
জন্মভূমি ডেস্ক : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বান্দরবানের তুমব্র“ ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় মিয়ানমার অংশে থেমে থেমে ভারী গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। এপারে বাংলাদেশ সীমান্তে নুরুল ইসলামের বসত ঘরে এসে পড়লো সেই গুলি। তবে সীমান্ত দিয়ে যাতে নতুন করে অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে সে জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড উলুবনিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। শুক্রবার বিকেল থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত বান্দরবানের ঘুমধুম ও টেকনাফ সীমান্তবর্তী শাহপরীর দ্বীপেও ভারী গুলির শব্দে স্থানীয়দের মধ্যে আবারও ভয়ভীতি দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়টি জানিয়েছেন নুরুল ইসলামের শাশুড়ি সামজিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে টেকনাফের হোয়াইক্যং উলুবনিয়া সীমান্তের মিয়ানমারের ওপারের মর্টারশেল ও গোলাগুলির শব্দ এপারে ভেসে আসতেছে। আমরা ভয়ে ও আতঙ্কে নিরাপদে সরে গেছি। হঠাৎ দেখি ভারী একটা গুলির শব্দ হলো। তখন দেখি আমার মেয়ের জামাইয়ের বসতঘরে টিনের দরজা ছিদ্র হয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে একটি গুলি। তখন আমরা আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গেছি। পরে বিজিবির সদস্যরা খবর পেয়ে তারা এসে বসতঘরের উঠান থেকে গুলিটা নিয়ে যায়।’
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মোঃ সোলেমান বলেন, ‘মিয়ানমারের ওপারে গোলাগুলির শব্দে বাড়ি ঘরে থাকতে পারছি না। শনিবার নুরুল ইসলামের বসতঘরে একটি গুলি এসে পড়েছে।
সীমান্তে বসবাসকারী মানুষদের ভাষ্য, ‘শুক্রবার বিকাল থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত তুমব্র“ সীমান্তে থেমে থেমে ভারী গুলিবর্ষণের বিকট শব্দ শুনতে পেয়েছেন তারা। এ ছাড়া তুমব্র“ সীমান্তের ঘুমধুমের বাজার পাড়ায়, বাইশ ফাঁড়িসহ তুমব্র“ রাইট এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং ও শাহপরীর দ্বীপে নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের ভেতরে ভারী গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সীমান্তে বসবাসকারী মানুষ।
এসব তথ্য স্বীকার করে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর তুমব্র“ সীমান্তে আবারও মিয়ানমারে ভারী গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। যার কারণে এপারের সীমান্তে বসবাসকারীরা ভয়ভীতির মধ্য রয়েছেন। গুলি ছোড়ার শব্দ শোনার পর জনসাধারণের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সীমান্তের খুব কাছাকাছি বসবাসকারী লোকজনকে আতঙ্কিত না হতে অনুরোধ করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যায় গুলির শব্দ পাওয়া যায়।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, ‘টেকনাফের হোয়াইক্যং উলুবনিয়া, তুলাতুলি ও কানজরপাড়া সীমান্তের মিয়ানমারের ওপারে সপ্তাহজুড়ে চলছে প্রচুর গোলাগুলি। ভয়ে আমরা বাড়ি-ঘরে থাকতে পারছি না। চিংড়ি ঘেরেও যেতে পারছি না। সীমান্তের ওপারে ফায়ার চলাচলের সময় একটি গুলি এপারে উলুবনিয়ার নুরুল ইসলামের বসত ঘরে এসে পড়ে। এখনো সীমান্তের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে।’
জানতে চাইলে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, ‘মিয়ানমার সীমান্তে মর্টারশেলের মতো বিকট গোলাগুলির আওয়াজ দেশের সীমান্তে বসবাসকারীদের মাধ্যমে অবহিত হয়েছি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে রেখেছি। তবে সীমান্ত দিয়ে কোনও লোকজন অনুপ্রবেশ করেছে কিনা জানা নেই।’
এদিকে গত বুধবার রাখাইনের একটি শহর নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় আরাকান আর্মি। এরপর আশপাশের গ্রামে তীব্র গোলাগুলি শুরু হয় বলে সংবাদমাধ্যম ইরাবতী সূত্রে জানা গেছে।
টেকনাফ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ এরফানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘স্থানীয়দের মাধ্যমে শুনেছি মিয়ানমার থেকে এপারে উলুবনিয়া সীমান্তের একটি বসতঘরে গুলি এসে পড়েছে। গোলাগুলির এ ঘটনায় স্থানীয়দের নিরাপদে থাকার জন্য বলা হয়েছে।’
এ বিষয়ে টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে যুদ্ধ চলছে। ফলে আমরা (বিজিবি) সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি, যাতে নতুন করে কোনও অনুপ্রবেশ না ঘটে।’
এদিকে রাজধানীতে শনিবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গত কয়েক মাসের ধারাবাহিকতায় রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তুমুল লড়াই চলছে। শুক্রবার দুইপক্ষের মধ্যে রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত রাখাইনের বুচিডং ও ফুমালি এলাকায় লড়াইয়ে বেশ কয়েকজনের হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
রাখাইনের সবশেষ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের বিষয়ে তাদের (ব্রিটিশ পার্লামেন্টের চার সদস্যের প্রতিনিধিদল) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়াই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি, সেটি আজ (শনিবার) হঠাৎ করে হয়নি।
বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সীমান্তরক্ষীরা অনেক আগে থেকেই সেখানে সতর্ক রয়েছে। সেখানে কিছুদিন পরপরই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাখাইনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই আছে। আমরা সব সময় আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছি। তারা আমাদের সঙ্গে আছে। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের পক্ষ থেকে যদি মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তারা তাদের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে।’
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা আবার বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘মানবতার কারণে রোহিঙ্গাদের তখন স্থান দিয়েছিলাম। যে রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে এসেছে, তাদের কারণে আমাদের নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এটি নিয়ে আমরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের দলের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের এখানে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হয়েছে। শিবিরগুলো উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসী গ্র“পগুলো রোহিঙ্গা শিবির থেকে তাদের সদস্য নিয়োগের চেষ্টা করে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের নানা সমস্যা। আমাদের দেশ জনবহুল, রোহিঙ্গাদের জন্য আমরা ভারাক্রান্ত। প্রতিবছর ৩৫ হাজার করে নতুন রোহিঙ্গা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি উত্তরণের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব।’
ইরাবতী আরও বলছে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) অ্যাম্বুলেন্সে করে আহত ৪১ জন রোহিঙ্গাকে মংডু হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চিকিৎসা করার মতো অর্থও তাদের কাছে নেই। এরই মধ্যে হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে।