
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূল। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ,ঘূর্ণিঝড় ,জলোচ্ছ্বাস সহ নানা মাত্রিক সমস্যার মোকাবেলা করে জীবনের সাথে যুদ্ধ করছেন উপকূলের প্রায় দুই কোটি মানুষ। উপকূলীয় মানুষের এখন একমাত্র দাবী তারা সরকারের কাছে আর্থিক সহতা ,ভাত ,কাপড় এমনকি কর্মসংস্থান চায়না। চায় তারা টেকসই মজবুত ভেড়ি বাধ। সে কারণে বিশেষজ্ঞদের অভিমত সরকারকে প্রতিবছর উপকূল রক্ষা ভেরিবাধের জন্য বাজেটে বড় ধরনের বরাদ্দ রাখতে হবে। তানা হলে উপকূল যদি সুরক্ষিত না থাকে শহরনগর সুরক্ষিত থাকবে না। টেকসই মজবুত ভেড়িবাধের জন্য, পদক্ষেপ নেওয়া অতি জরুরী। নেতিবাচক প্রভাবে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জার্মান ওয়াচের ২০১৭-এর প্রতিবেদনমতে, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশ ১৮৫ বার চরম বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছে, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বিরূপ আবহাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর গড়ে জিডিপির প্রায় ১.৮% হারায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ২% হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, প্রায় ৩২% ভূমি, ২৬.৭১% মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার শিকার এবং এর প্রধান শিকার হয় মূলত দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জনগণ। সাম্প্রতিক একটি গবেষণার তথ্যমতে, গত ৩০ বছরে বঙ্গোপসাগর ও সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর পানির উচ্চতা বাড়ার হিসাব ধরে এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ শতকের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা এক মিটার বাড়লে দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪ শতাংশ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ জনগণ এ উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে (জিডিপি) উপকূল অঞ্চলের অবদান প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ। ২০০৯-১৪ সময়কালে ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোয় বাংলাদেশের মোট খানার ২৫.৫১% ক্ষতিগ্রস্ত (বিবিএসের জরিপ, ২০১৫)। একসময়ের খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার বলে খ্যাত বরিশালসহ যশোর, খুলনা, বাগেরহাট জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিকভাবে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা-১১(গ)তে ২০২০-এর মধ্যে সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবেলায় কার্যকর নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সব পর্যায়ে সামগ্রিক দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ‘সেনডাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশান’-এ ২০১৫-৩০ সময়কালের মধ্যে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোয় দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন ও কার্যকর সাড়া প্রদানে দুর্যোগ-পূর্ববর্তী প্রস্তুতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে মূলত দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২.৫ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে মৃতের হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও এখনো দুর্যোগের ঝুঁকি বিদ্যমান, বিশেষ করে যথাযথভাবে তা চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের আগে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলো এবং গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত ও স্থানীয় ভাষায় জনগণকে ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য জানানোর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, পোল্ডার, আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করার পাশাপাশি খানা বা পরিবারভিত্তিক দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্মাণ জরুরি। উল্লেখ্য, উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ হাজারটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৩ হাজার ৭৫১টি বিদ্যমান। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সম্পদের জোগান না থাকা, কোনো কোনো ইউনিয়নে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম-দুর্নীতি ও বিভিন্ন সরকারের সময় নির্মিত অধিকাংশ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি করায় এবং যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ব্যবহার অনুপযোগী এবং কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছতে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের প্রায় দু-তিন কিলোমিটার কাঁচা ও ভাঙা রাস্তা অতিক্রম করতে হয় (টিআইবি, ২০১৭)।
বাংলাদেশে গত ২৫ বছরে ঘূর্ণিঝড়ের হারের ক্রমবৃদ্ধি লক্ষ্যণীয়, ১৬ বছরে (১৯৯১-২০০৬) মাত্র ছয়টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও পরবর্তী এক দশকে (২০০৭-১৬) পাঁচটি ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস, আইলাসহ ৪৭৮টি মাঝারি ও বড় জলোচ্ছ্বাস এবং বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানই এমন যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সমুদ্রের ফুঁসে ওঠা রাগকে সুন্দরবন বরাবরই মাথা পেতে নিয়ে উপকূলীয় পাঁচ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় রক্ষাকবচ হিসেবে অনন্য অবদান রাখছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা রোধে কিংবা জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা রোধে প্রতিরোধক হিসাবে শ্বাসমূলীয় বন এক ধরনের প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করে। আশঙ্কার বিষয়, ইউনেসকোর প্রতিবেদনে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ভাটিতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ায় সুন্দরী গাছের আগা মরে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। পাশাপাশি উপকূল অঞ্চলে বঙ্গোপসাগর থেকে সুন্দরবনে ঢোকা লোনা পানির প্রভাব কাটানোর জন্য নদ-নদীতে মিঠা পানির যে প্রবাহ থাকা দরকার, মে-নভেম্বর পর্যন্ত তা না থাকায় সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে, যা সুন্দরবনের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মত্স্যসম্পদ, নির্মাণ ও জ্বালানি কাঠ এবং অন্যান্য অবদান বিবেচনায় সুন্দরবনের মতো শ্বাসমূলীয় বনের আর্থিক অবদান হেক্টরপ্রতি কমপক্ষে ৬১ হাজার ডলার (ওয়াইল্ড নেচার সায়েন্স, ভলিউম-২৯৭, আগস্ট ২০০২:৯৫০-৯৫৩)। এছাড়া সুন্দরবনের কাছে সমুদ্রতীরের মত্স্য চাষ এবং জ্বালানি কাঠ, গোলাপাতার ওপর নির্ভর করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী বেঁচে থাকে এবং বড় আকারে স্থাপিত মত্স্য খামারের জন্য সরবরাহকৃত পোনার প্রধান উত্স শ্বাসমূলীয় বনের ভেতরে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাল, নালা।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে যশোার ও চুয়াডাঙ্গাও খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে ২০ শতাংশ আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে; বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে এসব এলাকার ৮০ লাখ একর ফসলি জমি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষা অনুসারে, উপকূলীয় অঞ্চলের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, বরগুনা, বরিশাল, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে ব্যাপকভাবে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত। দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪৩ লাখ একর জমির মাটি লবণাক্ত; নদীগুলোর ৫৬% মারাত্মক লবণাক্ততার কবলে। এর ফলে আয় কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্যের হার এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, লবণাক্ততার ফলে মানুষের জীবন-জীবিকা, জনস্বাস্থ্যসহ কৃষি, মত্স্য চাষ, অবকাঠামো, উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানসহ পারিবারিক ও বাণিজ্যিক কাজে নিরাপদ পানির আশু ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু লবণাক্ততার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে ফসলের জমি হারিয়ে যাচ্ছে এবং খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, লবণাক্ততার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে, যদি শ্বাসমূলীয় বনের আয়তন ১০% বৃদ্ধি পায়, তাহলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবনহানির আশঙ্কা প্রায় ১৩% হ্রাস পায় এবং গৃহপালিত প্রাণী যেমন গরু, ছাগলের প্রাণহানির আশঙ্কা যথাক্রমে ৭% ও ২.২৩% হ্রাস পায় (দাস, ২০০৭)। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হবে। তাই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবন মায়ের মতো আগলে না রাখলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো, তার হিসাব জরুরি। উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমির প্রয়োজন হলেও নির্বিচারে বন নিধনের ফলে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়েছে। চিংড়িঘেরের নামে অবৈধভাবে সুন্দরবনের বাফার জোনের ভেতরের বনভূমি দখলের কারণে ২০০০-১০ সময়কালে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর বন (দক্ষিণাঞ্চলের মোট ভূমির প্রায় ৮%) হারিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা মাত্র ১০০-এর কাছাকাছি নেমে আসার খবর প্রকাশ হয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে বাঘের সংখ্যা কমছে। বর্তমান প্রধান বন সংরক্ষকের তথ্যানুযায়ী, ‘সুন্দরবনের পাশের এলাকার বেশকিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, বন বিভাগের নিচু স্তরের কিছু কর্মকর্তাসহ অনেকেই বাঘ পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে ইন্টারপোল থেকে তথ্য দেয়া হয়েছে।’
এর মাঝে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবনের নয় কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করায় সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায় সুন্দরবনের বাফার জোনের মধ্যে রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ, ইসিএ এলাকায় প্রায় ২০০টি শিল্প ও প্রকল্পকে পরিবেশের প্রাথমিক (অবস্থানগত) ও চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়ার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। ঝড়-দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করলে সুন্দরবনের ক্ষেত্রে এ অবদান অনেক বেশি হবে, যা কয়লা বিদ্যুেকন্দ্রের লাভ-ক্ষতির হিসাব বা ইআইএ প্রতিবেদনে নেই। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তত্কালীন প্রধান বন সংরক্ষক কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক পত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং Landscape Zone-এ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের Royal Bengal Tiger তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।’ সমস্যাটা হচ্ছে, প্রায়ই আমাদের নীতিনির্ধারকরা কোনো প্রকল্পের লাভ-লোকসান হিসাব করতে আর্থিক ব্যয়কেই চোখে দেখেন, কিন্তু পরোক্ষ ক্ষতি তারা বিবেচনা করেন না। কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করা হলে ব্যাপকভাবে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি করবে, হাজার হাজার মানুষের মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়বে এবং জলবাযু পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় অভিযোজন তহবিলের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হবে, যা কাম্য নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন অব কনজার্ভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে সুন্দরবন এবং এর সম্পদের ক্ষতি করবে না, এমন যথাযথ স্থানে সরিয়ে নিতে সুপারিশ করলেও সরকার অনড় অবস্থানে থাকায় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবনকে সুরক্ষা প্রদানে কয়লা বিদ্যুেকন্দ্রসহ এর আশপাশের সব ধরনের স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকাকে সুরক্ষা প্রদানে কমিউনিটিভিত্তিক অভিযোজন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে; স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পানি ব্যবস্থাাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, জোয়ার-ভাটা হয় এমন নদ-নদীগুলোর ক্ষেত্রে জোয়ার নদী ব্যবস্থাপনা (Tidal River Management-TRM), যার সফল উদাহরণ বিলবুনিয়া, এর মাধ্যমে পলি ব্যবস্থাপনার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে অক্ষুণ্ন রেখেই স্থানীয় বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করেই অধিক ফসলের ফলন এবং একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব। পাশাপাশি উপকূলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধানের চারা রোপণ, খাওয়ার পানি ও অন্যান্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহারের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, দীঘি খনন ও সংরক্ষণ, ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণ জরুরি। পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সরকার কর্তৃক আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।
সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে একসময়ের শিল্পসমৃদ্ধ খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সম্পদ একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও অভিশাপ। জাতীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের সম্পদ যদি দেশের কাজে ব্যবহার করার দক্ষিণাঞ্চলের টেকসই সমৃদ্ধি নির্ভর করছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্থানীয় পর্যায় হতে ধাপে ধাপে সংলাপ ও মতামত গ্রহণের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলকে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করার বিকল্প নেই। দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই করে এ অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জকে কার্যকরভাবে মোকাবেলায় জাতীয় ও স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু অভিযোজনকে সমন্বিত করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।ণপ্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার সবসময়ই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে জাতীয় অর্থনীতির আন্তঃসলিলা শক্তির (রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার) উদ্বোধন যার হাতে, সেই সবচেয়ে বেদনায় বিবর্ণ। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো অর্থনীতির অনেক প্রবণতার সূচক সন্ধানে কালাতিপাত করে, কিন্তু উপকূলীয় জেলানিচয়ের আর্থসামাজিক চালচিত্রের খানা-পুরী থেকে শুরু করে ভূমি বণ্টন ব্যবস্থা, চাষাবাদের হালহকিকত, প্রাণিসম্পদের সালতামামি অনেক কিছুরই বাস্তবতার ব্যাখ্যা তাদের কাছে দুঃখজনকভাবে নেই। উপকূলীয় অঞ্চল যেন শুধু দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা সূত্রে সমুপস্থিত, আকালের দিনে নাকালের মোহনায় এবং একমাত্র মিডিয়ায়।
পাঁজি-পুঁথি ও সরকারি পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৯৭ থেকে শুরু করে এই সেদিন গত মে মাসে সর্বশেষ ইয়াস পর্যন্ত মোট ৪৯৪ বার মাঝারি ও মোটাদাগের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, আইলা, নার্গিস, মহাসেন, ফণী, বুলবুল, আম্পান বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি, এসেছে গড়ে ৫-১০ বছর পরপর, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে ১৭৪টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস ঘটেছে ঘন ঘন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
নদীর অববাহিকাই মানবসভ্যতার সূতিকাগার, কৃষিই প্রাচীনতম জীবিকা আর শ্যামল সবুজ প্রান্তরে প্রাণিসম্পদের সমারোহই জীবনায়নের স্পন্দন। বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল যে এসব সত্য ও সম্ভারে সমৃদ্ধ, তা তো চর্যাপদের পাতা থেকেও জানা যায়। সমুদ্র, নদীমেখলা প্রকৃতি আর শ্যামল সবুজ পরিবেশের সংমিশ্রণে উপকূল অঞ্চল গোটা দেশের, সমাজের, অর্থনীতির জন্য অনিবার্য অবকাঠামো শুধু নয়, উন্নয়ন প্রয়াস-প্রচেষ্টায় সার্বিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যও জরুরি। সুপ্রাচীনকাল থেকে ইতিহাসের পথ ধরে এ সত্য সতত সব ভূগোলে স্বীকৃত থাকলেও প্রাচীন এ জনপদে তা যেন সবসময় নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হয় যখন পালা করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সবাই। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পড়ে, তাপমাত্রার পরিবর্তনপ্রসূত তারতম্য সূত্রে সমুদ্রের তলদেশ স্ফীত হয়ে ওঠার ফলে পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে চলেছে বিশ্বের প্রায় সব সমুদ্র উপকূলবেষ্টনীতে, বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী বাংলাদেশের জন্য তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের অশনিসংকেত দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল, বিশেষ করে অদূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই তলিয়ে যাচ্ছে, তা উদ্ধারে বশংবদ কোনো কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য বিপন্ন হতে চলেছে এর প্রভাবে। এবার ইয়াসের অকস্মাৎ জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের মৃত হরিণ ভেসে এসেছে লোকালয়ের নদীতে, সুন্দরবন অভ্যন্তরে তিন শতাধিক সুপেয় পানির জলাধার (যা বন্যপ্রাণীদের একমাত্র পানীয় অবলম্বন) লোনা পানিতে একাকার হয়ে যাওয়ায় সেখানকার প্রাণিসম্পদ আজ নিদারুণ সংকটে।
ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে খাদ্য ও অর্থকরী ফসল উৎপাদন, মত্স্য চাষ ও উৎপাদন বারবার ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনসংক্রান্ত পরিসংখ্যান বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলে শস্য উৎপাদন দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় বাড়েনি, বরং কমছে। উজান থেকে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও চাষাবাদ পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল ততটা আসেনি যতটা শস্য-বর্হিভূত অর্থকরী খাতে অর্থাৎ মত্স্য চাষসহ প্রাণিসম্পদ চাষ ও বিকল্প পণ্য উৎপাদন ক্ষেত্রে এসেছে। এ খাতে আপাত ব্যাপক সাফল্যের ফলে কৃষি থেকে গড়পড়তায় জিডিপিতে এখনো সমানুপাতিক হারে অবদান (২৫%-২৩%) রেখে চলেছে এ অঞ্চল। আলোচ্য খাতের এ সাফল্যকে টেকসই করা যেমন প্রয়োজন, একই সঙ্গে শস্য উৎপাদনে, জমির সঠিক ব্যবহারে, উপায় উপাদান সরবরাহে, চাষ পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটানোয় এবং এমনকি ভূমি প্রশাসনেও সংস্কার আবশ্যক। মোদ্দাকথা, সময়ের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে, তার গতি-প্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে এ জন্য যে একে যথাসময়ে যথাপ্রযত্ন প্রদান করা সম্ভব না হলে, উষ্ণায়নের প্রভাবক ক্ষয়ক্ষতি যথানিয়ন্ত্রণ ও মোকাবেলা করা সম্ভব না হলে সমূহ সম্ভাবনাময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের আবদান থেকে অদূরভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতি শুধু বঞ্চিতই হবে না, সময়ের অবসরে জলবায়ুর পরিবর্তন প্রভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এটি গোটা দেশ ও অর্থনীতির জন্য দুর্ভাবনা-দুর্গতির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশের অন্যতম দুটি সামুদ্রিক বন্দর, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বর্গ সুন্দরবন ও পর্যটন সম্ভাবনা সমৃদ্ধ কক্সবাজারকে কার্যকর অবস্থায় পাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য যে কত জরুরি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিককালে সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াসে সুন্দরবন, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিসম্পদের ওপর যে দুর্বিষহ ও নেতিবাচক প্রভাব প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়, তাতে উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ দেখা দিয়েছে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, গত ২৬ মে প্রবাহিত ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৫ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ঝড়ের প্রভাবে এসব জেলার ২৬ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। দেশের ১৬ জেলার ৮২ উপজেলা এবং ১৩ পৌরসভায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাব পড়ে। আর ঝড়ে মারা গেছে নয়জন। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইয়াসের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, ভারি বৃষ্টির সঙ্গে বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ায় বাঁধ, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। ক্ষতির মুখে পড়ে উপকূলের হাজার হাজার মানুষ। ইয়াসে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এ জেলায় ৯৪ হাজার ৮৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, শ্যামনগর উপজেলার পৌনে ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গেছে। এছাড়া ৬ হাজার ৭৩৮ হেক্টর মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুলনার কয়রা ও পাইকগাছায় এবং বাগেরহাট জেলার শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় ৪৮ হাজার ৯১৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ৫৪৫ হেক্টর মাছের ঘের এবং আট কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ ভেঙে ফসলের জমি লোনা পানিতে তলিয়ে গেছে
উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকছে ফসলের ক্ষেতে। জমির ফসল নষ্টই শুধু নয়, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হাজার হাজার মানুষকে নিঃস্ব করছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মৌসুমি বন্যার পর রিং বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় প্রায়ই বন্যা আঘাত হানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোয়। নদ-নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের চাপে একের পর এক বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা। হু-হু করে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। ডুবছে মাছের ঘের, আবাদি জমি ও নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি। প্রবল বর্ষা ও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে পানি বাড়ছে দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিলেও। নদ-নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের পানির চাপে খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা, বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বাঁধে নতুন করে ধস নামায় পাইকগাছার সোলাদানা, বেতবুনিয়া, গড়ুইখালী, কয়রার হরিণখোলা, গোবরা, ঘাটাখালীতে ভাঙন আতঙ্ক দেখা দেয়। কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের চাপে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে দুটি দ্বীপ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে অসংখ্য চিংড়িঘের ও ছোট-বড় পুকুর, গৃহহারা হয়েছে অসংখ্য পরিবার। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যরক্ষা ব্যবস্থা। উপকূল রক্ষা বাঁধ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে নানা পক্ষের দায়িত্বহীনতায় প্রতি বছরই বাঁধে ফাটল ধরে। ভুক্তভোগীদের রক্ষা ও সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং বছর বছর এলাকাবাসীকে ভোগান্তি থেকে রক্ষার্থে স্থায়ী, টেকসই ও কার্যকর বাঁধ নির্মাণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পর্কে ২০১৬ সালে সমকাল পত্রিকায় ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে মার্চে’ শীর্ষক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, “ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে উপকূলীয় এলাকার জমি ও ঘরবাড়ি রক্ষায় ছয় জেলায় নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ৬২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এ কাজে ব্যয় হবে ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচার প্রাণান্ত চেষ্টা উপকূলীবাসীর। সাগরের বসতি হারানো মানুষ ক্রমশঃ উঁচু এলাকার দিকে ছুটছেন।
সেন্টমার্টিন, ধলঘাটা, মাতারবাড়ী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন দ্বীপের বিস্তর এলাকা ইতোমধ্যে সাগরে বিলীন হয়ে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে ওইসব স্থানের মানুষ। ফলে বিভিন্ন উপকূলের বাস্তুচ্যুত মানুষ নতুন করে বসতি গড়ে তুলেছেন কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায়। পুরাতন আবাসস্থলের নামে ওইসব এলাকার নামকরণ হয়েছে, ধলঘাটা পাড়া, কুতুবদিয়া পাড়া কিংবা মহেশখালী পাড়া। এখন নতুন সেই বসতিতেও রয়েছে উচ্ছেদ আতংক।
কেবল জলবায়ুর প্রভাব নয়; অপরিকল্পিত উন্নয়নের ছোঁবলেও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে উপকূলের মানুষ। মহেশখালী দ্বীপসহ উপকূলের বিভিন্ন প্রকল্পে বাস্তুচ্যুত হতে চলা মানুষগুলো আন্দোলনে নেমেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। অধিগ্রহণের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কক্সবাজারের সাবেক এক জেলা প্রশাসক সহ বেশ কিছু কর্মকর্তা জেল-হাজতে গেলেও, এখনও কমেনি অনিয়ম, হয়রানি, কমিশন, ঘুষ, দূর্নীতি।
উপকূলের মানুষের ভূমি অধিগ্রহণের টাকা সহজে বিতরণের জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিলেও, সেই নির্দেশ একেবারেই উপেক্ষিত। মাসের পর মাস, এমনকি বছর ধরে ঘুরেও টাকা পাচ্ছেন না, ভূমির প্রকৃত মালিকরা। এনিয়ে সচেতন মহলেও রয়েছে অসন্তোষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় উৎপাদিত লবণে পূরণ হয় দেশে মোট চাহিদা। উপকূলের লবণ চাষের গুরুত্বপূর্ণ জমিতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প করা হলে, লবণে স্বনির্ভর বাংলাদেশ হয়ে যাবে আমদানী নির্ভর। এতে বেড়ে যাবে লবণের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি। এছাড়া সমুদ্রের গভীরতা এবং ভূ-মধ্যসাগরীয় গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর করা গেলে; বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্ধনীতি। কিন্তু কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে উপকূলবাসীকে আরও ঝুঁকির ফেলা হচ্ছে।
যেসব উন্নত রাষ্ট্রের কারণে সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বেড়ে উপকূলে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল শুরু হয়েছে; সেইসব উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের স্থানান্তরের দাবি তোলাকেও যৌক্তিক বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হয়তো এমন একদিন আসবে, এরকম ভাসমান কোন বসতিতে টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে হবে উপকূলের মানুষকে। কিন্তু এর আগেই উন্নয়ন এবং দূর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে উপকূলবাসী। দায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও মুক্তি মিলছেনা উপকূলে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত