জন্মভূমি ডেস্ক : দেশে বিচারাধীন মানবপাচারের মামলার সংখ্যা দুই হাজার ৭২৯। তদন্তাধীন রয়েছে ৫১৭টি মামলা। সব মিলিয়ে মামলা পেন্ডিং রয়েছে তিন হাজার ২৪৬টি। এসব মামলায় মোট আসামি করা হয়েছে ৩১ হাজার ৫২৩ জনকে। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৪১ জনকে। ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মানবপাচারের অভিযোগে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ৬২টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৬১টি এবং মার্চ মাসে ৭৭টি মামলা দায়ের হয় দেশের বিভিন্ন থানায়। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৪৪টি মামলা, ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৪টি এবং মার্চ মাসে ৩৯টি মামলার নিষ্পত্তি হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তিন মাসে ৩৯টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ৭৮টি মামলার।
এ ছাড়া আদালতে বিচারের মাধ্যমে গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ১৪৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। দুটি মামলায় সাজা দেওয়া হয় আসামিদের। মাত্র ১৩ জনকে সাজা দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে।
মানবপাচার মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশকে ঘিরে মানবপাচারের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। মানবপাচার প্রতিরোধের প্রধান কাজ হিসেবে বেকারত্ব হ্রাসের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। যেসব দেশে মানবপাচারের হার বেশি, সেসব দেশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মানবপাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মনে করেন তারা।
ইউএনওডিসির মানবপাচার নিয়ে এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলার ৫১ শতাংশ মানুষ জীবিকার তাগিদে পাচারকারীদের ফাঁদে পা দেয়। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, ঝিনাইদহ, নড়াইল, সিলেট, নওগাঁ, মাগুরা, যশোর, খুলনা, নরসিংদী, মাদারীপুর, কক্সবাজার, ঢাকা, নেত্রকোনায় মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা বেশি। চক্রের খপ্পরে পড়ে বিদেশ গিয়ে শেষে সর্বস্বান্ত হয়ে কেউ ফিরে আসে, কেউ নির্যাতন ভোগ করতে থাকে। বাংলাদেশ থেকে পূর্ব আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বেশি মানবপাচার হয় বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে।র্যাবের তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে ৪১৭টি অভিযানে মানবপাচারকারী চক্রের ৮৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় মামলা করা হয় ৪৫১টি। এসব মামলার অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৩১০ জন পুরুষ ৩৬৬ জন নারী এবং সাত শিশুকে।
ভাগ্যোন্নয়নের আশায় বিদেশে পাড়ি জমালেও নির্যাতনের শিকার হন সেসব নারী-পুরুষ। এতে তাদের পরিবারও ভুক্তভোগী হচ্ছে। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জেনে তারপর লেনদেন করা উচিত। বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিস লিমিটেড (বোয়েসেল) শাখায় বিদেশে কর্মী পাঠানোর যেকোনও প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যাবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তে কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, জনশক্তি রফতানির কোনও লাইসেন্স না থাকার পরও লোকজনকে কথার ফাঁদে ফেলে মানবপাচারে সক্রিয় রয়েছে চক্রগুলো। উচ্চ বেতনে চাকরি, বছরে বোনাস, ভালোভাবে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা-এসবের প্রলোভন দেখিয়ে বেকার যুবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। তাদের ফাঁদে পড়ে যারা বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন, সেখানে গিয়ে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
একপর্যায়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে নিচ্ছে। এসব চক্রের সদস্যরা এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিষয়ে ভুক্তভোগীরাও কোনও অভিযোগ করতে চান না। এতে মানবপাচারের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী সংস্থাকে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। যারা বিদেশ থেকে ফিরে আসেন, তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এ জন্য তারাও মুখ খুলতে চান না।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে পুলিশ সদর দফতরে স্থাপন করা মনিটরিং সেল আরও কার্যকর রাখতে হবে। স্থল ও বিমানবন্দরগুলোয় বিশেষ তল্লাশির ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি বাড়ালে অনেক ক্ষেত্রেই মানবপাচারের মতো ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ ধরনের মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনার পর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এতে অনেকেই এ ধরনের অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। মানবপাচার রোধে শুধু বক্তৃতা, বিবৃতি ও গবেষণা যথেষ্ট নয় বলে জানান তারা।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মানবপাচার চক্রের ফাঁদে পড়ে বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার একাধিক নারী ও পুরুষকে আমরা দেশে ফিরিয়ে এনেছি। দেশি-বিদেশি চক্রের সহায়তায় বেশ কিছু গ্রুপ এ ধরনের মানবপাচারে সঙ্গে জড়িত। যারা বিভিন্ন রকম প্রলোভন দেখিয়ে অসচ্ছল নারী-পুরুষদের রাজি করায়। এসব চক্রের টার্গেট থাকে গ্রাম এলাকায়। তিনি আরও বলেন, যখনই আমরা মানবপাচারের মতো ঘটনা কিংবা মানবপাচারকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের ঘটনার বিষয়গুলো অবহিত হই বা অভিযোগ আসে, তখনই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। এ ছাড়া মানুষকেও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত