
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ঘুরেফিরে সকলের ওই একটাই কথা—নাজুক বেড়িবাঁধ সারানোর ব্যবস্থা হলে আইলার মতো আবারও ভাসতে হতো না। আইলা, ফণী, বুলবুলের পর কত আশ্বাসই না এলো; কই, কেউ তো ফিরেও তাকালো না। সবখানে শুধু জোড়াতালি। এভাবে কী বাঁধ টিকানো যায়?
আম্পানে ভেসে গেল বাড়িঘর, চিংড়ি ঘের, ফসলি জমি—সবকিছু। মানুষগুলো আবার নিঃস্ব হয়ে পড়ল। একজন বললেন, কী দরকার ছিল তেল খরচ করে আমাদের কাছে এসে আশ্বাস বাণী শোনানোর! আরেকজন বললেন, বাঁধ সারানো হলে আমরা ঠিক বেঁচে যেতাম!
পশ্চিম উপকূলে খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির জনপদে কান পাতলে এখন এসব কথা ভেসে আসে। মানুষজন অনেক সমস্যার কথাই বলেন; তার মাঝে ঘুরেফিরে একই কথা। অন্য যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে; তার নেপথ্য কারণ এই নাজুক বাঁধ। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রবল ধাক্কা থেকে বাঁধ রক্ষা করা গেলে তেমন কোন সমস্যা হতো না। বাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম পানি ঢুকেছে। মানুষগুলোর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। হাজার হাজার মানুষ নেমে গেছে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতে। আম্পানের প্রভাব শেষ হওয়ার পর গত সপ্তাহখানেক ধরে চলছে মেরামতের কাজ। খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার গাবুরা, বুড়িগোয়লিনী, কাশিমাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের ছবি আসছে একের পর এক।
‘আমরা আর কতকাল আশ্বাস বাণী শুনে শুনে অপেক্ষা করবো? জীবন তো শেষ হয়ে গেল।’ -কথাগুলো বলছিলেন গাবুরার বাসিন্দা খান আবু হাসান। নিজ এলাকার বর্ণনা তুলে তিনি বলছিলেন, দেশের মানচিত্রে গাবুরা উপকূলীয় অবহেলিত অঞ্চল। চারিদিকে নদী বেষ্টিত ৩৩ বর্গ কিলোমিটারে দ্বীপ। এখানে ৪৫ হাজার মানুষ প্রতিবছর নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদী ভাঙন, জলাবদ্ধতার কবলে থাকে। মানুষজন জান ও মালের অনিশ্চয়তার মাঝে বসবাস করে আসছে বছরের পর বছর। উপর মহল এটা জানেন; তবুও কোন কাজ হয় না।
খান আবু হাসানের এই ক্ষোভ ঝরানো কথাগুলো কতটা সত্যি? তার কথার সূত্র ধরে খানিক পেছনে ফিরে গেলেই এর প্রমাণ মিলে। ২০০৯ সালের ২৫ মে। দিনটি ছিল সোমবার। সেদিন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলা প্রলয়ে গাবুরার ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। আইলার পরে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এসেছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন- বাঁধ হবে; সাইক্লোন শেলটার হবে। কিন্তু হয়নি। গত বছর এই এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রলয়। তখন বাঁধ ছিঁড়েনি বটে; কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ একেবারে কম ছিল না। ফণী চলে গেল; এলেন মন্ত্রীদ্বয়। একইভাবে আশ্বাস দিলেন তারাও। এই আশ্বাসের ফলোআপও আছে; অক্টোবরে এলাকা ঘুরে এসেছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্যান্যরা। এতকিছুর পরেও আজ পর্যন্ত সে আশ্বাস গল্পই রয়ে গেছে। আর তারই ফল আম্পানের প্রলয়। এটা আম্পানের ছোট ধাক্কাই বলা যায়; কেননা ঘূর্ণিঝড়টি শক্তি কমিয়েই পশ্চিম উপকূলে আঘাত হেনেছে।
আম্পানের আঘাতের আগে বহুবার এই দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ঘুরে দেখেছি নাজুক পরিস্থিতি। কোথাও বাঁধ আছে অর্ধেক; কোথাও মোটরবাইক তো দূরের কথা; পায়ে হেঁটে যাওয়াও কঠিন। কোথাও আবার দেখেছি স্থানীয় জনসাধারণ নিজেদের উদ্যোগে জোড়াতালি দিয়ে বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এই ইউনিয়নের ধ্বসে যাওয়া যে স্থানগুলোর নাম বার বার সংবাদ মাধ্যমে উচ্চারিত হচ্ছে, সেগুলো আমার চেনা পথ। পারশেমারী, চাঁদনিমুখা, নাপিতখালী, নেবুবুনিয়াসহ আশপাশের এলাকাগুলো কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে বছরের পর বছর; তার ছবি আমার ফটোফোল্ডারে ঠাসা। স্বাভাবিক জোয়ারেও এসব স্থান জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। কোথাও বাঁশের পাইলিং, তার ভেতরে আবার পুরানো টিনের টুকরো দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা। দৃশ্যমান সব ছবি। বলা যায় নাজুক বাঁধগুলোও টিকে আছে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ টিকানোর উদ্যোগের মধ্যদিয়ে। এলাকার মানুষেরা বছরের পর বছর প্রকৃতির সঙ্গে অনেকটা লড়াই করেই বাঁধ টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আম্পান তাদের সর্বনাশ করে দিয়ে গেল।
এতো গেল শুধু গাবুরার কথা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর কাশিমাড়ী, আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া, শ্রীউলা, প্রতাপনগর, খাজরা, খুলনার কয়রা উপজেলার কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, মহারাজপুর, পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি, সোলাদানা, লস্কর এবং বাগেরহাটের রামপাল ও শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাঁধ বিধ্বস্ত হওয়ায় গ্রাম, জনপদ, চিংড়ির ঘের, ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। পশ্চিম উপকূল ছাড়াও দক্ষিণের পটুয়াখালী, ভোলা জেলায়ও বাঁধ বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরফলে এই সময়ের সকল ফসল নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে চিংড়ির ঘেরে।
সূত্র বলছে, ষাটের দশকে নির্মিত পশ্চিম উপকূলের বাঁধগুলো ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছিল। আশির দশকে এই এলাকায় চিংড়ি চাষের শুরুতে বাঁধ আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এরসঙ্গে লবণপানির ধাক্কা, জোয়ারের পানির প্রবল চাপ এই বাঁধকে নাজুক করে তোলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে এইসব বাঁধ মেরামতের কাজ হলেও যথাযথভাবে কাজ না হওয়ায় বাঁধের এই বেহাল দশা।
এ প্রসঙ্গে পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, উপকূল অঞ্চলের বেড়িবাঁধগুলো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। এর উচ্চতা অনেক কম। এক সময় ১৫ ফুট উচ্চতার বাঁধ করা হয়েছে। তখন ঘূর্ণিঝড়ের এই প্রভাবের চিন্তা বিবেচনায় ছিল না। আগামীতে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়বে কীনা বলা মুশকিল; তবে জলোচ্ছ্বাসের পানির উচ্চতা বাড়বে; এটা বলা যায়। সে কারণে বাঁধের উচ্চতা অন্তত তিন মিটার বাড়াতে হবে। সমুদ্রের দিকে বাঁধ করতে হবে। এক সময় বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে পানি কমিটি করা হয়েছিল। এখন তা সেভাবে কার্যকর নয়। একে কার্যকর করতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, উপকূলের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার বাঁধ আম্পানের মত ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার জন্য উপযুক্ত নয়। প্রতি অর্থ বছরে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যে অর্থ বরাদ্দ হয়; তা পর্যাপ্ত নয়। এজন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি বিদেশি সাহায্য নিয়ে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মহা পরিচালক এনায়েতুল্লাহ দাবি করেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাজে যেসব দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ আছে; তা আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে। দুর্নীতি রোধে নানামূখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন স্বচ্ছতার সঙ্গেই সকল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ের ঝুঁকি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘কোস্টাল এমব্যাকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ গ্রহন করে; যা সংক্ষেপে সিইআইপি নামে পরিচিত। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু জমি না পাওয়া, নদীর ভাঙন ইত্যাদি কারণে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ নেই। এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হচ্ছে ৬৯৬ কোটি টাকা
এ প্রসঙ্গে কোস্টাল এমব্যাকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ে উপকূলীয় এলাকায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে; তা কমিয়ে আনাই এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। আমরা কাজ করছি। কোন স্থানের কাজ শেষ হয়েছে, কোন স্থানের কাজ কিছু বাকি রয়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলায় প্রকল্পের আওতায় নির্মানাধীন একটি বাঁধ আম্পান আঘাতের আগেই ধ্বসে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নদীর ভাঙনের কারণে আগে থেকেই সেখানকার অবস্থা নাজুক ছিল। প্রকল্প প্রণয়নের সময়ে নদী শাসনের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল না। সে কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে বিলম্বিত হচ্ছে। সময় এ বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে; আরও এক বছর বাড়াতে হতে পারে।
সরকারের ডেল্টা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে দেশের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম। ২৭ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা উপকূলীয় অঞ্চল দেশের অন্যান্য বিশেষায়িত এলাকা থেকে অনেক বড়। ডেল্টা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের বিদ্যমান পোল্ডারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঝড়বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও লবনাক্ততার অনুপ্রবেশ মোকাবেলা করা হবে; পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা হবে ইত্যাদি। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে উপকূলীয় বাঁধ শক্ত ও উঁচু করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রকল্প পরিকল্পনা, আবেদন, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাঁধ সংস্কার প্রকল্পগুলো ফলপ্রসূ হচ্ছে না।
বাঁধের মালিকানা জনগণকে দেওয়ার দাবি তুলেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও দুর্যোগ ফোরামের আহবায়ক গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, দেশের মালিকানা জনগণকে না দিলেও মানুষের জীবন বাঁচাতে অন্তত বাঁধের মালিকানা জনগণকে দিতে হবে। বাঁধ কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে; সেটা জনগণই ঠিক করবে। ভোলার চরফ্যাসনে জনঅংশগ্রহণে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে সুফল পাওয়া গেছে। আর এখন জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ ভেঙে যেসব স্থান দিয়ে পানি ঢুকেছে; অবিলম্বে সে পানি সরাতে হবে। তা না হলে বাঁধের ভেতরের কৃষি নষ্ট হয়ে যাবে। মানুষ চরম সংকটের মুখোমুখি হবে। কৃষিকে আমাদের মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।
উপকূল অঞ্চলে বিদ্যমান বাঁধগুলোর সংস্কার এবং নতুন বাঁধ তৈরিতে কমিউনিটির নেতৃত্বাধীন বাঁধ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ক্লাইমেট ফিন্যান্স এনালিষ্ট এম. জাকির হোসেন খান।
তিনি বলেন, এ পদ্ধতিতে বাঁধ সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে যেমন খরচ অনেক কমবে; একইসাথে মানুষের মালিকানা প্রতিষ্ঠা পাবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে তদারকির দায়িত্ব দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধুমাত্র বাঁধের ডিজাইন প্রণয়ন ও স্থানীয় নাগরিকদের কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। যেকোন দুর্যোগে স্থানীয় কমিউনিটিই পারে শত বছরের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কার্যকর প্রাণ ও প্রকৃতি বান্ধব দুর্যোগ সহিষ্ণু টেকসই উন্নয়ন তথা কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন নিশ্চিত করতে।
বাঁধ বিপন্ন এলাকার মানুষেরা বলছেন, এ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা নির্ভর করে বাঁধের ওপর। বাঁধের ক্ষতি হলে তাদের সব ভেসে যায়। ফসল নষ্ট হয়, বাড়িঘর নষ্ট হয়। জরুরি খাবার না দিয়ে বাঁধটা শক্ত করে বানিয়ে দেওয়ার দাবিটাই তাদের কাছে প্রধান। বাঁধের ফাঁদ জনজীবন বিপন্ন করে তুলেছে।সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগরের গঙ্গা, ব্রক্ষ্মপুত্র, এবং মেঘনা নদীর সঙ্গমে গঠিতব-দ্বীপের একটি ম্যানগ্রোভ অঞ্চল। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি নদী থেকে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের বালেশ্বর নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। মোটামোটি ভাবে, সুন্দরবন অঞ্চলের ৬০% পড়েছে বাংলাদেশে (৬০০০ বর্গ কি.মি.) এবং বাকী ৪০% পড়েছে ভারতে (৪০০০ বর্গ কি.মি.)। সুন্দরবন বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত এবং ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা জুড়ে বিস্তৃত। সুন্দরবনের গুরুত্বের কথা বলে শেষ করা যাবেনা। বাংলাদেশ, ভারত উভয় দেশের জন্যই সুন্দরবন অশেষ গুরুত্ব বহন করে। সুন্দরবনকে বাংলাদেশের ফুসফুস বলা হয়। সুন্দরবন শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এর এক তৃতীয়াংশই তো মধ্যে হ্রাস পেয়েছে যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশে মারাত্মক পরিবেশগত হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট বনাঞ্চলের ৪০% ই সুন্দরবনে রয়েছে। সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রেলিং হিসেবে কাজ করে। এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন উপকূলীয় ক্ষয়, সুনামি, এবং জলোচ্ছ্বাস থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে। সুন্দরবন কলকাতা মেট্রোপলিটন শহরকেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষাকরে। সুন্দরবনের গুরুত্ব ও এর স্বাতন্ত্রের কথা বিবেচনা করে ইউনেস্কো ১৯৮৭ সালে ভারতীয় অংশকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করে। পরবর্তিতে ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ অংশকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করা হয়।
প্রায় ১৭০-১৭৫ বছর আগে ইংরেজরা সন্দরনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইজারা দেয় এবং মেদিনীপুর ও বর্তমান বাংলাদেশের যশোর, খুলনা, থেকে প্রচুর ভূমিহীন মানুষ সুন্দরবনে বসত গড়ে তুলতে আসেন। প্রথমেই তারা ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সাফ করে যাবতীয় বন্যপ্রানী দের বিতাড়িত করে আর তারপর তা রাজোয়ার আর কোটালের জল যাতে দিনে দুই বার ঢুকে পড়ে চাষবাস আর বসবাসের জমি ভাসিয়ে না দেয় তাই নদীর তীর বরাবর বাঁধ তৈরি করেন। কারন তারা যেখানে বসবাস করতে শুরু করেছিলন সেই জায়গা গুলি কোন দিনই মাটি ফেলে এত উঁচু করা সম্ভব হয়নি যাতে জোয়ারের জল ঢোকা আটকানো যায়, আর নদীর লবণাক্ত জল ঢুকলে চাষাবাদ করা সম্ভব হবেনা, পানীয় জল ও পাওয়া যাবেনা। তাই যত গুলো দ্বীপে মানুষ বসবাস করা শুরু করল, ১০২ টা দ্বীপের মধ্যে ৫৪ টা দ্বীপেই বড়বড় মাটির দেওয়াল বা বাঁধ দেওয়া হলো। আর মানুষের জীবন ধারনের ব্যাবস্থা করতে গিয়ে নষ্ট করা হলো ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ফলস্বরূপ এই স্বাভাবিক জোয়ার ভাটায় পলি আসা বন্ধ হয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গল এলাকার তুলনায় এই মানুষ গুলোর বসবাসকারী দ্বীপ হয়ে গেল আরও নিচু আর স্বাভাবিক জোয়ার ভাটায় বাধা পাওয়ায় নদী গুলোর চরিত্রও পাল্টাতে থাকে, কোথাও পাশের দিকে চওড়া আবার কোথাও সরু হতে থাকে। কিন্তু বছরে ২০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে আসছে গঙ্গা নদী, সেটা হুগলী মাতলা মোহনা অঞ্চলে এইভাবে বাধা প্রাপ্ত হয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে নদীখাতের নানান অংশে জমতে থাকে, কিন্তু তার উল্টো দিকেই জলের তোড়ে বাঁধের মাটি তলা থেকে সরে গিয়ে ভাঙতে থাকে পাড়। কিন্তু প্রতি বছর নদীবাধ মেরামত করা হলেও নদী ও প্রকৃতি কার ও কথা শোনে না। যে বিপুল ম্যানগ্রোভ অরণ্য এই দ্বীপ গুলির পাশে জলের কাছে ছিল, অধিকাংশ জায়গায় তা আর নেই অনেক বছর ধরে। আর ভাঙনের হারও সব জায়গায় সমান নয়। বহু জায়গায় নদী বাধ সাংঘাতিক ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে বছরের পর বছর আর তার পাশেই চরম অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে সুন্দরবনের মানুষ।
সিডর, আইলা, আম্পান, বুলবুল, ফনি এবং সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইয়াস, এই সব দুর্যোগে সুন্দরবন বাংলাদেশ ও ভারতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে আপোষহীন ভাবে রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান মন্ত্রণালয় এর হিসেব মতে, ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের জল বেড়ে উপকূলীয় ৯ টি জেলার ২৭ টি উপজেলায় ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশা শুনি, কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়ি বাঁধ ভেংগে লোকালয়ে জল ঢুকে গিয়েছে। অতিপ্রবল ঘুর্ণি ঝড় ইয়াস বাংলাদেশ উপকূলে সরাসরি আঘাত না আনলেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী জোয়ারে অধিকাংশ এলাকায় বাধ ভেংগে বাড়িঘড়, মাছের ঘের, ফসলি জমি ডুবে গিয়েছে। খুলনা জেলার কায়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বাটিয়াকোপ উপজেলার অন্তত ১০ টি স্থানে বাধ ভেঙেছে এবং উপকূলীয় মোট ২৭ কি.মি. বেড়ি বাঁধ ভেংগে গিয়েছে। এদিকে ভারতের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কাকদ্বীপ, নামখানা, ধামাখালি, গোসাবা, কুলপি, ক্যানিং সর্বত্র বাধ ভেংগে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে গিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩৪ টি বাঁধ ভেংগেছে, যার প্রায় বেশীর ভাগই দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায়।
তবে কিছু কিছু উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে যা উপকূলীয় মানুষ গুলোকে অসীম ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। যেমন
ম্যানগ্রোভ চারা লাগিয়ে প্রাকৃতিক বাধ তৈরি করা যেতে পারে। যদিও তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রধান নদী বা ডাইকের সামনে ম্যানগ্রোভ অরণ্য তৈরি করতে হবে। আর সেটা করতে হবে ম্যানগ্রোভের স্বাভাবিক সাকশেসন অনুযায়ী যেমনঃ ধানী ঘাষ, বানি, খলসে, গোলপাতা, কেওড়া, গর্জন, কাঁকড়া, ধুঁধল, পশুর, সুন্দরী, গেওয়া। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো এই সব গাছের গুড়ি গুলো যেমন তীরের দিকে ধাবমান জলের স্রোত কমায়, তেমনি তীব্র ঝড়ের বা প্রবল জোয়ারে তার জলের বাইরে বেরিয়ে থাকা বড়বড় ক্যানোপি গুলো উঁচউঁচু ঢেউ গুলোকে আটকে দেয়। কনক্রিটের তৈরি বাঁধের থেকেও এই বাঁধ বেশি কার্যকর হবে।
উপকূলবর্তী অঞ্চলে ট্রপিকাল সাইক্লোনের বিপুল হাওয়ার বেগ প্লাবন আনে তাই নয়, বিপুল পরিমান সল্ট স্প্রে আর লবণাক্ত এরোসল তৈরি করে যা ভূমি থেকে বহু কিলোমিটার উপরে উঠতে পারে যা গাছের পাতা ও মুকুলে নেক্রোসিস তৈরি করে গাছের পাতা হলুদ করে দেয়। এই এরোসল যদি মাটিতে পড়ে গাছের মূলতন্ত্রে প্রবেশ করে তা হলে গাছ শুকিয়ে যাবে। ফলস্বরূপ গাছ মারা যায়। এই জন্য বিশেষ কিছু গাছ যেমনঃ কাজুগাছ, নিমগাছ, দইগোটা, তাল, নারকেল, ঝাউ, দেশীতুলা, সমুদ্রজবা এই সব গাছ বপন করা যেতে পারে যা প্রবল ঝড়ও সল্ট স্প্রেরোধী।
উপকূল সুরক্ষা বেড়িবাঁধের ফাঁদে বিপন্ন উপকূল
বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্র উপকূলবর্তী ১৯টি জেলা নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চল। দেশের তিন ভাগের এক ভাগজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি মানুষের বাস। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ষাটের দশকে নির্মিত হয় ৫ হাজার ৮১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। যা ১৯৬১ সালে শুরু হয়, শেষ হয় ১৯৭১ সালে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতে, উপকূলীয় এলাকার ৫ হাজার ৭৫৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অর্ধেকের বেশিই আজ ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধগুলো অনেক পুরনো। উচ্চতা আছে তিন-সাড়ে তিন মিটার। এগুলোর কেবল সাধারণ জোয়ার ঠেকানোর ক্ষমতা আছে। আম্পান বা সিডর-আইলা, রোমানের মতো বড় ঘূর্ণিঝড় ঠোকানোর সামর্থ্য এই বেড়িবাঁধের নেই। উপকূলীয় ১৯টি জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ঘূর্ণিঝড়ের আতংকে দিন কাটে।
ষাটের দশকে দেশের ১৩ জেলায় ৫ হাজার ৮১০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার ১৩৯টি পোল্ডার বা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিলো। স্বাধীনতার ৫০ বছরে উপকূল সুরক্ষায় নতুন কোন পোল্ডারও তৈরী করা হযনি। পাকিস্তান আমলে তৈরী বেড়িবাঁধ সংস্কার আর পুনঃনির্মাণেই কেটে গেছে ৫০টি বছর! অর্ধশত বছরেরও আগে নির্মিত এসব বাঁধ এখন আর সামাল দিতে পারছে না সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা।
প্রতি বছর জুন মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে যেসব স্থানে বেড়িবাঁধ দুর্বল, স্থানগুলো উল্লেখ করে একটি আনুমানিক বরাদ্দ পাউবো এমপির ডিও লেটারের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেই ষাটের দশকে আদি বাঁধ নির্মাণের পর এ ধরনের আর কোনো মূল বাঁধ এ অঞ্চলে নির্মাণ হয়নি, হয়েছে শুধু সংস্কার-মেরামত। উপকূল সুরক্ষা বেড়িবাঁধ ভাঙ্গলে সংস্কারে কেটে যায় বছর। আর বাঁধ বলতে যেটি করা হয়েছে, তা হলো যেখানে ভেঙেছে সেখানে রিং বাঁধ দেওয়া। নকশায় ত্রুটি, বাস্তবতার সাথে পরিকল্পনার ভিন্নতার কারনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ টেকসই হয় না।
ষাটের দশকে উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পাকিস্তান সরকার। ৫৫ বছরে ভাঙতে ভাঙতে যার অস্তিত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লবণপানি প্রবেশ করায় সবুজ শ্যামল জনপদ বিরাণ হচ্ছে। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত আর নদীর ভাঙ্গন বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে এতটাই ভঙ্গুর করে দিয়েছে যে, এখানে এখন আর বড় ঘূর্ণিঝড়ের প্রয়োজন হয় না। অমাবস্যার জোয়ারে পানির চাপ একটু বাড়লে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল রেখার প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা এখনো অরক্ষিত। দেশে বর্তমানে পোল্ডারের সংখ্যা ১৩৯, যা ষাটের দশকে তৈরী করা হয়েছিলো। এর মধ্যে ৬০টি বেড়িবাঁধ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। পাউবো বিভিন্ন সময় সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করেছে। তবে নতুন করে কোন বাঁধ তৈরী করা হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লবণপানি প্রবেশ করায় একসময়ের সবুজ শ্যামল জনপদ বিরাণ হচ্ছে। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত আর নদীর ভাঙ্গন বেড়িবাঁধ এতটাই ভঙ্গুর করে দিয়েছে যে, এখন আর বড় ঘূর্ণিঝড়ের প্রয়োজন হয় না। অমাবস্যা বা পূর্ণিমার জোয়ারে পানির চাপ একটু বাড়লে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দফায় দফায় ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে জমিতে লবণপানি ঢুকে জমি উর্বরতা হারায়। ৫৫ বছরে ভাঙতে ভাঙতে যার অস্তিত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। দুঃখের বিষয়, বেড়িবাঁধ নির্মাণ হওয়ার পর থেকে স্বার্থান্বেষী মানুষদের ছোবলে বারবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বাঁধটি। ৮০দশ থেকে ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠিত কৃষকরাও বাঁধ কেটে জমিতে লবণপানি প্রবেশ করিয়ে মাছচাষ শুরু করে। ফলে একদিকে জমি নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে বিনাশ করা হয়েছে বাঁধ।
ভারতের ট্রপিক্যাল মেটেরোলজি ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রক্সি ম্যাথিও কল-এর তথ্যমতে, বিশ্বের ভয়াবহতম ১০ ঘূর্ণিঝড়ের ৮টিই সৃষ্টি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিশ্বে যত মৃত্যু ঘটেছে, তার ৮০ শতাংশই হয়েছে এই অঞ্চলে। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯ জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
১৯৭০ থেকে ২০২৪ সাল পযন্ত প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়সহ একের পর এক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে দেশের বাঁধের বেশিরভাগ অংশ নাজুক হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র সুপার সাইক্লোন সিডরে উপকূলীয় ৩০ জেলার ২ হাজার ৩৪১ কিলোমিটার বাঁধ বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিলীন হয় ৩৯১ কিলোমিটার। ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার ৩৮টি পোল্ডারের ১৬৫১ কিলোমিটার বেঁড়িবাধের মধ্যে ৬৮৪ কিলোমিটার বিধ্বস্ত হয়। ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে উপকূলীয় ১০ জেলার ৪৭৮ কিলোমিটার বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে বিলীন হয়ে যায়। আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬৭৮ কিলোমিটার।
১৯৬০ সালের দিকে নির্মাণ করা বাধের মেয়াদ ছিল ২০ বছর। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বিগত ৫৫ বছরের মধ্যে এ বাঁধ কখনো সংস্কার করা হয়নি। ভাঙলে মেরমত করা হয়। উপকূলীয় বাঁধগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। ৫৫ বছর আগের বাঁধ যে এখনো সার্ভিস দিচ্ছে সেটাই অনেক বেশি। এছাড়া যে সময় বাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়েছিলো, সে সময় শুধুমাত্র জোয়ার থেকে জনবসতিকে রক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের চাপ বাঁধগুলো আর নিতে পারছেনা।
বেড়িবাঁধ মাটি অথবা শিলা দ্বারা নির্মিত উচুঁ পৃষ্ঠবিশিষ্ট প্রাচীর সদৃশ মাটির স্থাপনা। প্রচলিত বাংলায় এটিকে বেড়িবাঁধও বলা হয়ে থাকে। অবস্থাভেদে বেড়িবাঁধের প্রকৃতি এবং গঠন বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের বেড়িবাঁধের মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ একটি, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রতিরোধের লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়। নিম্ন ভূমি অঞ্চলে বন্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে নদীতীর এবং তীরভূমি থেকে কিছুটা দূরে বন্যার পানি ধরে রাখার জন্য নির্মিত বেড়িবাঁধকে কান্দা বা জলস্রোত প্রতিরোধী বাঁধও বলা হয়, ইংরেজি ভাষায় যাকে বলা হয় লেভি বা ডাইক। এই ধরনের বাঁধের অভ্যন্তরে পানি প্রবেশ এবং নির্গমের ব্যবস্থা থাকতে পারে আবার নাও পারে। বন্যার পানি ধারণ ও প্রতিরোধ করা অথবা সড়ক, রেলপথ, খাল ইত্যাদি নির্মাণে এরূপ স্থাপনার প্রয়োজন হয়।
উপমহাদেশে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বেড়িবাঁধ নির্মাণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সুলতানি শাসনামলে (১২১৩-১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দ)। সুলতান গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খিলজী তাঁর রাজধানী লখনৌতিকে বন্যার কবল থেকে রক্ষার জন্য কয়েকটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেন। তাঁর সময়েই প্রায় ১৫০ মাইল দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট গ্রান্ড ট্রাঙ্ক সড়ক নির্মিত হয়, যা একই সঙ্গে বন্যা প্রতিরোধে বেড়িবাঁধ হিসেবেও কাজ করত। মুগল সম্রাটগণও বিভিন্ন বড় বড় নদ-নদীর গতিপথে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছিলেন।
বাংলাদেশে সমুদ্র উপকূলবর্তী বেড়িবাঁধসমূহ নির্মাণ শুরু হয় সপ্তদশ শতকের শুরুতেই। জমিদারদের কর্তৃত্বাধীন এসব উদ্যোগ ছিল মূলত বেসরকারি। স্থানীয়ভাবে এ বাঁধকে অষ্টমাসি বাঁধ বলা হতো। মূলত জোয়ারের পানি থেকে ফসল বাঁচানোর এ জন্য বাঁধ দেওয়া হতো। উপকূল সুরক্ষায় ব্যাপক পরিসরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মাফিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সূত্রপাত ঘটে ১৯৬০-এর দশকে। সে সময় থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বহু কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে। এই বাঁধগুলি কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে উপযুক্ত
বিশ্ব উষ্ঞায়নের প্রভাবে সুন্দরবন অঞ্চল আজ গভীর সংকটে। এই সব অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই জন্য চাই দুই বাংলার সরকারেরই সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, করতে হবে ক্লাইমেটরিজিলিয়ান্ট প্লানিং।
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত