
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : দস্যু আতঙ্ক, প্রাণহানির ভয় ও অনিশ্চিত জীবনের কারণে সুন্দরবনের হাজারো বনজীবি পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। এক সময় এই বনজীবিরাই বনের গভীরে প্রবেশ করে মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা, কাঁকড়া ও গোলপাতা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দস্যুদের উৎপাত, মুক্তিপণ আদায়, অপহরণের ঘটনায় বনের জীবিকা এখন হয়ে উঠেছে মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ । ফলে জীবনের নিরাপত্তা খুঁজে তারা ঝুঁকছে বিকল্প জীবিকার দিকে। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা পদ্মপুকুর আটুলিয়া কাশিমাড়ী বুড়ি গোয়ালিনী মুন্সিগঞ্জ ঈশ্বরীপুর রমজান নগর ও কৈখালী ইউনিয়নের প্রায় ৫০ টি গ্রামের ২৫ হাজার পরিবার সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল কিন্তু বর্তমানে বনদস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনের যেতে অপারকতা প্রকাশ করছে। কারণ বনদর্শদের দাবি কৃত অপহরণের টাকা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় সে কারণে তারা খুঁজছে বিকল্প পেশা।
ছোট কাল থেকে সুন্দরবনে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন জেলে রায়হান শেখ কিন্তু বনদস্যু আতস্কে এখন আর বনে যায়না তিনি, এলাকায় তেমন কর্মসংস্থান ও না থাকায় পরিবার নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা শহরে। মোবাইলে কথা হয় রায়হানের সাথে এসময় তিনি বলেন, জীবনের অর্ধেক সময় পার করেছে বনে মাছ ধরে। কিন্তু বনদস্যুর ভয়ে পেশা ছেড়ে ঢাকা শহরে একটি ফ্যাক্টারিতে শ্রমিকের কাজ করে কোন মতে দিন পার করছি।
৭জানুয়ারি সকালে কয়রা বাসস্ট্যান্ডে ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জম নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় বনজীবি সাফিদুল ইসলামের, তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বনদস্যু আতঙ্কে এখন আর সুন্দরবনে মাছ- কাঁকড়া ধরতে যেতে পারিনা। তাদের মুক্তিপন দিয়ে যে টাকা ইনকাম হয় তাতে সংসার চালানো খুব কষ্ট সার্ধ হয়ে পড়ছে। এলাকায় তেমন কোন কাজ কর্ম না থাকায় বাধ্য হয়ে নাড়াইলে দিন মুজুরী হিসাবে ধান কাটার কাজে যাচ্ছি।
আরেক বনজীবি বনজীবি আব্দুল জলিল (ছদ্মনাম)বলেন, বনে গেলে জানি না বেঁচে ফিরবো কি না। দস্যুরা বন্দুক ঠেকিয়ে টাকা চায়, না দিলে বেদম মারে, অপহরণ করে। একবার কাঁমুক্তিপণ দিতে হয়েছে, এরপর আর বনে যাই না এখন ইট ভাটায় কাজ করি।
সাম্প্রতিক সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করতে যাওয়া ২ বনজীবি আঃ সালাম ও আকবর আলী বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহীনির হাতে আটক হন। শুধু আটক হয়ে শেষ হয়নি তাদের উপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন।তারা দুজনই চিকিৎসাধীন আছে।
তার উপর করা নির্যাতনের বর্ননা দিয়ে আকবার বলেন, আমি আগে থেকে তাদের(বনদস্যুদের) চাওয়া অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করে বনে গিয়েছি কিন্তু তারা আমাকে খুব মারধর করেছে, আমার মাজা (কোমরে) সহ সারা শরীরে লাঠি দিয়ে প্রচুর মারে,এক পর্যায়ে আমি হুস হারাই। পরে আর কিছু বলতে পারিনা পরবর্তীতে আমি একদিন পরে আমার সহকর্মীরা আরো মুক্তিপন দিয়ে আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। একই বর্ননা আঃ সালামের ও তিনি বলেন, আমাকেও তাদের নৌকায় তুলে নিয়ে প্রচুর মারে, একপর্যায়ে রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন রাত ১ টার দিকে তাদের (বনদস্যুদের)নৌকা থেকে পালিয়ে বনের গহীনে চলে আসি।শরীরে প্রচুর ব্যাথার যন্ত্রনা আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে
রাতভর হেটে পরেরদিন সন্ধার একটু আগে একটি ফরেষ্ট ক্যাম্পে এসে উঠি। কিন্তু তারা বনদস্যু ভেবে আমাকে আশ্রয় দিতে চায়নি, কিন্তু যখন তাদের ফোন দিয়ে বাড়িতে কথা বলিয়ে দিয়েছি তখন তারা আমাকে আশ্রয় দেয়। পরে তাদের সহযোগীতায় আমার বাড়ির লোকজন গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ,ব,ম আব্দুল মালেক বলেন, দস্যু দমন ও নিরাপদ জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি না হলে এই জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়বে। সরকার ও এনজিওদের সমন্বিত উদ্যোগে তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সুন্দরবন–সংলগ্ন কয়রা, দাকোপ ও শ্যামনগর এলাকায় ঘুরে বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে ডাকাত-আতঙ্কের কথা জানা গেছে।ছাত্র জনতার গন অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর জেল থেকে পালিয়ে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে দস্যুরা আবারো সুন্দরবনে প্রবেশ করে বনজীবিদের কাছ থেকে মুক্তিপন আদায় করছে। বনদস্যুরা গত এক বছরে শতাধিক জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করেছে। এ সময় টাকা আদায়ের জন্য তারা জিম্মি ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনও চালিয়েছে। এ কারণে অনেক জেলে এখন বনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কেউ ভ্যান চালিয়ে, কেউ দিনমজুরি করে আবার কেউ ইট ভাটায় শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন
জেলেরা জানান, আত্মসমর্পণকারী অনেক বাহিনী আবার দস্যুতায় ফিরেছে। বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবনে মজনু বাহিনী, শরীফ বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবিউল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী, মাসুম বিল্লাহ ভাগনে বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ থেকে কয়েক ধাপে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পরে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
আরও জানা যায় বনদস্যুতার উৎপাতে জেলেরা আগের মতো বনে মাছ-কাঁকড়া ধরতে যাচ্ছেনা।বদলাচ্ছে পেশা যে কারণে বন থেকে সরকারের যে রাজস্ব আদায় হতো তা অর্ধেকের ও কমে নেমে এসেছে। গত ১ মাসে সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ স্টেশন থেকে ৩৬০ টি নলীয়ান থেকে৩১০ টি বানিয়াখালী থেকে২৫০টি কোবাদক থেকে৩৫০ টি (পাশ) নিয়ে জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে। যেটা অন্য সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের নেতারা বলেন বনদস্যু নির্মূলে যোথ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সাধারণ জেলে বাওয়ালীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে,প্রতিনিয়ত নির্যাতনে শিকার হচ্ছেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যান্ত জরুরী।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে জেলে অপহরণের ঘটনা শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে বন কর্মীদের সাথেও বনদস্যুদের গোলাগুলি হচ্ছে। সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করতে বন বিভাগের একার পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভাব নয়।বন বিভাগের সহযোগীতায় র্যাব,কোষ্টগার্ড,বিজিবি’র অনন্য বাহীনির সমন্বয়ে দ্রূত যৌথ ভাবে অভিযান শুরু করা হবে।

