
সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : সাতক্ষীরায় মৌসুম শুরুর আগেই সুন্দরবনে অপরিপক্ক মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে অসাধু মৌয়ালদের বিরুদ্ধে। এতে একদিকে যেমন বনজ সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে মৌমাছির প্রাকৃতিক বংশবিস্তার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের খলিশা ফুলের মধুর দেশজুড়ে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু মৌয়াল মাছ ধরার অনুমতি ব্যবহার করে বনে প্রবেশ করছেন এবং অপরিপক্ক মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে তা বেশি দামে বাজারজাত করেছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মধু সংগ্রহের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ক্রেতা আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণের আনুষ্ঠানিক মৌসুম শুরু হয়। এ বছরও তাই হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহ করায় উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি মৌমাছির বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছেন। এতে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগাম মধু আহরণের কারণে সরকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি প্রকৃত মৌয়ালরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অপরিণত মৌচাক কাটার ফলে মৌচাকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মধু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার মৌয়াল আব্দুর রহিম ও জামাল হোসেন বলেন, অপরিপক্ক চাক থেকে মধু সংগ্রহের কারণে মৌচাকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত মৌয়ালরা তাঁদের ন্যায্য আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ চোরাই মধু বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল দাবি করেন, বর্তমানে মধু সংগ্রহে বন বিভাগের অনুমতি না নিয়েই মাছ ধরার পাশ ব্যবহার করে বনে প্রবেশ করা হয়েছিল তিনি আরো বলেন এর সাথে কৈখালী স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ সহ হরি গোলে নিয়ে স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুর রহমান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে কারণ তারা গত আটই মার্চ থেকে এক শ্রেণীর অসাধু চক্রদের আদা ভাগিতে সুন্দরবনের ঢুকিয়ে ধলিসার মধু সব কেটে নিয়েছে। বিনিময়ে কিছু মধু সংশ্লিষ্টদের দিতে হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, মৌসুম শুরুর আগেই মধুর দাম বেশি থাকায় পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ১,২০০ থেকে ১,৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে এবছর।
আহরণের ব্যস্ততম মৌসুম। বন বিভাগের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অনুমতিপত্র নিয়ে মৌয়ালরা দলবদ্ধভাবে বনের গভীরে প্রবেশ করছেন মধু সংগ্রহে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন বনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা কিন্তু চাখে কাঙ্ক্ষিত মধু মিলছে না। প্রতিটি দলে থাকেন একজন অভিজ্ঞ ‘সর্দার’, যিনি বন সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং মৌচাক শনাক্তে পারদর্শী। গাছের ফুল, মৌমাছির উড়াউড়ি ও গন্ধ দেখে চাকের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এরপর ধোঁয়ার সাহায্যে মৌমাছি সরিয়ে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ করা হয় মধু। পুরো প্রক্রিয়াটি যেমন কৌশলনির্ভর, তেমনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মৌয়ালদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। প্রায়ই বাঘের আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিষধর সাপ, কুমির ও দুর্গম খাল-বিল তাদের পথকে আরো বিপজ্জনক করে তোলে। তবুও জীবিকার তাগিদে এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করে বনে প্রবেশ করেন তারা।
স্থানীয় মৌয়ালরা জানান, বছরের এই মৌসুমেই তাদের প্রধান আয় নির্ভর করে। অনেকেই ঋণ নিয়ে বনে যান, ভালো মধু সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে ঋণ শোধ ও সংসার চালানোর আশায়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যপ্রাণীর আক্রমণ কিংবা জলদস্যুর ভয়ে অনেক সময় তারা ক্ষতির মুখে পড়েন।
বন বিভাগের সাতক্ষীরা সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অনুমতিপত্র ছাড়া কাউকে বনে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি নির্ধারিত এলাকা ও সময় মেনে মধু আহরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না হয়। তবে মৌসুম শুরু হবার আগে চুরি করে মধু আহরণের সাথে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন মশিউর রহমান
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১ এপ্রিল থেকে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন এলাকা থেকে ২৪টি নৌকায় ১৬৭ জন মৌয়াল এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট ৪৬টি পাসের মাধ্যমে ৩১২ জন মৌয়াল মধু আহরণে বনে প্রবেশ করেছেন।
এদিকে, স্থানীয় বাজারে সুন্দরবনের খাঁটি মধুর চাহিদা ইতোমধ্যে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, মৌসুম ভালো গেলে সরবরাহও বাড়বে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকার মানুষ যুগের পর যুগ জীবনঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে মধু আহরণ করে আসছেন। বাঘ, কুমির ও জলদস্যুর ঝুঁকির মধ্যে তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালিত হয়। তিনি বাঘের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে, সুন্দরবনের মৌয়ালদের এই কঠোর পরিশ্রম শুধু তাদের জীবিকার উৎস নয়, দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০–২১ অর্থবছরে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে তা কমে ২০২১–২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮ কুইন্টাল এবং ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টালে নেমে আসে। তবে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, চোরাই মধু এই হিসাবের বাইরে থাকায় প্রকৃত চিত্র আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ১ এপ্রিল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগ কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। কেউ অবৈধভাবে মধু সংগ্রহ করলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনলাইন বিভাগীয় সম্পাদক- আলি আবরার , প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত