
পূর্ণ চন্দ্র মন্ডল, পাইকগাছা : পিরোজপুর জেলায় দল নিয়ে ধান কাটতে গিয়েছিলেন আব্দুল মাজেদ। গত শনিবার ট্রাক বোঝাই করে নিজেদের ভাগের ধান ও শ্রমিক দল নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। পাইকগাছা সরল জিরোপয়েন্টে রাস্তা সংস্কার এবং যানজটে আটকে পড়ায় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বলছিলেন, আর কয়েকদিন পরেই ভোট। সেজন্য একটু আগেভাগেই দল নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। অনেক দিন পর এবার নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। এমনটা ভেবে সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। পাশে থাকা অন্য শ্রমিকরা জানান, এর আগের তিন-চারটি নির্বাচনে তারা কেউ ভোট দিতে পারেননি। প্রার্থী অথবা তার কর্মীরা কেউ ভোটের জন্য খোঁজখবর দেয়নি। ভোটকেন্দ্রে গিয়েও অনেককে ভোট না দিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। কারণ তাদের ভোট আগেই কেউ দিয়ে দিয়েছে। তবে এবার সুষ্ঠু ভোট হবে, এমন ভাবনায় উৎসাহ নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন সবাই।
বছরের এই সময় উপকূলীয় জনপদ পাইকগাছা-কয়রার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এলাকার বাইরে শ্রম বিক্রি করতে যান। কেউ যায় ধান কাটতে, কেউ ইটের ভাটায়, আবার অনেকেই শহরে দিনমজুরির কাজ করেন। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই উপজেলায় এ ধরনের অর্ধলক্ষাধিক শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন। কয়েকদিন ধরে এসব শ্রমজীবী মানুষ দলে দলে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। ধানকাটা শ্রমিকরা কাজ শেষ করে ফিরলেও ইটের ভাটা ও পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে ফিরতে হয়েছে। কেবল ভোট উপলক্ষেই এসব শ্রমজীবী এলাকায় ফিরেছেন।
ঢাকা ও খুলনা শহরে রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক চালিয়ে রোজগার করেন দুই উপজেলার সহস্রাধিক শতাধিক মানুষ। ইতোমধ্যে এসব শ্রমজীবী নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। বাড়ি ফেরা রিকশা শ্রমিক নুরুল হক বলেন, 'আগের দুই-তিনটা ভোটে আমাগের পছন্দ-অপছন্দের দাম ছিল না। এক প্রকার জোর কইরে আমাগে কাঁধে এমপি (সংসদ সদস্য) চাপায় দেয়া হতো। তবে এবার সত্যিকারের ভোটে জিতেই এমপি হতি হবে। আমাগের ভোটে একজন যোগ্য মানুষকে নির্বাচিত করতি পারব আমরা।' ভ্যানচালক মিজানুর শেখ বলেন, 'এবার ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। নিজের ভোট না দিতি পারলি যদি পছন্দের প্রার্থী হাইরে যায়। তাই কষ্ট কইরে হলিও বাড়ি ফিরতি হয়েছে।' মিরপুর, আশুলিয়ার গার্মেন্টস থেকে রবিবার রাতে এলাকায় ফিরেছেন এমন কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট দেওয়ার কথা বলে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তারা। টাকা খরচ করে এভাবে বাড়ি ফেরায় তাদের কিছুটা ক্ষতি হলেও দীর্ঘদিনের ভোট না দেওয়ার আক্ষেপ মেটাতেই এলাকায় ফিরেছেন এসব শ্রমজীবী মানুষ।
পাইকগাছা পরিবহণ কাউন্টারে গার্মেন্টস শ্রমিক মাসুম গাজী, মিনারুল ইসলাম, শিউলি খাতুন জানান, ২০১৮ সালে নতুন ভোটার হওয়ার পর এবারই প্রথম ভোট দেবেন সবাই। এলাকায় এসে ভোটের উৎসবে যোগ দিতে পেরে নিজেদের গর্বিত নাগরিক বলে মনে হচ্ছে তাদের। এরকম চিত্র সরল জিরোপয়েন্টে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে স্ব স্ব গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি মোস্তফা শফিকুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এ জনপদে বেশির ভাগ শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। জীবন জীবিকার তাগিদে এসব শ্রমজীবীরা এলাকার বাইরে থাকেন। এর আগে নির্বাচন নিয়ে এমন উৎসাহ দেখা যায়নি। এবার প্রার্থীদের অনেকেই শ্রমজীবীদের এলাকায় ফিরতে সহযোগিতা করতে দেখা যাচ্ছে। আবার অনেক শ্রমজীবী নিজ নিজ উদ্যোগে বাড়ি ফিরছেন। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলন-৬ (কয়রা -পাইকগাছা) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচ প্রার্থী। তারা হলেন- এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী (ধানের শীষ), মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), মোস্তাফা কামাল জাহাঙ্গীর (লাঙ্গল), প্রশান্ত কুমার মণ্ডল (কাস্তে) ও আছাদুল্লাহ ফকির (হাতপাখা) প্রতীক। নির্বাচনের প্রায় শেষ মুহূর্তে প্রার্থীদের অনুষ্ঠিত মিছিল, সভা-সমাবেশ এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত