
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে একটি ব্যতিক্রমী গণভোট। এই দুই প্রক্রিয়া একত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে। ফলে এবারের নির্বাচন পূর্ববর্তী যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতটা পরিচিত ও চর্চিত, গণভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জ তার চেয়ে ভিন্ন ও গভীরতর। কারণ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী গণভোটের ধারণার সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নয়। নব্বইয়ের দশকের পর দেশে আর কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে ভোটারদের বড় অংশ গণভোটের বিষয়বস্তু ও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরোপুরি অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এমন নিশ্চয়তা নেই। শহুরে শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন তরুণদের মধ্যে গণভোট নিয়ে আগ্রহ থাকলেও, প্রবাসী ভোটার, নারী ভোটার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ তারাই ভোটার তালিকার বৃহত্তম অংশ। এই বাস্তবতায় যদি ভোটাররা গণভোটের বিষয় না বুঝে স্থানীয় প্রভাবের ভিত্তিতে ভোট দেন, তবে শতবর্ষব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে এমন জনইচ্ছার যথাযথভাবে প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে।
প্রথমত, গণভোট কী; গণভোট হলো কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব, আইন বা রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি জনগণের মতামত নেওয়া। ইংরেজিতে একে বলে রেফারেন্ডাম। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গণভোট হয়ে থাকে। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে নাগরিকরাই সরাসরি সিদ্ধান্ত দেন। এর মাধ্যমে নাগরিকরা সংবিধান সংশোধন, নীতি পরিবর্তন, শাসন ব্যবস্থা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত জানাতে পারেন। বিশ্বের বহু দেশে গণভোট সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট প্রশ্নে গণভোট, সুইজারল্যান্ডে নিয়মিত নীতিগত গণভোট কিংবা আয়ারল্যান্ডে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট—সবগুলো উদাহরণই দেখায় যে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে অধিক বৈধতা দেয়। তবে একই সঙ্গে এটিও প্রমাণিত যে গণভোট তখনই কার্যকর হয়, যখন ভোটাররা প্রশ্নের তাৎপর্য ও পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকেন। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের জন্য ভোটারের সামনে থাকে প্রার্থী, প্রতীক কিংবা দলীয় পরিচিতি। কিন্তু গণভোটের ক্ষেত্রে এসব কিছুই থাকে না। সেখানে ব্যালটে থাকা প্রশ্নের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটারকে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ মত দিতে হয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনিক গণভোট, ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি এরশাদের গণভোট, ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনী সংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোট। শুরুতেই এবারের গণভোটকে ব্যতিক্রমী বলার কারণ অতীতে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটই ছিল সীমিত ও নির্দিষ্ট বিষয়ে কিন্তু এবারের গণভোটের পরিধি মৌলিক ও কাঠামোগত।
দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন আসে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর কেন এই গণভোটের আয়োজন; বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটাধিকার, নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটেই গণভোট আয়োজিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি ভোটব্যবস্থার প্রশ্ন নয়, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে জনগণের মালিকানা সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য একটা ব্যাপকভিত্তিক সংস্কারের উদ্যোগ স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে গণভোটের মাধ্যমে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মূখ্য সমন্বয়ক, অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে যে অঙ্গীকার রাজনৈতিক দলগুলো করেছেন, একটি সাম্যভিত্তিক, ইনসাফভিত্তিক সমাজ, সেটা প্রতিষ্ঠা করতে গণভোট করা হচ্ছে। সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ‘হ্যাঁ’ বললে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। গণভোটে আমরা কোনো ব্যক্তিকে ভোট দিচ্ছি না; বরং সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে আগামী ৫, ১০, ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে দেশটা কেমন চলবে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটে যখন জাতীয় সংসদ তৈরি হবে, সেই সংসদ সদস্যরা ৫ বছর দেশ চালাবেন। কিন্তু কীভাবে চালাবেন। তারই দিকনির্দেশনা জনগণ দিয়ে দেবেন গণভোটের মাধ্যমে’। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মোটাদাগে গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে পারবেন ভোটাররা। প্রশ্নটি হলো- ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’। সংক্ষেপে বললে গণভোটে উত্থাপিত চারটি প্রস্তাবসমূহে মূলত জানতে চাওয়া হচ্ছে আমরা দেশের জনগণ সবাই মিলে এমন বাংলাদেশ চাই কিনা যেখানে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে। জাতীয় সংসদে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। ক্ষমতাসীন দল ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবেন না। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে অর্থাৎ জনগণের মতামত নিতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন। এমন বাংলাদেশ যেখানে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এবং বিরোধীদলের সম্মতি ছাড়া সরকার জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবেন না। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়ে দেশের ৫২ শতাংশ জনসংখ্যার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বাংলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষাও স্বীকৃতি পাবে। অপরাধ দমনে ও সুবিচার নিশ্চিতে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ইন্টারনেট সেবার মতো মৌলিক অধিকারের সংখ্যা বাড়বে। দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছামতো ক্ষমা প্রদানের সুযোগ থাকবে না। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্মতি লাগবে। এছাড়াও রাষ্ট্রপতি–প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করাসহ জুলাই সনদে একমত হওয়া ৩০টি বিষয় বাস্তবায়ন করা হবে।
এই প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে আসে তরুণ সমাজের দায়িত্ব। তরুণ ভোটাররা, যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চালিকাশক্তি ছিল, তাদের সামনে আবার দায়িত্ব এসেছে শুধু ভোট দেওয়ার নয়, বরং অন্যদের সচেতন করার। নিজ নিজ পরিবার ও কমিউনিটিতে জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে তোলাই হতে পারে তাদের সবচেয়ে বড় অবদান। সরকারও এ লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এবারের নির্বাচনের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক হলো প্রবাসী ভোটাধিকার। পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসী ভোটার, নিজ এলাকা থেকে দূরে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনী হেফাজতে থাকা ভোটারদের জন্যও প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে অংশ নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এটি গণতন্ত্রের পরিধি বিস্তৃত করেছে। নির্বাচন কমিশনের ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ জারিকৃত গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যে সকল ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হবে সেই সকল ভোটকেন্দ্রে একই দিনে একই সময়ে অর্থাৎ সকাল ০৭.৩০ টা থেকে বিকাল ০৪.৩০ টা পর্যন্ত একই সাথে বিরতিহীনভাবে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে তবে পৃথক ব্যালট পেপারে। গণভোটের জন্য নির্ধারিত ব্যালট(ফরম-১) পেপারের রঙ হবে গোলাপি। ভোটারগণ ভোট প্রদান শেষে জাতীয় সংসদের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট একই বাক্সে ফেলবেন। পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে, ভোটার গণভোটের পোস্টাল ব্যালট পেপারে (ফরম-২) হ্যাঁ (∙)/ না (x) এর পাশে ফাঁকা ঘরে টিক(∙) বা ক্রস (x) চিহ্ন দিয়ে তাঁর ভোট/মত প্রকাশ করবেন।
সবমিলিয়ে গণভোটের আলোচ্য বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি কেবল কিছু সাংবিধানিক সংশোধনের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা কোথায় থাকবে এবং কীভাবে তা নিয়ন্ত্রিত হবে এই মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা। যার উপর নির্ভর করছে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন।

