
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : হাড় কাঁপানো শীতের বিপাকে পড়েছে? সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল পঞ্চাশ হাজার বনজীবী খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে কাকড়া আহরণ করা দুই মাসের জন্য সুন্দরবনের নিষিদ্ধ থাকলেও অন্যান্য জাল দিয়ে মৎস্য আহরণ করা চালু আছে কিন্তু হিমেল হাওয়ায় আর প্রচন্ড ঠান্ডায় যাব অথবা মেরে গেছে সুন্দরবনের উপর জীবিকা নির্ভরশীল অন্তত ৫০ হাজার বনজীবী। সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার মৎস্যজীবী সমিতির মধু জিৎ রপ্তানা এই প্রতিবাদ টা জানান প্রচন্ড শেপের কারণে শীতের কারণে আজ এক সপ্তাহ কোন বনজীবী সুন্দরবনে প্রবেশ করতে না।বিচরণ ক্ষেত্র সুন্দরবন। যেখানে গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়ায় বানরের দল। ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী দাপিয়ে বেড়ায় স্থলে আর কুমিরসহ ২৯১ প্রজাতির মৎস্য সম্পদ লোনা পানিতে সাতরায়। ম্যানগ্রোভ এই বনের বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদসহ জীববৈচিত্র আহরণ করে যারা জীবীকা নির্বাহ করে। নতুন বছরের শুরুতেও যেন তাদের কষ্টের গল্প বাকি রয়ে যাচ্ছে। তারা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছে দু’বেলা দুমুঠো ভাতের আশায়।
জানা যায়, জীববেচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ২ লাখ হরিণসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড ও ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এই ম্যানগ্রোভ বনের ৩টি এলাকা ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট। এছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জলভাগে কুমির, ৬ প্রজাতির ডলফিনসহ ২৯১ প্রজাতির মাছ রয়েছে। অক্সিজেনের অফুরন্ত ভাণ্ডার সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটর। সুন্দরবনের এই অফুরন্ত সম্পদের ওপর নির্ভর করে যারা জীবীকায়ন করে তাদেরকে এক কথায় বনজীবী বলে। এছাড়া সুন্দরবনের গাঁ ঘেষে যেসব এলাকায় রয়েছে। ওইসব এলাকায় বসবাস করে অনেক মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ। তারাও তিন বেলার আহারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অনেকে আবার জীবীকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ছুটছেন বিভিন্ন শহরে। হচ্ছেন পরবাসি। ফলে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে চিরায়ত একটি পেশা। এই বনজীবী এবং মুন্ডা সম্প্রদায়ের পুরুষরা সুন্দরবনে গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেন। শিশুরাও তাদের সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। আর নারীরা সংসারের কাজ করে চিংড়ি পোনা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করতে নদীর পাড়ে অধিকাংশ সময় থাকতে হয় এই নারীদের। মেয়েশিশুরা থাকে মায়ের সহযোগী হয়ে। আবার পেটের টানে প্রয়োজনে নারীরা কখনও কখনও নৌকায় চেপে সুন্দরবনেও যান মাছ ধরতে।
সাতক্ষীরা ,খুলনার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর কয়রা এবং দাকোপ। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা সুন্দরবন ভিত্তিক। সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রার মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, ৪ নম্বর কয়রা, ৫ নম্বর কয়রা, ৬ নম্বর কয়রা, পাতাখালী, কাটকাটা, গাববুনিয়া, মদিনাবাদ, কাশির হাটখোলা, ঘড়িলাল, চরামুখা, শাকবাড়িয়া, হরিহরপুর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা ও গোলখালী গ্রামে ও শ্যামনগর উপজেলার পাতাখালি ,চন্ডিপুর, পাখিমারা ,ঝাঁপালি,বড় কুফট, নওয়াবেকি, কাশি মাড়ি,বুরি গোয়ালেনী,ডুমুরিয়া, গাবুরা ,পারশেমারি, চাঁদনী মুখা ,দাতি না খালি ,দুর্গা বাটি, পরাকাট লা, কলবাড়ি , আবার চন্ডিপুর,মুন্সিগঞ্জ ,মৌখালী, দক্ষিণ কদমতলা ,পূর্বকালীনগর ,মথুরাপুর ,কুলতলী, ধুম ঘাট, হরিনগর , সিংহর তলী , চুনকুড়ি ,মারা গান, যতীন্দ্রনগর , ছোটভেট খালি,টেংরাখালী , পার্শ্বে খালি , কাল ইঞ্চি,কৈখালী, ভেটখালী, দক্ষিণ পরানপুর, পশ্চিম পরানপুর, একইচিত্র। তবে জেলার দাকোপ উপজেলায়ও বনজীবীরা বেঁচে থাকার লাড়ায়ের চিত্র একই। এইসব এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখনও বনের সম্পদের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বনজীবীরা এখন আর বনে গিয়ে সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে এখানে বসবাসরত বনজীবীদের টিকে থাকা কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষই বাপ-দাদার আমল থেকেই সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন তাদের বছরের একটা বড় সময়ই কর্মহীন থাকতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই বনের কাজ ছেড়ে মাটিকাটা, নদীভাঙন রোধে ব্লক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে সেখাইের প্রাপ্ত পারিশ্রমিকে চলে না সংসারে চাকা।
কয়রা উপজেলার কাটকাটা এলাকায়র অবনী মন্ডল ও শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ গ্রামের আবিয়ার রহমান জানান, বাদায় (বনে) গিয়ে আর পেট চলে না। মাঝে মাঝে শহরে যাই কাজ করতে। কিন্তু সেখানে মন টেকে না। বাদায় মন টানে। তাই আবার বাপ দাদার পেশায় ফিরে আসি। আয় না থাকলে, গাঙ (নদী) পাড়ে বসে বাদার দিকে তাকায় থাকি। কি করবো। কোন তাল পাইনা। আবার সুন্দরবনের কথা মনে উঠলে জলদস্যদের ভয়ে চোখ দিয়ে ছলছল করে পানি আসে করবো কি জলদস্যদের কথা মনে আসলে গা শিউরে ওঠে। তারা আনা জান ান জলদস্যুরা দুই এক দল হলেও তাল মিল করে নেওয়া যায় কিন্তু বর্তমান অত্যন্ত দশটি বনদস্য বাহিনী লোকালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে বেড়াচ্ছে বনজীবীদের পেলে উপায় নেই অপহরণ করতে পারলে ৫০০০০ টাকা সর্বনিম্ন কিন্তু জলদস্য বাহিনী আছে দশটি কয়টি বাহিনীর টাকা দিয়ে পারা যায় মনে আর ভালো লাগেনা সুন্দরবনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি।
একই উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা এলাকার শাহাবাজ আলী জানান, বাদা ছেড়ে যাবো কনে? নদীতে পোনাও তেমন পাচ্ছি না। তারপর আবার নদীতে গেলে ফরেষ্টাররা তাড়িয়ে দেয়। তবু পড়ে আছি সুন্দরবনের মুখের দিকে তাকিয়ে।
জেলার দাকোপ উপজেলার মোজামনগর বরইতলা খেয়াঘাট এলাকায় আলেয়া আক্তার। তিনি জানান, এই বনকে ভালবাসি বলেইতো একমাত্র ছেলের নাম রাখছি মধু। ওর বাপ প্রতি বছর বনে যায় মধু কাটতে। আর আমি নদীতে চিংড়ির পোনা ধরি। ছেলেকে স্কুলে পাঠাই। পড়ালেখা শিখিয়ে সে যেন চাকরী-বাকরি করে। আমাদের মতো কষ্টের জীবন যেন তার আর না হয়। আমরাতো দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্যি বাঘের মুখে পড়ে থাকি। ছেলেটা যেন ভাল থাকে।
পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদককে জানান, সুন্দরবন এখন কঠোর নিরাপত্তা বেস্টনির মধ্যে রয়েছে। কাঠ চুরি বা বনের মধ্যে কোনও ধরণের অপরাধের সুযোগ নেই। তাই পাশ পারমিট ছাড়া কোনও লোকই এখন বনে যেতে পারে না। পাস পারমিট নিয়ে বনে যাওয়া বনজীবীরা নির্বিঘ্নেই অনুমোদিত কাজ করতে পারে। বন প্রহরীরা প্রতিটি এলাকায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে আমরা প্রকৃত বনজীবী এবং উপজাতি বা মুন্ডা সম্প্রদায়ের জন্য পাস পারমিটে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।
পুরুষরা মাছ ধরে, গোলপাতা কাটে, কাঁকড়া ধরে আর মধু আহরণ করে। নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরার কাজে। আবার নারীরা কখনো পুরুষের নৌকায় সুন্দরবনে যান মাছ ধরতে। শিশুরা হাঁটাচলা শিখে বাইরে বের হওয়ার পর থেকেই প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে বনের কাজে। এত কষ্টের পরেও সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোর বনজীবীদের কষ্টের দিন শেষ হয় না। কয়রা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পাথরখালী গ্রাম। সরকারি নানামুখী নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বন এখন আর তাদের জীবিকার পথ দেখাতে পারছে না। এসব গ্রামের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ বাপ-দাদার আমল থেকে বনের কাজে জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে। খুলনা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা কয়রা। ওপারে সুন্দরবন, এপারে লোকালয়, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কম প্রশস্তের ছোট্ট নদী শাকবাড়িয়া। এ নদীর পাড়ে সুন্দরবন লাগোয়া গ্রাম মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, ৪নং কয়রা, ৫নং কয়রা, ৬নং কয়রা, পাথরখালী, কাটকাটা, তেঁতুলতলার চর, বানিয়াখালী। গ্রামগুলোতে দেখা গেছে বহু কর্মহীন মানুষকে গাছের ছায়ায়, দোকানে, রাস্তার ধারে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে। বনের কাজ ছেড়ে এখন অনেকে মাটিকাটা, কৃষি কাজ, ইটের ভাটায় শ্রম দেয়া, নদীভাঙন রোধে ব্লক বানানোসহ নানা কাজ করছে। তবে এতে মজুরি একেবারেই কম। গত বুধবার ভরদুপুরে পাথরখালী থেকে জোড়শিং যাওয়ার সময় পথে দেখা মিজানুর গাজীর সঙ্গে। পাশের কোনো এক কৃষকের বাড়িতে চুক্তিভিত্তিক একবেলা কাজ শেষে কাঁধে কোদাল নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। মিজানুর আর আমিরুল জানালেন, কখনো কারও বাড়িতে, কখনো চিংড়ি ঘেরে আবার কখনো বনের কাজে যান। কিন্তু এ দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল। আবার কাজের নেই কোনো নিশ্চয়তা। অতিকষ্টে কাজ জোগাড় করতে পারলেও মজুরি খুবই সামান্য। কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, পারমিটধারী বনজীবীরা কোনো বাধা ছাড়াই বনে কাজ করতে পারে। জেলে বাওয়ালীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনের গা ঘেঁষে জেগে থাকা এই গ্রামগুলোর মানুষের বেঁচে থাকা নির্ভর করে বনের ওপর। ৪নং কয়রা এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল হুদা প্রায় ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মধু আহরণ করেন। তিনি জানান, বাংলা সনের চৈত্র মাসের ১৮ তারিখে মধু আহরণকারীদের পারমিট দেয়া হয়। এ বছর অধিক মধুর পাস হওয়ায় তেমন আয় করতে পারেনি। বর্তমানে কাঁকড়া ও মাছের ছাড়া কোনো পারমিট নেই। এর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে এ জনপদের জেলে পরিবার। বনজীবীদের এসব গ্রামের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায় না। কারণ, ওদের বাবা-মা, দাদা সবাই যে বনজীবী। এই পেশাই হয়তো হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওদের আগামী দিনগুলো। তাই আধুনিক যুগে এ জনপদের সাধারণ মানুষ একটু বিকল্প কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা পেলে তাতে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকতে পারতো এমন প্রত্যাশা সকলের।সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোর বনজীবীদের কষ্টের দিন যেন শেষই হচ্ছে না। সুদিন ফেরাতে পরিবারের সবাই সংগ্রাম করছেন। কিন্তু তিন বেলার আহারই জুটছে না। ফলে বনজীবীরা গ্রাম ছেড়ে ছুটছেন বিভিন্ন শহরে। অস্তিত্ব হারাতে বসেছে চিরায়ত একটি পেশা।
সুন্দরবনে গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেন পুরুষরা। শিশুরাও তাদের সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। আর নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ি পোনা সংগ্রহে। সংসারের রান্না থেকে শুরু করে সব কাজ করার পর তাদের চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করতে নদীর পাড়ে অধিকাংশ সময় থাকতে হয়। মেয়েশিশুরা থাকে মায়ের সহযোগী হয়ে। আবার পেটের টানে প্রয়োজনে নারীরা কখনও কখনও নৌকায় চেপে সুন্দরবনেও যান মাছ ধরতে।
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার অন্যতম প্রধান নদী শাকবাড়িয়ার তীরে সুন্দরবন সংলগ্ন ১৫টি গ্রামে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গ্রামগুলো হচ্ছে— মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, কয়রা ৪ নম্বর, ৫ নম্বর, ৬ নম্বর, পাথরখালী, মাটিকাটা, গাববুনিয়া, শাকবাড়িয়া, হরিহরনগর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা ও গোলখালী।
এই ১৫টি গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখনও বনের সম্পদের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। বনজীবীদের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে— মাছ ও কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু সংগ্রহ করা। বনের ভেতর ও আশপাশের নদী-খালে এরা চিংড়ি পোনাও ধরে থাকেন। জীবিকা নির্বাহে এটাও তাদের অন্যতম কাজ।
তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বনজীবীরা এখন আর বনে গিয়ে সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে এখানে বসবাসরত বনজীবীদের বেঁচে থাকাই কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষ বাপ-দাদার আমল থেকেই সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। কিন্তু এখন তাদের বছরের একটা বড় সময়ই কর্মহীন থাকতে হচ্ছে। এখন অনেকেই বনের কাজ ছেড়ে মাটিকাটা, নদীভাঙন রোধে ব্লক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকে তারা সন্তুষ্ট নন।
শাকবাড়িয়া গ্রামের কৃষ্ণপদ ম-ল জানান, বনে যেতে না পারার কারণে এখন বাড়িতেই সময় কাটে। আশপাশের চিংড়ি ঘেরে কিছুটা সময় দিলেও প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া যায় না। পেটের টানে ঝুঁকি নিয়ে চুরি করে হলেও বনে যেতে হয়। কিন্তু ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। ফলে কাজে অগ্রগতি হয় না। সংসারের টানাপড়েনও যায় না।
কাশিয়াবাদ ও মঠবাড়ি গ্রামের অনেক মানুষ নতুন বাঁধের ভেতর ও বাইরে আশ্রয় নিয়েছেন। বাঁধের দু’ধারে রয়েছে সারি সারি ছাউনিঘর। এসব মানুষের রয়েছে পানির কষ্ট। খাবার সংকট সহ্য করে তারা বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন বটে কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও পান না তারা। বনজীবীদের ছেলেমেয়েরাও স্কুলে যায় না। সংসারের টানাপড়েন ঘোচাতে তারাও বাবা-মার সঙ্গে নদী বা বনেই ব্যস্ত থাকে।
শাকবাড়িয়া গ্রামের চপল পাইন বলেন, ‘বনে যাওয়া যায় না। এছাড়া বিকল্প কাজেরও কোনও নিশ্চয়তা নেই। ঘের, মাটি কাটাসহ কিছু কাজ পাওয়া গেলেও মজুরি সামান্য। এসব কাজে দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও দুই শ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। এ অবস্থার কারণে মাঝে মধ্যে আট বছরের ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়েই বনে যেতে হয়। বনদস্যুদের আতঙ্ক, বাঘের ভয় আর বন বিভাগের কঠোর তৎপরতায় এখন বনে যাওয়া কঠিন। পাস পারমিট নিয়ে বনে গেলেও টাকা লাগে।’
স্থানীয় বাসিন্দা খলিল ঢালী জানান, তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করছেন। ১৮ চৈত্র থেকে মধু সংগ্রহের পারমিট দেওয়া হয়। আটজনের একটি দল নিয়ে তিনি এক মাসের জন্য মধু সংগ্রহে যান। এক মাস পর ১৫ দিনের বন্ধ রেখে আবার যেতে হয়। এভাবে তিন মাস চলে মধু সংগ্রহ। কিন্তু পারমিট নিয়ে মধু আহরণে গেলেও বন প্রহরীদের টাকা দিতে হয়। আর দস্যুদের বিচ্ছিন্ন তৎপরতার কবলে পড়লে তো রক্ষা নেই।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘সুন্দরবনে এখন কাঠ চুরির কোনও সুযোগ নেই। বন প্রহরীরা খুবই সতর্ক। তাই পারমিট ছাড়া কোনও লোকই এখন বনে যেতে পারে না। পাস পারমিট নিয়ে বনে যাওয়া বনজীবীরা নির্বিঘেœই অনুমোদিত কাজ করতে পারে। বৈধভাবে বনে গিয়ে অবৈধ কাজ করতে গেলে সে বাধার মুখে পড়ে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বন বিভাগ। সিদ্ধান্তটি পরিবেশ রক্ষায় জরুরি হলেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবারের ওপর। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জেলে, মৌয়াল, বাওয়াল ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষদের।
সাতক্ষীরার নদীঘেঁষা গ্রামগুলোতে এমন হাজারো পরিবার রয়েছে যাদের জীবন-জীবিকা পুরোপুরি নির্ভর করে সুন্দরবনের ওপর। কাঁকড়া, মাছ, গোলপাতা কিংবা মধু সংগ্রহ করেই চলে এসব পরিবারের জীবনযাপন। তবে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় তারা এখন কর্মহীন। অনেকটা ঘরবন্দি সময় কাটছে তাদের।
মুন্সিগঞ্জ এলাকার মৌয়াল শফিকুল গাজী এই প্রতিবেদককে বলেন, তিন মাস বন বন্ধ। অথচ সংসার তো থেমে নেই। সমিতির কিস্তি, তরিতরকারি, তেল, মসল্যা, ওষুধ সব কিছুরই খরচ আছে। সরকার থেকে ৫৫ কেজি চাল পেয়েছি। কিন্তু তাতে কতদিন চলা যায়? মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নিয়ে চলতে হচ্ছে।
একই কথা বলেন জেলে হোসেন গাজী। তিনি বলেন, একদিন মাছ না ধরলে আমাদের খাবার জোটে না। নিষেধাজ্ঞা মানি, সুন্দরবন রক্ষা দরকার। কিন্তু আমাদের তো বেঁচে থাকতে হবে। সেটা কি কেউ ভেবেছে? সুন্দরবনের গহীনের অপরাধীরা ঠিকই অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বনে জেলে বাওয়ালি না থাকার সুযোগে হরিণ শিকার বেড়েছে। অনেকে চুরি করে বনে যাচ্ছে।
‘একদিন মাছ না ধরলে আমাদের খাবার জোটে না। নিষেধাজ্ঞা মানি, সুন্দরবন রক্ষা দরকার। কিন্তু আমাদের তো বেঁচে থাকতে হবে। সেটা কি কেউ ভেবেছে? সুন্দরবনের গহীনের অপরাধীরা ঠিকই অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’
নিষেধাজ্ঞার কারণে শুধু বনজীবীরাই নয়, বিপাকে পড়েছেন পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরাও। সুন্দরবন ঘুরতে আসা পর্যটকদের ভরসা হয়ে থাকা শত শত ট্রলার, বোট, গাইড এখন অলস পড়ে আছে ঘাটে।
ট্যুর অপারেটর জাহাঙ্গীর হোসানের বলেন, গত এক মাস ট্রলারগুলো ঘাটে পড়ে আছে। ট্রলারে প্রতিদিন স্টাফ খরচ আছে। মেরামত না করতে করতে ট্রলারগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কারণ যাত্রী না এলে আয় হয় না, আর আয় না হলে মেরামত করবো কীভাবে?
স্থানীয়রা বলছেন, যখন সাধারণ বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ থাকে, তখন জঙ্গলের ভেতর সক্রিয় হয়ে ওঠে চোরাকারবারিরা। বন বিভাগের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় এই সময়ে।
এ বিষয়ে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, আমরা তো নিষেধাজ্ঞা মেনে ঘরে বসে আছি। কিন্তু শুনি এই সময়েই চোরা পথ দিয়ে অনেকে গাছ কাটছে, মাছ-কাঁকড়া শিকার করছে। এদের কেউ ধরে না।
‘তিন মাস বন বন্ধ। অথচ সংসার তো থেমে নেই। সমিতির কিস্তি, তরিতরকারি, তেল, মসল্যা, ওষুধ সব কিছুরই খরচ আছে। সরকার থেকে ৫৫ কেজি চাল পেয়েছি। কিন্তু তাতে কতদিন চলা যায়? মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নিয়ে চলতে হচ্ছে।’
সাতক্ষীরা সহকারী বন সংরক্ষ ক মশিউর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, সরকারি নির্দেশ মোতাবেক জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আমরা নিয়মিত টহল দিচ্ছি, স্পেশাল টিম ও স্মার্ট টিমের মাধ্যমে টহল কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্যই এই ব্যবস্থা। বনজীবীদের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন নিয়ম মেনে চলেন। কারও যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, প্রতিবছরই এই নিষেধাজ্ঞা আসে, কিন্তু নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান পরিকল্পনা। শুধুমাত্র ৫৫ কেজি চাল দিয়ে তিন মাস চলা যায় না।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম এই প্রতিবেদককে।জানান, সরকারিভাবে প্রথম পর্যায়ে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে চাল এসেছে কিন্তু প্রচন্ড শীতের কাঁপছে বনজীবীরা তাদের জন্য কোন সরকারিভাবে শ্বেত বস্ত্র ব্যবস্থা করা হয়নি। চালগুলো জেলেদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। তবে এটি পর্যাপ্ত নয়, অনেক জেলে ও বনজীবী এই তালিকার বাইরে রয়েছে।
‘সুন্দরবনকে বাঁচাতে গিয়ে যদি সুন্দরবনের মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে যায় তবে সেই সংরক্ষণ নীতিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার সমন্বিত, মানবিক এবং টেকসই পরিকল্পনা; যাতে বন বাঁচে, মানুষও বাঁচে।’
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন সিডিও ইয়ুথ টিমের সভাপতি গাজী আল ইমরান এই প্রতিবেদককে জানান, সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা জরুরি। তবে বনজীবীদের জন্য বিকল্প আয়ের পথ তৈরি না করলে তারা বাধ্য হয়ে নিয়ম ভেঙে বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারেন, ফলে প্রকৃতি আবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুন্দরবনকে বাঁচাতে গিয়ে যদি সুন্দরবনের মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে যায় তবে সেই সংরক্ষণ নীতিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার সমন্বিত, মানবিক এবং টেকসই পরিকল্পনা; যাতে বন বাঁচে, মানুষও বাঁচে।রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর চিত্রা হরিণের বিচরণ ক্ষেত্র সুন্দরবন। যেখানে গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়ায় বানরের দল। ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী দাপিয়ে বেড়ায় স্থলে আর কুমিরসহ ২৯১ প্রজাতির মৎস্য সম্পদ লোনা পানিতে সাতরায়। ম্যানগ্রোভ এই বনের বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদসহ জীববৈচিত্র আহরণ করে যারা জীবীকা নির্বাহ করে। নতুন বছরের শুরুতেও যেন তাদের কষ্টের গল্প বাকি রয়ে যাচ্ছে। তারা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছে দু’বেলা দুমুঠো ভাতের আশায়।
জানা যায়, জীববেচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ২ লাখ হরিণসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড ও ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এই ম্যানগ্রোভ বনের ৩টি এলাকা ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট। এছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জলভাগে কুমির, ৬ প্রজাতির ডলফিনসহ ২৯১ প্রজাতির মাছ রয়েছে। অক্সিজেনের অফুরন্ত ভাণ্ডার সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটর। সুন্দরবনের এই অফুরন্ত সম্পদের ওপর নির্ভর করে যারা জীবীকায়ন করে তাদেরকে এক কথায় বনজীবী বলে। এছাড়া সুন্দরবনের গাঁ ঘেষে যেসব এলাকায় রয়েছে। ওইসব এলাকায় বসবাস করে অনেক মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ। তারাও তিন বেলার আহারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অনেকে আবার জীবীকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ছুটছেন বিভিন্ন শহরে। হচ্ছেন পরবাসি। ফলে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে চিরায়ত একটি পেশা। এই বনজীবী এবং মুন্ডা সম্প্রদায়ের পুরুষরা সুন্দরবনে গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেন। শিশুরাও তাদের সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। আর নারীরা সংসারের কাজ করে চিংড়ি পোনা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করতে নদীর পাড়ে অধিকাংশ সময় থাকতে হয় এই নারীদের। মেয়েশিশুরা থাকে মায়ের সহযোগী হয়ে। আবার পেটের টানে প্রয়োজনে নারীরা কখনও কখনও নৌকায় চেপে সুন্দরবনেও যান মাছ ধরতে।খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা এবং দাকোপ। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা সুন্দরবন ভিত্তিক। সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রার মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, ৪ নম্বর কয়রা, ৫ নম্বর কয়রা, ৬ নম্বর কয়রা, পাতাখালী, কাটকাটা, গাববুনিয়া, মদিনাবাদ, কাশির হাটখোলা, ঘড়িলাল, চরামুখা, শাকবাড়িয়া, হরিহরপুর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা ও গোলখালী গ্রামে একই চিত্র। তবে জেলার দাকোপ উপজেলায়ও বনজীবীরা বেঁচে থাকার লাড়ায়ের চিত্র একই। এইসব এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখনও বনের সম্পদের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বনজীবীরা এখন আর বনে গিয়ে সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে এখানে বসবাসরত বনজীবীদের টিকে থাকা কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষই বাপ-দাদার আমল থেকেই সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন তাদের বছরের একটা বড় সময়ই কর্মহীন থাকতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই বনের কাজ ছেড়ে মাটিকাটা, নদীভাঙন রোধে ব্লক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে সেখাইের প্রাপ্ত পারিশ্রমিকে চলে না সংসারে চাকা।
কয়রা উপজেলার কাটকাটা এলাকায়র অবনী মন্ডল জানান, বাদায় (বনে) গিয়ে আর পেট চলে না। মাঝে মাঝে শহরে যাই কাজ করতে। কিন্তু সেখানে মন টেকে না। বাদায় মন টানে। তাই আবার বাপ দাদার পেশায় ফিরে আসি। আয় না থাকলে, গাঙ (নদী) পাড়ে বসে বাদার দিকে তাকায় থাকি। কি করবো। কোন তাল পাইনা।
একই উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা এলাকার শাহাবাজ আলী জানান, বাদা ছেড়ে যাবো কনে? নদীতে পোনাও তেমন পাচ্ছি না। তারপর আবার নদীতে গেলে ফরেষ্টাররা তাড়িয়ে দেয়। তবু পড়ে আছি সুন্দরবনের মুখের দিকে তাকিয়ে।
জেলার দাকোপ উপজেলার মোজামনগর বরইতলা খেয়াঘাট এলাকায় আলেয়া আক্তার। তিনি জানান, এই বনকে ভালবাসি বলেইতো একমাত্র ছেলের নাম রাখছি মধু। ওর বাপ প্রতি বছর বনে যায় মধু কাটতে। আর আমি নদীতে চিংড়ির পোনা ধরি। ছেলেকে স্কুলে পাঠাই। পড়ালেখা শিখিয়ে সে যেন চাকরী-বাকরি করে। আমাদের মতো কষ্টের জীবন যেন তার আর না হয়। আমরাতো দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্যি বাঘের মুখে পড়ে থাকি। ছেলেটা যেন ভাল থাকে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা।সন্দরবন পশ্চিম) হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদক কেজানান, সুন্দরবন এখন কঠোর নিরাপত্তা বেস্টনির মধ্যে রয়েছে। কাঠ চুরি বা বনের মধ্যে কোনও ধরণের অপরাধের সুযোগ নেই। তাই পাশ পারমিট ছাড়া কোনও লোকই এখন বনে যেতে পারে না। পাস পারমিট নিয়ে বনে যাওয়া বনজীবীরা নির্বিঘ্নেই অনুমোদিত কাজ করতে পারে। বন প্রহরীরা প্রতিটি এলাকায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে আমরা প্রকৃত বনজীবী এবং উপজাতি বা মুন্ডা সম্প্রদায়ের জন্য পাস পারমিটে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।দুখিনী মায়ের ছেলে দুখে। মধু আর সম্পদের লোভে বাঘবেশী অপশক্তি দক্ষিণ রায়ের কথা মতো দুই চাচা তাকে বনে ফেলে আসেন। তবে দক্ষিণ রায়ের কবল থেকে দুখেকে উদ্ধার করে বনবিবি। দুখে বিপদমুক্ত হয়ে ভিক্ষা করে বনবিবির পূজার প্রচলন করে। এই বনবিবি কাল্পনিক চরিত্র বা বাস্তব- যাই হোক না কেন, বনজীবীদের কাছে তার মতো নারীশক্তি পূজনীয়।
তাই তো বনে যাওয়ার আগে বনজীবীরা বাঘ থেকে রক্ষা পেতে পূজা করেন বনবিবির। তাদের স্ত্রীরাও পালন করেন নানা রীতি। এর পরও বন থেকে ফেরা হয় না অনেকের। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন স্বামীর বাড়ি থেকে নানা দোহাই দিয়ে এই বিধবাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। দুখের মতো সন্তানদের মুখের ভাত জোগাতে জাল টেনে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেন তারা। কষ্টের টাকায় ঘর তোলেন। কিন্তু সর্বনাশা আইলা, সিডর, বুলবুলে শেষ আশ্রয়টুকুও ভেসে যায়। শত প্রতিকূলতা ঠেলে এগিয়ে যাওয়া এই নারীরা সন্তান-সংসার রক্ষায় হয়ে ওঠেন একেকজন বনবিবি।
'সংসারের খরচ জোগাতি বাদায় (বন) গিয়ে স্বামী গেল বাঘের প্যাটে। শাকবাড়িয়ার ভাঙন করল ভিটেহারা। এখন গাঙে জাল টানি। কখন নিজি কুমুরির খাবার হই, কেডা জানে। তয় ভয় কারে কয় জানিনে। শুধু এটুকুই বুঝিছি, বাঁচতি হবি যুদ্ধ করিই।' কথাগুলো বলছিলেন কয়রা উপজেলার গোলখালী গ্রামের শরিফা খাতুন।
শরিফার বসবাস এখন সরকারি জমিতে। তবে বছর দশেক আগে নিজেদের ভিটে বাড়ি ছিল। ২০১২ সালে স্বামী মজিদ শেখ সুন্দরবনে গোলপাতা কাটতে গিয়ে বাঘের হামলায় মারা যান। কপালে জোটে স্বামীখেকো অপবাদ। পরের বছর শাকবাড়িয়ার ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হলে যোগ হয় অলক্ষ্মী-অপয়া অপবাদ। নিপীড়ন আর নিগ্রহের মধ্যেও দুই সন্তান নিয়ে নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে। বাগদার রেণু সংগ্রহ করে বিক্রি করে সন্তানদের খাবার ও লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন।
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত