
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া : ডুমুরিয়া (খুলনা) সবুজ পাতার ভেতর হলুদ,কোথাও পিংক-বেগুনি আবার কোথাও নীল রঙ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ফুটে আছে সুন্দর কোন ফুল। তবে এটা ফুল নয়, শীতকালীন সবজি ফুলকপি এবং বাঁধাকপির ক্ষেত। মনোরম এই দৃশ্য চোখে পড়বে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে ওই গ্রামে ক্ষেত ঘুরে দেখা যায়- চাষ করা হলুদ, গোলাপি ও হালকা লাল রঙের বাহারি ফুলকপি এখন শোভা পাচ্ছে তার জমিতে। যা শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্যই ডুমুরিয়া বাজারে এনেছে বিপুল ক্রেতার সাড়া।
কৃষি বিভাগের পাশাপাশি বিভিন্ন সকারি উদ্যোগে খুলনার বেশ কয়েকটি উপজেলায় বিস্তীর্ণ ক্ষেতজুড়ে রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষ হচ্ছে। পোকা দমনেব্যবহার করা হচ্ছে জৈব বালাইনাশক ফরোমন ফাঁদ ও হলুদ ট্যাপ। ফলনও হচ্ছে বেশ ভালো। বাজারে ব্যাপক চাহিদা হওয়ায় ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে অন্যান্য সবজি চাষ করে যে লোকসান হয়েছে, সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে পারছেন কৃষকরা। পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকেই নিয়ে যাচ্ছেন ফুলকপি। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি রঙিন ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। ফলে রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপির সাফল্যে খুশি কৃষকরা।
ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের রঙিন বাঁধাকপি ফুলকপি চাষিরা বলছেন, সাদা কপি ১০ টাকায় বিক্রি হলেও এ কপি এখনও বাজারে প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের খর্নিয়া গ্রামের সবজি চাষি আবু হানিফ মোড়ল ২০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছেন রঙিন ফুলকপি। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ১০০০/চারা প্রথমবারের মতো রঙিন বাঁধা চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। চারা ছাড়াও বাধা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব সার, কীটনাশক ও পরামর্শ দিয়ে তাকে সহযোগিতা করেছে উপজেলা কৃষি অফিস।
আবু হানিফ মোড়লের মতো মৃতূ্ন্যজয় আরও চারজন রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষীদের এনে দিয়েছে সাফল্য। সাদা ফুলকপি যেখানে বিক্রি হয় প্রতি পিস ১০ থেকে ১৫টাকায়, সেখানে তার চাষ করা রঙিন বাঁধাকপি ও্ ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। ইতোমধ্যেই ৭ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছেন ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করেছে। তিনি আশা করছেন, বাকি ফসল থেকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করবেন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষ করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী আবু হানিফ মোড়ল ও মৃত্যুঞ্জয় জৈব পদ্ধতিতে চাষ করেছেন এই রঙিন ফুলকপি। পোকামাকড় দমনের জন্য ব্যবহার করেছেন হলুদ ফাঁদ, যা কপিগুলোকে করেছে স্বাস্থ্যকর এবং বিষমুক্ত।
বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, ‘এ কপির পুষ্টি এবং গুণাগুণ অনেক ভালো। রঙিন ফুলকপি বাজারে আসা মাত্রই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। দামও মিলছে আশানুরূপ।
স্থানীয় ক্রেতা আকিরুল জানান, ২৫ টাকা দরে রঙিন ফুলকপি কিনেছেন তিনি। দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। এর আগে দুইবার খেয়েছেন। তাই আবারও নিলেন।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ নাজমুল হুদা বলেন, ‘এই রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষে কৃষকরা আশানুরূপ ফলন ও বাজারমূল্য পেয়েছেন। রঙিন বাঁধাকপি ও ফুলকপির পুষ্টিগুণ সাদা ফুলকপির তুলনায় অনেক বেশি এবং এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এ বছর ডুমুরিয়া উপজেলায় ১১০ হেক্টর জমিতে ফুলকপি চাষ হয়েছে এবং এর মধ্যে ২৫ একর জমিতে রঙিন ফুলকপি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাজারে এর উচ্চ চাহিদা থাকায় আগামী বছর আরও বেশি কৃষক এই চাষে যুক্ত হবেন।’
ডুমুরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ ক্ষেত জুড়ে ব্যতিক্রমী শীতকালীন সবজি রঙিন বাঁধাকপি ,ফুলকপি চাষ করেছেন কৃষকরা। কোনোটি হলুদ, কোনোটি পিংক-বেগুনি। আর এসব ফুলকপি কোনও প্রকার কীটনাশক ছাড়াই জৈব বালাইনাশক ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারেই এই ফুলকপি করা হচ্ছে।
ভান্ডার পাড়া ইউনিয়নের রাজবাধ গ্রামের কৃষক মৃত্যুঞ্জয় বলেন, ‘গত বছর তিনি পরীক্ষামূলকভাবে তার ২০ শতক জমিতে ক্যারোটিন জাতের রঙিন ফুলকপি চাষ করে ব্যাপক লাভবান হয়েছেন। তাই এ বছর ঘেরের আইলের জমিতে চাষ করেছেন এই রঙিন ফুলকপি। এবার ক্যারোটিনের পাশাপাশি ইয়োলো স্টার (হলুদ) ও ভেনেটিনা (পিংক) জাতের রঙিন ফুলকপি চাষ করেছি। বাম্পার ফলন হয়েছে। কোনও রোগ বালাই নেই, খরচ কম। লাভ বেশি।’
কৃষক রাশেদুল ইসলাম বলেন ইউনাইটেড সিড কোম্পানির বীজ পেয়ে তিনি ১০শতক জমিতে এই রঙিন ফুলকপির চাষ করেছি। শুধুমাত্র জৈব বালাইনাশক ও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারেই চাষ করেছি এই ফুলকপি। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা ক্ষেত থেকেই ফুলকপি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। দামও ভালো।’
কৃষক ইমতিয়াজ বলেন, ‘প্রথমবারের মতো রঙিন ফুলকপির চাষ করেছি। ফলন বেশ ভালো হয়েছে। চাষে পোকা দমনে ফরোমন ফাঁদ ও হলুদ ট্যাপ ব্যবহার করে ২২ শতক জমিতে প্রায় দেড় হাজার কপি হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার টাকা। বাজারে প্রতিটি কপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করছি। এ পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকার কপি বিক্রি করেছি। আরও আছে। লোকজন রঙিন জাতের কপি কিনতে বেশ আগ্রহী। অল্প টাকা খরচ করে আমি বেশ লাভ পেয়েছি। আগামীতে আরও বেশি জমিতে এ জাতের কপির চাষ করব।’
উপজেলার বরাতিয়া গ্রামের তাপস সরকার বলেন, ‘বাড়ির অদূরে জমিতে সাদা, গোলাপি, সবুজ, হলুদ- চার প্রকারের ফুলকপি এবং ব্রকলি, চায়নিজ ক্যাবেজ, রেড ক্যাবেজ, সাধারণ বাঁধাকপিসহ মোট ৫হাজার চারা লাগিয়েছি। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারজাত করে দামও ভালো পেয়েছি। কিন্তু অন্যান্য শীতকালীন সবজি চাষে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় অনেক আফসোস। তবে রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে লোকসান পুষিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।’
ছামিদুল আরও বলেন, এ বছরের জন্য বর্গা নিয়েছি ৬০ হাজার টাকায়। জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, রসুন, টমেটো লাগিয়েছি। এর মধ্যে ৪ হাজার রঙিন ফুলকপি-বাঁধাকপির চারা স্থানীয় এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিনামূল্যে পেয়েছি। অবশিষ্ট চারাগুলো কিনতে হয়েছে প্রতি পিস ১ টাকা ৮০ পয়সা দরে। এর পর জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক, শ্রমিকবাবদ খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা।’
ছামিদুল বলেন, ‘প্রতি পিস কপি যদি ১৫/২০ টাকাও দাম পেতাম, অন্তত আসলটা উঠে আসত। কিন্তু বাজারে এখন প্রতি পিস বিক্রি করছি ১০ থেকে ১২ টাকায়। তবে রঙিন ফুলকপিটার দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা পেয়েছি। সেটা দিয়ে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত দুই বছর ধরে জেলায় রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ হচ্ছে। চাষ করে সফলতা পেয়েছেন অনেক কৃষক। বাজারে ভাল চাহিদা থাকায় আগামীতে বাণিজ্যিকভাবে রঙিন জাতের এই ফুলকপির চাষ বাড়বে। অন্য কৃষকরাও এ জাতের রঙিন ফুলকপি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’
ক্ষেতে কোনো প্রকার কীটনাশক ও সার প্রয়োগ না করে কেবল জৈব পদ্ধতিতে বালাইনাশক ফরোমন ফাঁদ ও হলুদ ট্যাপ ব্যবহার। ফলনও বেশ ভালো। রঙিন ফুলকপি ভেষজগুণ সম্পন্ন একটি সবজি। স্বাদেও ভালো। সাধারণ ফুলকপির তুলনায় রঙিন ফুলকপিতে ২৫ শতাংশের বেশি ক্যারোটিন রয়েছে। যা ত্বক ও চোখকে ভালো রাখে। এটি কোলাজেন ধ্বংস করে। যা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এর মধ্যে ভিটামিন এ, সি এবং ক’সহ বিভিন্ন ধরণের ভিটামিন রয়েছে। এতে রয়েছে মিনারেলস, পটাসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ। সেই সাথে এ ফুলকপিতে প্রচুর পরিমাণে বেটা ক্যারোটিন যা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।'
বিভিন্ন উচ্চমূল্যের সবজি যেমন- স্কোয়াশ, ক্যাপসিকাম, রঙিন ফুলকপি, রঙিন বাঁধাকপি, ব্রকলি আবাদ প্রদর্শনী কৃষকদের প্রদান করা হয়েছে। এ বছর দিনাজপুর জেলায় ৫২ হেক্টর জমিতে রঙ্গিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ হয়েছে। ভোক্তাদের মাঝে নিরাপদ উচ্চ মানের সবজি উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে কৃষি অধিদপ্তর ও কিছু উন্নয়ন সংস্থা কৃষকদের পাশে থেকে সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদানে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এ কপি দেখতেও যেমন আকর্ষণীয় তেমনি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। এটিতে জ্যান্তফিল, ক্যারোটিনেট, ভিটামিন এ থাকার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত