
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : শেখ মুজিবসহ দলের অন্য নেতৃবৃন্দ সারাদেশ জুড়ে ছয় দফার প্রচার শুরু করেন। ছয় দফার পক্ষে অভাবনীয় জনমত সৃষ্টি হয় এবং এতে আতঙ্কিত শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ধর পাকড় শুরু করে। ৮ মে (১৯৬৬) শেখ মুজিব দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার হন। প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ৭ জুন (১৯৬৬) গোটা প্রদেশে হরতাল পালন করে। শ্রমিক শ্রেণী এ ধর্মঘটে সাড়া দেয়। ৭ জুন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে ১০জন নিহত হয়। ৭ জুন হরতালের পর সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। ১৫ জুন ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) গ্রেফতার হন এবং ১৬ জুন ইত্তেফাক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৯,৩৩০ জন কর্মী-সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়। বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতির উপর নতুন করে হামলা আসে। সরকার ১৯৬৭ সালের আগস্ট মাসে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দেয়।
আইয়ুব বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ ১৯৬৭ সালের ২ মে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট বা পি.ডি.এম নামক একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করে। পি.ডি.এম আট দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ আট দফা ছিল ছয় দফার বর্ধিত সংস্করণ। পি.ডি.এম-এর আট দফায় কেবল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন অর্জনই নয়, দশ বছরের মধ্যে দুপ্রদেশের বিরাজমান বৈষম্যাবলি দূর করার কর্মসূচিও দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের ছয়দফা দাবি ছিল একটি আঞ্চলিক দলের দাবি, অপর পক্ষে পি.ডি.এম-এর আট দফা দাবি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। যেহেতু পি.ডি.এম-এর আট দফার মূল দাবি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন অর্জন, সেহেতু সরকারের সকল ক্ষোভ পড়ে শেখ মুজিবের উপর। সরকার শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে জনবিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে এবং বিরোধী দলীয় জোটে ভাঙ্গন সৃষ্টির লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন করার এক ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে (৬-১-৬৮)। এবং একে আগরতলা ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করা হয়। ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে ২৯ জানুয়ারি সারা পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মঘট পালন করা হয়। শুরু হয় নতুন করে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য এন.ডি.এফ, পি.ডি.এম জোটদ্বয়সহ ছয় দফাপন্থি আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (ওয়ালী), কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি দল মিলে ‘ডেমোক্রাটিক অ্যাকশন কমিটি’ বা ডাক (DAC) গঠন করে। তবে ডানপন্থি ও বামপন্থিদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায় ডাকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি পালন করা কঠিন হয়।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন যৌথভাবে ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ (Students Action Committee) গঠন করে এবং আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ১১ দফা দাবি ঘোষণা করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগার দফা দাবির মধ্যে আওয়ামী লীগের ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণী, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দাবিও ১১ দফার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে ১১ দফার আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। আইয়ুব বিরোধী মিটিং মিছিল সমাবেশ নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শ্রমিক শ্রেণীর অংশগ্রহণে আন্দোলন তীব্র হয়। সরকার পুলিশ, ই.পি.আর, সেনাবাহিনী দিয়ে আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হয়। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্র নেতা মোঃ আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে আন্দোলন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তা গণআন্দোলনের রূপ নেয়। ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে প্রায় ১০০ জন পূর্ব পাকিস্তানি নিহত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা প্রক্টরিয়াল দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় পাক সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হলে গণআন্দোলন চরম আকার ধারণ করে।
সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে রেসকোর্স ময়দানে প্রায় পাঁচ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের উদ্ভবও ঘটে ওই সভায়। আইয়ুব খান আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেন। তিনি ১০-১৩ মার্চ (১৯৬৯) রাওয়ালপিন্ডিতে বিরোধী নেতাদের বৈঠকের আয়োজন করেন। ভাসানী ন্যাপ ও পিপলস পার্টি ওই বৈঠক বয়কট করলেও শেখ মুজিব বৈঠকে যোগদান করেন এবং ছয় দফা ও ১১ দফা দাবির পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করেন। বৈঠকে ফেডারেল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ডানপন্থি দলগুলি এ সিদ্ধান্তে খুশি হলেও আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ (ওয়ালী) বৈঠকের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করে। এ দুদল ‘ডাক’ থেকে নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়।
ইতোমধ্যে আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানেও তীব্ররূপ ধারণ করে। এমতাবস্থায় আইয়ুব খান ২৪ মার্চ (১৯৬৯) তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ দেশে সামরিক আইন জারি করেন। ক্ষমতা গ্রহণের ৮ মাস পর ২৮ নভেম্বর ১৯৬৯ ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন যে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর দেশে জাতীয় পরিষদের এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৭০ সালের ২৮ মার্চ উক্ত নির্বাচনের ‘আইন কাঠামো আদেশ’ (Legal framework order)-এর মূল ধারাগুলি ঘোষণা করা হয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ব্যবস্থা বাতিল করে সেখানে চারটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি এবং ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ এ নীতিতে নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করেন। আইন কাঠামো আদেশে জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা ৩১৩ (১৩টি মহিলা আসনসহ) এবং তন্মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ৭টি মহিলা আসন সহ ১৬৯টি আসন নির্ধারণ করা হয়। আদেশে বলা হয় যে, জাতীয় পরিষদ তার প্রথম অধিবেশনের সময় থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ‘শাসনতন্ত্র বিল’ নামক একটি বিলের আকারে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবে এবং তা করতে ব্যর্থ হলে পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে। উক্ত বিল প্রেসিডেন্টের অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হলেও জাতীয় পরিষদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এভাবে দেখা যায় যে, আইন কাঠামো আদেশে জাতীয় পরিষদের অস্তিত্ব প্রেসিডেন্টের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল করা হয়।
আইন কাঠামো আদেশের বিরূপ সমালোচনা করলেও ভাসানী ন্যাপ ও ন্যাশনাল লীগ ছাড়া অন্য সকল দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে ৬ দফা ও ১১ দফা দাবিসমূহের ওপর ‘রেফারেন্ডাম’ হিসেবে অভিহিত করে। পাকিস্তানের প্রায় ১১টি দল এ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। তবে সকল শক্তিশালী রাজনৈতিক দল (যেমন আওয়ামী লীগ, পাকিস্তান পিপলস পার্টি) ছিল আঞ্চলিক।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট হয়। কিন্তু ১২ নভেম্বর দক্ষিণ বাংলায় এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দুলক্ষ লোক নিহত হলে উক্ত অঞ্চলের জাতীয় পরিষদের ৯টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ২১টি ঘূর্ণি-উপদ্রুত নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন একমাস পর অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পি.পি.পি) পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৪৪টির মধ্যে ৮৮টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পি.পি.পি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন পায় নি। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টির মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। নির্বাচনী ফলাফলা ঘোষিত হওয়ার পর পরই পি.পি.পি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো দাবি করেন যে, পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের প্রতিনিধিত্বকারী পি.পি.পি-র সহযোগিতা ছাড়া কেন্দ্রে কোনো সরকার প্রতিষ্ঠা কিংবা সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না। এর প্রত্যুত্তরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, যেহেতু এক ব্যক্তি এক ভোট ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর প্রতিনিধিত্ব আবশ্যক নয়। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বলেন যে, যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ৬ দফা ও ১১ দফার প্রতি ম্যান্ডেট ঘোষণা করেছেন অতএব সংবিধান প্রণয়নে তা রদবদল সম্ভব নয়। এসব তর্ক-বিতর্কের মাঝে ইয়াহিয়া খান ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে, সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশন ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় বসবে।
কিন্তু ভুট্টো তাঁর মতামত গ্রহণের পূর্ণ অঙ্গীকার না দিলে উক্ত অধিবেশনে যোগ দিতে অস্বীকার করেন। ফলে ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ ১৯৭১ এক ঘোষণা জারির মাধ্যমে ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ইয়াহিয়া খানের এ ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানবাসী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ ঢাকায় এবং তার পরদিন সারা প্রদেশে হরতাল ডাকেন। সকল সরকারি কর্মকান্ড প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ৩ মার্চ (১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি ইশতেহার প্রচার করে। ৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান এক ঘোষণায় ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ভাষণের মাধ্যমে তিনি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ঘোষিত ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে চারটি পূর্ব শর্ত আরোপ করেন– (ক) অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে, (খ) অবিলম্বে সৈন্য বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, (গ) প্রাণহানি সম্পর্কে তদন্ত করতে হবে এবং (ঘ) (জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের পূর্বেই) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এ শর্তগুলি মানলেই কেবল তিনি বিবেচনা করে দেখবেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে আওয়ামী লীগ যোগদান করবে কিনা।
১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকা আসেন এবং ২৪ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের সংগে বৈঠক করেন। ২১ মার্চ ভুট্টো ঢাকায় এসে আলোচনায় যোগ দেন। ইয়াহিয়া খান আলোচনার নামে কালক্ষেপণ এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাসদস্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি আনয়ন করছিলেন। অবশেষে সকল প্রস্ত্ততি সম্পন্ন হলে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আকস্মিকভাবে গণহত্যা শুরু করে। পাকবাহিনীর এ নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যা নয় মাস ধরে চলে। [মোঃ মাহবুবর রহমান]
বাংলাদেশ আমল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে (তিনি তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন) উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলায় অস্থায়ী সরকার (মুজিবনগর সরকার নামেও পরিচিত) শপথ গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সমাপ্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ।
শেখ মুজিব সরকার (১৯৭১-১৯৭৫) পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১১ জানুয়ারি অস্থায়ী সংবিধান আদেশ অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থার সূত্রপাত এবং মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার প্রবর্তন করেন। দু’মাসের মধ্যে ভারত বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। দেশের প্রতিটি জেলায় বেসামরিক প্রশাসন সচল হয়। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে সংবিধান প্রণীত হয়। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি লাভ করে। ন্যাপ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, জাতীয় লীগ ১টি করে, এবং নির্দলীয় প্রার্থীরা ৫টি আসনে জয়লাভ করে। এরপর স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়।
শেখ মুজিবের লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত যে সামরিক-বেসামরিক আমলা এলিট শ্রেণী দেশ শাসন করছিল তাদের উপর রাজনৈতিক এলিট শ্রেণীর নেতৃত্ব স্থাপন করা। অবশ্য সামরিক-বেসামরিক বাঙালি আমলাগণ বুঝতে পারেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের দাবি বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সর্বাত্মক সমর্থন পেয়েছে। এখন থেকে রাজনীতিবিদগণই নেতৃত্ব প্রদান করবেন। তাছাড়া ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত অনেক সিনিয়র বাঙালি আমলা ও সামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে না আসতে পারায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও তারা বেশ দুর্বল ছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলিও দুর্বল এবং বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
শেখ মুজিব আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ‘ক্যারিশ্মা’ এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর করেন। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের একটি অংশ রাষ্ট্রের চারটি মৌল নীতিকে (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা) ‘মুজিববাদ’ হিসেবে গ্রহণ করে।
যদিও সামগ্রিকভাবে দেশের অবস্থা ছিল দুর্বল, তা সত্ত্বেও এ সময় বেশ কিছু বড় আকারের সমস্যার সমাধান হয়; যেমন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণ, শরণার্থীদের পুনর্বাসন, অবকাঠামোগত পুনর্গঠন, অবাঙালিদের ফেলে যাওয়া শিল্প কারখানা পরিচালনা, স্বীকৃতি এবং সাহায্যের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা ইত্যাদি। শিল্প কারখানা, ব্যাংক এবং বীমা স্থাপনের উদ্যোগ গৃহীত হয়; যদিও রাষ্ট্রের স্বল্প সামর্থ্যের কারণে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা বেশ সমস্যার সম্মুখীন ছিল।
বাংলাদেশের সামাজিক জীবনও তখন ছিল বেশ বিশৃংখল। একদিকে সমাজে ছিল পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি এবং তাদের বাঙালি সহযোগীদের বিচারের প্রবল দাবি, অন্যদিকে পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্রগুলির পক্ষ থেকে তা বাতিল করার চাপ। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন গ্রুপের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন নিয়ে আসে। তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা সমাজে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন। স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের একটি অংশ নতুন একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল যাদের ঘোষিত লক্ষ্য। দ্বিধাবিভক্ত কম্যুনিস্ট সংগঠনের অনেক গুলি গ্রুপ সারাদেশে শ্রেণী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। কিছু মুক্তিযোদ্ধা এনজিও (বেসরকারি সংগঠন) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে উদ্যোগী হন। স্বাধীন বাংলাদেশে এক বছরের মধ্যে এভাবেই এনজিও কর্মকান্ডের শুরু যা পরবর্তীকালে সমাজের একটি প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
দেশের এ ধরনের পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষামূলক ভূমিকা গ্রহণ করেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি বাতিল এবং পাকিস্তানি যুদ্ধ বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর শেখ মুজিব সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তনে বিশ্বাসী বিরোধী বামপন্থি শিবিরের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তিনি আওয়ামী লীগের একান্ত অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে উগ্রপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আধা-সামরিক ‘রক্ষী বাহিনী’ গঠন করেন।
আওয়ামী লীগের উপর ছিল দেশের সামগ্রিক পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজের চাপ; কিন্তু অগ্রগতি ছিল খুবই ধীর। ফলে মানুষের অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। একই সময় আওয়ামী লীগের অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ক্রমশ প্রকাশ পায়। একদিকে উগ্রপন্থি যুব নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবের অধীনে বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। অন্যদিকে মধ্যপন্থি অবলম্বনকারী নেতৃবৃন্দ সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন অব্যাহত রাখার পক্ষাবলম্বন করেন। ১৯৭৪ সালের বন্যা, খাদ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, বাংলাদেশকে ঋণ দানে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনিচ্ছা এবং ‘বাংলাদেশ সাহায্য সংস্থা’ গঠন করেও তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য না পাওয়ার পরিস্থিতিতে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও বিরোধিতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিব ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবাদপত্র ও বিচার ব্যবস্থার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করে একদলীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করেন।
১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব দেশে প্রচলিত সকল রাজনৈতিক দল বাতিল ও বেআইনি ঘোষণা করে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) নামে একটি জাতীয় দল গঠন করেন। বাকশালের পাঁচটি ফ্রন্ট ছিল কৃষক, শ্রমিক, যুবক, ছাত্র এবং মহিলা। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ ঐতিহ্য ভেঙ্গে বেসামরিক আমলা এবং সেনা সদস্যগণও এ দলে যোগদানের অনুমতি পায়।
শেখ মুজিবের ভাষায় এটি ছিল ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’। একদলীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হয়। মুদ্রামানের সংস্কার, আমদানি ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস, খাদ্য উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ, রফতানি প্রসারে নতুন কৌশল, শিল্পখাতে নিয়ন্ত্রণ হ্রাস, মূল্যমান নির্ধারণে খোলা বাজারের ভূমিকা প্রসার এমনি ধরনের বিভিন্ন সংস্কার নতুন উদ্যোগে শুরু হয়। জেলা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো, সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করে একজন রাজনৈতিক প্রশাসনিক গভর্নর নিয়োগ, ভোগ্যপণ্য সরবরাহের জন্য প্রতিটি গ্রামে সমবায় প্রতিষ্ঠান গঠনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নতুন ধীকল্প (idea)-এর সম্পূর্ণ প্রয়োগের পূর্বেই ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে গুটি কয়েক উচ্চাভিলাষী জুনিয়র সামরিক অফিসার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাঁর উপস্থিত পরিবার পরিজন এবং তাঁর কিছু সহকর্মীকে হত্যা করে সাংবিধানিক ধারাকে ব্যাহত করে দেয়।
মুশতাক সরকার (১৯৭৫) অভ্যুত্থানকারীরা খন্দকার মুশতাক আহমদকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত করে। মুজিব সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী মুশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। একদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দকে আটক করা হয় এবং অন্যদিকে মুক্তি দেওয়া হয় ইসলামপন্থি সংগঠন জামায়াতে ইসলামী এবং চীনপন্থি মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কয়েকজন বন্দি নেতাকে। চীন ও সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। খন্দকার মুশতাক তিন মাসেরও কিছু কম সময় ক্ষমতায় বহাল ছিলেন। কিন্তু এ অল্প সময়ের মধ্যেই জেলা গভর্নরের ধারণা বাতিল করা হয় এবং বেসামরিক আমলাগণ তাদের বিদ্যমান অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হন। শেখ মুজিব সরকারের আনুকূল্য পাননি এমন বেশ কয়েকজন সিনিয়র আমলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি লাভ করেন।
নভেম্বরের ৩ তারিখে কয়েকজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা বিগ্রেডিয়ার (পরে মেজর জেনারেল) খালেদ মোশাররফ-এর নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান পরিচালনা করেন। খন্দকার মুশতাক ও ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী জুনিয়র অফিসারদের হটিয়ে বিগ্রেডিয়ার মোশাররফ সামরিক আইন জারি করেন। ওই দিনই তিনি মেজর জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বেই শেখ মুজিবের হত্যাকারী সামরিক অফিসারদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি বিচ্ছিন্ন অংশের হাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় চারজন নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহম্মদ, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মনসুর আলী এবং আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান নিহত হন।
খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থান নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী হয়। তিনদিন ধরে রাষ্ট্র পরিচালনায় অনিশ্চয়তা বিরাজ করে। মুশতাক রাষ্ট্রপতি তবে ক্ষমতাহীন। কারাগারে বন্দি অবস্থায় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে এক সেনা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ৭ নভেম্বর জাসদ এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহের-এর অনুসারি সিপাহিদের বিদ্রোহে মোশাররফ এবং তাঁর সহযোগীগণ নিহত হন। ওই দিনই প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন।
মুশতাকের সরকার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাধিনায়ক মনোনীত করেছিলেন। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের হাতে তিনি বন্দি হন এবং ৭ নভেম্বর একটি সিপাহি অভ্যুত্থানের ফলে তিনি মুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর একটি সামরিক আইন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ভবিষ্যতে যেকোন বিদ্রোহীর জন্য মৃত্যু দন্ডাদেশের বিধান করা হয়। কর্নেল (অব.) তাহের এবং জাসদের কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হন। পরে কর্নেল তাহেরকে সামরিক আদালতে বিচার করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়।
জিয়া সরকার (১৯৭৫-১৯৮১) ১৯৭৫ সালের সিপাহি অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান একজন শক্তিশালী সামরিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনজন ডেপুটি মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটরের একজন হিসেবে প্রায় এক বছরকাল জিয়া প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। প্রেসিডেন্ট এবং চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বিচারপতি সায়েমের কর্তৃত্ব বজায় থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন জিয়া। ১৯৭৬ সালের ২৮ নভেম্বর বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সামরিক আইন অধ্যাদেশের মাধ্যমে জিয়া সংবিধান সংশোধন করেন এবং রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন। সংসদ বাতিল করা হয়। কূটনীতিবিদ এবং আমলাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদ।
জিয়া সামরিক বাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেন। জিয়া রক্ষী বাহিনীকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে নেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে তিনি তাঁর ডেপুটি হিসেবে নিয়োগ দেন।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জিয়া রাজনৈতিক দলগুলি নিষিদ্ধ থাকলেও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। ১৯৭২ সালের ‘কলাবরেটর অর্ডার’ বাতিল এবং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এ সময় ‘দালাল আইন’-এ আটককৃত অনেক ব্যক্তি মুক্তি পান। নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলগুলি এ সময় পুনর্জীবিত হয়। জিয়া, ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিরও সমর্থন লাভ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন লাভের পর ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে ২৩টি দল রাজনীতি করার অনুমতি লাভ করে।
১৯৭৭ সালের সংবিধান (সংশোধনী) আদেশে বাংলাদেশ সংবিধানে যে সকল পরিবর্তন সাধিত হয় তার মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি উল্লেখযোগ্য: (ক) বাংলাদেশের নাগরিক ‘বাঙালি’ নয় ‘বাংলাদেশী’ বলে পরিচিত হবে; (খ) ধর্ম নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে সংযোজিত হয় ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং সংবিধান শুরু করা হয় ‘বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ দিয়ে; (গ) সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার হিসেবে; (ঘ) রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক সংহত ও সংরক্ষণ করবে; (ঙ) সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্তকরণ এবং দখলের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দানের ব্যবস্থা করা হবে।
এক বছরের মধ্যে জিয়া রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগো দল) গঠন করেন। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সকল রাজনৈতিক মতাদর্শী মহল থেকেই তিনি সদস্য সংগ্রহ করেন। অবসরপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এ দলে যোগ দেন। সামরিক শাসনের অধীনে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৭ সালের গণভোট; ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালে সংসদীয় নির্বাচন এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৭, আওয়ামী লীগ ৩৯, মুসলিম লীগ এবং ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ ২০, জাসদ (সিরাজ) ৮, আওয়ামী লীগ (মিজান) ২, গণফ্রন্ট ২, জাতীয় লীগ ২, এবং নির্দলীয় প্রার্থীরা ১৬টি আসন পায়। নব গঠিত সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্ববর্তী ৪ বছরের সামরিক শাসনকে বৈধতা প্রদান করা হয়।
চার বছরের সামরিক শাসনে জিয়া দেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়নের চেষ্টা করেন। তিনি বিভিন্ন গ্রুপের লোকজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সকলের অংশগ্রহণে খাল খননের মতো উন্নয়ন কর্মকান্ড হাতে নেন এবং ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেন।

