
জন্মভূমি ডেস্ক : দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু। অকালে স্বজন হারিয়ে বাকরুদ্ধ পরিবারগুলো। বছরের শুরু থেকে শনিবার পর্যন্ত মৃত্যু ১০০ ছাড়িয়েছে। মৃতদের বেশিরভাগই শিশু। যে মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না পরিবারগুলো। আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ছুঁই ছুঁই। এমন পরিস্থিতিতেও ডেঙ্গু বিষয়ে জরুরি অবস্থা জারির সময় আসেনি বলে দাবি করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জ্বর কমে গেলে শক পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত রোগীদের হাসপাতালে আনার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোর সব বেড এমনকি মেঝে পর্যন্ত পূর্ণ রোগী। ফলে বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। জুলাইয়ের শুরু থেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে বহু রোগী। খালি হচ্ছে মায়ের বুক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের। আর আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৪৭৬ জন। যারা কোনো না কোনোভাবে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
॥ এখনি জরুরি অবস্থা নয় ॥
ডেঙ্গুর এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রকোপ অব্যাহত থাকলেও এখনি জরুরি অবস্থা জারির সময় আসেনি বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মো. খুরশিদ আলম। রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যখন করোনা ছিল, তখন ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন এটি ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি আমরা দেখছি না। তিনি বলেন, ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি’র যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সেটা পলিসি লেভেলে আলোচনা করতে হবে। আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণ উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছি। তারা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবেন। তিনি বলেন, এবার বর্ষা দেরিতে শুরু হয়েছে তাই ডেঙ্গু মৌসুম লম্বা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট নিরসনে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। রাজধানীর সব সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। নির্দিষ্ট একটি হাসপাতালে না গিয়ে ডেঙ্গু চিকিৎসায় অন্যান্য সেসব হাসপাতালে আছে সেসব হাসপাতালে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আশঙ্কাজনক হারে রোগী বাড়ছে বলে স্বীকার করে মহপরিচালক বলেন, আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি, দেবো। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে নিশ্চয়ই আমরা সংকটে পড়ব। এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো সংকট নেই। আমরা সবাই মিলে যদি ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে চাই, আশা করছি পারব।
॥ অধিদপ্তরে নেই সব রোগীর তথ্য ॥
প্রতিদিন অধিদপ্তর থেকে ডেঙ্গু বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বিষয়ে যে তথ্য দেওয়া হয় তাও সঠিক নয়। যেসব রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের কোনো পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের কাছে থাকে না। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্যগুলোও ঠিকমতো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন খোদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। এজন্য তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অনেক বেসরকারি হাসপাতাল এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডেঙ্গুর রিপোর্ট জমা দিচ্ছে না। যারা এখন থেকে আমাদের রিপোর্ট দেবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সঠিক তথ্য না থাকার কারণে কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ কেমন তা খুঁজে বের করা মুশকিল হচ্ছে বলে দাবি সিটি করপোরেশনগুলোর। আর এর কারণেই পুরোপুরি ধ্বংস করা যাচ্ছে না এডিসের মশার প্রজনন স্থল। ফলে প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বাড়ছে জানিয়ে কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, এক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজে লাগাতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গু এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একার পক্ষে এটির নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এডিস মশা কোথায় আছে বা ঠিক কোন বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী রয়েছে তা ওই বাড়ির লোকজনের পক্ষেই বলা সম্ভব। ওই বাড়ির লোকজন যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য সরবরাহ করে তাহলে করপোরেশনের পক্ষে লার্ভা ধ্বংস করা অধিকতর সহজ হবে।
॥ বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চমূল্যে চিকিৎসা ॥
তিনদিন যাবত রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামান। তিনদিনে শনিবার পর্যন্ত ৩৬ হাজার টাকা বিল হয়েছে বেড ভাড়াসহ ওষুধপত্রের দাম জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালের যে পরিবেশ তাতে যাওয়ার সাহস হয়নি। কিন্তু এখানে চিকিৎসা নিতে এসে মনে হচ্ছে এ পর্যন্ত যা জমানো টাকা আছে সব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই দিয়ে যেতে হবে।
একই অভিযোগ করেন পান্থপথের অপর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী আফসানা জাহান। তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা ডেঙ্গুর নেই সেটা সবাই জানে। তাও প্রতিদিনই এই টেস্ট ওই টেস্ট করেই যাচ্ছে হাসপাতালের লোকজন। প্রতিদিন খরচ হচ্ছে অন্তত ১০ হাজার টাকা করে। কিন্তু বাঁচতে তো হবে।
তবে ডেঙ্গু চিকিৎসায় অতিক্তি খরচ নিলেই ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার। তিনি বলেন, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেও সতর্ক থাকতে হবে। রবিবারের ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডাইরেক্টদের বলছি, এ বিষয়ে দ্রুত খোঁজ নিতে হবে। বেসরকারি যেসব হাসপাতালেই ডেঙ্গু রোগী আছেন, সেগুলোতে টিম পাঠাতে হবে এবং অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
॥ আরও বাড়তে পারে ভয়াবহতা ॥
আগেই আশঙ্কা করা হয়েছিল ভরা মৌসুমে এবার ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে এডিস মশার আক্রমণ। আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যাও ছাড়াতে পারে আগের সব রেকর্ড। তারই সংকেত যেন পাওয়া গেল জুলাইয়ের ১৬ দিনে। আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংসে ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন তারা। একইসঙ্গে আবহাওয়ার তারতম্যও সমানভাবে দায়ী উল্লেখ করে তারা বলছেন, এখনি এডিসের জীবাণুবাহী মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করতে পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাইয়ের আক্রান্ত ও মৃত্যুর এ পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও বৃদ্ধি পাবে। এ বছর ডেঙ্গুর মৌসুমে বিশেষ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ হতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ হিসেবে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বিশেষ করে রাজধানী বা রাজধানীর বাইরে যেসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাদের বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে ওইসব বাড়িতে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালাতে হবে। চলতি বছরের শুরু থেকেই কেন সারাদেশে এমন ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম মোস্তাক হোসেন তুহিন জনকণ্ঠকে বলেন, উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া থাকার কারণে বাংলাদেশ মশা ও মশাবাহিত রোগ বিস্তারের জন্য উত্তম জায়গা। উপযুক্ত তাপমাত্রা, আর্দ্রতার সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গুর চোখ-রাঙানি আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে নগরবাসীকে। এমন পরিস্থিতিতে আর নির্দিষ্ট সময় না বরং সারাবছর এডিস মশা নিধনে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ডেঙ্গুর একমাত্র কারণ এডিস মশা। এটি জমানো পানিতে জন্ম নেয়। তাই জমানো পানি তিনদিনে একদিন ফেলে দিতে হবে।
॥ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাঁচ নির্দেশনা ॥
ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতামূলক পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
রবিবার মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়, ডেঙ্গু জ্বর কমে গেলে অবহেলা না করে অবশ্যই পরবর্তী জটিলতা এড়াতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডেঙ্গু জ্বর হলে করণীয় সম্পর্কে মন্ত্রণালয় পরামর্শ দিয়েছে, জ্বরের শুরুতে অবশ্যই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। এছাড়া দিনে অথবা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করার জন্যও বলেছে মন্ত্রণালয়।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বাসার ভেতর ও চারপাশে, নির্মাণাধীন ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ করুন ও পরিষ্কার রাখুন।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত