
মনিজা হাবীব : রাজা চলে যায়, থেকে যায় তার নির্মাণ শৈলী রাজপ্রাসাদ-কালের প্রবাহে এক সময় তাও বিলীন হয়ে যায়, তেমনি মূল মালিকের অভাবে শ্রী হারিয়েছে প্রায় শতাব্দী কালের পুরোনো উদ্যান প্রেম কানন। নানা জাতের বাহারি ফুল গাছের বদলে উদ্যান জংলায় ভরে গেছে। চারিদিকে তাকালে প্রেম কাননের করুণ দশায়ই কেবল প্রতীয়মান হয়।
বাংলা ১৩৩৫ সালের ২৫ শে মাঘ জোড়াগেট নুরনগর এলাকায় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল এই ফুলবাগিচা প্রেম কানন। এটি নগরীর কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর বয়রার কাছে। ৫ একর জমির উপর গড়ে উঠেছিল এই বাগিচা। সম্পদশালী মাড়োয়ারী ব্যবসায়ী মঙ্গলচাঁদ চুনীলাল মেহতা এই উদ্যান নির্মাণ করেন।
প্রেম কাননের মূল ফটক লোহার তৈরী। গেটের উপরে বাংলা ইংরেজি এবং হিন্দিতে লেখা আছে প্রেম কানন। কাননে প্রবেশের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না। ভিতরে ঢুকলে চোখে পড়ে কাননের প্রায় ৮০ ভাগ জায়গা ভরে গেছে জংলায়। অথচ আগে প্রবেশ পথ দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়তো হাতির মডেল, পেখম মেলা ময়ূর, লাঙ্গল কাঁধে চাষী, হরিণ, ঘোড়া, সোফা সেট, শিয়াল পণ্ডিত ছাত্রদের পড়াচ্ছেন ইত্যাদি কামিনী গাছ দিয়ে বানানো কাঠামো। দুঃখের বিষয় এখন এসবের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কিছুটা ভেতরে গেলে বাম দিকে চোখে পড়ে সান বাধাঁনো পুকুর ঘাট সংলগ্ন এক তলা বিল্ডিং। এর দেয়ালে শে^তপাথরে খোদাই করে লেখা প্রেম কানন বাগিচা দান করা হইলো শ্রী শ্রী নারায়নের কর কমলে দাস মঙ্গল চাঁদ চুনিলাল। খুলনা ২৫ শে মাঘ ১৩৩৫ সাল। সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা প্রেম কাননের একাংশে সম্পূর্ণ নেট দিয়ে তৈরি একটি ঘর ছিল। ছাওনি ছিল বাগানবিলাস আর মাধবীলতায় ঢাকা। ঘরে ঢোকার দরজায় ছিল হাসনাহেনার ঝোপ। কালের প্রবাহে পরীর ঘর নামে খ্যাত সেই ঘরটিও বিলীন হয়ে গেছে। এর পাশে ছিল গোলাপের বাগিচা। এই বাগিচায় প্রায় ২০/২৫ জাতের গোলাপ ছিল, তার কিছু নেই এখন। জানা যায়, এই কানন তত্ত্বাবধানের জন্য মঙ্গলচাঁদ চুনীলাল মেহতার পুত্র শ্রী প্রেমকুমার মেহতা তার মৃত্যুর আগে কমিটি সেক্রেটারি নন্দবাবুর নামে অনেক অর্থ, জমি দান করে যান। তবে এখন এটি পরিচালনা করছেন খুলনার বড়বাজারের এষ্টেট অব শ্রী সত্যনারায়ণ মন্দির কমিটির নির্বাহী ট্রাষ্টী গোপী কৃষাণ মুন্ধড়া।
প্রেম কাননের এই দূরাবস্থার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস্তা উচুঁ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির জল বাগানে এসে জমে থাকে। এই জলের জন্য বাগানের ফুলগাছ সব মরে গেছে। ট্রাকে করে মাটি এনে বাগানে ফেলা হয়েছে। তবে আর ফুলের বাগান করার পরিকল্পনা নেই। গাছ দিয়ে বানানো কাঠামোগুলো আবার তৈরীর কাজ করা হবে। ওটাই এই বাগানের ঐতিহ্য। আগে উড়িষ্যা থেকে মালী এনে গাছ দিয়ে কাঠামো তৈরী করা হয়েছিল। ভালো কারিগর খোঁজা হচ্ছে। কারিগর পেলেই কাজ শুরু করা হবে। তিনি আরো জানান, এখন এখানে বিয়েসহ নানা রকমের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে এর জন্য বাড়তি কোনো অর্থ প্রদান করা হয় না। শুধুমাত্র পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য কিছু অর্থ এবং বিদ্যুৎ বিল যা আসে তা পরিশোধ করতে হয়। পূজা কমিটি বছরে একবার এখানে রথ পূজো করেন। ২০২০ সালে ভারতীয় হাইকমিশন এখানে একটি মঞ্চ এবং ছাউনি নির্মাণ করে দেয়।
চিরসুখ দেখাধিকারী নামে এক ব্যক্তি পরিবার নিয়ে এখানে বসবাস করেন। মূলত তিনি এখন কেয়ারটেকারের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ৬৮ বছরের রমাপ্রসাদ মিত্র প্রায় ২০ বছর ধরে এই বাগান পরিচর্চা করে আসছেন। তিনি জানান, দর্শনার্থীরা আগের মত আসেন না। বাগানে গাছের কাঠামোগুলো পুনরায় তৈরী করলে হয়তো আবারও দর্শনার্থী বেড়ে যাবে।
শত প্রকারের ফুলে আচ্ছাদিত ছিল এই বাগান। আগে পুরো খুলনা শহরের ফুলের জোগান দেয়া হতো এই বাগান থেকে। প্রেম কাননকে যদি ঢেলে সাজানো হয়, ঠিক মত পরিচালনা করা হয় তাহলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থী আসবেন। শহরের লোকজনের চিত্ত বিনোদনের জায়গা পাবেন। খুলনায় একদিকে যেমন বিনোদনের স্থানের একান্ত অভাব অন্যদিকে ফুলের বাগানেরও বড় অভাব। তাই অতি দ্রুত এই বাগানের বিষয়ে জোরদার পরিকল্পনা নেয়া উচিত বলে মনে করেন খুলনার সচেতনমহল, সৌন্দর্য প্রিয় শহরবাসী।