
সোহরাব হোসেন : ২৭ বছর আগে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুলনা সফর করেন। রাজনীতিতে নাম লেখালেও মূলত: সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি খুলনাতে আসেন। তখন একটি মানবিক কর্মসূচিতে আসেন। কোনো হোটেল বা রেস্ট হাউজে ওঠেন নি। খুলনা-২ আসনের সাবেক এমপি আলী আসগার লবির বাস ভবনে দুই দিন অবস্থান করেন। তার এই সংক্ষিপ্ত কর্মসূচির অধিকাংশ সময় আমিসহ দৈনিক দিনকালের খুলনা ব্যুরো’র সকল সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলাম। নির্দিষ্ট তারিখটা এই মুহূর্তে মনে নেই। জনাব তারেক রহমান তখন দৈনিক দিনকালের প্রকাশক। তিনি প্রতিদিন দৈনিক দিনকালে বসতেন। সেখান থেকে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতেন এবং দেশের রাজনীতির খবর নিতেন। সঙ্গত কারণেই তার কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দৈনিক দিনকালের খুলনা ব্যুরোতে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। দিনকালের তখনকার ব্যুরো প্রধান ও সাবেক জেলা বিএনপি’র আহবায়ক সৈয়দ ঈসার নির্দেশনায় বড় ভাই স্টাফ রিপোর্টার মাসুদুর রহমান (পরবর্তীতে ব্যুরো প্রধান) ও আমি জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। বলতে গেলে তারেক রহমানের নিউজ কাভার করাই ছিল আমার কাজ। তখন স্মার্ট ফোনের যুগ ছিল না। আবার ডিজিটাল ক্যামেরার প্রচলনও ছিল কম। তাই সকল কর্মসূচির ছবি তোলার দায়িত্ব পড়ে ফটো সাংবাদিক নাজমুল হক পাপ্পুর কাঁধে। অত্যন্ত টগবগে যুবক তখন পাপ্পু। দৌঁড়ে দৌঁড়ে এনালগ ক্যামেরায় বন্দী করেন সকল ছবিগুলো।
আলী আসগার লবির বাসভবনে একান্তে আমরা কথা বলেছি তখন। একজন ধির স্থির এবং বুদ্ধিদীপ্ত মানুষটিকে তখন দেখেছি। অতি অল্প সময়ে তার আচরণ দেখে আমাকে মুগ্ধ করে। শুধু আমাকে নয়, যারাই তার পাশে গেছেন, হয়েছেন মুগ্ধ। এক অন্যন্য প্রতিভার অধিকারী তিনি সহজে আপন করে নিতে পারেন। তিনি খাবারের প্রতি ছিলেন সচেতন। পরিমিত খাবারের বেশি তিনি গ্রহণ করতেন না। তারেক রহমান খুলনায় আসার পরের দিন তিনি যান খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার ভৈরব নদের পাড়ে অবিস্থত সেনহাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প চলছিল। যার সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন তারেক রহমান। ওই দিন তারেক রহমান সড়ক পথে না যেয়ে খুলনার জেলাখানা ঘাট থেকে একটি স্পিডবোর্ড যোগে অনুষ্ঠান স্থলে পৌঁছান। আমার যতোদূর মনে পড়ে ওই স্পিডবোর্ডে অন্যতম আরোহী ছিলেন, খুলনা মহানগর বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি সাবেক এমপি এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাই। ওই দিনের কর্মসূচির ছবি ও নিউজ পাঠালাম। আর মনে মনে ভাবলাম, প্রথম পাতায় দৈনিক দিনকালে নিউজটি ছাপবে। কিন্তু তার পরের দিন দেখলাম নিউজ ও ছবি ছাপা হয়েছে শেষ পাতায়। ঢাকায় কথা বললাম, তখন উত্তর এলো প্রকাশকের নির্দেশ ছিল তার নিউজ যেনো প্রথম পাতায় না যায়। এই ছিলেন তারেক রহমান।
পরের দিন তিনি ঢাকায় ফিরে যান। আবারও ব্যুরো প্রধান সৈয়দ ঈসা ভাইয়ের নির্দেশে খুলনা থেকে যশোর পর্যন্ত সড়ক পথে তারেক রহমানের বহরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সঙ্গে পাঠালেন ফটো সাংবাদিক নাজমুল হক পাপ্পুকে। এরপর যশোর বিমানবন্দরে তাকে আমরা বিদায় জানিয়ে চলে আসি।
তারেক রহমানের খুলনার পরবর্তী সফর ছিল ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। তখন খুলনা-২ আসনে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। মায়ের নির্বাচনী প্রচারের জন্য তিনি খুলনায় আসেন। ওই দিন দুপুর নাগাদ তিনি খুলনায় পৌঁছান এবং যথারীতি বিএনপি নেতা সাবেক এমপি আলী আসগার লবি ভাইয়ের বাসায় ওঠেন। ওই দিন দৈনিক দিনকালে আমার একটি রিপোর্ট প্রথাম পাতায় ৩ কলাম জুড়ে গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের ফাস্ট সেক্রেটারী এস পি বসু খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা সফর করেন। গোপনে তার এই সফর আগামী নির্বাচনে কি প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি রিপোর্ট ছাপা হয়। এস পি বসুর খুলনায় সামিট গ্রুপের কেপিসিএল’র রেস্টরুমে অবস্থান, কখন খুলনার রূযসা ফেরিঘাট পার হন এবং কি রংয়ের গাড়ি তিনি ব্যবহার করেছিলেন, সেটি বিস্তারিত ছাপা হয়। এস পি বসুর বাগেরহাট ও মোংলা, সাতক্ষীরা, কলারোয়া হয়ে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার ঘটনা ছাপা হয়। ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে তারেক রহমান খুলনায় পৌঁছানো মাত্রই আমি দৈনিক দিনকালে একটি কপি প্রদান করলে, তিনি তা দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দলের তখনকার দপ্তর সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্সকে দায়িত্ব দেন এবং বলেন, এটি নিয়ে দলের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের গুরুত্বসহকারে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তার পরের দিন ২২ সেপ্টেম্বর ও ২৩ সেপ্টেম্বর খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা থানায় ব্যাপক গণসংযোগ করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।
আগামীকাল (সোমবার) তার খুলনায় আগমন হতে যাচ্ছে ইতিহাসের এক মহেন্দ্রক্ষণ। যা উদ্দীপ্ত করেছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে। ২৭ বছরের আগের তারেক রহমান ছিলেন একজন সাধারণ জীবন-যাপনের যুবনেতা। আজ এক পরিণত রাজনীতিবিদ। রাজনীতির প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কাটিয়েছেন কারাবন্দী জীবন। দেশ ছেড়ে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে ১৭টি বছর। নিপীড়ত মানুষের জননেতা হিসেবে ফিরেছেন এক মহাআড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে। দেশের মাটিতে পা রেখে দেশের মাটি স্পর্শ করে তিনি জানান দেন দেশকে কতোটা ভালবাসেন। রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য নয়, দলের সকল স্তরের নেতা-কর্মীদের ভালোবাসা ও সমর্থনে দায়িত্ব নিয়েছেন দলের। তিনি হতে যাচ্ছেন তার মরহুম পিতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একমাত্র উত্তরসূরী। তিনি এমন একটি সময়ে দলের দায়িত্ব কাঁধে নিলেন, যখন আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সন্নিকটে। তাই প্রথমবার দলের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি বিরামহীন ছুটে চলেছেন, দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। জাতি চেয়ে আছে তার দিকে। তার সফল নেতৃত্বই দেখিয়ে দিতে পারে আগামীর উন্নত ও নতুন বাংলাদেশের মহাসড়ক। যে পথে বাংলাদেশ চলতে থাকবে অবিরাম।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত