
বিধান চন্দ্র ঘোষ, দাকোপ (খুলনা) : কয়েক দফা টিকাদার বদলের পর অবশেষে খুলনার দাকোপে নির্মানধীন মূল গার্ডার ব্রীজের বর্ধিত করণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে ব্রীজের সংযোগ সড়কের কাজ। ৫০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় ব্রীজটি নির্মিত হয়েছে উপজেলার দাকোপ ইউনিয়নের শিংজোড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ভদ্রা নদীর উপর। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ব্রীজটি চালু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্রীজটি সচল হলে মোংলা পোর্ট ও উপজেলা সদরের সাথে সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হবে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী উপজেলা পাইকগাছা, কয়রা থেকে মোংলা বন্দরের সঙ্গেও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা সুগম হবে। প্রত্যক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ উপকৃত হবেন।
এলাকাবাসি সূত্রে জানা গেছে, পৃথক তিনটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই উপজেলা। দ্বীপ তিনটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডার নামে পরিচিত। এখানে একটি পোল্ডার থেকে অন্য পোল্ডারে যেতে হলে খেয়া পারাপারে সংখ্যাই বেশি। ব্রীজটি সচল হলে ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হবে। এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের গতিও বাড়বে। কৃষকের ফসলের দামও বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষকরা অনেক লাভবান হবেন বলে অনেকে মনে করেন। ব্রীজটির পশ্চিম পাড়ে ৩২ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন এবং পূর্ব পাড়ে ৩৩ নম্বর পোল্ডারে রয়েছে দাকোপ, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ, বাজুয়া ও বানীশান্তা ইউনিয়ন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গুরুত্বপূর্ণ ৯টি ব্রীজ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার কালিনগর জিসি—খুটাখালী জিসি রাস্তায় শুন্য চেইনেজে শিংজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে ভদ্রা নদীর উপর পিসি গার্ডার ব্রীজটি নির্মিত হয়েছে। ব্রীজটির দৈর্ঘ্য ৩০১ দশমিক ৪০ মিটার এবং প্রস্থ ৭ দশমিক ৩ মিটার। এ ছাড়া সংযোগ (ভায়াডাক্ট) সড়ক ১৪০ দশমিক ১৬ মিটার। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ব্রীজটি নির্মানের জন্য দরপত্র আহবান করা হলে পুরানো পল্টন ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পিটিএসএল মৈত্রী (প্রাঃ) লিমিটেট কাজটি বাস্তবানের দায়িত্ব পায়। কাজটির প্রাক্কলিত মূল্য ছিলো ৩৭ কোটি ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫৫ টাকা। ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট ব্রীজটি নির্মান কাজ শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময় কাজটি শেষ করতে না পারায় কয়েক বার বর্ধিত সময় অনুমোদন করেন এলজিইডি। তারপরও কাজটি শেষ না হওয়ায় ঐ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল হয়। পুনরায় ব্রীজের অসমাপ্ত কাজের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে দরপত্র আহবান করলে বরিশালের নতুন ঠিকাদার মেসার্স কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের মেহেদি হাসান চৌধুরী কাজটির দায়িত্ব পায়। কিন্তু নির্ধারিত সময় কাজ শেষ করতে না পারায় ওই প্রতিষ্ঠানেরও কার্যাদেশ বাতিল হয়। পরবর্তীতে পুনরায় আবার ব্রীজটি নির্মানের জন্য দরপত্র আহবান করা হলে নিকাটন গুলশান ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এমবিইএল-এইসিকেই (জেভি) কাজটি বাস্তবানের দায়িত্ব পায়। কাজটির প্রাক্কলিত মূল্য ছিলো ১৩ কোটি ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৩ টাকা। মোট ব্রীজটি নির্মানে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি ৭৫ লাখ ৯ হাজার ২৩৮ টাকা।
শ্রীনগর নব জাগ্রত যুব সংঘের সভাপতি সমাজ সেবক প্রসেনজিৎ রায়, কামারখোলা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বর স্বপন কুমার মন্ডল বলেন, উপজেলার ঐতিয্যবাহী কালিনগর বাজার সংলগ্ন ভদ্রা নদীর উপর ব্রীজটি চালু হলে উপজেলার পোল্ডার সমূহের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার কাঙ্খিত উন্নয়ন হবে। ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহন সহজতর হবে ও নানাবিধ সুযোগ তৈরি হবে। দ্রুততম পরিবহন ব্যবস্থা সৃষ্টির ফলে এলাকায় আমদানি রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। ফলে নানামুখি কৃষিজ উৎপাদনের সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। এলাকার সার্বিক পরিবেশ আধুনিকায়নসহ সেতুটি উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বহুমাত্রিক সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে।
এমবিইএল-এইসি-কেই (জেভি) ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইনঞ্জিয়ার উত্তম বিশ্বাস জানান, মূল গার্ডার ব্রীজের বর্ধিত করণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে ব্রীজের সংযোগ সড়কের কাজ। ব্রীজটির পশ্চিম পাশে সংযোগ সড়কের কাজ প্রায় শেষ প্রান্তে। আর পূর্ব পাশে দুই একদিনের মধ্যে ব্রীজের সাথে সংযোগ হবে।
এবিষয়ে স্থানীয় সরকারের উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) এম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নকসা ত্রুটির কারণে প্রথম ঠিকাদারের আমলে নির্মাণাধীন ব্রীজের সংযোগ সড়কে বালু ভরাটের সময় দুই পাশের সুরক্ষা দেয়াল (রিটেইনিং ওয়াল) ভেঙে পড়ায় দীর্ঘ এক বছরেরর বেশি কাজ বন্ধ ছিলো। পরে নকসার ত্রুটি সংশোধন করে মূল ব্রীজ বর্ধিত করা হয়। এখন মূল ব্রীজের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে সংযোগ সড়কের কাজ। আশা করছি অল্প কিছুদিনের মধ্যে ব্রীজটি জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের সময়ে ব্রীজটির উপর দিয়ে নির্বাচনে নিয়োজিত প্রশাসনের যানবাহন চলাচল করতে পারবে।

