
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : বনজীবীদের কষ্টের কথা কেউ কি চিন্তা করে? ১লা জুন থেকে ৩১আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনের সম্পূর্ণ প্রবেশ অধিকার নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাহলে সুন্দরবনের দুই বিভাগ মেলে১২ হাজারবিএল সি আর এর সাথে সুন্দরবনে আয়ের উপর নির্ভরশীল প্রায় লক্ষ্য ধিক বনজীবী এদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিয়ে কেউ কি ভেবেছে? এরা এই তিন মাস করবে কি এদের বিকল্প কর্মসংস্থান কি এদের জীবন জীবিকা চলবে কিসের উপর এই চিন্তা কারো মাথায় নেই। সরকারিভাবে যে সহযোগিতা করা হয় তা অত্যান্ত ন্যূনতম তাতে বনজীবীদের এক সপ্তাহের রুটি রোজগার হয় না। এর ওপর রোগব্যাধি চিকিৎসা ঔষধ সহ হাটবাজার নানা খাতে অর্থের প্রয়োজন হয় একটি সংসার চালাতে শুধু ৪০ কেজি চাল দিলে তো বনজীবীদের পেট থেমে থাকবে না একটি সংসার চালাতে প্রয়োজন আছে অনেক কিছু র। সেজন্য অতি জরুরি হয়ে পড়েছে এই সমস্ত হত-দরিদ্র অসহায় বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের,,। বিশেষজ্ঞরা বলতে চান আগে তো মানুষের জীবন মানুষের জীবন রক্ষা করার বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তারপরে সুন্দরবন রক্ষা করা অতি প্রয়োজন। কিন্তু মানুষের জীবন জীবিকার উপরে প্রভাব ফেলিয়ে সুন্দরবন রক্ষা করা সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা এটা কোন মতেই কাম্য না বলে বিশেষজ্ঞরা বলতে চান,,। সে কারণে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মধুজিৎ রপ্তান বলেছেন সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পাদ সুন্দরবন এদেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্পদ সুন্দরবন বিশ্বের একটি ঐতিহ্যবাহী সম্পদ এটিকে টিকিয়ে রাখতে দলমত নির্বিশেষে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে, সাথে সাথে চিন্তা করতে হবে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল হতদরিদ্র অসহায় বনজীবীদের জন্য,। সরকার প্রতিবছর জুন থেকে আগস্ট তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ অধিকার সম্পন্ন নিষিদ্ধ করে। আর বনদেবীদের জন্য বিকল্প খাদ্য হিসেবে মাসে বরাদ্দ রাখে মাত্র চল্লিশ কেজি চাউল তাতে অনেক জেলে পরিবারের এক সপ্তাহ যায় না তারপরে রয়েছে বাজার ঘাট রোগ ব্যাধি ঔষধ সহ নানা প্রয়োজনে অর্থ। কিন্তু এই অর্থ নিয়ে কেউ ভাবেনা ভাবতে হবে সরকারকে জুন হইতে আগস্ট তিন মাস জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি দু মাস মোট পাঁচ মাস সুন্দরবনে প্রবেশ অধিকার নিষিদ্ধ এই পাঁচ মাসের জন্য সরকারকে বনজীবীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান করতে হবে। সেজন্য উপকূলী এলাকায় সরকারিভাবে গার্মেন্টস মিল কলকারখানা সরকারিভাবে গড়ে তুলতে হবে তাহলে সুন্দরবনে পাঁচ মাস নিষিদ্ধ সহ সারা বছরের চাপ কমে যাবে বনজীবীরা দিন দিন ওই সমস্ত শিল্প কলকারখানায় বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নেবে।১ জুন থেকে সুন্দরবনে উরবের অধিকার নিষিদ্ধের জন্য উপকূলীয় এলাকায় বন বিভাগ যত ঘোষণা দিচ্ছে ততো বনজীবীদের মধ্য মারাত্মক আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক বনজীবীরা বুকফাটা কান্নায় ভেউ ভেউ করে কেঁদে বেড়াচ্ছে । তাদের একমাত্র উপার্জনের পথ সুন্দরবন তাদের বিকল্প কোন পেশা নেই যে সে পেশায় নিয়োজিত হবে। এ ব্যাপারে সুন্দরবনের পশ্চিম বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন ভাই অসহায় দরিদ্র বনজীবীদের কষ্টের কথা বুঝি কারণ আমরা ও মানুষ কিন্তু সরকারি সম্পাদ রক্ষা করতে এবং সুন্দরবনে নদী খালে মাছের বংশবৃত্তি করতে সরকারের সিদ্ধান্ত সকলকে মানতে হবে এবং এটা প্রয়োজনও আছে সুন্দরবনে যদি মাছ না থাকে তাহলে মৎস্যজীবীরা চিরতরে সুন্দরবনের পথ থেকে একেবারে বঞ্চিত হতে হবে। তিনি আরো বলেন শ্যামনগর উপজেলার মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মধুজিৎ রপ্তান যে কথা বলেছেন সেগুলোও সত্য কথা সেগুলো নিয়ে আমরাও লেখালেখি করছি আমাদের পাশাপাশি জন প্রতিনিধিরাও সরকারের কাছে এ সমস্ত যৌতিক দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরলে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর চিত্রা হরিণের বিচরণ ক্ষেত্র সুন্দরবন। যেখানে গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়ায় বানরের দল। ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী দাপিয়ে বেড়ায় স্থলে আর কুমিরসহ ২৯১ প্রজাতির মৎস্য সম্পদ লোনা পানিতে সাতরায়। ম্যানগ্রোভ এই বনের বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদসহ জীববৈচিত্র আহরণ করে যারা জীবীকা নির্বাহ করে। নতুন বছরের শুরুতেও যেন তাদের কষ্টের গল্প বাকি রয়ে যাচ্ছে। তারা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছে দু’বেলা দুমুঠো ভাতের আশায়।
জানা যায়, জীববেচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবনে বর্তমানে ১১৪টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ২ লাখ হরিণসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড ও ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এই ম্যানগ্রোভ বনের ৩টি এলাকা ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট। এছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জলভাগে কুমির, ৬ প্রজাতির ডলফিনসহ ২৯১ প্রজাতির মাছ রয়েছে। অক্সিজেনের অফুরন্ত ভাণ্ডার সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটর। সুন্দরবনের এই অফুরন্ত সম্পদের ওপর নির্ভর করে যারা জীবীকায়ন করে তাদেরকে এক কথায় বনজীবী বলে। এছাড়া সুন্দরবনের গাঁ ঘেষে যেসব এলাকায় রয়েছে। ওইসব এলাকায় বসবাস করে অনেক মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ। তারাও তিন বেলার আহারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অনেকে আবার জীবীকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ছুটছেন বিভিন্ন শহরে। হচ্ছেন পরবাসি। ফলে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে চিরায়ত একটি পেশা। এই বনজীবী এবং মুন্ডা সম্প্রদায়ের পুরুষরা সুন্দরবনে গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেন। শিশুরাও তাদের সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। আর নারীরা সংসারের কাজ করে চিংড়ি পোনা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করতে নদীর পাড়ে অধিকাংশ সময় থাকতে হয় এই নারীদের। মেয়েশিশুরা থাকে মায়ের সহযোগী হয়ে। আবার পেটের টানে প্রয়োজনে নারীরা কখনও কখনও নৌকায় চেপে সুন্দরবনেও যান মাছ ধরতে।
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা এবং দাকোপ। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা সুন্দরবন ভিত্তিক। সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রার মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, ৪ নম্বর কয়রা, ৫ নম্বর কয়রা, ৬ নম্বর কয়রা, পাতাখালী, কাটকাটা, গাববুনিয়া, মদিনাবাদ, কাশির হাটখোলা, ঘড়িলাল, চরামুখা, শাকবাড়িয়া, হরিহরপুর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা ও গোলখালী গ্রামে একই চিত্র। তবে জেলার দাকোপ উপজেলায়ও বনজীবীরা বেঁচে থাকার লাড়ায়ের চিত্র একই। এইসব এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখনও বনের সম্পদের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বনজীবীরা এখন আর বনে গিয়ে সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে এখানে বসবাসরত বনজীবীদের টিকে থাকা কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষই বাপ-দাদার আমল থেকেই সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন তাদের বছরের একটা বড় সময়ই কর্মহীন থাকতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই বনের কাজ ছেড়ে মাটিকাটা, নদীভাঙন রোধে ব্লক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে সেখাইের প্রাপ্ত পারিশ্রমিকে চলে না সংসারে চাকা।
কয়রা উপজেলার কাটকাটা এলাকায়র অবনী মন্ডল জানান, বাদায় (বনে) গিয়ে আর পেট চলে না। মাঝে মাঝে শহরে যাই কাজ করতে। কিন্তু সেখানে মন টেকে না। বাদায় মন টানে। তাই আবার বাপ দাদার পেশায় ফিরে আসি। আয় না থাকলে, গাঙ (নদী) পাড়ে বসে বাদার দিকে তাকায় থাকি। কি করবো। কোন তাল পাইনা।
একই উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা এলাকার শাহাবাজ আলী জানান, বাদা ছেড়ে যাবো কনে? নদীতে পোনাও তেমন পাচ্ছি না। তারপর আবার নদীতে গেলে ফরেষ্টাররা তাড়িয়ে দেয়। তবু পড়ে আছি সুন্দরবনের মুখের দিকে তাকিয়ে।
জেলার দাকোপ উপজেলার মোজামনগর বরইতলা খেয়াঘাট এলাকায় আলেয়া আক্তার। তিনি জানান, এই বনকে ভালবাসি বলেইতো একমাত্র ছেলের নাম রাখছি মধু। ওর বাপ প্রতি বছর বনে যায় মধু কাটতে। আর আমি নদীতে চিংড়ির পোনা ধরি। ছেলেকে স্কুলে পাঠাই। পড়ালেখা শিখিয়ে সে যেন চাকরী-বাকরি করে। আমাদের মতো কষ্টের জীবন যেন তার আর না হয়। আমরাতো দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্যি বাঘের মুখে পড়ে থাকি। ছেলেটা যেন ভাল থাকে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা(সুন্দরবন পশ্চিম) এ জেড এম হাসানুর রহমান এই প্রতিবেদককে. জানান, সুন্দরবন এখন কঠোর নিরাপত্তা বেস্টনির মধ্যে রয়েছে। কাঠ চুরি বা বনের মধ্যে কোনও ধরণের অপরাধের সুযোগ নেই। তাই পাশ পারমিট ছাড়া কোনও লোকই এখন বনে যেতে পারে না। পাস পারমিট নিয়ে বনে যাওয়া বনজীবীরা নির্বিঘ্নেই অনুমোদিত কাজ করতে পারে। বন প্রহরীরা প্রতিটি এলাকায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে আমরা প্রকৃত বনজীবী এবং উপজাতি বা মুন্ডা সম্প্রদায়ের জন্য পাস পারমিটে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত