
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : একাত্তরের স্বাধীনতা অর্জনের একটি উলেস্নখযোগ্য দিক হলো স্বাবলম্বিতা অর্জন বা নিজের পায়ে দাঁড়ানো। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর স্বাবলম্বী বা আত্মনির্ভরশীল হওয়া মানে এক কঠিন সংগ্রাম ও সাধনার ব্যাপার। নারী এ পথে পা বাড়ালে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। নারী স্বাবলম্বী হওয়ার দুটি প্রধান দিক রয়েছে- একটি হচ্ছে নিজ যোগ্যতাবলে চাকরি বা ব্যবসা করা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে অন্যের সাহায্য নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। অন্যের সাহায্য বলতে ব্যাংক অথবা ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে কিংবা যে কোনো বেসরকারি সংস্থার ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া। এ কাজটি অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। নারী এতটাই পুরুষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও নির্যাতিত যে, এ ভয়াবহ জীবন থেকে মুক্তি চায় সে প্রতিনিয়ত। এ মুক্তির প্রধান দিক হচ্ছে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন।
ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীর স্বনির্ভরতা অর্জন ইদানীং গণজোয়ারে পরিণত হয়েছে। এনজিওর মাধ্যমে সারা দেশব্যাপী চলছে এ ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি। নারীরাও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য বাছবিচার না করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এ কর্মসূচিতে। সারাদেশের বিত্তহীন নারীরা যেন মোহে পড়ে গেছে। যে নারীর ঠিকমতো চালচুলো নেই, হয়তো বাড়িতে একটি ভাঙা ঘর বা পাঁচ/দশ কাঠা জমি রয়েছে, এসব নারী জীবনে নগদ অর্থের মুখ দেখেনি, তাকে যদি কোনো এনজিও তার আর্থ-পারিবারিক উন্নয়নের জন্য নগদ পাঁচ হাজার টাকা ঋণ দেয় তবে তার মাটিতে পা পড়ার কথা নয়। ওই নারী সঙ্গে সঙ্গে মহাঘোরের মধ্যে পড়ে যাবে। কারণ এত টাকা সে একসঙ্গে দেখেনি।
প্রশ্ন উঠতে পারে এনজিওর টাকা নিয়ে বিত্তহীন মহিলারা কী করে। উঠানে জমি থাকলে কেউ শাকসবজির আবাদ করে, কেউ গরু, ছাগল কেনে, কেউ সেলাই মেশিন কেনে, কেউ বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগায়, আবার কেউ রাস্তার মোড়ে মুদি দোকান দেয়। হাঁস-মুরগি, কবুতর পালে কেউ। কেউ মুড়ি ভাজে। কেউ পুকুরে মাছচাষ করে। ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণের মাধ্যমে যে পেশাই গ্রহণ করুক না কেন, প্রত্যেকেরই সপ্তাহ শেষে উচ্চ সুদসহ কিস্তি গুনতে হয়। অবাক ব্যাপার যে, সুদের হার কত তা ঋণ গ্রহীতারা জানে না। তারা দেখে, তারা সপ্তাহ শেষে এক বা দুইশ’ টাকা পরিশোধ করছে। যে গাভী পালছে সে দুধ বিক্রি করে পরিশোধ করছে, যে হাঁস-মুরগি পালছে, যে ডিম বিক্রি করছে, যে দোকান চালাচ্ছে সে হয়তো দোকান থেকে সুদসহ ঋণ পরিশোধ করছে।
এমনও অনেক নারী রয়েছে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দৈনন্দিন সংসার খরচ মিটিয়েছে অথবা ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসান দিয়েছে তারা কীভাবে কিস্তি পরিশোধ করবে। ঋণ দেয়ার আগে এনজিওদের কঠিন ও অনিবার্য শর্ত হচ্ছে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা। যেসব নারী বিভিন্ন কাজে তাদের আর্থিক পারিবারিক উন্নয়নের নামে ঋণ নিয়েছে, এনজিওর মাঠকর্মীরা সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মতো সকালে, বিকালে ও দুপুরে তাদের খোঁজ রাখে। মধুর ব্যবহার করে প্রথম। ঋণ সফলভাবে পরিশোধ করার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়বার ঋণ নেয়ার তাগিদ দেয়। কিন্তু যে নারী ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেনি, মুহূর্তে তার ওপর নেমে আসে অত্যাচার নির্যাতনের খড়গ। পুরুষ ঋণ গ্রহীতাকে এনজিও অফিসে বন্দি করে রাখার খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বাড়ির ছাগল ধরে নিয়ে যাওয়া, ঘরের টিন খুলে নেয়া, বাড়ির আসবাব, বাসন, অলঙ্কার বিক্রি করে কিস্তি পরিশোধে চাপ দেয়া এসব তো এনজিওদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে নারীর আত্মহননের ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটেছে। তারপরও ঋণ নেয়া থেমে থাকেনি। ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে যে নারী একবার পড়েছে, তার আর রক্ষা নেই, তার জীবন বিপন্ন হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণ গরিবকে আরও গরিব করে এমন বহু প্রমাণ রয়েছে। ঋণ নেয়ার পর কিছুদিন তার মধ্যে নগদ টাকার প্রাপ্তির উন্মাদনা থাকে, তখন নিজেকে সচ্ছল মনে হয়। আসলে এটা অর্থের গোলক ধাঁধা। এ ধাঁধায় যে পড়েছে তার বের হয়ে আসা কঠিন।
ঋণ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের কিস্তি শোধের পালা এসে যায়। ঋণ গ্রহণের পর লাভ-লোকসানের হিসাব কেউ করে না। তারা যে কিস্তি পরিশোধ করে তা অনেকাংশ মজুর খাটার মতোই। অর্থাৎ সারাদিন গতর খেটে কিস্তির টাকা জোগাড় করতে হয়। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
যারা দুটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে, তাদের বিপদ বেশি। তারা এ ঋণ পরিশোধ করার জন্য ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই পরিশ্রমের ফল হয় শূন্য। কারণ ঋণ পরিশোধ করতেই তাকে হিমশিম খেতে হয় বাড়তি আয়ের মুখ দেখবে কীভাবে। এর মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক সঞ্চয়। প্রতি সপ্তায় ১০ টাকা করে বাধ্যতামূলক সঞ্চয় খাতে টাকা জমা দিতে হয়।
গ্রামীণ নারীরা সহজ-সরল। তারা সারাদিন কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে। জীবনেও মোটা অঙ্কের টাকার মুখ দেখেনি। ফলে এক সঙ্গে পাঁচ বা ১০ হাজার পেয়ে তারা অনেকটা দিশাহারা হয়ে যায়। অনেকের স্বামী আবার ঋণের টাকার ওপর ভাগ বসায়। আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য স্ত্রীর কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে যায়। একদিকে স্বামী প্রদত্ত চাপ, অন্যদিকে, এনজিও কর্মকর্তার চাপ- দুই চাপে গ্রামীণ নারীরা অসহায় হয়ে পড়ে। অথচ কিস্তি পরিশোধের ব্যাপারে স্বামীর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যেসব এনজিও গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের ঋণ দেয় তারা কখনই ভাবে না যে, প্রতি সপ্তায় তারা এ ঋণ পরিশোধ করবে কী করে।
এনজিওর পক্ষ থেকে বলা হয় ঋণ নিয়ে বিত্তহীন নারীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। তাদের ছেলেমেয়েরা বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, কন্যাদায়গ্রস্তরা অনায়াসে মেয়ে বিয়ে দিতে পারছে, বয়স্করা পর্যন্ত শিক্ষা পাচ্ছে, আরও কত কী? কিন্তু এ চিত্র কি টেকসই এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত? আরও বলা হয় তাদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কারিগরি দক্ষতা অর্জনের জন্য আগে প্রশিক্ষণ এবং তারপর ঋণ দেয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশিক্ষণ পেলেই কি সে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধের দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। গ্রামীণ নারী জানে না, তাদের ঋণের টাকার সুদ কত। যদিও বলা হয় শতকরা ১৫ ভাগ, আসলে এ সুদ গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪০ ভাগে।
যেমন একজন নারীর নিজের পুঁজি রয়েছে ৩০ হাজার, এনজিওর কাছ থেকে বাকি ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে যদি সে একটি দুধেল গাভী কেনে তবে তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে। অর্থাৎ শতভাগ এনজিওর ঋণ নিয়ে কোনো নারীর পক্ষে আত্মনির্ভরশীল হওয়া কঠিন। তবে যেসব নারী সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দিয়েছে তারাই সাফল্যের মুখ দেখেছে। অথবা যার ১০ কাঠা বা এক দুই বিঘা জমি রয়েছে, রয়েছে একাধিক পুকুর তারা ঋণ নিয়ে শাকসবজি ফলিয়ে পুকুরে মাছ চাষ করে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে। এখানে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, শতভাগ এনজিও নির্ভরশীল হয়ে ঋণ নিলে তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গরিব যে আরও গরিব হয়ে যায়, তার প্রধান কারণ নিজের কোনো অর্থ-বিত্ত না থাকা সত্ত্বেও ঋণ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা। কেবল এনজিওর ঋণে কোনো নারীর পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়। যেমন একজন নারী এনজিওর ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগি, কবুতর পালন করছে বা মুড়ি ভেজে হাটবাজারে বিক্রি করছে তার অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যে রাস্তার মোড়ে মুদি দোকান দিয়েছে কিংবা পরপর দুইবার দুই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গাভী বা ছাগল কিনেছে তার অর্থনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। তবে উত্তরবঙ্গের নারীরা বেশি কর্মঠ ও কর্তৃত্বপরায়ণ। তারাই সংসার পরিচালনা করে। নিজেরাই মাঠের কাজ করে। বেশ কজন গ্রামীণ নারীর কথা আমি জানি, তারা ঋণ নিয়ে এক দশক ধরে সংগ্রাম করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যেমন লালমনিরহাটের মহেন্দ্রনগরের বুলবুলি, মোঘলাহাটের হাজেরা, ঠাকুরগাঁওয়ের পদমপুরের সোনাবালা, নীলফামারী জেলার সোনারায় গ্রামের তাহেরা। এরা এনজিও থেকে ঋণ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মোন্নয়নের ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য এনেছে। এরা হাজারে একজন। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন বা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ক্ষেত্রে এরা উদাহরণ হতে পারে না। তবে এনজিওদের কারসাজি অন্য জায়গায়। তারা হাজারে একজন নারীর সাফল্যকে মডেল হিসেবে দাতাগোষ্ঠী বা মিডিয়ার সামনে দাঁড় করায়, বাকি ৯৯৯ জন পড়ে থাকে অন্ধকারে। মিডিয়াকে ঘুষ অথবা উপঢৌকন দিয়ে ওই একজনের সাফল্যকে মহাসাফল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারেও ওই আত্মনির্ভরশীল নারীকে হাজির করা হয়। এর ফলে দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ফান্ড পেতে সুবিধা হয়। এটাও এক ধরনের প্রতারণা। এনজিওগুলোর প্রতারণা আর লোভের ফাঁদে পড়ে এ দেশের দরিদ্র নারী আরও হতদরিদ্র হয়েছে। নারী ঋণের মাধ্যমে অর্থ নিয়েছে কিন্তু আত্মনির্ভরশীল হতে পারেনি।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এনজিরও ঋণ নিয়ে নারীর আত্মনির্ভরশীল হওয়া খুবই কঠিন। এটা হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বপ্নময় প্রলোভন ও শোষণজনিত ফাঁদ। এ ফাঁদে নারী একবার পড়লে তার আর রক্ষা নেই। একবার ফাঁদে পড়া বা ঋণের জালে আবদ্ধ হওয়া মানে, বারবার পড়া। এর ফলে একজন নারীর জীবন-সংসার হয়তো চলে কিন্তু প্রান্তিক অর্থনৈতিক দুঃসহ স্তর অতিক্রম করা হয়ে পড়ে কঠিন।
কৃষি, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন, সামাজিক বনায়ন বা বৃক্ষরোপণের দিকে নারীকে উৎসাহিত করতে হবে। নারী নিজের পায়ে দাঁড়ানো মানে কেবল নারীর আত্মোন্নয়ন ঘটবে না, দেশও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে।সমাজের বুকে স্থান পেতে হলে নারীদের অবশ্যই নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। অন্যের উপর ভর দিয়ে টিকে থাকা নারীর জন্য অসহনীয় কষ্টের। যেখানে থাকে না বিন্দুমাত্র স্বাধীনতা, থাকে না নিজের অনুভূতি কিংবা ইচ্ছা প্রকাশের স্বাধীনতা। অন্যকে খুশি করার জন্য, নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হরেকরকম অভিনয় করে নারীর জীবন চলমান। তবে হ্যাঁ ব্যতিক্রমী ও কারো কারো হয়। যেটা একমাত্র ভাগ্য বলা চলে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী বিভিন্ন ভাবে নির্যাতিত হয়ে থাকে কেউ শারীরিক আবার কেউ কেউ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। পরিবার হতে একটা মেয়েকে সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে এবং সুযোগ দিতে হবে যাতে করে মেয়েটা অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। একটা ছেলে পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারলে একটা মেয়েও তা অবশ্যই পারবে। আমাদের সমাজের অনেক মা বাবার ধারণা, মেয়ের বয়স হলে আর ভালো পাত্র পাওয়া যাবে না। এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক অনেক মেয়েকে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিয়ে দেয়া হয় উচ্চ শিক্ষিত এবং অঢেল ধন সম্পদ দেখে। যেখানে ওই মেয়েকে অন্যের মন জয় করার জন্য নিজেকে মানিয়ে নিতে নিতে নিজের সবকিছু বিসর্জন দিতে হয়। এইভাবে অনেক মেধাবী মেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মা বাবার ভুল ধারণার জন্য। সমাজে টিকে থাকতে মেধাবী অনেক নারী অবিরাম এইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে! সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা মাঝপথে এইভাবে খসে পড়ছে। বিয়ের পর এক পা ঘরের বাইরে ফেলতে ও অনেক হিসেব করতে হয় যেটা কর্মজীবী বা প্রতিষ্ঠিতদের বেলায় একদম না। আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাবো, প্রতিষ্ঠিত নারীদের কখনো ভাগ্যের উপর নির্ভর করে টিকে থাকতে হয় না। তাদেরও বিয়ে হয় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির সাথে। যেখানে একে অপরকে মূল্যায়ন করে থাকে। একজনের অনুভূতি অন্যজন বুঝতে পারে খুব সহজে। এখানে কেউ কাউকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই। এখানে একে অপরের পরিপূরক। প্রতিষ্ঠিত নারীদের জীবনে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে সংসার ভাঙলে মা বাবা কিংবা সমাজের করুনা নিয়ে বেঁচে থাকার আকুতি করতে হয় না। তাই সবাইকে অনুরোধ করবো নারীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ভাগ্যের উপর ঠেলে না দিয়ে নারীদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগ দিন।গ্রামীণ নারীরা সহজ-সরল। তারা সারাদিন কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে। জীবনেও মোটা অঙ্কের টাকার মুখ দেখেনি। ফলে এক সঙ্গে পাঁচ বা ১০ হাজার পেয়ে তারা অনেকটা দিশেহারা হয়ে যায়। অনেকের স্বামী আবার ঋণের টাকার ওপর ভাগ বসায়। আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য স্ত্রীর কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে যায়। একদিকে স্বামী প্রদত্ত চাপ, অন্যদিকে এনজিও কর্মকর্তার চাপ- দুই চাপে গ্রামীণ নারীরা অসহায় হয়ে পড়ে। অথচ কিস্তি পরিশোধের ব্যাপারে স্বামীর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যেসব এনজিও গ্রামীণ দরিদ্র নারীকে ঋণ দেয় তারা কখনই ভাবে না যে, প্রতি সপ্তাহে তারা এ ঋণ পরিশোধ করবে কী করে।
নারীর স্বাধীনতা অর্জনের একটি উলেস্নখযোগ্য দিক হলো স্বাবলম্বিতা অর্জন বা নিজের পায়ে দাঁড়ানো। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর স্বাবলম্বী বা আত্মনির্ভরশীল হওয়া মানে এক কঠিন সংগ্রাম ও সাধনার ব্যাপার। নারী এ পথে পা বাড়ালে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। নারী স্বাবলম্বী হওয়ার দুটি প্রধান দিক রয়েছে- একটি হচ্ছে নিজ যোগ্যতাবলে চাকরি বা ব্যবসা করা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে অন্যের সাহায্য নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। অন্যের সাহায্য বলতে ব্যাংক অথবা ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে কিংবা যে কোনো বেসরকারি সংস্থার ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া। এ কাজটি অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। নারী এতটাই পুরুষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও নির্যাতিত যে, এ ভয়াবহ জীবন থেকে মুক্তি চায় সে প্রতিনিয়ত। এ মুক্তির প্রধান দিক হচ্ছে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন।
ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীর স্বনির্ভরতা অর্জন ইদানীং গণজোয়ারে পরিণত হয়েছে। এনজিওর মাধ্যমে সারাদেশব্যাপী চলছে এ ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি। নারীরাও আত্মনির্ভর হওয়ার জন্য বাছবিচার না করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এ কর্মসূচিতে।
প্রশ্ন উঠতে পারে এনজিওর টাকা নিয়ে বিত্তহীন মহিলারা কী করে। উঠানে জমি থাকলে কেউ শাকসবজির আবাদ করে, কেউ গরু, ছাগল কেনে, কেউ সেলাই মেশিন কেনে, কেউ বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগায়, আবার কেউ রাস্তার মোড়ে মুদি দোকান দেয়। হাঁস-মুরগি, কবুতর পালে কেউ। কেউ মুড়ি ভাজে। কেউ পুকুরে মাছচাষ করে। ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণের মাধ্যমে যে পেশাই গ্রহণ করুক না কেন, প্রত্যেকেরই সপ্তাহ শেষে উচ্চ সুদসহ কিস্তি গুনতে হয়। অবাক ব্যাপার যে সুদের হার কত তা ঋণ গ্রহীতারা জানে না। তারা দেখে, তারা সপ্তাহ শেষে এক বা দুশো টাকা পরিশোধ করছে। যে গাভী পালছে সে দুধ বিক্রি করে পরিশোধ করছে, যে হাঁস-মুরগি পালছে, যে ডিম বিক্রি করছে, যে দোকান চালাচ্ছে সে হয়তো দোকান থেকে সুদসহ ঋণ পরিশোধ করছে।
এমনও অনেক নারী রয়েছে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দৈনন্দিন সংসার খরচ মিটিয়েছে অথবা ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসান দিয়েছে তারা কীভাবে কিস্তি পরিশোধ করবে। ঋণ দেওয়ার আগে এনজিওদের কঠিন ও অনিবার্য শর্ত হচ্ছে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা। যেসব নারী বিভিন্ন কাজে তাদের আর্থিক পারিবারিক উন্নয়নের নামে ঋণ নিয়েছে, এনজিওর মাঠকর্মীরা সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মতো সকালে, বিকালে দুপুরে তাদের খোঁজ রাখে। মধুর ব্যবহার করে প্রথম। ঋণ সফলভাবে পরিশোধ করার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়বার ঋণ নেওয়ার তাগিদ দেয়। কিন্তু যে নারী ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেনি, মুহূর্তে তার ওপর নেমে আসে অত্যাচার নির্যাতনের খড়গ। ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে যে নারী একবার পড়েছে, তার আর রক্ষা নেই, তার জীবন বিপন্ন হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণ গরিবকে আরও গরিব করে এমন বহু প্রমাণ রয়েছে। ঋণ নেওয়ার পর কিছুদিন তার মধ্যে নগদ টাকার প্রাপ্তির উন্মাদনা থাকে, তখন নিজেকে সচ্ছল মনে হয়। আসলে এটা অর্থের গোলকধাঁধা। এ ধাঁধায় যে পড়েছে তার বের হয়ে আসা কঠিন।
ঋণ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের কিস্তি শোধের পালা এসে যায়। ঋণ গ্রহণের পর লাভ-লোকসানের হিসাব কেউ করে না। তারা যে কিস্তি পরিশোধ করে তা অনেকাংশ মজুর খাটার মতোই। অর্থাৎ সারাদিন গতর খেটে কিস্তির টাকা জোগাড় করতে হয়। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
যারা দুটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে, তাদের বিপদ বেশি। তারা এ ঋণ পরিশোধ করার জন্য ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই পরিশ্রমের ফল হয় শূন্য। কারণ ঋণ পরিশোধ করতেই তাকে হিমশিম খেতে হয় বাড়তি আয়ের মুখ দেখবে কীভাবে। এর মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক সঞ্চয়। প্রতি সপ্তায় ১০ টাকা করে বাধ্যতামূলক সঞ্চয় খাতে টাকা জমা দিতে হয়।
গ্রামীণ নারীরা সহজ-সরল। তারা সারাদিন কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে। জীবনেও মোটা অঙ্কের টাকার মুখ দেখেনি। ফলে এক সঙ্গে পাঁচ বা ১০ হাজার পেয়ে তারা অনেকটা দিশেহারা হয়ে যায়। অনেকের স্বামী আবার ঋণের টাকার ওপর ভাগ বসায়। আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য স্ত্রীর কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে যায়। একদিকে স্বামী প্রদত্ত চাপ, অন্যদিকে এনজিও কর্মকর্তার চাপ- দুই চাপে গ্রামীণ নারীরা অসহায় হয়ে পড়ে। অথচ কিস্তি পরিশোধের ব্যাপারে স্বামীর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যেসব এনজিও গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের ঋণ দেয় তারা কখনই ভাবে না যে, প্রতি সপ্তাহে তারা এ ঋণ পরিশোধ করবে কী করে।
এনজিওর পক্ষ থেকে বলা হয়, ঋণ নিয়ে বিত্তহীন নারীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। তাদের ছেলেমেয়েরা বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, কন্যাদায়গ্রস্তরা অনায়াসে মেয়ে বিয়ে দিতে পারছে, বয়স্করা পর্যন্ত শিক্ষা পাচ্ছে, আরও কত কী? কিন্তু এ চিত্র কি টেকসই এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত? আরও বলা হয় তাদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কারিগরি দক্ষতা অর্জনের জন্য আগে প্রশিক্ষণ এবং তারপর ঋণ দেয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশিক্ষণ পেলেই কি সে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধের দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। গ্রামীণ নারী জানে না, তাদের ঋণের টাকার সুদ কত। যদিও বলা হয় শতকরা ১৫ ভাগ, আসলে এ সুদ গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪০ ভাগে।
যেমন একজন নারীর নিজের পুঁজি রয়েছে ৩০ হাজার, এনজিওর কাছ থেকে বাকি ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে যদি সে একটি দুধেল গাভী কেনে তবে তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে। অর্থাৎ শতভাগ এনজিওর ঋণ নিয়ে কোনো নারীর পক্ষে আত্মনির্ভরশীল হওয়া কঠিন। তবে যেসব নারী সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দিয়েছে তারাই সাফল্যের মুখ দেখেছে। অথবা যার ১০ কাঠা বা এক দুই বিঘা জমি রয়েছে, রয়েছে একাধিক পুকুর। তারা ঋণ নিয়ে শাকসবজি ফলিয়ে পুকুরে মাছ চাষ করে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে। এখানে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, শতভাগ এনজিও নির্ভরশীল হয়ে ঋণ নিলে তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গরিব যে আরও গরিব হয়ে যায়, তার প্রধান কারণ নিজের কোনো অর্থ-বিত্ত না থাকা সত্ত্বেও ঋণ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা। কেবল এনজিওর ঋণে কোনো নারীর পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়। যেমন একজন নারী এনজিওর ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগি, কবুতর পালন করছে বা মুড়ি ভেজে হাটবাজারে বিক্রি করছে তার অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যে রাস্তার মোড়ে মুদি দোকান দিয়েছে কিংবা পরপর দুইবার দুই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গাভী বা ছাগল কিনেছে তার অর্থনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। তবে উত্তরবঙ্গের নারীরা বেশি কর্মঠ ও কর্তৃত্বপরায়ণ। তারাই সংসার পরিচালনা করে। নিজেরাই মাঠের কাজ করে। বেশ কজন গ্রামীণ নারীর কথা আমি জানি, তারা ঋণ নিয়ে এক দশক ধরে সংগ্রাম করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যেমন লালমনিরহাটের মহেন্দ্রনগরের বুলবুলি, মোঘলাহাটের হাজেরা, ঠাকুরগাঁওয়ের পদমপুরের সোনাবালা, নীলফামারী জেলার সোনারায় গ্রামের তাহেরা। এরা এনজিও থেকে ঋণ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মোন্নয়নের ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য এনেছে। এরা হাজারে একজন। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন বা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ক্ষেত্রে এরা উদাহরণ হতে পারে না। তবে এনজিওদের কারসাজি অন্য জায়গায়। তারা হাজারে একজন নারীর সাফল্যকে মডেল হিসেবে দাতাগোষ্ঠী বা মিডিয়ার সামনে দাঁড় করায়, বাকি ৯৯৯ জন পড়ে থাকে অন্ধকারে। মিডিয়াকে ঘুষ অথবা উপঢৌকন দিয়ে ওই একজনের সাফল্যকে মহাসাফল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারেও ওই আত্মনির্ভরশীল নারীকে হাজির করা হয়। এর ফলে দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ফান্ড পেতে সুবিধা হয়। এটাও এক ধরনের প্রতারণা। এনজিওগুলোর প্রতারণা আর লোভের ফাঁদে পড়ে এ দেশের দরিদ্র নারী আরও হতদরিদ্র হয়েছে। নারী ঋণের মাধ্যমে অর্থ নিয়েছে কিন্তু আত্মনির্ভরশীল হতে পারেনি।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এনজিরও ঋণ নিয়ে নারীর আত্মনির্ভরশীল হওয়া খুবই কঠিন। এটা হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বপ্নময় প্রলোভন ও শোষণজনিত ফাঁদ। এ ফাঁদে নারী একবার পড়লে তার আর রক্ষা নেই। একবার ফাঁদে পড়া বা ঋণের জালে আবদ্ধ হওয়া মানে, বারবার পড়া। এর ফলে একজন নারীর জীবন-সংসার হয়তো চলে কিন্তু প্রান্তিক অর্থনৈতিক দুঃসহ স্তর অতিক্রম করা হয়ে পড়ে কঠিন।
কৃষি, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন, সামাজিক বনায়ন বা বৃক্ষরোপণের দিকে নারীকে উৎসাহিত করতে হবে। নারী নিজের পায়ে দাঁড়ানো মানে কেবল নারীর আত্মোন্নয়ন ঘটবে না, দেশও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে।বিয়ে হয়ে গেছে, ওর আর পড়ালেখা হবে না। ও আর জীবনে কিছুই করতে পারবে না’- খুব অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় আশপাশের অনেকের এমন কথা শুনেছেন তরুণ উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থী নাজিয়া বিনতে আমিন। সবাইকে মিথ্যা প্রমাণ করে সেই সদ্য বিবাহিত মেয়েটিই এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেলেন, পেলেন বৃত্তিও। আশেপাশের মানুষের কথাগুলো থেকেই নিজের কাজ দিয়ে ‘সবাইকে দেখিয়ে দেওয়ার’ জন্য কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করলেন।
সেই গল্প শোনাতেই বলছিলেন, ‘আমার পছন্দের কাজের মধ্যে ছিল ‘মেকওভার’ বা পার্লারের কাজ। মেকআপ নিয়ে কাজ করতেই আমার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা। শুরু করলাম ‘মেকওভার বাই নাজিয়া আমিন’ নামে একটি অনলাইন পেজের মাধ্যমে।’ নাজিয়ার মতে, একজন নারীর সফলতার পিছনে তার পরিবার ও আপনজনদের সহায়তা থাকা জরুরি।
নাজিয়া জানান, ‘আমি ভাগ্যবতী যে, আমার বাবা-মা, স্বামী, শ্বশুরবাড়ীর সবার থেকেই সবসময় খুব বেশিই অনুপ্রেরনা পেয়েছি। আর সবচেয়ে বেশি পাশে পেয়েছি আমার মা এবং স্বামীকে। একজন ছোট ও সাধারণ উদ্যোক্তা হলেও আমি নিজে কিছু করতে পারছি, এটিই আমার আনন্দের বিষয়।’ সকল নারীর কাছে তার চাওয়া, যেন প্রত্যেকে আত্মবিশ্বাসী ও কাজের ক্ষেত্রে দৃঢ় মনোবলের অধিকারী হয়।
‘ব্যাক টু চাইল্ডহুড- এ শপ অব কিউটনেস’ নামক অনলাইন বিজনেস পেজের সত্ত্বাধিকারী নুসরাত জাহান মিম। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন আরও ১২জন। মাসে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার ক্রেতা, পরিবারের দুই সন্তান –সবকিছু মিলিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটে তার। তার মতে, ‘একজন নারীর জন্য প্রতিটা দিনই এক একটি যুদ্ধের সামিল, যুদ্ধ আরো বহুগুণ বড় হয় যখন নারীর পাশে ‘উদ্যোক্তা’ যুক্ত হয়৷ ঘরে-বাইরে, সমান তালে নিজেকে বার বার প্রমাণ করার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়।’ তবে নিজেকে একজন কর্মজীবি নারী, নারী উদ্যোক্তা কিংবা নারী ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রতি পদেপদে তিনি পুরুষের সক্রিয় ভূমিকাও উপলব্ধি করেছেন। মিম বলেন, ‘আমাকে আজ সবাই একজন সফল নারী উদ্যোক্তা ভেবে থাকলে এর একটা সিংহভাগ অবদান আমার স্বামীর।
ভোর পাঁচটা থেকে শুরু করে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন গৃহিণী আফরোজা চায়না। তার মতে, একজন গৃহিনী হিসেবে তার দৈনন্দিন জীবন খুব আরাম-আয়েশে কাটে তা নয়। একজন গৃহিনীকে ঘরেবাইরে দশদিকে নজর রেখে চলতে হয়, যা একজন কর্মজীবি নারীর কাজের থেকে কোনো অংশে কম নয়। তবে, সেই কাজের সঠিক মূল্যায়ন বেশিরভাগ সময়ই তারা পান না, এমন অভিযোগ আছে। হাসিমুখে এত পরিশ্রমের পরও পরিবারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না সবসময়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই পরিবর্তনটা খুব প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। আফরোজা বলেন, ‘ভাবতেই ভালো লাগে যে আমাদের নারীদের জন্য একটি আলাদা দিবস পালিত হয়। দায়িত্ববান ও কর্মঠ প্রত্যেক নারীর জন্য তার প্রত্যেকটি দিনই নারী দিবসের মতো সুন্দরভাবে কাটুক এটাই আমার প্রত্যাশা।
খুব অল্প বয়স থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইতেন তরুণ উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থী মাঈশা তাবাসসুম ঐশী। তিনি কারো ওপর নির্ভরশীল থাকা পছন্দ করতেন না, তাই হতে চেয়েছেন একজন সফল উদ্যোক্তা। করোনা মহামারীর ঘরবন্দী অবস্থায় তিনি রান্না শেখায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় হয়ে ওঠে ‘কেক বেকিং’। তারপর একদিন অনলাইনে ‘মাঈশা’স কেক’ নামে পেজ খোলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি এখান থেকেই তার নতুন এক আয়ের শুরু। প্রথমে ভেবেছিলেন কেক বিক্রি হবে না, তিনি হয়তো পারবেন না। তবুও হাল ছাড়েননি। একসময় সবাই তার কেক পছন্দ করতে শুরু করলো, যা তাকে আরো উৎসাহিত করেছিলো। বর্তমানে তার এই ক্ষুদ্র ব্যবসাটি বেশ ভালো চলছে।