা নামে এক যুবক জানান, সোনামিয়া একজন ভাল লোক। বিএনপি’র রাজনীতির সাথে জাড়িত তিনি। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তার দোকানে বসে আড্ডা দিয়ে বাড়িতে ফিরে যান তিনি। তাকে এভাবে যে খুন হতে হবে তা কখনও ভাবতে পারেনি।
তিনি জানান, মুদি দোকানের পাশাপাশি তার ২০টি ইজিবাইক ছিল। সেগুলো পরিচালনা করে তার বেশ চলছিল। খুনীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি। ঘটনাস্থলে সিআইডি’র কর্মকর্তাদের কাজ করতে দেখা যায়। পুলিশের পাশাপাশি পিবিআইয়ের কর্মকর্তাদেরও কাজ করতে দেখা গেছে।
নিহতে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় প্রচুর ভীড়। পরিবারকে শান্তনা দিচ্ছেন আশপাশের বাড়ির মহিলারা। নিহতের স্ত্রী সাথী বেগম স্বামী হারানোর শোকে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন।
তিনি জানান, ৪ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছে। তাদের দাম্পত্য জীবনে ৩ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। সেই সন্তানকে কিভাবে বড় করবে সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনে তিনি বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুলের হয়ে কাজ করেছেন। তিনি যাদের নিয়ে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে ১২ জন বিএনপি’র প্রার্থীকে ভোট দেয়নি।
এ নিয়ে ওই ১২ জনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। যা তার মোবাইলে ধারন করা আছে। বর্তমানে পুলিশ সেটি পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে। আমার স্বামী সোনা মিয়ার সাথে কারও কোনো বিরোধ নেই কেন তাকে এভাবে মরতে হল। পুলিশকে তদন্ত করে এর সঠিক বিচার দাবি করেছেন।
সাথী বেগম আরো বলেন, তার স্বামী তাতী দলের সভাপতি হলেও ওই দলের কোন নেতা পরিবারকে শান্তনা দিতে বাসায় আসেনি (দুপুর ২ টা পর্যন্ত)। এমনকি কেউ খোঁজও নেয়নি।
নিহত সোনা মিয়ার মা মরিয়ম বেগম জানান, তার ৪ ছেলের মধ্যে সেজো ছেলে সোনামিয়া। সংসারের হাল ধরে রেখেছিল। বাসাবাড়ি ভাড়া করে বেশ ভাল যাচ্ছিল তাদের সংসার জীবন। কিন্তু দুর্বৃত্তের চোখে সেটি সহ্য হলনা। তারা আমার বুকের মানিককে কেড়ে নিল। আমার সন্তান হত্যার সঠিক বিচার চাই। তাছাড়া এ দুধের মাসুম শিশুকে কিভাবে বাবা হারানোর ব্যাথা বুজ দিব।
খালিশপুর থানার কয়েকজন পুলিশ অফিসার বলেন পুলিশ বান্ধব মানুষ ছিল সোনামিয়া। বিভিন্ন সময় থানায় আসতেন। তার ২০টি ইজিবাইক ছিল। কিছুদিন আগে তার দুটি বাইক চুরি হয়ে যায়। এছাড়া কয়েকটি বাইকের মোটর চুরি হয়ে যাওয়ায় তিনি হতাশ ছিলেন। পুলিশ অপর একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন তদবিরে তিনি খালিশপুর থানায় আসাতেন সোনামিয়া।
জানতে চাইলে খালিশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: তৌহিদুজ্জামান বলেন, এলাকায় সুদের ব্যবসা, অলাইনে জুয়া খোরদের টাকা ধার দেওয়া, ইজিবাইকের ব্যবসা এবং কয়েকদিন আগে দু’টি ইজিবাইক চুরি হয় সেগুলো নজরে রেখে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি কিন্তু ঘটনাটি রাতে হওয়ায় পরিস্কারভাবে তা বোঝা যাচ্ছে না।