
টিকা তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ
বিশেষ প্রতিবেদক : গত বছরের শেষেই জাপানের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি তৈরি করেছিলেন ডেঙ্গু রোগের টিকা। জায়ান্ট তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিটি ‘কিউডেঙ্গা’ নামের ভ্যাকসিনটি ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশে অনুমোদনও দেয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন না পেলেও অপেক্ষায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশে অনুমোদনের। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই টিকা পুরোপুরি অকার্যকর করে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এই টিকা দিতে হলে প্রথমে পুরো দেশের মানুষের মধ্যে কে কে ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের মধ্যে আবার কারা কোনো সেরোটেপে (ডেঙ্গুর টাইপ) আক্রান্ত হয়েছিল তা আলাদা করতে হবে। কারণ এক সেরোটেপে আক্রান্তের শরীরে অপর সেরেটেপের টিকা গেলেই সর্বনাশ। ঘটতে পারে মৃত্যু পর্যন্ত।
১৭ কোটি মানুষকে এই পদ্ধতিতে টিকাদানের চাইতে মশা মারাই সহজ বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। তাই টিকার চাইতে আপাতত ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা মারতেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশে মারা গেছেন ৬৪ জন। হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন দুই হাজার ১২৯ জন ডেঙ্গু রোগী। রোগী বৃদ্ধির ধারা ঊর্ধ্বমুখী জুলাইয়ে। মাসের শুরুতে থেকে ৬ দিনে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়ায় দুই হাজারের ওপর। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে টিকা দিয়ে যদি করোনাভাইরাস মোকাবিলা করা যায় তাহলে ডেঙ্গু মোকাবিলা করা যাবে না কেন? ডেঙ্গুর টিকাই বা কোথাও আবিষ্কৃত হচ্ছে না কেন?
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রাণঘাতী ডেঙ্গু রোগ ঠেকাতে দীর্ঘদিন থেকেই একটি কার্যকর টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে ওষুধ ও প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে জনসন অ্যান্ড জনসনের ইউরোপীয় শাখা জ্যানসেন। একটি টিকা উদ্ভাবনও করেছে। যা ইঁদুর ও বানরের ওপর ট্রায়াল করা হয়েছে এবং তাতে সাফল্যও মিলেছে বলে দাবি করেছেন জ্যানেসেনের ইমার্জিং প্যাথোজেন বিভাগের প্রধান নির্বাহী মার্নিক্স ভ্যান লুক। বার্তাসংস্থা এএফপিকে মার্নিক্স ভ্যান লুক বলেন, দুই বছর গবেষণার পর জেএনজি-১৮০২ নামের একটি টিকা প্রস্তুত করেছে জ্যানসেন। নতুন এই টিকাটির মূল কাজ হলো, মানুষ বা প্রাণীদেহে ডেঙ্গু ভাইরাসের বংশবিস্তার থামিয়ে দেয়া। ইঁদুর ও রেসাস জাতের বানরের ওপর সেই টিকার প্রয়োগ করা হয়েছে এবং তাতে সাফল্য পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেছেন মার্নিক্স ভ্যান লুক। তিনি বলেন, বিশ্বে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন শনাক্ত হয়েছে। আমরা কয়েকটি বানর এবং ইঁদুরের দেহে প্রথমে ভাইরাসটি এবং পরে আমাদের টিকা প্রয়োগ করেছি। আমাদের সেই পরীক্ষা সফল হয়েছে।
কিন্তু তার এই দাবি এখনো আমলে নেয়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা উন্নত দেশগুলো। এখনো মানবশরীরে তার যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে দাবি তাদের।
এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত ডেঙ্গুর আরেকটি টিকা হলো ডেংভাক্সিয়া। অল্প কয়েকটি দেশে এই টিকা পাওয়া যায় এবং ডেঙ্গুর মাত্র একটি ধরনের ওপর কার্যকর এই টিকাটি। আরেকটি নাম কোডেঙ্গা। ইউরোপীয় দেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অনুমোদনও পেয়েছে এই টিকাটি। তবে এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন না পাওয়ায় এটি নিয়ে ভাবছে না বাংলাদেশের সরকার।
তবে জাপানের টিকাটি পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুর এই টিকাটি আমরা আপাতত পর্যবেক্ষণ করছি। বিভিন্ন দেশে দেওয়ার পর কী হয় সেটি বুঝে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদনের পরই ভ্যাকসিনটি নিয়ে চিন্তা করবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত আমরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছি। যে কোনো নতুন টিকার ক্ষেত্রে খরচসহ অন্যান্য অনেক বিবেচনার বিষয় রয়েছে। যেমন- টিকাটি কতদিন সুরক্ষা দেবে। এর মধ্যে ডেঙ্গুর রয়েছে চারটি ধরন। একেকটি ধরন আবার আলাদা আলাদা। একটি ধরনে কেউ যদি একবার আক্রান্ত হয় তাহলে এর বিপরীত ধরনের টিকাটি যদি তার শরীরে দেয়া হয় তাহলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। আবার মনে করেন, একটি টিকা যদি চার বছর সুরক্ষা দেয়, তাহলে চার বছর পরপর এই টিকা পুরো দেশের মানুষকে দিতে হলে এটিকে বিশদ পরিকল্পনা প্রয়োজন। পুরো ভ্যাকসিনেশন প্ল্যানে নিয়ে আসতে হবে। যা সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়। তাই এই মুহূর্তে এটি আমাদের জন্য সহজ হবে না। এছাড়া ডেঙ্গুর একটি টিকায় বেশ কিছু শিশু মারা গিয়েছে ফিলিপাইনে। আমরা এই ঝুঁকি নেবো কি না তাও একটা বিষয়। তাই আমি মনে করি এই মুহূর্তে এটি সহজ হবে না। টিকাগুলো আগে অন্যান্য দেশের বাজারে আসুক। আমরা পর্যবেক্ষণ করি। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।
ডেঙ্গুর টিকার চাইতে বরং ডেঙ্গু প্রতিরোধ সহজ বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এত বড় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের আলাদা আলাদা সেরোটেপ খুঁজে বের করা মুশকিল। তার চেয়ে মশা মারার কাজটি সহজ। যদি সম্মিলিতভাবে আমরা মশা মারতে পারি তাহলে টিকার কোনো প্রয়োজন পড়বে না। এছাড়া এ পর্যন্ত ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ফোরামে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বিবেচনা করি তাই ডেঙ্গুর টিকার বিষয়ে সংস্থাটি থেকে কোনো গাইডলাইন দেয় কি না আমরা দেখি। তারপর দেখা যাবে। তিনি বলেন, টিকাটির সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে টিকাটির কার্যকরিতা শতভাগ কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে আগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার থেকে তথ্য পাওয়ার পর আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব। এই ভ্যাকসিন ডেঙ্গুর ৪টি ধরনের সেরোটাইপের বিরুদ্ধে কাজ করে কিনা তা জানতে হবে।