
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : উত্তরের হিমেল হাওয়া হাড়ে হাড়ে কম্পন লাগিয়ে শীত এসেছে তার নিজস্ব রূপে। প্রচন্ড এই শীতের মাঝে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় এক লক্ষ ৮ হাজার খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় পার করছে গাছিরা। খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে পিঠা পায়েসও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। খেজুরের গুড়ের মিষ্টি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে বিদেশে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ দাম অনেক বেশি আর চিনি মিশ্রিত ভেজাল গুড়ে সয়লাব।আর কৃষি বিভাগ বলছে গাছিদের প্রশিক্ষণ দিতে পারলে গুড় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করায় আগের চেয়ে অনেক গাছ কমে গেছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কাশেমপুর এলাকার শিক্ষক আজিবার রহমান, হাবিব,খোকন জানান, খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। খেজুর গাছ কেটে মাটির হাঁড়ি গাছে বাঁধছেন। কাচা রস ক্ষেতে খুব মিষ্টি । কাঁচা রস হাট-বাজারে বিক্রি হয়। আবার রস জ্বালিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গুড় ও পাটালি।
কলারোয়া উপজেলার কেঁড়াগাছি গ্রামের আব্দুল্লাহ, আরশাদ, মোসলেম জানান, নতুন ধানের চাল আর খেজুরের রসে তৈরি নানা প্রকার পিঠা-পায়েস ক্ষেতে খুব মজা। শহরের বিভিন্ন স্থানে খেজুরের গুড়ের পিঠা বিক্রি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা শহরের লাবনী মোড় এলাকার মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, খেজুরের গুড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরি হচ্ছে। এসব মিষ্টি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে বিদেশে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কুলিয়াডাঙ্গা গ্রামের গাছি আব্দুল মজিদ, মোশারফ জানান, খেজুর গাছ কেটে দুইদিন রস সংগ্রহ করা হয়। এভাবে চলে খেজুরের রস সংগ্রহ। এক খানা রস বিক্রি হয় ২শ থেকে ৩শ টাকা আর এক কেজি পাটালি বা গুর বিক্রি হয় ৫থেকে ৬শ টাকা।
এভাবে খেজুরের রস আর গুড় তৈরিতে গাছিরা ব্যস্ত থাকবে চৈত্র মাস পর্যন্ত। ইট ভাটা মালিকরা খেজুর গাছ ইট ভাটায় জ্বালানি হিসাবে বেশি ব্যবহার করছে। যার কারণে দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা শহরের আব্দুস সামাদ, আলিম জানান খেজুরের রস গুড়ের দাম অনেক বেশি। আবার বাজারে চিনি মিশ্রিত গুড় পাঠালি বিক্রি হচ্ছে। অরজিনাল গুড় পাওয়া কঠিন। প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা। আর এই সময়ে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটায় অযত্ন-অবহেলায়পড়ে থাকা খেজুরগাছের কদর বেড়ে যায় বহুগুণ। পিঠাপুলি ও সুস্বাদু গুড়ের প্রধান উপকরণ খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য এখন চরম ব্যস্ততা দেখা দিয়েছে এই এলাকার গাছিদের মধ্যে।
গাছিরা বর্তমানে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছেন। এটিকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘গাছ তোলা’ বা গাছের প্রাথমিক পরিচর্যা। এই প্রক্রিয়ায় গাছ পরিষ্কার করা হয়। প্রাথমিক পরিচর্যার এক সপ্তাহ পরই আবার গাছে চাঁছ দিয়ে নলি ও গুজা (রস সংগ্রহের যন্ত্রাংশ) লাগানো হবে।
পাটকেলঘাটার বিভিন্ন গ্রামে, বিশেষ করে রাস্তার পাশে এখন খেজুরগাছ তোলা ও চাঁছার দৃশ্য চোখে পড়ছে। এই রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে শুরু হবে গুড় ও পাটালি তৈরির উৎসব।
খলিষখালীর বাগমারা গ্রামের গাছি আব্দুস সবুর জানান, তিনি অনেক বছর ধরে এই কাজ করে আসছেন। বর্তমানে শীত এলে রসের চাহিদা ভালো থাকে, তাই তাঁদের উপার্জনও ভালো হয়।
জুজখোলা গ্রামের মধু মোড়ল জানান, একটি গাছ তোলা থেকে রস সংগ্রহ পর্যন্ত গাছিকে ১৫০ টাকা দিতে হয়। বর্তমানে এক ভাঁড় রস ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়।
গাছি শওকাত আলী খাঁ ও সুরোত আলী জানান, এক ভাঁড় রস জ্বালানোর পর তাতে প্রায় এক কেজি গুড় বা পাটালি হয়, যার বাজারমূল্য ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
একদিকে যখন গাছিরা ব্যস্ত, অন্যদিকে তখন খেজুরবাগান কমে আসার দৃশ্য চোখে পড়ছে। এখন আর আগের মতো মাঠজুড়ে খেজুরবাগান দেখা যায় না। রস জ্বালানোর জন্য ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী ‘বান’-এর (চুলা) সংখ্যাও নিতান্তই কম। ফলে নলেন গুড় ও পাটালি পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে।
পাটকেলঘাটার খলিষখালী ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাব্বির হোসেন এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইট পোড়ানোর কাজে এলাকার খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে। যার প্রভাব পরিবেশের ওপর পড়ছে। এ ব্যাপারে পরিবেশবিদদের সুদৃষ্টি কামনা করি।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ- পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় এ বছর এক লক্ষ ৮ হাজার গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছে গাছিরা।রাস্তার পাশেও মেঠো পথের দুই ধারে অসংখ্যা খেজুর গাছ লাগানো হয়েছে। গাছিদের প্রশিক্ষণ দিতে পারলে খেজুরের রস গুর উৎপাদন বেড়ে যাবে।

