
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া : ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মৎস্য অধিদপ্তরের রাজস্ব অর্থায়নে “উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের চ্যালেঞ্জসমূহ ও করণীয়” শীর্ষক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার ৩ জানুয়ারি সকাল ১১টায় খুলনা বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ কর্মশালার আয়োজন করে মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগ, খুলনা।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগ, খুলনা।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোঃ হাসানুজ্জামান, যুগ্ম সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ঢাকা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোঃ হাসানুজ্জামান বলেন, বর্তমানে মাছচাষে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় চাষিদের লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মাছ আহরণের পর আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান খুবই কম থাকছে। ফলে “মাছচাষে উৎপাদন খরচ বেশি”—এটি এখন মৎস্যচাষিদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি কম খরচে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই চাষপদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মত দেন।
কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বিপুল কুমার বসাক, উপ-পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।
এছাড়া কর্মশালায় খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ ও বাগেরহাট জেলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তাসহ মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
কর্মশালায় আলোচকরা বলেন, উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণে বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এর মধ্যে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রোগের ঝুঁকি, অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, পানির গুণগত মানের অবনতি, প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব।
বক্তারা উল্লেখ করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাষিরা দ্রুত লাভের আশায় অতিরিক্ত খাদ্য, রাসায়নিক ও ওষুধ ব্যবহার করেন, যার ফলে চিংড়ির রোগ বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে লবণাক্ত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে আশপাশের কৃষিজমি, মিঠাপানির উৎস ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব চাষের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
আরও বলা হয়, মানসম্মত পিএল (PL) প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানের অভাব এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও নজরদারির ঘাটতির কারণে অনেক চাষি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কর্মশালায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কম ইনপুট নির্ভর চাষ পদ্ধতি, বায়ো-সিকিউরিটি ব্যবস্থা জোরদার, পানির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণ, এবং প্রাকৃতিক ও প্রোবায়োটিকভিত্তিক উপকরণ ব্যবহারের প্রসার।
এছাড়া চাষ ব্যবস্থাপনায় বটম ক্লিন মেথড (BCM), পলি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সঠিক মজুদ ঘনত্ব বজায় রাখা, এবং স্থানভিত্তিক পরিবেশ উপযোগী চাষ মডেল অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা আরও বলেন, পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষের টেকসই উন্নয়নের জন্য চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী খামার স্থাপন, গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের ফলাফলের সমন্বয়, এবং নীতিগত সহায়তা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে পরিবেশবান্ধবভাবে উৎপাদিত চিংড়ির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চাষিরা এই পদ্ধতিতে আরও উৎসাহিত হবেন বলে মত প্রকাশ করেন।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষের মাধ্যমে একদিকে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও চাষিদের আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ মঞ্জুরুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক, পরিচালকের কার্যালয়, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগ, খুলনা।

