
সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণে গত বছর দুই দফায় মোট ৫৬ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার এক দফায় মাত্র ২৮ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে এবার বননির্ভর মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।” তবে “সুন্দরবনের ওপর চাপ কমাতেই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। আগামী ৩ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে গোলপাতা আহরণ মৌসুম।
এদিকে গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুম সামনে রেখে সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদে এখন নৌকা পুরোপুরি উপযোগী করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাওয়ালিরা। আগামী ৩ মার্চ থেকে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে তাঁরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে গোলপাতা আহরণ করতে পারবেন। ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলবে এ মৌসুম। নৌকা মেরামতের এই সময়কে বাওয়ালিরা বলেন ‘শারণের সময়’।
সূত্র জানায়, সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজবীদের মধ্যে রয়েছে, জেলে, বাওয়ালী, মাওয়ালী। যাঁরা গোলপাতা সংগ্রহ করেন, স্থানীয়ভাবে তাঁদের বলা হয় বাওয়ালি। গোলপাতা বহনের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ নৌকাগুলো আকারে বড় হওয়ায় অনেকেই সেগুলোকে ‘বড় নৌকা’ বা ‘পেটকাটা নৌকা’ নামে পরিচিত। বন বিভাগের অনুমতি অনুযায়ী, ৫০০ মণ (১৮৬ কুইন্টাল) ধারণক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিটি নৌকা ২৮ দিন সুন্দরবনে অবস্থান করে নির্ধারিত স্পট থেকে গোলপাতা সংগ্রহ করতে পারবে।
খুলনার কয়রা উপজেলার বাওয়ালি আবদুল গনী জানান, “তাঁর বড় নৌকাটি তৈরি হয়েছে ১৪ বছর আগে। প্রতি মৌসুমের আগে সেটি মেরামতে লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। বর্তমানে নতুন একটি নৌকা নির্মাণে ব্যয় প্রায় সাত লাখ টাকা।”
তিনি আরও বলেন, “গোলপাতা বহনের এসব নৌকা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না। মৌসুম শেষে তাই সেগুলো নদীর চরে ফেলে রাখতে হয়।
কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া, কয়রা নদীর তীর, দাকোপ, মোংলা, শরণখোলাসহ উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীতে দেখা যায়, নদীর চরে কাত করে রাখা বড় নৌকাগুলোর নিচের পাটাতনে তক্তা বসানো হচ্ছে, কোথাও দেওয়া হচ্ছে আলকাতরার প্রলেপ। কোথাও রং করা হচ্ছে। প্রায় এক মাসের বাজার করে নৌকা ভরছেন কেউ কেউ।
কাঠমিস্ত্রি মোঃ মইজ উদ্দীন জানান, সারা বছরই তিনি নৌকা তৈরি ও মেরামতের কাজ করেন। তবে গোলপাতা মৌসুমের আগে বড় নৌকাগুলোর ‘শারণ’ কাজ বেড়ে যায়। বছরের অন্য সময় সুন্দরবনে যাওয়া জেলেদের নৌকা মেরামতেই ব্যস্ত থাকতে হয়।
বাওয়ালি কামরুল ইসলাম বলেন, “এ বছর নৌকা মেরামতে খরচ বেড়েছে। একটি নৌকায় ১০ থেকে ১১ পাত্র আলকাতরা লাগে, শুধু আলকাতরাতেই খরচ হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় মিস্ত্রি ও শ্রমিকের মজুরি, কাঠ ও লোহা কেনার খরচ এবং বন বিভাগের রাজস্ব। সব মিলিয়ে এক নৌকা গোলপাতা আনতে খরচ পড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি।”
তিনি আরও বলেন, “আগের মতো গোলপাতার বাজার না থাকলেও জীবিকার তাগিদে পুরোনো পেশা ধরে রেখেছি।”
এবার গোলপাতা আহরণের সময়সীমা কমানো হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাওয়ালিরা। সুন্দরবন বাওয়ালি ফেডারেশনের সভাপতি মীর কামরুজ্জামান জানান, “আগে প্রতিবছর দুই দফায় মোট ৫৬ দিনের অনুমতি দেওয়া হতো। এবার এক দফায় মাত্র ২৮ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা বননির্ভর মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “সুন্দরবনের ওপর চাপ কমাতেই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারিত স্পট থেকে গোলপাতা আহরণ করা যাবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি নৌকায় সর্বোচ্চ ১৮৬ কুইন্টাল বা ৫০০ মণ বহনের অনুমতি রয়েছে। অতিরিক্ত বহন করলে দ্বিগুণ জরিমানা করা হবে।” গোলপাতা ছাড়া অন্য কোনো কাঠ সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলেও তিনি জানান।
বনে দস্যুতা প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, দস্যু দমনে নৌ-বাহিনী, কোষ্ট গার্ড, র্যাব, বনবিভাগ যৌথছভাবে কাজ করছে। বাওয়ালীদের নৌকার বহর এক সাথে পাশাপাশি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গোলকূপগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত