
দশমিনা(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি : পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় থাকা জলে-স্থলে বসবাসকারী মানতা সম্প্রদায়ের মানুষেরা অনেকটা মানবেতর ভাবেই জীবনযাপন করে থাকে। স্থায়ী কোন ঠিকানা পাওয়া না গেলেও নৌকায় তাদের বসবাস। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় নৌকায় করে ছুটে চলা তাদের নিত্যদিনের সাথী। খালের পাশে এক একটি দলে ১০ থেকে ১৫ টি নৌকা সারিবদ্ধ হয়ে নোঙ্গর করে থাকে। জীবন ও জীবিকার জন্য কখনও বড়শি দিয়ে মাছ ধরা কিংবা পল্লী জনপদে গিয়ে ঝাড়ফুক ও সিঙ্গা লাগানোই তাদের প্রধান পেশা। এ যেন এক বিচিত্র জীবন। আধুনিক যুগেও জীবনযুদ্ধে জীবিকার জন্য নৌকায় বসবাস করছে মানতা সম্প্রদায়। মানতা সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা মাছ ধরা। খালে মাছ তেমন না থাকায় সংসার চালাতে নিদারুন কষ্টের মধ্যে দিয়ে পার করতে হয়। এদের খবর রাখে না কেউ। অসহায় হয়ে পড়েছে এসব মাছ ধরা লোকগুলো। এক সময় নৌকা নিয়ে নৌ পথে চলাচল করত মানতা সম্প্রদায়রা। এখন নৌপথে বাঁধ, স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে নৌকা নিয়ে চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।
নদীর কলতানে যাদের ঘুম ভাঙা আর ঘুমোতে যাওয়া তেমনি অপর একটি সভ্যতার নিগৃহীত সম্প্রদায় মানতারা। তেঁতুলিয়া-বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর বাঁকে খালে তাদের দেখা মেলে। জন্ম থেকে নদীর জলে খেলা করতে করতে ওরা বড় হয়। এ রকম একজন জসীম সরদারের স্ত্রী রুনু বেগম (৩৯)। তার ১৭ বছরের স্বামীর সংসারে হাল ধরতে নৌকার হাল ধরতে হয়েছে। কিশোরী বয়সের বিবাহিত জীবন আজ জীর্ণছিন্ন, রোগাক্রান্ত শরীর, পুষ্টিহীনতায় ভুগেও রুনু বেগম রেহাই পাচ্ছে না সংসার নামক যন্ত্রণা থেকে। ৬ সদস্যের পরিবারে ৪ সন্তানের জননী আজ। নৌকায় প্রায় পৌনে শতাধিক লোকের বাস। এদের প্রত্যেকের গড়ে ৪-৫টি সন্তান রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন খালে রয়েছে এই রকম প্রায় শতাধিক লোকের বসবাস। পুঁজি জোগানোসহ এ সম্প্রদায়ের মানুষের সাহায্য-সহায়তায় নেই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। কয়েকশ’ বছর ধরে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষকে যাযাবর চরিত্র নিয়ে সমাজ-সভ্যতায় তাদের অংশগ্রহণ। বিচিত্রময় জীবন এই মানতা সম্প্রদায়ের।
সর্দাররা বংশক্রমেই সরদার হয়। সর্দারের দৃষ্টিতে অপরাধ করলে বেদে সমাজে জুতা পেটা, অর্থ দন্ডসহ নানা ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। যৌতুকবিহীন বিয়েতে কাজী রেজিস্টার প্রয়োজন হয় না।এই মানুষেরা নদীর কয়েক ফুট উঁচু ঢেউ কিংবা প্রকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে শক্ত হাতে নৌকা চালাতে পারে। নদী আর সাগর জলের আচার-আচরণ এদের নখদর্পণে। জলের মতি-গতির সাথে সখ্যতা এদের জন্মাধিকার। এরা দল বেঁধে বহর নিয়ে নদী থেকে খালে মাছ ধরতে ঘুরে বেড়ায়। এরা প্রধানত পোয়া, রামছোস (তাপসী), ট্যাংরা, গলসা, পাঙ্গাশ, কাওন প্রভৃতি মাছ ধরে। মইয়া জাল দিয়ে চিংড়ি মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে থাকে। এই সম্প্রদায়ের প্রতিটি নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর মাছ ধরায় পারদর্শী। এত সব অবদানের পরেও মানতা সম্প্রদায় আমাদের সমাজের অন্তর্ভুক্ত নয়। নানা সমস্যা-সংকট এদের আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। খালের জলে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতোই মানতা সম্প্রদায়ের লোকেরা আজীবন নদীর পানিতে ভেসে বেড়ায়। সময়ের আবর্তে মানতা সম্প্রদায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত