
শহিদ জয়, যশোর : ২০২৫ সালে যশোর জেলায় সংঘটিত হয়েছে অন্তত ৬০টি হত্যাকাণ্ড। পারিবারিক বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার, মাদক এবং পরকীয়াজনিত কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একের পর এক খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতির কারণেই এমন সহিংসতা বাড়ছে। তবে পুলিশ বলছে, বিচ্ছিন্নভাবে এসব ঘটনা ঘটেছে এবং অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ শনাক্ত করা হয়েছে।
যশোর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৬০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩টি, মার্চে ৬টি, এপ্রিলে ৬টি, মে মাসে ৭টি, জুনে ৮টি, জুলাইয়ে ৬টি, আগস্টে ৬টি, সেপ্টেম্বরে ২টি, অক্টোবরে ৭টি, নভেম্বরে ৩টি এবং ডিসেম্বরে ২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
গত ২২ মে অভয়নগরের ডহর মশিয়াহাটী গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন নওয়াপাড়া পৌর কৃষকদলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম। এ হত্যাকাণ্ডের পর ওই এলাকায় মাতুয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ২০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়, যা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তদন্তে জানা যায়, মাছের ঘের সংক্রান্ত বিরোধ থেকে ঘটনার সূত্রপাত হলেও এতে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এরপর ৯ জুন যশোর সদর উপজেলার ডাকাতিয়া গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মইন উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই রাতে চৌগাছার পুড়াহুদা গ্রামে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই রবিউল ইসলাম নিহত হন।
১৪ জুন অভয়নগরের নাউলি গ্রামে কুয়েতপ্রবাসী হাসান শেখকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতের স্বজনদের দাবি,পূর্বশত্রুতার জেরেই এ হত্যাকাণ্ড। একই রাতে শার্শার দুর্গাপুর বাজারে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে বিএনপি কর্মী লিটন হোসেন নিহত হন। এর চারদিন আগে ঈদের দিন শার্শার ডুবপাড়া গ্রামে ককটেল বিস্ফোরণে নিহত হন বিএনপি নেতা আব্দুল হাই।
এদিনই ঝিকরগাছার হাড়িয়া গ্রামে আরও একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। বেড়াতে এসে নিখোঁজ হওয়া ১০ বছরের শিশু সোহানার ধর্ষিত মরদেহ একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ নয়ন ওরফে নাজমুস সাকিবকে গ্রেপ্তার করে।
৯ জুলাই বাঘারপাড়ার ঘোষনগর গ্রামে সুচিত্রা সেন দেবনাথ নামের এক গৃহবধূর লাশ লেপ-তোষকের স্টিলের বাক্সের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার স্বামী তপন দেবনাথকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তে পরকীয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
১২ জুলাই রাতে যশোর শহরের ষষ্ঠিতলা এলাকায় আশরাফুল ইসলাম বিপ্লব নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, বন্ধুর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করায় তাকে হত্যা করা হয়।
এছাড়া, ৬ ডিসেম্বর গভীর রাতে তানভীর হোসেন নামে এক যুবক খুন হন। নিহতের প্যান্টের পকেট থেকে ৬১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ১৩ ডিসেম্বর যশোর সদরে প্রকাশ্যে শহিদ নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পূর্বশত্রুতার জেরেই এ ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ইসমত আরা বলেন, “বিচারহীনতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং নিজের হাতে বিচার করতে চাচ্ছে।”তিনি আরও বলেন, অপরাধের বীভৎসতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের অবচেতন মনও প্রভাবিত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার গণমাধ্যমকে বলেন,“২০২৫ সালে জেলায় ৬০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অধিকাংশ ঘটনার মোটিভ উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং জড়িত অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
প্রধান সম্পাদক: লে. কমান্ডার (অব.) রাশেদ ইকবাল, প্রকাশক আসিফ কবীর কর্তৃক জন্মভূমি প্রকাশনী লি: ১১০/২,সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু সড়ক, খুলনা থেকে মূদ্রিত ও প্রকাশিত