
জন্মভূমি ডেস্ক : নানা জল্পনা-কল্পনা আর উত্তেজনার দিন শেষে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তৃতীয় বারের মত খুলনার নগর পিতা হলেন আ’লীগ মনোনীত নৌকার মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক। তিনি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮২৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখার প্রার্থী মোঃ আব্দুল আউয়াল পেয়েছেন ৬০ হাজার ৬৪ ভোট।
এছাড়া জাতীয় পাটির্র শফিফুল ইসলাম মধু পেয়েছেন ১৮ হাজার ৭৪ ভোট, এস এম শফিকুর রহমান ১৭ হাজার ২১৮ ভোট এবং এস এম সাব্বির হোসেন পেয়েছেন ৬ হাজার ৯৬ ভোট।
সোমবার রাত পৌনে ৯টার দিকে খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বেসরকারিভাবে কেসিসি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দীন।
তবে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সিটি নির্বাচন বয়কট করলেও ভোটকে উৎসবমুখর করতে কোনো প্রচেষ্টার কমতি রাখেনি নির্বাচন কমিশন।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দীন বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। কোনো কেন্দ্র বন্ধ হয়নি। কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি। প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সকলের সহযোগিতায় নির্বাচন পরিচালনা করেছে। আমরা কথা দিয়েছিলাম খুলনাবাসীকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিবো। আমরা সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। পাশাপাশি ফলাফলের মধ্য দিয়ে খুলনাবাসীর বিজয় হবে।
এর আগে সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এবারই প্রথম পুরো সিটিতে ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ভোট নেয়া হয়। কোনো ধরনের সহিংসতার খবর না পাওয়া গেলেও কিছু কিছু জায়গায় ইভিএমে ভোট দিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন ভোটাররা। প্রায় অনেক কেন্দ্রে ইভিএম ধীরগতিতে কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেন ভোটার ও প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীরা।
এর আগে ভোটপর্ব নির্বিঘেœ পার করার জন্য নির্বাচন কমিশন সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়, নগরীকে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা চাদরে মুড়ে ফেলা হয়। রবিবার সকাল থেকেই নগরীতে আধা-সামরিক বাহিনী-বিজিবি সদস্য, র্যাব, পুলিশ, আনসার ও সাদা পোশাকে বিশেষ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়। জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে।
এবার নির্বাচনে খুলনা সিটি মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩৩ এবং নারী ২ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৬ জন। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে মোট ভোটকেন্দ্র ২৮৯টি। ভোট কক্ষ ছিল ১ হাজার ৭৩২টি। ভোটকেন্দ্রগুলোয় ২ হাজার ৩০০টি ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়। ভোট কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ভোটগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন ৫ হাজার ৭৬০ জন কর্মকর্তা।
নগরীতে বিজিবি’র ১১ প্লাটুন সদস্য টহল দেয়। ভোট কেন্দ্র ও নগরীর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৮ হাজার ৩০০ জন সদস্য। নির্বাচনী মাঠে ছিলেন ৪৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। ভোট কেন্দ্রগুলোতে স্থাপন করা হয় ২ হাজার ৩০০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। ইভিএম মেশিন প্রায় ৩ হাজার। পর্যবেক্ষক ছিলেন বেসরকারি দু’টি সংস্থার ২০ জন ও নির্বাচন কমিশনের ১০ জন।
এ নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নৌকা প্রতীকের তালুকদার আবদুল খালেক, জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের মোঃ শফিকুল ইসলাম মধু, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের মোঃ আব্দুল আউয়াল, জাকের পার্টি মনোনীত গোলাপফুল প্রতীকের এস এম সাব্বির হোসেন, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান মুশফিক (দেয়াল ঘড়ি)।
অপরদিকে সাধারণ ৩১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ১৩৬ জন এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। এর মধ্যে নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডে এস এম খুরশিদ আহমেদ টোনা এবং ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে জেড এ মাহমুদ ডন বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হন।
এবার নির্বাচনে দেশের রাজপথের প্রধান বিরোধীদল বিএনপিসহ বামফ্রন্ট বা প্রগতিশীল কোনো রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। এমনকি এসব রাজনৈতিক দল তাদের নেতা-কর্মীরা ভোটদানে বিরত ছিলেন। এমনকি বিএনপি তাদের মাঠকর্মী ও নেতাদের ঠেকানোর জন্য গোপন মনিটরিং সেল গঠন করে, যাতে কেউ যেন ভোট কেন্দ্রে না যান। আবার দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ায় ওই সব নেতা এবং তাদের সমর্থকদের আজীবন বহিষ্কার ও কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করে বিএনপি।
সংক্ষিপ্ত বিবরণ : তৃতীয়বার মেয়র হলেন আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক। এর আগে ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৩ সালে সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির কাছে তিনি হেরেছিলেন। ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও বাগেরহাট-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে খুলনা সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে দ্বিতীয়বার মেয়র হন।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ১ জুন বাগেরহাটের মলিকেরবেড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তালুকদার আব্দুল খালেক। স্কুলজীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে খুলনায়। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭৭ সালে খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ওই বছরই ২১ বছর বয়সে খুলনা পৌরসভার মহসিনাবাদ ইউনিয়নের কমিশনার হন। এরপর মহসিনবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের খুলনা জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে খুলনা পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপ নেয়। সেবার তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মাঝে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে কেটেছে রাজনৈতিক সময়। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বাগেরহাট-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। ওই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য তার স্ত্রী হাবিবুন নাহার। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।